নববর্ষ , হালখাতা ও প্রাচীন বাংলার বাণিজ্য

নববর্ষ, হালখাতা ও প্রাচীন বাংলার বাণিজ্য অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (ইতিহাস পাঠক ও গবেষক)   ১৪৩৩ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন ১ লা বৈশাখ যতটা না মাঙ্গলিক সংস্কৃতির পরিচায়ক তার চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্নদিন বাংলার ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ৷ বাংলা সন বা বর্ষের ইতিহাস অনেকদিনের ৷বহু প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের বঙ্গে সৌরকেন্দ্রিক বর্ষগননা হত ৷ মুঘল সম্রাট আকবর তার রাজত্বকালে দেখলেন এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন বর্ষপঞ্জী , তখন ভারতে হিজরী সন গননা পদ্ধতিও চলছে ৷ কিন্তু কর আদায়ের ক্ষেত্রে এইসব বর্ষপঞ্জী ঠিকঠাক সুবিধাজনক হচ্ছে না ফলে তিনি তার রাজ জ্যোতিষি আমির ফতেউল্লাহ সিরাজীকে এমন এক ক্যালেন্ডার তৈরি করতে বলেন যা ফসল উৎপাদনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং সৌরকেন্দ্রীক এই পঞ্জিকায় হিজরী সনেরও গুরুত্ব থাকবে ৷এর আগে হিজরী সন অনুযায়ী কর আদায় অসুবিধাজনক ছিল ৷ ফসল উৎপাদনের পর কর নেওয়াই সঠিক নিয়ম কিন্তু এ ব্যবস্থা করা যাচ্ছিল না ৷ সিরাজী সাহেব মুসলিম চন্দ্রগননা পদ্ধতি সৌরকেন্দ্রিক গননা পদ্ধতিতে সংযুক্ত করলেন ৷ ফসলি বর্ষ ক্যালেন্ডার তৈরি হয়ে গেল ১৫৮৪ সাল থেকে ৷ পরবর্তীকালে বছর শেষে পাওনা গণ্ডা মিটিয়ে দেবার রেওয়াজ তৈরি হয় ৷ সারাটা বছর চাষের পর কৃষক যেমন রাজস্ব দেবে তেমনি বণিকদলও তাদের হিসাব নিকাশ বুঝে নেবে বচ্ছরের শেষদিনটিতে ৷ কার কাছে কত পাওনা তার হিসাব লেখা আছে যে খেরোর খাতায় তা দেখে পরদিন সেইসব ক্রেতাদের ডেকে মিষ্টি মুখ করিয়ে টাকাটা বুঝে নেওয়ার বিষয়টি বছর শুরুর প্রথমদিনেই করা হতে লাগলো ৷ ১ লা বৈশাখ তাই বণিকদের কাছেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে গেল ৷ এ দিন বাঙালি ব্যবসায়ীদের মধ্যে মন্দিরে পুজো দেওয়ার হিড়িক পড়ে। একটা লাল সালুতে বাঁধানো দড়ি বাঁধা খাতা কিংবা হাল আমলের কার্ডবোর্ড বাঁধানো গণেশের ছবি দেওয়া একখান খাতা নিয়ে তারা ঢুকে যান মন্দিরে। পুরুতমশাই আবার সেই খাতা খুলে লক্ষ্মী গণেশের কাছে পুজো দিয়ে তার সামনের পাতায় তেল-সিঁদুর দিয়ে এঁকে দেন একখানা স্বস্তিক চিহ্ন আর তারপর একটা পুরানো দু’টাকার কয়েন সিঁদুরে মাখিয়ে তার ছাপ দিয়ে দেন পাতার সামনেই। তারপর প্রসাদ আর খাতা হাতে দোকান খোলেন ব্যবসায়ীরা। দোকান সাজানো হয় শোলার কদমফুল আর আমপাতা দিয়ে। নতুন বছরের প্রথম দিনে অনেকে আবার ক্রেতাদের মিষ্টিমুখও করান। পুরোনো বছরের ধার-বাকি হিসাবের জের টেনে শুরু হয় নতুন খাতা লেখা। কেউ আগের বাকি মিটিয়ে দেন, কেউ নতুন জিনিসপত্র