ঈশানী নদীর আত্মকথা

ঈশানী নদীর আত্মকথা রাজীব কুণ্ডু পূর্ব বর্ধমান জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত রাঢ় বঙ্গের একটি অন্যতম নদী হল ঈশানী। বীরভূম জেলার চিতগ্রাম-উড়ুন্দির মধ্যে এক  সারগাদা বা ক্যানেল বা জলের নালা থেকে উৎপন্ন হয়ে কেতুগ্রামের উপর দিয়ে পূর্ব বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদের সীমান্ত ঘেঁষে গোমাই , অম্বল, বেলুন, খাঁরুলিয়ার পাশ দিয়ে গঙ্গাটিকুরি গ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শিবলুনের কাছে দু ভাগে বিভক্ত হয়েও মাসিসেঁকোর কাছে  পুনরায় ঈশানী মিলিত হয়ে এর মিলিত প্রবাহটি শাঁখাইয়ের কাছে অজয় নদীতে পড়েছে। ঈশানী নদীর প্রবাহ পথের দুই পাড়ের সৌন্দর্য আমাদের মনকে মোহিত করে। শরৎকালের কাশ ফুলের বন নদীর তীরবর্তী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অপরূপ মোহময় করে তোলে। নদীর জল প্রবাহের কুলকুল – কলতান মনের গভীরে এক অনুভূতির সঞ্চার করে। বিশেষ করে পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় নদীর মনমোহিনী রূপকে যেন এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য প্রদান করে।   জনশ্রুতি আছে যে, নদীটির উৎপত্তি হয়েই ঈশান কোণে অর্থাৎ দেবতার অবস্থান যে দিকে অর্থাৎ উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হওয়ায় এর নাম হয় ‘ঈশানী নদী’ (কাঁদর)। এই নদীটি প্রাচীন কালে ‘সিঙ্গাটিয়া’ নামেও পরিচিত ছিল বলে শোনা যায় –তবে এই ধরনের নাম কেন হয়েছিল সে বিষয়ে কোন সঠিক তথ্য জানা নেই।  ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে এই ঈশানী নদীর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের দক্ষিণদিহি গ্রামের  কাছেই এই ঈশানী নদীর তীরে রয়েছে অট্টহাস সতীপীঠ তীর্থক্ষেত্র। অট্টহাস হিন্দু ধর্মের একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, এখানে দেবী সতীর অধরোষ্ঠ বা নিচের ঠোঁট পড়েছিল বলে মান্যতা রয়েছে। সংস্কৃত ‘অট্টহাস’ (প্রচন্ড হাসি) শব্দ থেকেই এই পবিত্র জায়গার নামকরণ হয়েছে বলে মনে হয়। পুরাণে উল্লেখ আছে যে , দক্ষ যজ্ঞে পতি নিন্দা শুনে সতী দেহত্যাগ করার পর শিব তার সেই নশ্বর দেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বজুড়ে তান্ডব নৃত্য শুরু করলে পৃথিবী ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। সেই সময় দেবতাদের পরামর্শে শ্রীবিষ্ণু সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীর দেহ টুকরো টুকরো করে দিলে যেখানে যেখানে সেই দেহাংশ পরে সেখানে সেখানে তৈরি হয় একটি করে সতীপীঠ। ঈশানী নদীর তীরে অবস্থিত এই অট্টহাস সতীপীঠ হিন্দুদের পবিত্র তীর্থ ক্ষেত্রে একটি অন্যতম পীঠস্থান। এই ঈশানী নদীর তীরেই অধিষ্ঠিত ভগবান শিব, যিনি এই নদীর নামে “ঈশানেশ্বর শিব”  নামে পরিচিতি পেয়েছেন। এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বহুলাক্ষ্মী মন্দির। জঙ্গল ঘেরা নির্জনে দেবী অধরেরশ্বরী বা দস্তুরা চামুন্ডা ঈশানী নদীর তীরে পূজিত হন । এই নদীর তীরেই রয়েছে তন্ত্রসাধনার অন্যতম ক্ষেত্র মহাশ্মশান। বিখ্যাত আধ্যাত্মিক লেখক প্রমোদ কুমার চট্টোপাধ্যায় ‘তন্ত্রবিলাসী সাধুসঙ্গ’ নামে একটি বইতে ঈশানী নদীর তীরে অবস্থিত অট্টহাস সতীপীঠ যাত্রা প্রসঙ্গে লেখেন, “নিরোল  বা পাচুন্দি  স্টেশনে নেমে প্রায় দেড় ক্রোশ হাঁটিতে হইয়াছিল, মাঠের উপর দিয়েই পথ, মধ্যে মধ্যে ঘনবৃক্ষলতা পূর্ণ জনবহুল গ্রামও আছে। এইরূপ দুইখানি গ্রাম ও একটি ছোট্ট খাল বা নদী নৌকায় করে পার হয়ে অট্টহাসে পৌঁছেছিলাম।” এখানে লেখক নৌকা করে যে ছোট নদীটি পার হয়েছিলেন সেটিই হল ঈশানী নদী। এলাকায় জনশ্রুতি আছে যে, কেতুগ্রামের কাছেই ঈশানী নদীর তীরে অবস্থিত গ্রাম ভৈরব তলার চণ্ডী মণ্ডপে বসে শ্রীশ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু বিশ্রাম করেছিলেন। এছাড়াও কথিত আছে যে, শ্রীশ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু যখন রাঢ় দেশে পরিভ্রমণে বেরিয়েছিলেন তখন তিনি এই ঈশানী নদীর পথ ধরেই গঙ্গার তীরবর্তী উদ্ধারন পুরে এসে পৌঁছেছিলেন এবং সেখান থেকেই শ্রীশ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু শান্তিপুরের অদ্বৈতাচার্যের  আশ্রমে পৌঁছান। ঈশানী নদীর তীরেই রয়েছে ইতিহাস প্রসিদ্ধ গ্রাম বালুটিয়া বা বাল্লহিট্টা বা বাল্লহিটা। বাংলার সেন রাজা বল্লাল সেন দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই গ্রাম দান করেছিলেন তার পুরোহিত বাসুদেব শর্মনকে, যার উল্লেখ পাওয়া যায় ঈশানীর পার্শ্ববর্তী গ্রাম  নবহট্ট বা নৈহাটিতে প্রাপ্ত নৈহাটি- সীতাহাটি তাম্র শাসনে। এই তাম্র শাসনটি ১৯১১ সালে নবহট্ট বা নৈহাটি গ্রামে পাওয়া গিয়েছিল। যেটি বর্তমানে কলকাতা মিউজিয়ামে রক্ষিত রয়েছে বলে শোনা যায়।  এই তাম্র শাসনে বালুটিয়া ছাড়াও জলসাথী, খন্ডেয়িল্লা বা খাঁরুল, মোলাদণ্ডী বা মুরুন্দি প্রভৃতি ঈশানী নদীর পার্শ্ববর্তী গ্রামের নাম পাওয়া যায়। বালুটিয়া গ্রামে বাংলার পাল যুগে  মদন পালের সময় হেমাশ্ব যজ্ঞের প্রভাবও পড়েছিল বলে শোনা যায়। এছাড়াও বালুটিয়া গ্রামে পাল ও সেন যুগের বেশ কিছু মৃৎপাত্রও পাওয়া যায়। আবার ঈশানী নদীর একটি ক্ষীণ শাখা শিবাই নদীর উপর রয়েছে বিখ্যাত মাসিসেঁকোর ধ্বংসপ্রাপ্ত ইঁটের পিলার– যা আজও অতীত ইতিহাসকে নীরবে বয়ে চলেছে। একসময় ঈশানী নদী ছিল যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম মাধ্যম। এই নদী পথ ধরে এক সময় নৌকা, ডিঙ্গা ,বড় বড় বাজরা চলাচল করত। এই নদী যেমন শান্ত -শীতল স্রোতে বয়ে চলেছে তেমনি বর্ষাকালে এই নদী রুদ্ররূপও ধারণ করে। ফলে নদীর তীরবর্তী বহু গ্রামের মানুষ প্রভাবিত হন। এই ঈশানী নদীর তীরবর্তী মানুষ তাদের মৎস্য শিকার ও কৃষিকাজের জন্য এই নদীর উপর ভীষণভাবে নির্ভর করে থাকেন। ঈশানী নদীর দুই পাড়ের বিস্তীর্ণ তৃণক্ষেত্রে এক সময় ছিল বাঘ- হরিণ- বন মহিষের বিচরণ করত। এই বিস্তীর্ণ চারণ ক্ষেত্রে একসময় বাংলার গৌড় ও মুর্শিদাবাদের নবাবরা হরিণ শিকার করতে আসত। এখনও এখানে  ‘হরিণডাঙ্গার মাঠ’ নামে একটি জায়গার অস্তিত্ব রয়েছে। বহু বছর আগে এই ঈশানী নদীতে গঙ্গা থেকে বড় বড় কুমিরও ঢুকে পড়ত। এই নদীর পথ ধরেই নদীর তীরবর্তী গ্রাম গুলোতে এক সময় ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লেখায় এই ‘ঈশানী নদী’-র কথা উল্লেখ করেছেন। বহু কবি, বোলান পালাকার, বাউল সাধক ঈশানী নদী কে নিয়ে ঈশানীর তীরে বহু গান বেঁধেছেন। ঈশানীর তীরে বসে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি ও সাহিত্যিক ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ও বহু কবিতা রচনা করেছেন। এই ঈশনী নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার  কাঁদরার কবি জ্ঞানদাস, ঝামটপুরের বৈষ্ণব কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজ, বাংলার সেন রাজা লক্ষণ সেনের মাতা হেরম্ভ দেবীর ঈশানী নদীর পার্শ্ববর্তী গ্রাম নৈহাটিতে গঙ্গা মাতার পূজা, মারাঠা বর্গী আক্রমণ সহ বহু ইতিহাস ও মহাপুরুষের জীবন গাঁথার সাক্ষী আজও বহন করে চলেছে। ঈশানী-র রূপের মাধুরী সব সময় সকলকেই মোহিত করেছে। প্রকৃতিপ্রেমী বহু মানুষ এই নদীর সৌন্দর্যের টানে ভ্রমণে আসেন। ঈশানী তার রূপের মায়ায় মানুষকে আকর্ষণ করে। যেন এক প্রকৃতির রূপমোহীনি ও অপার সৌন্দর্যের অধিকারী এই ঈশানী এক মোহময়ী নারী, যার রূপের মোহে মানুষকে তার দিকে আকর্ষণ করে। তাই এই ঈশানী সম্পর্কে বলা যায় –“নদীর স্রোত কখনও শুধু জল বহন করে না—তার সঙ্গে বহন করে অপার সৌন্দর্য, সময়, স্মৃতি ও ইতিহাস।”   তথ্যসূত্র:- লেখকের নিজস্ব গবেষণালব্ধ তথ্য ও স্থানীয় মানুষের সাক্ষাৎকার। গুগল- ইন্টারনেট। বিশেষ কৃতজ্ঞতা- প্রশান্ত রায়চৌধুরী, ফুলহক সেখ, স্বপন কুমার ঠাকুর ও সম্পর্ক মন্ডল।  চিত্র:- নিজস্ব রাজীব কুণ্ডু ঠিকানা – ধাত্রীগ্রাম, পূর্ব বর্ধমান ৷পেশায় শিক্ষক ৷ ইতিহাস গবেষক ৷ ধাত্রীগ্রামের ইতিহাস লেখক ৷ ইতিহাস বিষয়ক প্রবন্ধ লিখে চলেছেন বিভিন্ন পত্রিকাতে ৷

ঈশানী নদীর আত্মকথা Read More »

ভয়, হাতি ও মানুষের অন্তর্লোক

ভয়, হাতি ও মানুষের অন্তর্লোক‘হাওয়াভূত আর হাতির গল্প’-এর পাঠ অয়ন মুখোপাধ্যায় গত শুক্রবার, ১০ তারিখে গিরিশ মঞ্চের আলো-আঁধারি থেকে বেরিয়ে আসার পরেও আমার মাথার ভেতর অনেকক্ষণ একটা অবশ হাওয়া অদ্ভুতভাবে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কারণ গিরিশ মঞ্চে ‘হাওয়াভূত আর হাতির গল্প’ নাটকটি দেখার পর আমাদের নিজেদের সময়েরই এক অলীর রূপকথা যেন নির্মম আয়নার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। আমি স্বীকার করি, আনন্দপুর ‘গুজব’ প্রযোজিত এই নামটি আমাকে কবিতার মতো এক স্বপ্নময় বিষণ্নতার দিকে নিয়ে যায়। আর নাটকের ভেতরের কাব্যময়তা, বাস্তব ও অবাস্তব, লোককথা ও রাজনৈতিক রূপক, শিশুমন ও প্রাপ্তবয়স্কের নির্মম অভিজ্ঞতাকে এক অদ্ভুত মিশ্রণে শেষ পর্যন্ত মিলেমিশে যায়। প্রথম দেখার পর অনেকের কাছেই মনে হতে পারে নাটকটি আসলে নিছক কল্পলোকের রূপকথা। কিন্তু কাহিনির স্তরগুলো একে একে উন্মোচিত হতে দেখলে বুঝতে পারবেন, এর শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত—যেখানে নাটকের মূল সুর আজকের সমাজ, এমনকি মানুষের আবহমান সমষ্টিগত অবচেতন কে টান মারে। বাংলা লোক কথায় আমাদের কাছে ভূত শুধুমাত্র অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তা নয়; বহু সময়ই তা অদৃশ্য ভয়, সামাজিক নিষেধ এবং ক্ষমতার রূপক। বিশ্ববসু বিশ্বাস সেই দীর্ঘ লোক ঐতিহ্যকে আধুনিক রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় এক নতুন অর্থ দিয়েছেন। ফলে নাটকটি শিশুদের রূপকথার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং আমাদের সময়ের এক তীক্ষ্ণ আত্মজিজ্ঞাসায় পরিণত হয়েছে।’ কায়াহীন শরীর ও পরিমিতির ব্যাকরণ বিরতিহীন, নাতিদীর্ঘ এই নাটকের ব্যাপ্তি প্রায় এক ঘণ্টা দশ মিনিট, কিন্তু এখানে কোথাও কোনো দর্শকের মনোযোগে ভাটা পড়ে নেই বা মনোযোগে ভাটা পড়েনি। তার প্রধান কারণ পুরো নাটকের সংলাপ থেকে শুরু করে আলো কিংবা আবহসংগীতের মধ্যে থাকা এক অসাধারণ পরিমিতিবোধ। নেপথ্য সংগীত, আলোর ব্যবহার, মঞ্চ-নির্মাণ কিংবা নৈশব্দ্য—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে এক সচেতন সংযম। কোথাও অযথা আবেগের বিস্ফোরণ নেই, নেই মেলোড্রামার বাড়াবাড়ি কিংবা অতি-নাটকীয়তা। বরং প্রতিটি উপাদান যেন পরস্পরকে সংযত করে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। এই প্রযোজনার সবচাইতে বড় শক্তি অভিনেতা বিশ্ববসু বিশ্বাসের শরীরনির্ভর অভিনয়। যিনি একাধারে নাটকটির লেখক ও নির্দেশক, তিনি তাঁর শরীরকেই নাটকের প্রধান ভাষায় রূপান্তরিত করতে পেরেছেন। কখনো একজন পুরুষ, কখনো একজন নারী এবং সবশেষে হাতির ভূমিকায় অনবদ্য একক অভিনয়ে তিনি মুগ্ধ করেন। সীমিত মঞ্চসজ্জা, অল্প উপকরণ এবং নিখুঁত শরীরী অভিব্যক্তির সাহায্যে তিনি একাই নির্মাণ করেন বহুচরিত্রের এক বিস্তৃত জগৎ। আধুনিক নাট্যচর্চায় অভিনেতার শরীর যে কেবল চরিত্রের বাহন নয়, বরং ভাবনা, প্রতিবাদ ও অস্তিত্বেরও ভাষা হয়ে উঠতে পারে, সেই ধারণারই এক শক্তিশালী শিল্পরূপ দেখতে পেলাম তাঁর অভিনয়ের ভেতর। সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিশ্ববসুর অভিনয় কখনোই স্রেফ দক্ষতার প্রদর্শনী হয়ে ওঠেনি। বরং চরিত্র, কাহিনি এবং নাট্যভাবনার সঙ্গে তিনি এমনভাবে মিশে গেছেন যে, দর্শক অভিনেতাকে নয়, দেখতে শুরু করেন তাঁর নির্মিত জগৎকে। এই সংযমই প্রযোজনাটিকে দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো করে তুলেছে।ক্ষমতার জুজু ও নিষিদ্ধ আনন্দ এই নাটকের কেন্দ্রে রয়েছে ভয়। কিন্তু এই ভয় কোনো অতিপ্রাকৃত অশুভ শক্তির নয়; মানুষের তৈরি এক সামাজিক ও রাজনৈতিক নির্মাণ। মানুষ জন্মগতভাবেই হাসে, কাঁদে, ভালোবাসে, প্রশ্ন করে। অথচ ক্ষমতা যখন মানুষের এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলোকেই নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন ভয় হয়ে ওঠে তার সবচাইতে কার্যকর অস্ত্র। অনেকেই স্বৈরাচারকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মনে করেন, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা ও ব্যক্তিসত্তাকে ভয়ের আবহে আবদ্ধ করাই ক্ষমতার অন্যতম কৌশল। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে বারবার আমার মনে হয়েছে, যে সমাজ মানুষকে হাসতে ভয় দেখায়, প্রশ্ন করতে ভয় দেখায়, ভালোবাসতে ভয় দেখায়, সে সমাজ আসলে নিজের অস্তিত্বকেই ভয়ের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখে। এই প্রেক্ষিতে ‘হাওয়াভূত’ কেবল একটি কাল্পনিক চরিত্র নয়; সে ক্ষমতার নির্মিত এক অদৃশ্য জুজু। শম্ভু সেই ভয়ের গল্প শুনিয়ে এমন এক মানসিক কাঠামো তৈরি করে রেখেছিল, যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের স্বাধীনতাকেও একদিন সন্দেহ করতে শেখে। স্বৈরাচারের সবচাইতে বড় সাফল্য হলো, সে মানুষের শৃঙ্খলকে বাইরে থেকে নয়, বরং তার ভেতর থেকে তৈরি করে দেয়। ফলে হাওয়াভূতকে আর চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তার ভয় সর্বত্র ছড়িয়ে থাকে। এই ভয়কে অস্বীকার করার সাহস দেখায় মা এবং ঝুম্পা। তাদের প্রতিরোধ কোনো স্লোগানের ভাষায় আসেনি, এসেছে স্বতঃস্ফূর্ত জীবনের কান্নাহাসি আর দোল-দোলানো ফাগুনের পালায়। তারা বেঁচে থাকার অধিকার, ভালোবাসার অধিকার এবং প্রশ্ন করার অধিকারকে রক্ষা করতে চেয়েছে। এই কারণেই এই নাটকের এই দুই নারীচরিত্র নিছক ব্যক্তি হয়ে থাকে না; তারা হয়ে উঠেছে সেই সমস্ত প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি, যাদের স্বাধীনতা রক্ষণশীলতা, কুসংস্কার এবং ক্ষমতার যাঁতাকলে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।   গণেশ ও আমাদের ভেতরকার হাওয়াভূত এই জায়গাতেই নাটকটি তার সবচেয়ে গভীর দার্শনিক স্তরে পৌঁছে যায়। প্রশ্ন তোলে, ভয় কি সত্যিই বাইরে থাকে, নাকি মানুষের নিজের মধ্যেই তার বাস? এখানেই এসে উপস্থিত হয় গণেশ। সে কেবল নাটকের একটি চরিত্র নয়; সে যেন প্রকৃতির এক প্রাচীন, ধীর এবং প্রাজ্ঞ উপস্থিতি। ভারতীয় সাংস্কৃতিক কল্পনায় হাতি শুধু শক্তির প্রতীক নয়; সে স্মৃতি, স্থৈর্য, প্রজ্ঞা এবং সহাবস্থানেরও প্রতীক। তাই নাটকের গণেশ মানুষের নির্মিত কৃত্রিম ভয়ের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয় প্রকৃতির সহজ সত্যকে। তার নীরব উপস্থিতিই যেন মানুষের হিংসা, লোভ এবং ক্ষমতার দম্ভকে আরও নগ্ন করে তোলে। জঁ-পল সার্ত্র লিখেছিলেন, মানুষ স্বাধীন হতে বাধ্য; কারণ পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর তার প্রতিটি নির্বাচনের দায় শেষ পর্যন্ত তাকেই বহন করতে হয়। ‘হাওয়াভূত আর হাতির গল্প’ এই দর্শনকে সরাসরি উচ্চারণ না করেও তার নাট্যরূপ নির্মাণ করে। নাটকটি যেন আমাদের সামনে আয়না ধরে প্রশ্ন করে—আমরা কি সত্যিই হাওয়াভূতকে ভয় পাই, নাকি নিজেদের মধ্যেই তাকে লালন করি? শেষ পর্যন্ত বোঝা যায়, হাওয়াভূত কোনো অলৌকিক সত্তা নয়। সে মানুষের মনের গভীরে জমে থাকা অজ্ঞতা, কুসংস্কার, ক্ষমতালিপ্সা এবং পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসেরই আরেক নাম। আর গণেশ সেই বিস্মৃত বিবেক, যে নীরবে মনে করিয়ে দেয়, ভয় নয়, সহমর্মিতাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি। শূন্য আসন ও বিপণনের থিয়েটার নির্দিষ্ট সময়ে নাটক শেষ হয়, কিন্তু একটি মনখারাপ থেকেই যায়। প্রেক্ষাগৃহের শূন্য আসনগুলো বারবার চোখে পড়ছিল। এই মানের একটি প্রযোজনা তার শিল্পগুণের তুলনায় অনেক কম দর্শক পেয়েছে, যা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। দিনটি শুক্রবার ছিল, বৃষ্টি হয়েছিল, প্রচারেরও হয়তো ঘাটতি থাকতে পারে। কিন্তু কারণ যাই হোক, এই দৃশ্য আমাকে বাংলা থিয়েটারের বৃহত্তর সংকটের কথাই মনে করাচ্ছে। আজকাল দেখতে পাই নাটকের শিল্পমূল্যের চেয়ে অনেক সময় প্রচারের ভাষাই বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ফলে সামাজিক মাধ্যমের দৃশ্যমানতা, বিপণনের কৌশল কিংবা জনসংযোগের দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রযোজনার প্রকৃত শিল্পগুণকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। ফলে আলোচনায় থাকে পোস্টার, প্রচারাভিযান কিংবা মুখচেনা নাম; নাটকটি নিজে নয়। এই বাস্তবতার মধ্যেই ‘হাওয়াভূত আর হাতির গল্প’-এর মতো সংযমী, মননশীল এবং শিল্পসচেতন প্রযোজনাগুলিকে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে হবে আরও কঠিন লড়াইয়ের মাধ্যমে। অথচ বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, সত্যিকারের শিল্প শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞাপনের নয়, দর্শকের স্মৃতির ওপর ভর করেই দীর্ঘজীবী হয়। তাই এই প্রযোজনার সবচেয়ে বড় প্রচার হতে পারে সেই দর্শকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া অভিজ্ঞতা, যা নাটকটি দেখে তাঁকে সত্যিই আলোড়িত করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সামাজিক মাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী আলো নয়, দর্শকের দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিই একটি ভালো নাটকের প্রকৃত আশ্রয়। শেষ দৃশ্য: এক দার্শনিক উত্তরণ পরিশেষে বলব,

ভয়, হাতি ও মানুষের অন্তর্লোক Read More »