কেনাকাটা করেন – সবই তোলা হয় সেই খাতায়। এরই নাম হালখাতা (Halkhata) । আজ অবশ্য শুধু ব্যবসার সঙ্গেই এই হালখাতার সংস্কৃতি জড়িয়ে রয়েছে, অতীতে কিন্তু তা ছিল না। কৃষিভিত্তিক সমাজে হালখাতা ছিল সম্পূর্ণ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত একটি প্রথা। হালের খাতাই ছিল হালখাতা – এই ‘হাল’ কথার মানে লাঙলের ফলা। আদিম মানুষ ঠিক যে সময় থেকে চাষাবাদ শিখলো, সেই সময় চাষ করা ফসলের বিনিময় প্রথা শুরু করল তারা আর তার জন্যেই হিসাব রাখা হতো একটি খাতায়। সংস্কৃত শব্দ ‘হাল’ মানে লাঙল আর ফারসি ভাষায় ‘হাল’ কথার মানে নতুন। ভাষাবিদরা মনে করেন ‘হাল’ কথাটি সম্ভবত দুটি ভাষা থেকেই বাংলায় এসেছে। এই রীতি বহাল রেখে ছিলেন মোগল সম্রাট আকবর। জমিদারি প্রথা তখনও বহাল রয়েছে বাংলায়। নিয়ম ছিল বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে জমিদারেরা তাদের সমস্ত বকেয়া খাজনা বা রাজস্ব জমা করবেন সম্রাটের ঘরে। সেই বিশেষ দিনে খাজনার হিসাব হালনাগাদ করা হতো। নবাব জমিদার সকলের মধ্যে আকবর এই দিনের জন্য চালু করেছিলেন ‘পুণ্যাহ’ প্রথা। মৌসুমী ফসল বিক্রির টাকা পেতেন এই দিন কৃষকেরা আর তা দিয়ে তারা পুরো বছরের বকেয়া শোধ করতো বিভিন্ন দোকানদারের কাছে। ফলে দোকানদারদের খাতায় সেই হিসেব তুলে রাখতেই হতো। সেটাই ছিল হালখাতার রীতি। তবে কি আমরা বাংলার মানুষ শুধুই কৃষিকাজ করতাম ? শিল্প ও বাণিজ্য কি শুরু হয়েছিল বেনিয়া জাতি ইংরেজদের হাত ধরে ? কারণ কলকাতায় যে বাবু কালচার গড়ে উঠেছিল তার বাবুরা প্রায় সকলেই ছিলেন ইংরেজ অনুগ্রীহিত ব্যবসাদার ৷ তাই মনে করাই স্বাভাবিক ৷ কিন্তু বছরের প্রথমদিন এটা লিখতে বেশ অহংকার বোধ হচ্ছে সেটা হল বাঙালি আসলে ছিল কৃষি ও শিল্প উৎপাদনমূখী ব্যবসায়ী জাতি ৷ বহু বহু প্রাচীন কাল থেকেই তার ব্যবসাবৃত্তির প্রমাণ পাওয়া যায় ৷ একদিকে তাম্রলিপ্ত বন্দর ,অন্যদিকে সপ্তগ্রাম , উত্তরে গৌরের নিচের অংশ এবং প্রাচীন গঙ্গার দক্ষিণ পশ্চিম পাড় এই নিয়ে ছিল রাঢ়ের বাণিজ্য অঞ্চল ৷ যে অঞ্চলের বাণিজ্যের জন্য একসময় (মুঘল শাসনের প্রারম্ভে ) বাংলা সারা পৃথিবীর লক্ষ্য ছিল ৷মঙ্গলকোট , মানকড় , উজানিনগর (কোগ্রাম ) , দাঁইহাট , কাটোয়া , মুর্শীদাবাদ , কালনা এই সমস্ত বাণিজ্য কেন্দ্রগুলি একসময় বাংলার অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল ৷ অজয় ও কুনুরের সঙ্গমস্থলের উজানি থেকেই ধনপতি ও তার পুত্র শ্রীমন্ত সিংহল যাত্রা করেছিলেন ৷এই ধনপতি ছিলেন গন্ধবনিক জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ বণিক ৷ দাঁইহাট , কাটোয়া ,কালনার অবস্থান গঙ্গা তীরবর্তী হওয়ায় বাণিজ্য কেন্দ্র রূপে পরিচিত হয়েছিল ৷ বাণিজ্য সম্মৃদ্ধি সাধরণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে বৃদ্ধি করেছিল