ধর্মনিরপেক্ষতা, সহিষ্ণুতা_কৌশিক দে

ধর্মনিরপেক্ষতা, সহিষ্ণুতা ও ভারতীয় সংস্কৃতি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গী কৌশিক দে   রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মননে ও দর্শনে ভারতবর্ষ কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা বা রাজনৈতিক রাষ্ট্র ছিল না; তাঁর কাছে ভারতবর্ষ ছিল এক আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক মহামিলনের তীর্থক্ষেত্র। বর্তমান বিশ্বে যখন ধর্মান্ধতা ও অসহিষ্ণুতা সমাজের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘সহিষ্ণুতা’র ধারণা আমাদের জন্য এক আলোকবর্তিকা স্বরূপ। ভারতবর্ষের আত্মপরিচয়ের মূল সুর যদি একটি শব্দে প্রকাশ করতে হয়, তবে সেই শব্দটি হবে “সমন্বয়”। এই সমন্বয়ের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, সহিষ্ণুতা এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতির অনন্ত ঐতিহ্য। রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “ভারততীর্থ”-এ ভারতবর্ষকে এমন এক মিলনভূমি হিসেবে কল্পনা করেছেন, যেখানে নানা জাতি, নানা ভাষা ও নানা ধর্মের মানুষ এক মানবিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। তিনি লিখেছেন,“হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড়-চীন,শক-হূণ-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন।”উৎস: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভারততীর্থ (কাব্যগ্রন্থ: পূরবী)এই কয়েকটি পঙক্তির মধ্যেই ভারতীয় সংস্কৃতির মৌলিক চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে কোনো জাতি বা ধর্ম অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সকলেই মিলিত হয়ে গড়ে তুলেছে ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক সত্তা। এই সমন্বয়ই প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি। রবীন্দ্রনাথের ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতিভেদমুক্ত ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ দেখা যায় তাঁর ‘গোরা’ উপন্যাসে। উপন্যাসের নায়ক গোরা প্রথমদিকে ছিল এক কট্টর হিন্দুত্ববাদী এবং রক্ষণশীল মানসিকতার মানুষ। কিন্তু উপন্যাসের শেষে যখন সে জানতে পারে যে সে জন্মসূত্রে হিন্দু নয়, বরং এক আইরিশ খ্রিষ্টান সন্তান, তখন তার সমস্ত অহংকার ও ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটে। ধর্মান্ধতার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে গোরা উপলব্ধি করে প্রকৃত ভারতবর্ষের রূপ। গোরার সেই অবিস্মরণীয় উক্তিটি রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব দর্শনেরই প্রতিফলন:“আজ আমি ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই। আজ এই ভারতবর্ষের সকলের অন্নই আমার অন্ন, সকলের পানীয়ই আমার পানীয়।” (গোরা উপন্যাস) তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ধর্মান্ধতা মানুষের চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে দেয় এবং সমাজে হিংসার বীজ বপন করে। তাঁর ‘ধর্মমোহ’ কবিতায় তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই অন্ধত্বের সমালোচনা করেছেন:“ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরেঅন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,ধার্মিকতার অহংকার যারে নাই;রূপহীন ভক্তি করে সে আপন-পর,ধর্মান্ধের চেয়ে সে যে ভালো তাই।”অর্থাৎ, তাঁর মতে একজন অহংকারী ও অসহিষ্ণু ধার্মিকের চেয়ে একজন নীতিবান নাস্তিকও অনেক শ্রেয়। ধর্ম যদি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাই শেখাতে না পারল, তবে সেই ধর্মের কোনো উপযোগিতা নেই।সহিষ্ণুতার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আপসহীন। তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মুক্ত চিন্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বিশ্বখ্যাত কাব্য “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য”-এ তিনি প্রার্থনা করেছেন,“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,জ্ঞান যেথা মুক্ত…”উৎস: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নৈবেদ্য (কবিতা: চিত্ত যেথা ভয়শূন্য)এই কবিতায় তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে সংকীর্ণতার প্রাচীর ভেঙে মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করবে। ভয়মুক্ত সমাজই সহিষ্ণুতার ভিত্তি, কারণ ভীত মানুষই সহজে বিদ্বেষে প্ররোচিত হয়। রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শও ধর্মনিরপেক্ষতার এক অনন্য উদাহরণ। শান্তিনিকেতনে তিনি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা দেশের বিভেদ ছিল গৌণ। প্রকৃতির উন্মুক্ত পরিবেশে শিক্ষার্থীরা শিখত পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা এবং মানবিক মূল্যবোধ। পরবর্তীকালে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার মূল মন্ত্রও ছিল,“যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্।”উৎস: বিশ্বভারতীর মূল মন্ত্র (উপনিষদ থেকে গৃহীত; রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক প্রতিষ্ঠানের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ) পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি নীতি ছিল না, তা ছিল আত্মার গভীর উপলব্ধি।আজ যখন চতুর্দিকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প এবং অসহিষ্ণুতার আস্ফালন দেখা যায়, তখন রবীন্দ্রনাথের এই বাণীগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে—বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যই ভারতবর্ষের শাশ্বত সত্য। ধর্ম, বর্ণ বা ভাষার ভিন্নতা কোনো বিভেদের কারণ নয়, বরং তা আমাদের সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ। লেখক — কৌশিক দেঠিকানা — কৃষ্ণনগর , নদীয়া ৷ শিক্ষকতা পেশা হলেও সাহিত্যচর্চা এবং নাটকের সাথে যুক্ত আছেন বহুদিন ৷ ছোট বড় সব রকম সাহিত্য পত্রিকায় লেখালিখি করেছেন ৷কবিতা ,গদ্য এবং প্রবন্ধ রচনায় তিনি সাবলিল ৷

ধর্মনিরপেক্ষতা, সহিষ্ণুতা_কৌশিক দে Read More »

কালনার মহিষমর্দিনী পুজো

আড়াইশো বছরের প্রাচীন কালনার মহিষমর্দিনী পুজো পুলক মণ্ডল   দেবী দুর্গার আর এক নাম মহিষাসুরমর্দিনী। সেটাই কালক্রমে রুপ নিল মহিষমর্দিনী। দেবীর এই ভিন্ন রূপের আরাধনা হয় পশ্চিমবঙ্গের পূর্ববর্ধমান জেলার কালনা শহরে।  কয়েক বছর আগেই আড়াইশো বছর পার করেছে গোটা বাংলার ঐতিহ্যপূর্ণ মহিষমর্দিনী পুজো। হাওড়া-কাটোয়া রেলপথে কালনার দূরত্ব আশি কিমি। ভাগীরথীর পাড়ে ছোট শহর কালনা। কিন্তু স্থাপত্যে ও ঐতিহ্যে রাজ্যের অন্যতম সাংস্কৃতিক পীঠস্থান। একদা বর্ধমান রাজ পরিবারের উদ্যোগে এখানে গড়ে উঠেছিল একের পর এক স্থাপত্য ও পুরাকীর্তি। তৈরি হয়েছিল শহরের শেষ প্রান্তে ভাগীরথীর পাড়ে নয়াগঞ্জ। তখনকার এই নয়াগঞ্জে ছিল ব্যাবসায়ীদের রমরমা। সারাদিন রাত তখন ভাগীরথীর ঘাটগুলিতে ভিড়ত একের পর এক পণ্য বোঝাই নৌকা আর জাহাজ। কালনা তখন দেশের মধ্যে এক নামকরা বাণিজ্যকেন্দ্র। নদীপথে চাল, ডাল, তেল, নুন সহ নানা সামগ্রী তখন কালনা থেকে যেত দেশের নানা প্রান্তে। জনশ্রুতি প্রায় আড়াইশো বছর আগে ১৭৬৪-৬৮ সাল নাগাদ এই নয়াগঞ্জেই ছিলেন ঈশ্বরী প্রসাদ পালচৌধুরী নামে এক আড়তদার। তিনি এসেছিলেন নদীয়ার রানাঘাট থেকে। সৎ ও মিশুকে মানুষ হিসেবে ব্যাবসায়ীদের মধ্যে তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল। তিনি নাকি মহিষমর্দিনী দেবীর স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে জানতে পারেন ভাগীরথীর ঘাটে ভেসে আসবে একটি কাঠের পাটাতন। ঘুম ভাঙার সাথেসাথে ঈশ্বরী প্রসাদ ছোটেন ঘাটে। দেখেন সত্যি সত্যিই একটি পাটাতন হাজির হয়েছে নদীর ঘাটে। জল থেকে তোলা হয় পাটাতন। সেকালে শহরে সংস্কৃত চর্চার জন্য ছিল অনেক টোল। খবর পাঠানো হয় টোলের পণ্ডিতদের কাছে। তাঁরা পুজোর সম্বন্ধে নানান নিদান দেন। শুধু ঈশ্বরী প্রসাদই নন, দেবীকে পুজো করতে এগিয়ে আসেন অন্যান্য ব্যাবসায়ীরাও। তাঁরা মিলিত ভাবে ঠিক করেন পুজোর জন্য ব্যাবসার লাভের একটা অংশ জমিয়ে রাখবেন। পুজোর বন্দোবস্ত হলেও ব্যাবসায়ীদের চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে দেবীর মূর্তি কেমন হবে? এইসময় আচমকাই ভবতারন পাল নামে এক যুবক এসে হাজির হন রানাঘাট থেকে নয়াগঞ্জে। তিনি জানালেন, দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়েই তিনি এসেছেন দেবীমূর্তি গড়তে। কয়েক দিনের চেষ্টায় তিনি গড়ে তোলেন দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি। প্রতিমার চালচিত্রে আঁকা হয় নানান দেবদেবীর মূর্তি। দু’পাশে রাখা হয় চামর ব্যজনরত জয়া ও বিজয়ার মূর্তি। মূর্তি গড়ার পর শুরু হয় দেবীর বাসস্থান নির্মাণ নিয়ে তোড়জোড়। কাছাকাছি এলাকা থেকে হোগলা পাতা নিয়ে এসে তৈরি হয় দেবীর মন্দির। প্রথমে চৈত্র মাসে দেবীর পুজো শুরু হয়েছিল। পরে ব্যাবসায়ীদের হালখাতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ-সহ নানা কারনে পুজোর সময় পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে এই পুজো শ্রাবণী শুক্লা সপ্তমী বা শ্রাবণী পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয়। দেবীর হোগলা পাতার মন্দির বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তৈরি হয় পাকা ও স্থায়ী মন্দির। এরপর একে একে মন্দিরকে ঘিরে তৈরি হয় বিশাল আটচালা, যাত্রামঞ্চ, নহবৎখানা, অতিথিশালা, রন্ধনশালা সহ অনেক কিছু। সময়ের সাথে বাড়তে থাকে উৎসবের জৌলুস। ব্যাবসায়ীদের পুজো একসময় সার্বজনীনে পরিনত হয়। এককালে পুজোর সময় হোরমিনার কোম্পানির স্টিমারে করে আসতো বেলোয়ারি ঝাড়। সে আলোর রোশনাইয়ে ঝলমল করত মন্দিরের ভেতর-বাহির। এখন অবশ্য সে রেওয়াজ নেই। ১৯২২ সালে রামবিহারি চাল নামে এক ব্যবসায়ির সহযোগিতায় তৈরি হয় পাকা ও স্থায়ী নহবৎখানা। মন্দিরে প্রবেশের মুখে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু নহবৎখানা তৈরি করেন স্থানীয় শিল্পী প্রিয়লাল মিস্ত্রী। সুউচ্চ এই নহবৎখানাটির ওপরের অংশটি দেখতে অনেকটা হাতলহীন পাল্কির মতো। পুজো চারদিনের- সপ্তমী থেকে দশমী। কিন্তু নহবৎখানায় ষষ্ঠীর সকাল থেকেই সানাইয়ের সুর বাজতে থাকে, শুরু হয় উৎসবের আমেজ। মন্দির লাগোয়া ভাগীরথীতে স্নান করে ভক্তরা পুজো দেন, দেবীর কাছে মানত করেন। পুজো উপলক্ষে মন্দির চাতালে জড়ো হন হাজার খানেক দুঃস্থ মানুষ, তাদের জন্য খুলে দেওয়া হয় অতিথিশালার দরজা। নিয়ম অনুযায়ী পুজোর তিনদিন মন্দির চত্বরে বসে অন্নসত্র। সপ্তমীর দিন অন্নসত্রের পর শুরু হয় চাল ও বস্ত্র বিতরন। বিশালাকৃতি আটচালার ভেতর পুজোর উপাচার নিয়ে বসেন পুরোহিত। পুজো হয় তান্ত্রিক মতে। পাশে সাজানো থাকে ভক্তদের দেবীর উদ্দেশ্যে মানত করা নানা মুল্যবান সামগ্রী। প্রতিমাকে সাজানো হয় বহু মুল্যবান সোনার অলঙ্কার দিয়ে। কথিত আছে, বহু আগে পণ্ডিতদের হাতে পুজোর সময় তুলে দেওয়া হতো ধর্মগ্রন্থ, নগদ অর্থ ও পিতলের সামগ্রী। পণ্ডিত বিদায়ের রেওয়াজ ভাঙলেও দেবীর পাশে আজও পিতলের সামগ্রী রাখার রেওয়াজ আছে।পুজোর চারদিন যে অসংখ্য মানুষ আসেন তাদের মনোরঞ্জনের জন্য রাতে হয় যাত্রাপালা, চলে দ্বাদশী পর্যন্ত। একসময় হতো ঢপ ও তরজার আসর। সময়ের সঙ্গে তা বন্ধ হয়ে গেলেও পুজোর জৌলুষ আগের তুলনায় বেড়েছে অনেক। উৎসবের একটি পুরনো রেওয়াজ পুতুল নাচ। আগে পুতুল নাচ আসত ঘাটাল থেকে। প্রায় চল্লিশ বছর যাবত তা আসে দক্ষিন ২৪ পরগণার খাগড়াকোনা থেকে। ভাগীরথীর বাঁধানো পাড়ে সুদৃশ্য পার্কে সকাল থেকে রাত অবধি চলে পুতুল নাচের আসর। উৎসব উপলক্ষে মন্দির চত্বরে প্রায় আধ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসে মেলা। একমাস ধরে চলে তার প্রস্তুতি। মহকুমা প্রশাসন, পুরসভা ও পুজো কমিটির মধ্যে হয় বৈঠক। মেলা চত্বর মুড়ে ফেলা হয় সিসিটিভি ক্যামেরায়। মেলায় প্রবেশের মুখে থাকে পুলিশ ও নানা স্বেছাসেবী সংস্থার ক্যাম্প। লাগোয়া ভাগীরথীতে পারাপারের জন্য লাইফ সেভিং বোট থেকে নানা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়। দশমীতে প্রতিমাকে নিয়ে শহর পরিক্রমার রেওয়াজ এখনও অব্যাহত। প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য আসে বিশেষ ধরনের চাকাওয়ালা লোহার একটি গাড়ি। নিচু এই গাড়িটিতে দেবীকে চাপিয়েই শহর পরিক্রমা হয়। তা শেষ হয় মন্দির লাগোয়া ভাগীরথীর ঘাটে। সেখানেই বিসর্জন। চেনা শহরটা দিন চারেকের জন্য উৎসবের আলোয় কেমন যেন অচেনা হয়ে ওঠে। মাটির প্রতিমা জাতপাতের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয়। বাতাসে কাশের দোলার এখনও ঢের দেরী। দেরী আছে শরত মেঘের আনাগোনারও। তবুও ফি বছর এইসময় শ্রাবণের পূর্ণিমা তিথিতে কালনার আকাশ-বাতাস জুড়ে থাকে শারদীয়ার আমেজ। প্রতীক্ষার প্রহর গোনে শহরবাসী থেকে অতিথিরাও।কাশফুল ফোটার আগেই যেন অকালবোধন শুরু হয়ে যায় কালনায়। ছোট এই শহরটিতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগমে যেন শারদোৎসবের আগমনী সুর বেজে ওঠে। পুলক মণ্ডল  ঠিকানা কালনা ৷ পেশায় শিক্ষক পুলক মণ্ডল সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ৷গল্প কবিতা ও প্রবন্ধ সবরকম লেখায় সাবলিল ৷ দেশ , আনন্দবাজার সহ সবরকম লিটল ম্যাগাজিনে লেখালিখি করছেন নিয়মিত ৷ নিজে নাগরিক সমাচার নামক একটি পাক্ষিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন দীর্ঘদিন ধরে ৷

কালনার মহিষমর্দিনী পুজো Read More »

কালনার রথের ইতিহাস

কালনার রথের ইতিহাস অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় আজকে উল্টো রথ সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে। কালনার জন্য এটি একটি শুভ দিন, কারণ এ বছর এই রথযাত্রা সরকারি সাহায্য পেয়েছে। রথের দিন কালনাবাসী খুব আনন্দ করেছে ৷ আসুন একবার দেখে নিই কবে থেকে কালনাতে রথযাত্রার সূচনা হয়েছিল।কালনা ছিল বর্ধমান রাজ পরিবারের কাছে বারানসী সমতূল্য পবিত্র স্থান ৷ পূর্ববর্ধমান জেলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান কালনা ৷ কালনার প্রথম রথযাত্রা জগন্নাথ বাড়ি থেকে। কালনার পশ্চিম প্রান্তে ভাগীরথীর ধারে এই জগন্নাথ বাড়ি বা মন্দির অবস্থিত। ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে রাজমাতা ব্রজকিশোরী দেবী দ্বিতীয়বার যখন পুরীধামে জগন্নাথ দর্শন করতে গমন করেছিলেন, সে সময় তার নিজের মনের মধ্যে কালনাতে গঙ্গার তীরে একটি জগন্নাথ দেবের মন্দির প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা তৈরি হয়। তার এই ইচ্ছাকে মর্যাদা দিতে রাজা কীর্তিচন্দ্র আনুমানিক ১৭৩২—৩৩ খ্রিস্টাব্দে অম্বিকা কালনার গঙ্গার খাত থেকে উচ্চ স্থানে জগন্নাথ দেবের দালান কোঠা মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। পরের বছরেই দুটি বিশাল রথও নির্মাণ করা হয়েছিল। গঙ্গার ধারে বিশাল এই দুটি রথের অবস্থান দেখে গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণরত রেভারেন্ড জেমস লং লিখেছিলেন যে,ভাগীরথীর তীরে তিনি যে দুটি বিশাল, বিশাল রথ দেখেছিলেন, তা এত বড় ছিল যে, এর নিচে ডাকাতেরা মানুষ খুন করে লুকিয়ে থাকতে পারে। জগন্নাথ দেবের মন্দির প্রতিষ্ঠার আগে জানা যায়, ওই স্থানে একটি ছোট আকারের জগন্নাথ মন্দির ছিল। শোনা যায়, রাজা কীর্তিচাঁদ হুগলি জেলায় অবস্থিত ভান্ডারহাটির জমিদারি লুট করে ধনসম্পদের সঙ্গে জমিদারের গৃহদেবতা জগন্নাথ দেবের মূর্তিটি কালনায় নিয়ে এসে গঙ্গার এই স্থানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। লুট করে আনা জগন্নাথ দেবের মূর্তিটিকে সেই সময়ে “লুঠের জগন্নাথ” বলা হতো। রাজা তেজচন্দ্র বাহাদুরের উদ্যোগে যে একটি ছোট রথ তৈরি হয়েছিল, সেই রথে রাধাকৃষ্ণের সাথে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা এনাদেরকেও আরোহণ করিয়ে প্রদক্ষিণ করানো হতো। তা প্রায় উনিশশো সাল পর্যন্ত অস্তিত্ব যুক্ত ছিল। তা যখন বড় দুটো রথ এসে গেল, তখন ছোট রথের জনপ্রিয়তা কমে গেল। এই বড় বড় রথ দুটি বদর সাহেবের ঘাট থেকে জগন্নাথ বাড়ি পর্যন্ত পুরাতন কালনা বর্ধমানের যে রাস্তা, সেই রাস্তা ধরে যাত্রা করত। অর্থাৎ, সেই রাস্তা ধরে রথযাত্রা হত। সেই সড়ক আর বর্তমানে নেই। ভাগীরথী নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তো, ওই সময়ে রথ টানার জন্য বর্ধমান থেকে এই পথ ধরে রাজার হাতি আসত। কালনাতে তখন রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিশাল উন্মাদনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ত। প্রথমে রাজবাড়ির রথের টান সম্পূর্ণ করে, হাতি জগন্নাথ দেবের রথ টানার জন্য চলে আসত। জগন্নাথ দেবের এই রথ ছিল পাঁচ তলা বিশিষ্ট। বিশাল তাদের চেহারা দেখলে সম্ভ্রম জাগতো। একটি রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা এবং অপরটিতে রঘুনাথ ও অন্যান্য দেবতারা আরোহণ করতেন। আনুমানিক ১৯৩৯—৪০ সালে, রথ দুটিকে সমাজ বাড়ির সামনে, দিঘির পাড়ের রাস্তায় নিয়ে আসা হয়েছিল। জগন্নাথ বাড়ি থেকে দেবতাদের এখানে নিয়ে এসে রথে চড়ানো হতো। হাবু সাহার বাড়ির সামনে থেকে জাকেরিয়া বিল্ডিং পর্যন্ত রথ দুটি তখন টানা হতো। উনিশশো ছেচল্লিশ সালে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দাঙ্গা জামালপুর অঞ্চল পূর্বস্থলী থানা থেকে আরম্ভ হয়ে নোয়াখালী, পূর্ব বাংলা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। সম্ভবত নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বর মাস নাগাদ, জনৈক দুষ্কৃতী সন্ধ্যা রাতে কালনার এই দুটি রথের ছাউনিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। পাশের দিঘি থাকা সত্ত্বেও একটি রথ প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। অপরটি অর্ধদগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা বন্ধ হয়ে যায়। কালনায় দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রা ছিল রাজবাড়ীর লালজির রথযাত্রা উৎসব। রাজবাড়িতে তিনটি রথ ছিল এবং তাদের পৃথক পৃথক নামও ছিল। লালজী যেটায় চাপতেন, সেই রথটির নাম ছিল গরুধধ্বজ। উচ্চতায় বাইশ হাত। কৃষ্ণচন্দ্র যেটাই চাপতেন, সেটির নাম ছিল **লাঙ্গলধ্বজ**; উচ্চতা একুশ হাত। এবং গোপালজী যেটাই চাপতেন, সেটির নাম ছিল **পদ্মধ্বজ**; উচ্চতা কুড়ি হাত। এই রথ তিনটি নির্মিত হয়েছিল রানী বিষ্ণুকুমারী দেবীর উদ্যোগে। এই তিনটি রথ টেনে নিয়ে যেতে বর্ধমান রাজাদের হাতি আসতো কালনায় । মহারাজার বন্দুকধারী সিপাহীরা পোশাক পরিহিত অবস্থায় সারিবদ্ধভাবে রথকে রাজকীয় কায়দায় পাহারা দিয়ে নিয়ে যেত। এখানে রথ টান শেষ হলে, এই হাতিগুলি চলে যেত জগন্নাথ বাড়ির রথ টানতে। উনিশশো পঞ্চাশ সাল থেকে বর্ধমানের থেকে হাতি আসা বন্ধ হয়ে গেছিল। লালজি বাড়ির অভ্যন্তরে যে রথগুলি থাকতো, সেগুলি মেরামতের অভাবে ক্রমে ক্রমে স্থবির হয়ে পড়লো। সেগুলি মেরামতির জন্য কোনো উদ্যোগ সে সময় নেওয়া হয়নি। কালক্রমে রথগুলি মাটিতে বসে যায়। সেই অবস্থাতেও কয়েক বছর লালজি, কৃষ্ণচন্দ্র এবং গোপালজিউদের রথে বসিয়ে নিয়ম রক্ষা করে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়েছিল। তারপর উনিশশো সত্তর একাত্তর সালে রাজবাড়িতে অবস্থানরত বন্যাপীড়িত মানুষেরা ভগ্নরথের উই ধরা কাঠ রান্নার কাজে ব্যবহার করে।এইভাবে একটা গৌরবময় ঐতিহ্যপূর্ণ ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। দীর্ঘ সময় পর, দুই হাজার আট সালে, রাজবাড়ি সংলগ্ন এলাকার অধিবাসীরা পুনরায় রথ কমিটি তৈরি করে রথযাত্রার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগী হন। বর্তমানে কালনার রথটি জনসাধারণের সংগৃহীত টাকাতেই তৈরি। এই লোহার রথটির উচ্চতা পনেরো ফুট। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ভাষাপথের সম্পাদক এবং সব রকম লেখার সাথে যুক্ত ৷ বর্তমানের ভাষাপথ বিষয় ভিত্তিক সংখ্যা করছে ৷ বাসভূমি কালনা ৷ পেশা শিক্ষকতা ৷

কালনার রথের ইতিহাস Read More »