বলেই একসময়ের অনুর্ব্বর জঙ্গলাকীর্ণ (রাঢ়ের বেশ কিছু অংশ ) রাঢ় মারাঠা দস্যুদেরও লক্ষ্যবস্তু ছিল ৷ এ অঞ্চলেই বার বার সামন্ত রাজা ও জমিদাররা ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকেই তৈরি হয়েছে ইতিহাস তার সাক্ষী ৷ স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত যে বর্ধমান রাজারা বাংলায় প্রভাব বিস্তার করে এসেছে তারাও মূলত ব্যবসায়ী ছিলেন ৷পশ্চিমপ্রদেশ থেকে ব্যবসা সূত্রে এসে বর্ধমানে স্থায়ী বসবাস করতে লাগেন ৷ গঙ্গা তীরবর্তী হওয়ায় প্রথমে দাঁইহাটকে বর্ধমান রাজারা তাদের পবিত্র স্থান হিসাবে বেছে নিলেও যখন বর্গী আক্রমন হয় তখন তারা দাঁইহাট থেকে তাদের তীর্থ অঞ্চল গুটিয়ে নিয়ে কালনায় চলে আসেন ৷কালনার সাথে এমনিতেই বর্ধমান রাজাদের পুরানো সম্পর্ক ৷ পুরানো বাণিজ্য অঞ্চল তাই কালনাতে গড়ে ওঠে একের পর এক মন্দির , প্রশাসনিক ভবন , স্মৃতি সৌধ ৷ এ গেল একটা দিকের কথা কিন্তু চন্ডীমঙ্গল বা মনসামঙ্গলে যেসব চরিত্রকে মূখ্য রাখা হয়েছিল তারা সকলেই ছিলেন ব্যবসায়িক ৷ উজানি ও চম্পকনগর এদুটি স্থানের কথা মঙ্গলকাব্যে উঠে এসেছে ৷ আর যাই হোক লোক মুখে মুখে তৈরি হওয়া কাহিনি মুকুন্দরামের সুন্দর রচনাতে পরিশীলিত হয়েছে ৷ বনিকদের যে এ বঙ্গে রমরমা ছিল তা বর্ননাগুলো পড়লেই বোঝা যায় ৷ নাম ও বাসস্থান উল্লেখ হয়েছে কাব্যমধ্যে ৷ খুল্লনার পাত্র নির্বাচনে জনার্দন পণ্ডিত বাংলার ব্যবসায়ী সমাজের বিবাহযোগ্য ছেলেদের একটা তালিকাই করে দিলেন ৷ প্রধানত রাঢ় দেশের বর্ধমান ও হুগলী অঞ্চলের বণিকদেরই নাম করেছেন কবিকঙ্কণ ৷সবচাইতে বেশি নাম পাওয়া যায় ধনপতি সওদাগরের পিতৃ শ্রাদ্ধ উপলক্ষ্যে উজানিতে বিভিন্ন স্থান থেকে যে বণিকদের সমাগম হয়েছিল তার তালিকায় ৷একে একে বণিকের কত কব নাম ৷সাত শত বেনে আইসে ধনপতি ধাম ৷বোঝা যাচ্ছে যে ধনপতি সদাগরের নিমন্ত্রণে সেদিন সাতশো বণিক হাজির হয়েছিলেন ৷ কবিকঙ্কণের তালিকা থেকে কিছুটা তুলে ধরছি — বর্ধমানের ধুস দত্ত , চম্পাইনগরের চাঁদসদাগর , লক্ষ্মী সদাগর , কর্জনার নীলাম্বর ও তাঁর সাতভাই ,গনেশপুরের সনাতন চন্দ ও তাঁর ভাই গোপাল , গোবিন্দ , দশঘরার বাসুলা , সপ্তগ্রামের শ্রীধর হাজরা , সাঁকোর শঙ্খ দত্ত ,বিষ্ণু দত্ত ও তাঁর সাত ভাই ,কাইতির যাদবেন্দ্র দাস , জাড়গ্রামের রঘূ দত্ত ,

নববর্ষ , হালখাতা ও প্রাচীন বাংলার বাণিজ্য Read More »

পথপ্রান্তের দেবমূর্তি_তথাগত সেন