রথ এবং রথযাত্রা

ইতিহাস, পুরাণ এবং ধর্মতত্ত্বের প্রেক্ষাপটে জগন্নাথদেব রথ এবং রথযাত্রা সিদ্ধেশ্বর আচার্য্য রথ একটি প্রাচীন যান। বৈদিক এবং রামায়ণ মহাভারতের যুগে এই যানটির উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন গ্রীস, রোম সাম্রাজ্যে এই যানটি যুদ্ধ বিগ্রহ এবং মনুষ্য স্থানান্তরের কাজে ব্যবহার করা হত। প্রাচীন মিশরেও এই যানটির ব্যবহার দেখা যায়। প্রায় সব দেশের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে এবং মহাকাব্যে রথ নামক যানটির নির্মাণের কৃৎ কৌশল ও গঠনের বর্ণনা দেওয়া আছে। বেনহুর চলচ্চিত্রে রথের (Chariot) প্রতিযোগিতার দৃশ্যে প্রাচীন কালে রোমান সাম্রাজ্যের রথের অবয়ব সম্বন্ধে একটা স্পষ্ট ধারণা করা যায়। আমাদের দেশে রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী গ্রন্থে যোদ্ধাদের রথ আকাশ পথে পুষ্পক রথ আখ্যায়িত হয়ে শূণ্য মার্গে  পরিভ্রমণ করতো। সাত ঘোড়ায় টানা রথে সূর্যদেব প্রতিদিন বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড পরিভ্রমণ করে চলেছেন। আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থে এই সব রথের যে বর্ণনা দেওয়া থাকে তার সঙ্গে বর্তমান জগন্নাথ দেবের রথ এবং ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে দেবদেবীকে বিভিন্ন সময়ে যে রথে চাপানো হয় তার আকৃতি এবং গঠন এক নয়। প্রাচীনকালে ভারতে বা ইউরোপে রথের চেহারার বর্ণনা সাধারণত দেখা যায় একটি দু চাকার যান, মাথার উপরে একটি ছত্র থাকে, (ইউরোপে ছত্র প্রায় থাকে না) পিছনের দিক আচ্ছাদন থাকে এবং তিনদিক উন্মুক্ত। এক বা দুজন আরোহী এবং একজন চালকের স্থান সংকুলান হয়। আদিম সভ্যতায় চাকা আবিষ্কারের পরই মানুষ গতিকে আয়ত্ব করতে সক্ষম হয়েছিল। চাকা ব্যবহারের বিবর্তনের ফল স্বরুপ দুই এবং দুয়ের অধিক চাকা যুক্ত করে নানা ধরণের যান নির্মাণ হয়েছে। এই রথ (Chariot) হল আদিম যানের রূপান্তরিত শকট। মনে হয় সর্বপ্রথম এই আদিম যানটির সঙ্গে দুই এবং ততোধিক চাকা যুক্ত করে যানটি পাটাতনের উপর মন্দির (দারু নির্মিত) স্থাপনা করে রথ (Chariot) যানটির নব রূপায়ন এই ভারতবর্ষেই আবিষ্কার (Discover) হয়েছিল। ভারতীয় এই রথকে অনেক ঐতিহাসিক Temple Car হিসাবে নামকরণ করেছেন। ভারতে দেবতারা যে রথে আরোহন করেন সেটি মন্দিরযান। শব্দকল্পদ্রুম থেকে জানা যায় সূর্যদেব যে রথটি ব্যবহার করেন সেটি হল পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন রথ (কোনারকের সূর্য মন্দির রথ দ্রষ্টব্য)। ভবিষ্য পুরাণ মতে ভাদ্রমাসের শুক্ল পঞ্চমী তিথিতে সূর্যদেবের রথযাত্রার বিধি পালনের নির্দেশ রয়েছে। ঐ পুরাণেই উল্লেখ আছে ভক্ত প্রহ্লাদ বিষ্ণুর রথ প্রথম টেনেছিলেন, পরে গন্ধর্বরা টেনেছিলেন। বামদেবেশ্বর তন্ত্রে দেবী ভগবতীর প্রতি মাসেই রথ যাত্রার কথা বলা আছে। এই জাতীয় ষোল প্রকার রথযাত্রার উল্লেখ এই পুরাণ গ্রন্থে রয়েছে। এই সব ধর্মগ্রন্থে বলা আছে মানুষ রথযাত্রায় অংশ গ্রহণ করলে সংসার চক্র থেকে চিরকালের জন্য মুক্তি প্রাপ্ত হয়। “রথস্থং বামনং দৃষ্টবা/পুনঃ জন্ম ন বিদ্যতে।” যাত্রাতত্ত্ব গ্রন্থে বিষ্ণুর বারো রকম রথ যাত্রার উল্লেখ আছে। হরিভক্তি বিলাস গ্রন্থে কার্ত্তিক মাসে বিষ্ণুর রথ উৎসবের বর্ণনা দেওয়া আছে। শিবের রথযাত্রার কথা গদাধর পদ্ধতিতে রয়েছে। তাঁর রথের বিশেষত্ব হল রথটির রং সাদা এবং চার তোরণের চারটি স্বর্ণকলস ও স্বর্ণদীপ দ্বারা সজ্জিত থাকে। প্রতিবেশী হিন্দু রাজ্য (বর্তমানে প্রজাতন্ত্র) নেপালে দেবী যাত্রা, কুমারী যাত্রা, ভৈরব যাত্রা, মৎসেন্দ্রনাথ যাত্রা এই রকম বিভিন্ন প্রকার রথযাত্রা বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু ধর্ম ছাড়া বৌদ্ধ ধর্মেও রথযাত্রার উল্লেখ আছে। বুদ্ধদেবের মূর্তি রথে বসিয়ে হর্ষবর্দ্ধনের রাজত্বকালে (৬০৬-৬৪৭ খ্রীঃ) রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বৈশাখী পূর্ণিমায় রথযাত্রার কথা ভারত ভ্রমণকারী ফা হিয়েনের বিবরণে পাওয়া যায়। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন জগন্নাথ দেবের অন্যস্থানে (মাসির বাড়ি) কিছু দিনের অবস্থান বৌদ্ধ ধর্মের আচরণের অঙ্গীভূত অনুষ্ঠান। কিছু ঐতিহাসিকের মতে বৌদ্ধ ত্রিরত্নের মধ্যে সংঘ নারী রূপে বুদ্ধদেব এবং ধর্মের মধ্যস্থলে অবস্থান করায় জগন্নাথদেবের মূর্ত্তি ত্রিরত্নের রূপান্তরিত এক দেবতা। তিব্বতে লামারা ছোট তুলসী মঞ্চের মতন কালো, হলুদ এবং সাদা রং-এর স্তুপ ত্রিরত্ন বা পরমেশ্বরা (পরমেশ্বর) বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘের প্রতীক হিসাবে পূজা করেন। এই স্তুপগুলির প্রত্যেকটিতে চোখ এবং ঠোট এঁকেছিলেন ওনারা জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা কল্পনায়। অনেক ঐতিহাসিক জগন্নাথ দেবকে বুদ্ধের অবতার বলে মনে করেন (কাশ্মীর ও তিব্বতে স্বামী অভেদানন্দ) অর্থাৎ জগন্নাথ বিগ্রহ বুদ্ধদেবেরই রূপান্তর। Chember’s Encyclopedia (Vol-II) বলা হয়েছে ‘There is much in rites at Puri to countenance the idea that though professedly Hindu if is realy a Bud-dhist shrine.’। শ্রীকৃষ্ণ বুদ্ধরূপে জগন্নাথ নামে প্রতিষ্ঠিত এই তত্ব দারুব্রহ্ম এবং শূন্য সংহিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উড়িষ্যায় এক সময় বৌদ্ধ প্রভাব প্রবল ছিল (সম্রাট অশোকের সিংহাসন লাভ ২৭৩ খ্রীঃ পূর্বাব্দে) এবং ২৬০ খ্রীঃ পূর্বাব্দে কলিঙ্গ জয়)। বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবতা তারা, হেরুক, অপরাজিতা প্রভৃতি হিন্দুদেরও পূজ্য দেবতা। ড. মায়া ধর মনে করেন রামানুজ বুদ্ধ এবং বিষ্ণুকে একত্রিত করেছেন। এটা ঐতিহাসিক ভাবে স্বীকৃত হিন্দু তন্ত্রশাস্ত্রের বহুমত যেমন বৌদ্ধধর্মে অনুপ্রবেশ করেছে তেমনি বৌদ্ধ ধর্মের বহু ধারণা হিন্দু ধর্মও ধারণ করেছে। বৌদ্ধ পূর্ব্ববর্তী ধর্ম জৈন ধর্মের মধ্যে রথযাত্রার প্রচলন ছিল। পুরাণ মতে জরা নামে এক ব্যাধের বাণে শ্রীকৃষ্ণর মৃত্যু হলে তিনি দেহটি সমুদ্রতীরে ফেলে রেখে পঞ্চভূতে বিলিন হয়ে স্বর্গে চলে যান। পৃথিবীর নিয়মানুসারে তার দেহটি ধ্বংস হলেও তাঁর হৃৎপিণ্ডটি একটি কাষ্ঠ খন্ডে রূপান্তরিত হয়ে সমুদ্রতীরে পরে থাকার পর স্কন্ধ পুরাণের উৎকল এবং পুরুষোত্তম খন্ডে বর্ণিত মতানুসারে শবরপতি বিশ্বাবসু স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত হয়ে ঐ কাষ্ঠ খন্ডটি নীলগিরি পর্ব্বতের এক গুহায় স্থাপনা করে দীর্ঘদিন নীল মাধব জ্ঞানে পূজা করেছিলেন। বিশ্বাবসু জাতিতে অনার্য ছিলেন। তাঁর তিরোধানের পর নীলমাধবও গুহা থেকে অন্তর্হিত হন। পরে পুরীধামে জগন্নাথ মূর্ত্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন (Evolution of Sakti Cult & Tara)। এই সূত্রানুসারে জগন্নাথদেব হলেন মূলত অনার্য দেবতা তাই জগন্নাথদেবের ভোগের উপাচারে এবং শ্রীক্ষেত্রে আচার বিচারে কিছু অনার্য রীতিনীতি বিদ্যমান রয়েছে। পুরীতে স্পর্শদোষ নেই এবং মধ্যযুগীয় হিন্দু সংস্কার এঁটো এবং একাদশীর নিয়মকানুন এখানে অচল। যদিও মন্দিরে অহিন্দুর প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, কিন্তু রথযাত্রা উপলক্ষ্যে পুরীধামে উচ্চনীচ সর্ব্ব ধর্মের সকল মানুষ রথের কাছি স্পর্শ করতে পারেন। হিন্দু দর্শনে মনুষ্য দেহকে রথের সঙ্গে তুলনা করেছে। কথোপনিষদে বলা হয়েছে..   “আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেবতু। বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি মনঃ প্রগ্রহমেব চ।।” আত্মাকে রথস্বামী এবং নিজ দেহকে রথ বলে উপলব্ধি করতে হবে। দেহরূপ রথে অবস্থান করছেন আত্মা যিনি পরমাত্মার অংশ দেবতা স্বরূপ। সৎবুদ্ধি দ্বারা মনকে সঠিক পথে পরিচালনা করলে মনুষ্যশরীর রূপ রথে অবস্থান আত্মা সঠিক পথ গমন করে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হতে পারে। আবার শাস্ত্রে একথাও বলা হয়েছে… “ইন্দ্রযানি হয়ানাপুর্বিষয়াং স্তেষু গোচরান। আত্মেন্দ্রিয় মনোযুক্তং ভোক্তেত্যাহুর্মনী যিনঃ।।” বিবেকবান ব্যক্তিরা শরীরের ইন্দ্রিয় সমূহকে দেহ রথের অশ্বরূপ কল্পনা করেন আর আমাদের চারিদিকে ভোগ্য বিষয়বস্তু হল সেই পথ যার মধ্য দিয়ে আমাদের দেহ রথ গমন করে। শরীর ইন্দ্রিয় এবং মন, এই ত্রয়ীর সমন্বয়ে আত্মা সুখ ও দুঃখ অনুভব করে থাকে। মন সংযত না হলে দেহের ইন্দ্রিয় সকল সংযত হয় না। সকল ধর্মের নির্দেশিকায় বলা রয়েছে নিজেকে সংযত কর। এবং সংযমী হও। রথযাত্রা নিছক অন্ধভাবে ধর্ম পালন নয়, গভীর তত্বজ্ঞানের বিষয়। আরো একটু গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে জগন্নাথ সপরিবারে নিজ মন্দিরালয় থেকে বাহির হয়ে মাসির বাড়ীর উদ্দেশ্যে (পুরীধামে গুন্ডিচা বাড়ি) গমন এবং সেখানে ৭দিন অবস্থান করে অষ্টমদিনে নিজ আলয়ে প্রত্যাবর্তন, পৃথিবীতে কোন দেবতার এই ধরণের ভ্রমণের নজির নেই যেখানে পুজিত দেবতারা নিজ আলয় (মন্দির) থেকে বাৎসরিক ভ্রমণে বাহির হন।

রথ এবং রথযাত্রা Read More »

সবাই ভালো

সবাই ভালো শ্রী রায় গ্রামের ধানক্ষেতের মাঝখানে, পাকারাস্তা থেকে একটু ভিতরে একটা তালগাছ ছিল। বেঁটে খাটো গাছ। তাল হতো না। কেবল জট বের হতো। ওগুলো আসলে তালগাছের ফুলের মঞ্জরী। শুকিয়ে গেলে জটার মতো দেখতে হতো। জোরে বাতাস বইলে ঝরে পড়ত মাটিতে। সেই গাছটায় বছর দুয়েক ধরে একটা একপেয়ে একানড়ে এসে বসবাস করতে শুরু করেছে। মাঠে চাষ করার সময় চাষীরা বুঝতে পারত ঐ গাছটায় কিছু একটা আছে। অনেকে আবার রাতের অন্ধকারে ফাঁকা মাঠে তালগাছটা থেকে ঝুরঝুর করে আগুনের ফুলকি ঝরে পড়তেও দেখেছে।ভূতটা অশরীরী হয়েই ছিল, কাউকে দেখা দেয়নি কোনো অনিষ্টও করেনি বরং ও আসার ফলে চাষবাসের উন্নতি দেখা দিল। ফলে গ্রামের মানুষেরা আদর করে একানড়েটাকে তালভূত বলে ডাকতে লাগল। একদিন এক চাষীবউ নয়নতারা নাম, সে তার চাষী বরকে দুপুরের খাবার দিতে এসেছিল। তারসঙ্গে ছিল ভাত, ডাল আর আলুভাজা। চাষী সেগুলো সপ সপ্ করে খেয়ে নিল। ভাত খাওয়ার পর চাষী বউ তার শাড়ির কোঁচড় থেকে ছোট্ট একটা কৌটো বের করল। তার মধ্যে ছিল নটা তালের বড়া। চারটে চাষী খেল চারটে খেল চাষীর বউ। বাকি রইল একটা। চাষী বউ বলর-এটা কে খাবে? চাষী বসেছিল ঐ তালগাছটার নীচে। একবার উপর দিকে তাকাল। তারপর চোখ নামিয়ে একটু ভেবে বলল। -বউ, দিয়ে দে ওটা তালভূতকে। খাক্ বেচারা। বউয়ের মন খুব দরদী, সে একটা বড়া তালগাছের গোড়ায় রেখে ‘ভূতদাদা খাও’ বলে চলে গেল। চাষীওকাজে মন দিল।একটু পরে মাঠ ফাঁকা হলে তালভূত গাছ থেকে নামল। দেহ ধারণ করে বড়াটা খেয়ে দেখল। সে ভূত হবার পর কোনোদিন তালের বড়া খায় নি। খেয়ে এতো ভালো লাগল যে, আরো কটা খাবার লোভ হল। দিনেরবেলা গ্রামের ভিতরে যাবার সাহস হল না। সন্ধ্যে হলে পর গায়ে একটা সাদা ময়লা কাপড় জড়িয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে ঘুরে ঘুরে খুঁজতে লাগল চাষির বাড়ি। গ্রামে অল্প কটাই বাড়ি ছিল। এক বাড়িতে শুনতে পেল শাশুড়ি তার ছেলের বউকে খুব বকছে।-তুমি এই কাজটা একদম ঠিক করোনি বউমা। তালের বড়া কেন তালভূতকে খাওয়াতে গেলে? -মা, আপনার ছেলেই তো বলল। -আমার ছেলে বলল আর তুমি করলে? একটা কথাও তো কারো শোনো না। ও কিছু জানে নাকি? তুমি তো জানো যাকে তাকে তালের বড়া খাওয়াতে নেই আকর্ষণ হয়। মানুষ হলেও না হয় হোতো, ভূতকে গেলে খাওয়াতে? সাহস তো মন্দ নয়! -আমি এটা জানতাম না।-কিছুই শেখোনি দেখছি বাপমায়ের কাছ থেকে। এবার দেখো কী হয়। আমাকেও তো একবার জিজ্ঞাসাকরতে পারতে ? -ভুল হয়ে গেছে। এবার থেকে আর কাউকে দেবো না। এসব কথা বলে ওরা দুজনে রান্নঘরের আলো নিভিয়ে শিকল তুলে দিল।তালভূত আড়ালে একপায়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। বুঝতে পারল এই সেই বউ যে তাকে বড়া খাইয়েছিল। সে রান্নাঘরের শিকল খুলে ভিতরে ঢুকে বাসনপত্র নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগল আর বড়া আছে কিনা। একটা বাটিতে তিন চারটে ছিল। পা ছড়িয়ে মজা করে সেগুলি খেল তারপর যেই উঠতে যাবে অন্ধকার ঘরে কিছু দেখতে না পেয়ে মাথাটা তাকে রাখা একটা মাটির হাঁড়ির সাথে ঠুকে গেল। হাঁড়িটা ঠাস্ করে পড়ল আর ভাঙল।শাশুড়ি আর বউমা হ্যারিকেন হাতে ছুটে এসে দেখে সাদা কাপড় পরে কে একটা রান্নাঘরে দাঁগিয়ে আছে, সরু একখানিমাত্র পা। পা টা বড়ো দেহটা তুলনায় ছোটো, লম্বা লম্বা হাত। গায়ের রং কালচে চোখগুলো রসগোল্লার মতো। ও বাবাগো মাগো বলে দুজনে বিকট চিৎকার আরম্ভ করল।তালভূতটা বলল-ভয় পেয়ো না গো, ভয় পেয়ো না। আমি তালের বড়া খেতে এসেছিলাম। -তুই কে? না বলে ঘরে ঢুকেছিস? -আমি গো গিন্নিমা আমি। তোমাদের গাঁয়ের অতিথি। তোমাদের বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে আবার আসব। আমার ভাগটা যেন রাখতে ভুলোনা। না বলে ঘরে ঢুকেছি বলে কিছু মনে কোরোনা, চাইতে সাহস পাইনি। বউদিমণি ভালো মেয়ে তাকে বোকো না। দাদাকেও না। বলতে বলতে ভূতটা হাওয়ার মতো শাশুড়ির গা ঘেঁসে হুস করেবেরিয়ে গেল। মিলিয়ে গেল কোথায়। এদিকে শাশুড়িমা হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসল-কী সব্বোনাশ হল গো কী সব্বোনাশ হল। শেষে মাঠের ভূত ঘরে ঢুকল? যেমনি আমার ছেলেটা আস্ত গাধা, তেমনি জুটেছে তার বউটা! এখন আমাকেই একটা কিছু করতে হবে। পরদিন সকালেই ছেলের সাথে কথা বলে বউকে দিল বাপের বাড়ি পাঠিয়ে।তিনদিন পর ছেলেকে বলল-চঞ্চল বাবা যাতো, মাঠে গিয়ে তোর নতুন দাদাকে নেমন্তন্ন করে আয়। সন্ধ্যার সময় একটু ভোজ দেব। চঞ্চলকুমার মায়ের বাধ্য ছেলে, ঠিকঠাক নেমন্তন্ন করে এল। ফিরে এসে মায়েরকথামতো মামারবাড়ি গেল দাদুকে দেখতে।সেদিন বিকাল থেকেই তোড়জোড় শুরু হল। বড়ো তে আঠিয়া তাল ছুলে তাতে নারকেল কোড়া, চালের গুঁড়ো, আরো সব ভালো ভালো জিনিস দিয়ে তালের বড়া ভাজতে বসল চঞ্চলের মা পরীবালা দাসী। সুন্দর খাবারের গন্ধে বাতাস ম ম করছে ছেলে বুড়ো ছুটে এল খাবে বলে। পরীবালা সক্কলকে ফিরিয়ে দিল ‘কালকে এসো’ বলে, আজ আমার ঘরে অতিথি আসবে। তাকে না দিয়ে কাউকে দিতে পারব না।এদিকে একানড়েটা গন্ধে গন্ধে ঠিক এসে হাজির হল। জিভ দিয়ে টস্ টস্ করে জল ঝরছে কৈ হল তোমাদের? ও গিন্নিমা, দাও শিগগির। আর তো পারি না ক্ষিদে চাপতে। কী জিনিস খাওয়ালেগো, আমিও পাগল বেনে গেছি।-এই তো বাছা, হয়ে এসেছে। তা তোর কটা ফুলুরি লাগবে বলতো? এই ধরো পঁচিশটা মতো হলেই হবে তার বেশি না। খেয়ে মনের আশ মেটেনি কিনা তাই -বা,বা,বা, তাই হবে। তুই কিন্তু ঘরে ঢুকবি না। জানলা দিয়ে হাত পাতবি। আমি একটা একটা করেদেবো, তুই খাবি। ভূতটা রান্নাঘরের পিছনে জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াল। হাতটাকে লম্বা করে জানালার শিকের মাঝখান দিয়ে গলিয়ে দিল। গিন্নিমা একটা একটা করে ভাজছে আর তেল থেকে তুলেই গরম গরম ওর হাতে দিচ্ছে। উঃ আঃ করে উঠল ভূতটা। বড্ড গরম বড্ড গরম! বেশ খেতে বেশ খেতে! জিভটা পুড়ে গেল, বড্ড গরম।এই করে পাঁচ নম্বর বড়া খাওয়ার জন্য যেই আবার হাত পেতেছে গিন্নিমা বলল- চোখটা বন্ধ কর তাহলে আর গরম লাগবে না। ভূতটা বিশ্বাস করে চোখ বন্ধ করেছে ওমনি চঞ্চলের মা বড়ো লোহার ডাবু হাতাটা, যেটা দিয়ে ভাজছিল, তাতে করে অনেকটা গরম তেল কড়াই থেকে তুলে ভূতের হাতে বেশ করে ঢেলে দিল।ভূতটার প্রায় গোটা হাতটাই ঝলসে গেল। বড়ো বড়ো ফোস্কা গজিয়ে উঠল দেখতে দেখতে। আর সে কী ছটফটানি! সে কী দাপাদাপি! সে কী কাতরানি। কী করলে গো গিন্নিমা কী করলে? এমন কাজ কেউ করে? নেমন্তন্ করে এনে এমনি সাজা দিলে? দুটো তো খেতেই এসেছিলাম, ক্ষতি করতে তো আসিনি! এখন আমার কী হবে? খুঁতো হয়ে গেলাম যে, কে আমাকে মানবে? সবাই টিটকারি দেবে এখন। পরীবালা হাসি আর চেপে রাখতে পারে না। ফিক্ ফিক্ করে হাসি দমকে দমকে বেরিয়ে আসছে। দেখ কেমন মজা! আর আসবি আমাদের বাড়ি? আবার যদি এবাড়ির ত্রিসীমানায় পা দিয়েছিস; কী আমার ছেলে, ছেলেবউয়ের দিকে নজর দিয়েছিস; এর থেকেও ভয়ানক কিছু হবে বলে দিলাম। আমার নাম পরীবালা! আমাকে সবাই যমের মতো ভয় খায়। তুই তো কোন ছাড়! তোর বাপঠাকুরদাও তোকে বাঁচাতে পারবে না।ভূতটা এবার বেজায় রেগে গেল। একে পোড়ার জ্বালা তার উপর পরীবালার কথার

সবাই ভালো Read More »

জীবন কৃতী সম্মান সিদ্ধেশ্বর আচার্য্যর

জীবন কৃতী সম্মান সিদ্ধেশ্বর আচার্য্যর বেশ কিছু দিন ধরেই অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে আছেন ৷ এর মধ্যে কিডনি জনিত অপারেশনও হয়েছে কলকাতার একটি নামী বেসরকারী হাসপাতালে ৷ কালনাতেও ভর্ত্তি ছিলেন একটি নার্সিংহোমে ৷ এ অবস্থায় তিনি বাইরের জগতের থেকে অনেকটাই দূরে আছেন ৷ এ অবস্থায় গত ০৭ই জুন ২০২৬-এ সিদ্ধেশ্বর বাবুর বাড়ি গিয়ে তাঁকে সম্মানিত করে এলেন ভাষাপথের একদল সদস্য ৷ উল্লেখ্য তিনি নিজেও ভাষাপথের প্রধান উপদেষ্টা ৷ তাঁর বাড়িতে গিয়ে সস্ত্রীক সিদ্ধেশ্বর বাবুকে সম্মানিত করে আসেন পত্রিকা সম্পাদক অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় , কালনা মহকুমা ইতিহাস ও পুরাতত্ব চর্চা কেন্দ্রের সম্পাদক বিশ্বজিৎ গাইন , কালনা যোগা সেন্টারের কর্নধার অদীপ চট্টোপাধ্যায় এবং থ্যালাসেমিয়া যোদ্ধা মধুসুদন দাস ৷ শ্রী সিদ্ধেশ্বর আচার্য্য বহুদিন থেকেই কালনাতে বসে ইতিহাস ও অন্যান্য পুরাতত্ব বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন ৷ নিয়মিত লেখাও তিনি লিখেছেন সারা ভারতের ছোটো বড় পত্রপত্রিকাতে , বেশকিছু বই আছে তাঁর ৷ তাঁর দীর্ঘদিনের এই লেখালিখি এবং পত্রিকা পরিচালনাতে প্রত্যক্ষ সহযোগিতার জন্য ভাষাপথ থেকে দেওয়া হল জীবনকৃতী সম্মাননা এবং একটি টেরাকোটার ফলক জানালেন সম্পাদক অভিজিৎ বাবু ৷ কালনার প্রতাপেশ্বর মন্দিরের টেরাকোটা র আদলে পোড়ামাটির ফলকটি তৈরি করেছেন শিল্পী ও শিক্ষক দেবব্রত রায় ৷ পুরস্কার গ্রহণ করার পর সিদ্ধেশ্বর বাবু ভাষাপথ পরিবারের সকলকে অনেক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান ৷

জীবন কৃতী সম্মান সিদ্ধেশ্বর আচার্য্যর Read More »

ডলারের দম্ভ বনাম ফ্লেমিঙ্গোর ডানা:

ডলারের দম্ভ বনাম ফ্লেমিঙ্গোর ডানা: ট্রাম্পের জামাইয়ের বিলাসবহুল রিসর্ট ও এক অবরুদ্ধ রাজধানীর রূপকথা অয়ন মুখোপাধ্যায় দূর আলবেনিয়ার সমুদ্র উপকূল। নোনা বাতাস আজ ভারী। সেখানে হঠাৎ ডানা ঝাপটাচ্ছে একঝাঁক ফ্লেমিঙ্গো। এই গোলাপি ডানা আজ শুধু ওড়ার জন্য ছটফট করছে না। তারা যেন এক কর্পোরেট কফিনের ওপর মৃত্যুর পরোয়ানা লিখছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার অলিন্দে জ্যারেড কুশনারের বাস। সম্পর্কে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই। এই কুশনারের লোভী চোখ পড়েছে আলবেনিয়ার শান্ত প্রকৃতির বুকে। কুশনার সাহেবদের ডলারের পাহাড় আছে। তাঁদের কাছে আলবেনিয়ার এই নোনা জল আর পরিযায়ী পাখির কলকাকলি নেহাতই এক ফালতু বিলাসিতা। তাই সেখানে মাথা তুলবে দশ হাজার ঘরের এক দানবীয় বিলাসবহুল রিসর্ট। প্রকৃতির ফুসফুসটা খুবলে নিতে চাইছে কুসনার সাহেব। সেখানে বসানো হবে কংক্রিটের এক কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড। কিন্তু হিসাবের খাতায় একটা মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছেন এই মার্কিন ধনকুবের। তিনি ভুলে গেছেন এক আশ্চর্য আদিম প্রতিরোধের কথা। পুঁজির দম্ভ যেখানেই প্রকৃতিকে রক্তগঙ্গায় ভাসাতে চাইছে, ঠিক সেখানেই গড়ে উঠছে প্রতিরোধ । বলকান অঞ্চলের এই ছোট দেশটার সাধারণ মানুষ আজ ঘর ছেড়ে রাজপথে নেমেছেন। রাজধানী তিরানা আজ অবরুদ্ধ। কোনো সেনাবাহিনীর বুটের তলায় এই অবরোধ হয়নি। রাজপথ থমকে গেছে খেটে খাওয়া আমজনতার এক অভূতপূর্ব মিছিলে। তাদের হাতে কোনো মারণাস্ত্র নেই। বুকে ধরা রয়েছে স্রেফ এক-একটা ফ্লেমিঙ্গো পাখির ছবি। এ লড়াই শুধু জল আর জমির নয়। এ লড়াই আসলে এক করপোরেট মস্তানির বিরুদ্ধে মানবতার শেষ জেহাদ। এই কর্পোরেট বাবুদের মানসিকতা দুনিয়ার সব প্রান্তেই এক রকম। ওয়াশিংটনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে আলবেনিয়ার ম্যাপের ওপর পেনসিল দিয়ে দাগ কাটা হচ্ছিল। তখন কুশনার বা তাঁর পারিষদদের মাথায় ছিল স্রেফ খাঁটি মুনাফার অঙ্ক। কতগুলো ঘর হলে কত ডলার আসবে, কোন কোন অ্যাঙ্গেল থেকে সমুদ্রের ভিউ সবচেয়ে ভালো পাওয়া যাবে— এই ছিল তাঁদের গবেষণার বিষয়। অথচ ভাবুন ওই জলাভূমির তলায় কত হাজার বছর ধরে একটা আস্ত বাস্তুতন্ত্র বেঁচে রয়েছে, তা নিয়ে তাঁদের কোনও মাথাব্যথা নেই। কত বিপন্ন প্রাণীর ওটাই শেষ আশ্রয়, সেই খতিয়ান দেখার সময় ও তাঁদের নেই। পুঁজিবাদ কখনো প্রকৃতির ভাষা বোঝে না। সে বোঝে শুধু লভ্যাংশের ভাষা।তারা ভেবেছিল একটা অনুন্নত দেশের সরকারকে পকেটে পুরে নিলেই কেল্লাফতে। আইন বদলে যাবে। পরিবেশের ছাড়পত্র চলে আসবে। আর চটজলদি তৈরি হয়ে যাবে ধনীদের ফুর্তি করার স্বর্গরাজ্য। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যাওয়া এই আন্তর্জাতিক ফাটকাবাজরা মানুষের ভেতরের বারুদটাকে চিনতে ভুল করেন। তাঁরা ভাবেননি যে একটা পাখির জন্য মানুষ নিজের জীবন বাজি রাখতে পারে। এক চিলতে জলাভূমির জন্য মানুষ রাজপথে নেমে আসতে পারে। তিরানার রাজপথ আজ কুশনার সাহেবদের সেই অহংকারকে এক মস্ত বড় থাপ্পড় মেরেছে। তিরানার রাস্তা দিয়ে যদি আজ কেউ হেঁটে যান, তবে তিনি এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী থাকবেন। কোনো উগ্র স্লোগান নেই। নেই কোনো ভাঙচুরের তাণ্ডব। অথচ এক অমোঘ, নিরেট স্তব্ধতায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে গোটা রাজধানী। স্তব্ধতাও যে কত বড় প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে, আলবেনিয়ার জনতা আজ তা বিশ্বকে শেখাচ্ছে। বুড়ো থেকে শিশু, স্কুল শিক্ষক থেকে দিনমজুর— সবার হাতে শুধু ফ্লেমিঙ্গোর ছবি। এই ছবিটা আজ আর শুধু একটা সুন্দর পাখির অবয়ব নয়। এই গোলাপি ডানা আজ হয়ে উঠেছে শোষণের বিরুদ্ধে শোষিতের এক আন্তর্জাতিক প্রতীক। যখন রাষ্ট্র পুঁজির কাছে মাথা নোয়ায়, তখন সাধারণ মানুষই হয়ে ওঠে প্রকৃতির শেষ রক্ষাকবচ। শাসকেরা যখন বহুজাতিক সংস্থার দালালি করতে ব্যস্ত থাকে, তখন জনতা ঢাল হয়ে সামনে দাঁড়ায়। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, তিরানার রাজপথ মার্কিন ডলারের কাছে বিক্রি হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। যে জনতা এতকাল নিজেদের দৈনন্দিন রুটি-রুজির লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকত, তারা আজ এক মহত্তর উদ্দেশ্যে একজোট হয়েছে। আর এই একক লক্ষ্য যখন হাজার হাজার মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে, তখন সেখানে এমন এক আশ্চর্য শক্তির জন্ম হয়, যার সামনে পৃথিবীর বড় বড় সাম্রাজ্যও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। ইতিহাস সাক্ষী, এই লড়াই নতুন কিছু নয়। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাঁচানোর লড়াই থেকে শুরু করে আমাজনের জঙ্গল রক্ষার আন্দোলন— সর্বত্রই খলনায়কের চেহারাটা এক। শুধু তার নাম আর পোশাকটা বদলে যায়। আজ আলবেনিয়ায় সেই খলনায়কের নাম জ্যারেড কুশনার। তিনি ভাবছেন ট্রাম্পের নাম ভাঙিয়ে আর করপোরেট ক্ষমতার দাপটে এই গণবিক্ষোভকে বুটের তলায় পিষে দেবেন। কিন্তু জনতা যখন একবার বুঝতে পারে যে তাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত আসছে, তখন তারা সমস্ত ভয়ডর ঝেড়ে ফেলে। এক অলৌকিক প্রাচীর তৈরি করে। আলবেনিয়ার মানুষ আজ সেই প্রাচীরটাই তুলে ধরেছে তিরানার বুকে। একটা দেশের রাজধানী স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মানে শুধু ট্রাফিকের চাকা থমকে যাওয়া নয়। ওটা আসলে শোষক শ্রেণীর হৃৎকম্পনের শব্দ কে থামিয়ে দেওয়া। মার্কিন ক্যাপিটালিজমের থাবা কতদূর বিস্তৃত, তা আমরা জানি। কিন্তু আমরা এটাও জানি যে সাধারণ মানুষের একতার চেয়ে বড় কোনো শক্তি আজ পর্যন্ত কোনো ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়নি। কুশনার সাহেবরা ডলার ছড়াতে পারেন। কিন্তু মানুষের এই আদিম, অকৃত্রিম আবেগকে কিনে নেওয়ার মতো রেস্ত তাঁদের ব্যাঙ্কে নেই। লড়াইটা হয়তো দীর্ঘ হবে। একদিকে থাকবে আধুনিকতম প্রযুক্তি, আইনি মারপ্যাঁচ আর রাষ্ট্রশক্তির পরোক্ষ মদত। অন্যদিকে থাকবে স্রেফ খালি হাত, কিছু প্ল্যাকার্ড আর বুকভরা জেদ। কিন্তু এই অসম লড়াইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য। আলবেনিয়ার এই আন্দোলন আজ সীমান্ত ছাড়িয়ে পৃথিবীর সমস্ত পরিবেশপ্রেমী, সমস্ত মুক্তিকামী মানুষের বুকে এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। এটা প্রমাণ করেছে যে দুনিয়াটা এখনো পুরোপুরি করপোরেটদের চারণभूमि হয়ে যায়নি। এখনো কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রকৃতির কান্না শুনতে পান। যাঁরা একটা পাখির ডানা মেলার अधिकार রক্ষা করতে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতে পারেন। তিরানার অবরুদ্ধ রাজপথ আজ বিশ্ব পুঁজিবাদের মুখে এক জ্বলন্ত প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই লড়াইয়ের শেষ কোথায়, তা হয়তো ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কুশনারের সংস্থা হয়তো আরও অনেক আইনি চাল চালবে। হয়তো ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তর থেকে চাপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার। আলবেনিয়ার মানুষ অলক্ষ্যে একটা মস্ত বড় জয় ইতিমধ্যেই হাসিল করে ফেলেছে। তারা প্রমাণ করে দিয়েছে যে ঐক্যবদ্ধ জনতা যখন কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, তখন ক্ষমতার সিংহাসনও কাঁপতে শুরু করে। জ্যারেড কুশনার আলবেনিয়ার বুকে তাঁর বিলাসবহুল রিসর্টের একটা ইটও গাঁথতে পারবেন কিনা তা নিয়ে মস্ত বড় সংশয় তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু তার অনেক আগেই, তিরানার রাজপথে রাজপথে সাধারণ মানুষেরা প্রতিরোধের যে অভেদ্য, আশ্চর্য মিনার গড়ে তুলেছে, তার গায়ে আঁচড় কাটার সাধ্য কোনো ডোনাল্ড ট্রাম্প বা তাঁর ধনকুবের জামাইয়ের নেই। ফ্লেমিঙ্গোর গোলাপি ডানার সেই প্রতিবাদের আলোয় আজ বিশ্ব দেখছে এক নতুন রূপকথা। এখানে ডলারের দম্ভ হেরে যাচ্ছে প্রকৃতির আদিম টানে। আর শোষকের বন্দুক থমকে গেছে একজোড়া পাখির ছবির সামনে। ছবিসমৃহীত অর্ক ভাদুড়ীর দেওয়াল থেকে।  অয়ন মুখোপাধ্যায় লেখক পরিচিতি – কবি ও লেখক অয়ন মুখোপাধ্যায়। ঠিকানা – বলাগড়, হুগলী। যে সমম্ত পত্রিকাতে লিখে চলেছেন —  পরম্পরা ,বাংলা স্ট্রিট অনলাইন , গুরুচণ্ডালী  , বাংলা স্পিয়ার ,কেতাব ,ভারতের কণ্ঠ  বাঙালা নেটওয়ার্ক ,আবর্ত , আপনপাঠ , বিকল্প ,গণশক্তি ,জলদর্চি ৷

ডলারের দম্ভ বনাম ফ্লেমিঙ্গোর ডানা: Read More »

বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী

বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী মাতৃ সাধক ভবা পাগলা সত্যেন্দ্র প্রসাদ নন্দী যুগে যুগে বাংলা সাহিত্যের সম্ভারকে রত্নখচিত করে তুলেছেন বিভিন্ন মতের সাধক। বৈষ্ণব, বৈষ্ণবসহজিয়া, বাউল, মরমিবাদ, ফকিরি, সুফি এবং শাক্তপদাবলীর বিভিন্ন রচনা। ভবা পাগলা হলেন বিংশ শতাব্দীর এক জন অন্যন্য সাধক। ব্যক্তিত্বগত প্রতিভায় যে স্বাক্ষর রেখেছেন তা শুধু অনস্বীকার্য নয় গবেষকদের গবেষণার বস্তুগত উপাদান। একজন মানুষ থেকে তাঁর সিদ্ধ পুরুষে রূপান্তরের ক্ষেত্রে যে সকল বিশেষণে তাঁকে প্রতীয়মান করা হোক না কেন, সকল বিশেষণই তাঁর কাছে যেন ক্লিশে হয়ে পড়ে। তিনি তাঁর সাধনায় সিদ্ধ সাধক, মহাপুরুষে উত্তোরণ, উত্তর প্রজন্মের কাছে মহামানব। তিনি সমাজ তত্ত্ববিদদের কাছে একজন সমাজ সংস্কারক। সাহিত্য প্রতিভার স্বাক্ষরে কবি, গীতিকার। সঙ্গীত বোদ্ধাদের কাছে একজন সুরসাধক, সঙ্গীতশিল্পী, বেহালা বাদক, হারমোনিয়াম বাদক। এছাড়াও তিনি মৃৎশিল্পী, সূচী শিল্পী। আত্মভোলা এই মহামানব ভবেন্দ্র চৌধুরী থেকে আপামর শিষ্য, ভক্ত, শ্রোতা ও পাঠক সাধারণের কাছে হয়ে ওঠেন ভবা পাগলা। ভবাপাগলার সাধনকালে যে সমস্ত স্বরূপের উদঘাটন করেছেন, সেই সকল ভাবাদর্শের মধ্যে দিয়ে দর্শন ও চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক ভাবনার ভাববাদী বিশ্লেষণ করেছেন। সেই ভাবনা ও বিশ্বাসের পথিকৃত কিন্তু থেকে গেছেন আড়ালে। তাঁর জীবনচারণে যে আলোর সন্ধান করেছেন। সেই আলোর উৎসে নিজেকে নিয়ে গেছেন অসীম থেকে অনন্ত পথে, যা আসলে আজকের এই পৃথিবীর জটিল আবর্তে ঘুরে বেড়ানো মানবের কাছে চর্চিত বিষয় হয়ে পড়েছে। ভক্তি সাধনার বা আরাধনার আঙ্গিক কে নতুন পথের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এই আরাধনার পথেই তাঁর সিদ্ধ পুরুষ হয়ে ওঠার সোপান। নিজেকে জানার জন্য তাঁর প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসা এবং কর্মকান্ডকে তিনি রচনার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। প্রকাশ করেছেন নিজের উপলব্ধি যা আজ মানুষকে ভাবিয়ে তোলে- “যত খুঁজবি হারিয়ে যাবিবই পুস্তক আর চন্ডীগীতাআত্মনির্ভর এই তো ঈশ্বরখুলে দ্যাখ তোর মনের খাতা।” আত্মনির্ভরতা যে ঈশ্বরের নামান্তর সাধক কত সহজে তা বলে দিয়েছেন। মনের মধ্যে নানা রকম সংশয় থাকলে নির্ভরতা যেন সংশয়ের ঘূর্ণিপাকের মধ্যে পড়ে হারিয়ে যাবে। এই ভাবনা যেন আত্মাকে মুক্ত করে ঈশ্বরত্বে অনুধাবন করা। এই রচনাকে সামনে রেখে একটি বিষয় আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভবা পাগলাকে যতই খোঁজার চেষ্টা করা হোক তিনি কিন্তু নিজের কর্মকান্ডকে আড়ালে রেখেই হয়ে উঠেছেন অন্য আর পাঁচজন মানুষের থেকে স্বতন্ত্র। এই স্বতন্ত্র হয়ে ওঠা যেন সময়ের দিন গুনে চলেছিল। বালক বয়সেই মা কালী অবলম্বন করে এগিয়ে চলা। যত বড় হয়েছেন ততই যেন মাতৃজ্ঞানের আধারে মা কালীকে নিয়ে জীবনের ধ্রুব তারা স্বরূপ দিক নির্দিষ্ট করেছেন। জীবনের প্রতিটি কাজের সাথে জড়িয়ে পড়েছে মাতৃরূপের একাত্মতা, খেলার ছলেই হোক বা আত্মনির্ভরতার নিবেদনে, মা-এর কাছেই সকল চাওয়া পাওয়ার আকুতি। বালক বয়স থেকেই মাতৃনামের উপলব্ধিতে গানের মধ্যে দিয়ে জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, ক্রোধ-ভালোবাসা সকল অনুভুতির প্রকাশ করেছেন তাঁর রচনার মাধ্যমে। সঙ্গীতকে করে তুলেছেন মাতৃসাধনার একমাত্র উপাদান বা উপাচার হিসাবে। তিনি তাঁর গানে বলেছেন- “গানই আমার দেবী মূর্তি,গানই আমার স্ফূর্তি।” একজন সাধক তাঁর ঈশ্বর আরাধনায় বিভিন্ন উপাচার ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে সাধনক্রিয়া পরিচালনা করে থাকেন। কিন্তু ভবাপাগলা এখানেই এক নতুন ধারার দিক নির্দেশ করছেন। তিনি উপাচার হিসাবে গানকেই ভেবে নিয়েছেন। সমাজতাত্বিক ভাবনায় অন্য আরও একটি দিক নির্দেশ করে, গানকে মাধ্যম করে সমাজের অভ্যন্তরে মানুষের মধ্যে চেতনার উন্মেষ ঘটানোর প্রবল ইচ্ছা সাধকের মনোজগতে প্রতীয়মান ছিল। সেই সময়কালীন ভারত তথা বাংলা দেশের অবস্থানগত বিষয়গুলি লক্ষ্য করলে দেখা যায় জাত-পাত ধর্মীয় কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, দারিদ্রতা এবং অভাবের তাড়নায় মানুষের জীবন যন্ত্রনা সাধক জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সাধকের কাজ শুধু মাত্র তাঁর সাধনার পথে মানুষের কাছে চেতনার বার্তা তুলে ধরা। এক্ষেত্রে গানই হলো একমাত্র মাধ্যম যা এই মানুষগুলির কাছে বার্তাকে পৌঁছে দেওয়ার কাজে সহজতা তৈরি করে। গ্রাম বাংলার মানুষ লোকায়ত সাধনার নির্যাস লোক আঙ্গিকের গানের মধ্যে দিয়ে নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতার বিনিময় করে চলেছে। ভবাপাগলার মাতৃসাধনার ভাবাদর্শে জারিত হওয়া চেতনার উপলব্ধি গানের সুরে প্রকাশ করতে থাকেন। গ্রাম বাংলা তাঁর গানের কথা ও সুরে ভেসে যেতে থাকলো বিভিন্ন আসরে। তাঁর সেই সুরের নিমগ্নতায় যেন প্রকৃতি যেন ক্রমশ তাঁর কাছে এসে ধরা দিতে চাইছে। ভবাপাগলার জীবন পরিচয় সম্পর্কে যা জানা যায়, তা হল- পিতা গজেন্দ্র মোহন রায় চৌধুরী, মাতা গয়াসুন্দরী দেবী। ‘রায় চৌধুরী’ উপাধী হিসাবে পাওয়া। এই উপাধী হিসাবে রায়চৌধুরী নামের সাথে যুক্ত হওয়া মানেই জমিদারী ব্যবস্থার সাথে ভবাপাগলার পরিবার যে যুক্ত ছিল তা প্রমান হয়। মূল পদবী হলো সাহা। এই ধারণা থেকে বলা যায় ভবাপাগলা জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম কোজাগরী লক্ষী পূর্ণিমা তিথিতে শুক্রবার, তারিখ ১৩০৯ সালের ৩১শে আশ্বিন (ইংরাজী ১৯০২ সালের ১৭ই অক্টোবর)। ঢাকা জেলার ধামরাই থানার আমতা গ্রামে। আসল নাম ভবেন্দ্র মোহন সাহা (রায়চৌধুরী)। গজেন্দ্র মোহন রায় চৌধুরীর তিন পুত্র, গিরীন্দ্র, দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্র এবং এক কন্যা সন্তান সতী আগমনী। দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্র যমজ দুই ভাই। শৈশব জীবনেই ভবেন্দ্রকে দেখে পরিবারের মনে এক শঙ্কা উপস্থিত হয়। তার কারণ ভবেন্দ্র চলা ফেরা এবং পারিবারিক কালীমায়ের প্রতি আত্মমগ্নতা দেখে। আমতা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্রকে ভর্তি করা হলেও তাঁর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল না। এই নিয়ে শিক্ষকদের অভিযোগ শোনা যায়। ভবেন্দ্র পড়াশোনা বাদ দিয়ে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে কোন কিছু একটা খুঁজে চলেছেন। ভাকুটিয়া শ্মশানে যাতায়াত করতে থাকেন। আত্মভোলা ভবেন্দ্র মা কালীর প্রতি ভাবাবেশে নিমগ্ন হয়ে পড়া। এই বিষয়গুলি পরিবারের সকলকে আশঙ্কার মধ্যে রাখতো। এমতবস্থায় তাঁর দাদা গীরিন্দ্রমোহন দুই ভাইকে কলকাতায় নিয়ে এলেন। গিরিন্দ্র মোহন চৌধুরী সে সময় কলকাতায় পাটের একটি গুদামে চাকরী করতেন এবং কীর্তন গায়ক হিসাবে সুনাম অর্জন করেছেন। দুই ভাইকে কলকাতার নাম স্কুলে অর্থাৎ এরিয়ান্স স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু কলকাতায় এসেও ভবেন্দ্রমোহন একই ধারায় পরিচালিত হতে থাকলো পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে বেড়াতে থাকলো। আর তার সঙ্গে উপরি পাওনা হিসাবে দাদার সাথে বিভিন্ন কীর্তন আসরে উপস্থিত থাকা এবং গান গাওয়া। বালক ভবেন্দ্রর গান শুনে সকলেই খুব মুগ্ধ হয়ে পড়তো। কৃষ্ণ নাম ছাড়া বিশেষ করে শ্যামা সংগীতের সময়ে তাঁর ভাবের আবেশে সকলেই যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত স্থির হয়ে বসে থাকতো। মাঝে মাঝে ভবেন্দ্র মধ্যে ভাবে বিভোর হয়ে ধ্যানস্থ হয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতো। ভবাপাগলা শাক্ত সাধক হলেও তিনি বৈষ্ণবসাধনা ও শাক্ত সাধনার মধ্যে কোন প্রভেদ রাখেননি। বরং তিনি অভেদতত্ত্ব ও সমন্বয়িক সুরের জাগরণ ঘটিয়েছেন। যা আধুনিক যুগের শুরু সময়কালের এক সংস্কারমুক্ত জাগ্রত চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এই বিষয়ে একটি ধারণা আমরা দেখতে পাই কবি ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে। হরিহোড়ের আখ্যানে কবি ভারতচন্দ্র দেখিয়েছেন হরি এবং হর বা বিষ্ণু ও শিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ফলে এই সময়কালে শাক্ত কবিদের মধ্যে এই অভেদ তত্ত্বের প্রচলন ঘটেছিল। ফলত ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে কোনো তফাত নেই। এই ভাবনার মধ্যে দিয়ে জারিত হয়েছে ভবাপাগলার জীবনাচারণ। সাধকের সাধকোচিত ভাবনার রসে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এক অকল্পনীয় ছবি তৈরি করে গেছেন। তিনি লীলাকারী শক্তির দ্বারা নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন সমন্বয়ের বাহক। শাক্ত ও বৈষ্ণব বা অন্য কোন মত তাঁর কাছে ধরা মানব জীবনের বাস্তবতার নিরিখে পালনীয় কর্তব্যের ধারামতে।

বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী Read More »

Scroll to Top