পথপ্রান্তের দেবমূর্তি তথাগত সেন   বরাহ, গোকুল নগর যে কোন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নাগাল পেতে হলে সেখানকার অতীত যুগের বিবিধ উপাদানের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়, এই উপাদান গুলি সেই অঞ্চলে বা তার সন্নিহিত অঞ্চলে হয়ত এক দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চিত রয়েছে। এই সঞ্চিত উপাদান বা আরও স্পষ্ট করে বললে বিবিধ প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান সেই অঞ্চলের মানুষের সাংস্কৃতিক ইতিহাস কে বোঝার জন্য একমাত্র বিবেচিত বস্তু হতে পারে। যদিও অনেক সময় প্রচলিত লোককাহিনি বা স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনির ওপর নির্ভর করতে হয়, তবে তা কখনই মূল ইতিহাস রচনার উপাদান নয় বরং এর থেকে সহায়তা নেওয়া যেতে পারে মাত্র। ষণ্ডেশ্বরতলা, সূর্য মূর্তি আমাদের এই বাংলায় সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনার মুল পরিপন্থী হল এখানকার উষ্ণ এবং আর্দ্র আবহাওয়া, যার ফলে বহু উপাদান যেমন পুথি বা প্রাচীন লেখা বা পোড়ামাটির তৈরী উপাদান দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, সে দিক থেকে চিন্তা করলে পাথরের তৈরী প্রত্নবস্তু অনেক বেশিদিন অবিকৃত অবস্থায় থাকে, তাই পাথরের মূর্তি নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে গবেষক একটু হলেও সুবিধা পান যে হাতের কাছে বেশ কিছু ভগ্ন বা অভগ্ন মূর্তি পাওয়া যায়। তবে সংগ্রহালয় গুলিতে এই বিষয়ে বিরাট সংখ্যায় উপাদান মজুত রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল সব সময় সকলের পক্ষে সব সংগ্রহালয় পৌছানো সম্ভব হয় না, আর সব সংগ্রহালয়তেই স্থানাভাবের কারণে সব সংগ্রহ তারা সাধারণ মানুষ কে দেখাতে পারেন না। এই একই স্থানাভাবের সমস্যা রয়েছে আমাদের কলকাতার ভারতীয় সংগ্রহালয়েও। সাধারণ গবেষকদের আরও একটি সমস্যার মুখে পড়তে হয়, সংগ্রহালয়ের সংগ্রহে থাকা মূর্তির ছবি ব্যবহার করতে হলে তা অনুমোদন সাপেক্ষ এবং তার জন্য নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ দিতে হয়, তা সবসময় সাধারণ গবেষকদের পক্ষে ব্যয় করা সম্ভব হয় না, ফলে তাদের কাজের প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে পথে প্রান্তরে বা মাঠে ঘাটে পড়ে থাকা প্রধানত পাথরের বিভিন্ন মূর্তি ভাস্কর্য। বিষ্ণু, মুলাজোড় কালীবাড়ি এইবার আসি সে আলোচনায় যেখানে দেখি কি অনুপম এবং বিচিত্রধর্মী পাথরের মূর্তি আমরা পথে ঘাটে দেখতে পাই, যা আমাদের কাছে হয়ে ওঠে খোলা মাঠের সংগ্রহালয়।আসুন আমরা চলে যাই বাঁকুড়া জেলার জয়পুরের কাছে গোকুলনগরে ৷ এখানকার গোকুলচাঁদের পঞ্চরত্ন মন্দির ছাড়াও আরও একটি প্রত্ন নিদর্শন হল কাছেই খোলা জমিতে অর্ধেক প্রথিত অবস্থায় থাকা একটি পাথরের বরাহ মূর্তি। এই ধরনের মূর্তির মধ্যে এই শিল্প নিদর্শনটি এক কথায় অনবদ্য, বিশেষ করে পরিধেয় অলংকার গুলি বা মাথায় থাকা কোঁকড়ান চুলের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। এবার চলে আসি উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার শ্যামনগরের মূলাজোড় কালীবাড়িতে, এখানে ৩ টি বিষ্ণু মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। এই ৩ টির মধ্যে একটি বিশেষ মূর্তি সকলেরই আলাদা করে চোখে পড়ে, মূর্তিটি মূল মন্দির থেকে নাট মন্দিরে যাওয়ার সময় বাম দিকে পড়ে। এই প্রায় অভগ্ন সমপদস্থানক ভঙ্গিমায় থাকা মূর্তিটির হাতের আয়ুধের সজ্জা অনুসারে দেখলে আশ্চর্য হয়ে যাবেন ৷ পদ্মপুরাণ ও অগ্নিপুরাণ মতে বিষ্ণুর এই রূপের নাম ‘দামোদর’। আমরা এইবার চলে আসি হুগলি জেলায়, সদর শহর চুঁচুড়ার পরিচিত ষন্ডেশ্বরতলায় একটি অসাধারণ সূর্য মূর্তির কথায়। এই মূর্তিটি স্থানীয় ভাবে ষষ্ঠী বলে পূজা করা হয়, কিন্তু আদপে এটি সপ্তাশ্ববাহী রথের ওপর থাকা সূর্য মূর্তি। হুগলি থেকে চলে যাব নদীয়া জেলার রানাঘাটের কাছে চূর্ণি নদীর ধারে অবস্থিত আনুলিয়া গ্রামে, এখানে একটি গাছের নিচে থাকা একটি অনন্য বিষ্ণু মূর্তি স্থানীয় ভাবে বাসুদেব বলে পুজিত হন। মুখের ভাব, অর্ধনিমিলিত চোখ, মাথার মুকুট, ইত্যাদি এই মূর্তিকে আর দশটি মূর্তির থেকে আলাদা করেছে। বিশেষকরে মূর্তির পায়ের কাছে বামে আয়ুধ পুরুষ রূপে শঙ্খ পুরুষ ও ডান দিকে আয়ুধ দেবী রূপে গদা দেবীকে দেখা যায়। বিষ্ণু মূর্তি, আনুলিয়া মোটামুটি ভাবে খুব সংক্ষেপে আমাদের পরিচিত কয়েকটি মূর্তির কথা লিখলাম। চিন্তা করলে এই সবগুলি মূর্তিই কিন্তু খোলা জায়গায় রয়েছে, যদিও খোলা জায়গায় মূর্তি রাখাটার মধ্যে সব সময়ই ঝুঁকি থেকে যায়। কিছুদিন আগেই নদীয়া জেলার দিকনগরের রাঘবেশ্বর মন্দির থেকে এই রকমই একটি বিষ্ণু মূর্তি চুরি হয়ে যায়, একটি অমুল্য প্রত্ন ও শিল্প নিদর্শন হারিয়ে গেল। এইরকম বহু নিদর্শন হারিয়ে যাচ্ছে, অবহেলায় আর গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে। এইরকম উদ্ধার হওয়া অনেক মূর্তির দিনের পর দিন ঠাঁই হয় থানার মালখানায়। আসলে যারা একদম নিজের উদ্যোগে কাজ করতে চান তাদের পক্ষে সব সময় সংগ্রহালয় থেকে ছবি সংগ্রহ বা প্রকাশ করা সম্ভব হয় না, আবার পথে প্রান্তের মূর্তির ছবি ব্যবহার করতে কোন মুল্য দিতে হয় না, ফলে একটি অদ্ভুত অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রাচীন মূর্তির স্থান হওয়া উচিত সংগ্রহালয়ে আর মূর্তির ছবি তোলা ও ছাপানো সংক্রান্ত নিয়মের সরলীকরণ জরুরি, যাতে যারা তাদের নিজের দেশের অতীত ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করতে চান তাদের কাজ সহজতর হয়, এই অনুরোধ সংস্লিষ্ট সকলের কাছেই রইল।প্রবন্ধের সাথে সব ছবিই লেখক নিজে সংগ্রহ করেছেন ৷ তথাগত সেন লেখক পরিচিতি – তথাগত সেন, জন্ম ১৮.০৭.১৯৭৮, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক, বর্তমানে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রযোজনা সংস্থায় কর্মরত। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলার মন্দির নিয়ে কাজ করছেন, এই মন্দিরচর্চার অনুসঙ্গে সম্প্রতি বাংলার মূর্তি ভাস্কর্য নিয়ে চর্চা শুরু করছেন। তার লেখা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বাংলার পুরাতত্ত্ব পত্রিকা, ভাষাপথ, রূপশালি, পুরাবৃত্ত, রাঢ় কথা, বাঁকুড়ার খেয়ালী, ইত্যাদি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, পেয়েছেন নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদ প্রদত্ত “দার্শনিক অরুণ প্রসাদ সেন স্মৃতি পুরস্কার” (২০২২ ও ২০২৩)। রক্তমৃত্তিকা পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক, এ ছাড়া যৌথ ভাবে সম্পাদনা করেছেন বাংলার টেরাকোটা সংক্রান্ত সংকলন গ্রন্থ। বাংলার মন্দিরের “যুগ্মদেহী ও মিশ্রদেহী মূর্তি” নিয়ে তার প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ২০২৪ এ।

পথপ্রান্তের দেবমূর্তি_তথাগত সেন Read More »

রেডিও নিয়ে দুচার কথা_ দেবব্রত ঘোষ মলয়

রেডিও নিয়ে দুচার কথা দেবব্রত ঘোষ মলয়   এক  তখন হাফপ্যান্ট। ঘুম থেকে উঠেই আমাদের প্রথম কাজ ছিল বাড়ির বিস্তীর্ণ বাগানের মধ্যে অবস্থিত পুকুরের বাঁধানো ঘাটে বসে দাঁত ব্রাশ করা (সে সময়ে আঙুল দিয়েই অথবা দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজতাম আমরা)। বাবা আমাদের থেকেও ভোরে উঠে পড়ে পুকুরের পাড়ে গাছ গাছালি পরিচর্যা করতেন অফিসের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আগে পর্যন্ত। বাবার একটা ছোট্ট ট্রানজিস্টার ছিল ওই পুকুর পাড়েই বসানো থাকতে এবং তাতে সুন্দর সুন্দর গান হতো সকাল বেলা। তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোট ছিল কাজল। ও হঠাৎ দাঁত মাজা বন্ধ করে চোখ গোল করে আমাকে জিজ্ঞেস করল – হ্যাঁরে মনাই, রেডিওর ভিতরে কি করে গান হয় বলতো? দাদা অগ্নিপাস থেকে বলে উঠলো – কি বোকা রে তুই এটাও জানিস না, রেডিওর ভিতরে লোকে বসে গান গায়। এরপর আমরা তিন ভাই গভীরভাবে ভাবতে বসলাম এত বড় মানুষগুলোকে কি উপায়ে এই ছোট্ট রেডিওর মধ্যে বসিয়ে দেওয়া হয়। দুই সন্ধ্যেবেলা বাড়ির সামনে জাফরী দেওয়া বারান্দায় পাতা তক্তবোসে পড়তে বসেছি তিন ভাই। দাদা ক্লাস এইট আমি ফোর আর কাজল থ্রি। আমি একটা কাগজে রুটিন বানাতে শুরু করলাম। কাজল তাতে মনোনিবেশ সহকারে সাহায্য করতে লাগলো। আমরা সন্ধে ছটা থেকে রাত্রি নটা অব্দি আধ ঘন্টা ছাড়া ছাড়া এক একটি বিষয় পড়ার জন্য নির্বাচন করলাম। সব থেকে মজার ব্যাপার ওই প্রতিটি আধঘণ্টার একটা একটা আলাদা নাম দেওয়া হল। যেমন সন্ধ্যে ছটায় বর্ণালী, বাংলা পড়া। সাড়ে ছটায় মঞ্জুসা, ইংরেজি পড়া। এরপর সন্ধ্যা সাতটায় বোরোলিনের আসর, অংক করা। এই যে নামগুলো, এগুলো সবই সে সময়ে রেডিওতে কলকাতা ক বা ক্ষয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নাম, যে অনুষ্ঠানগুলি আমরা সবাই মন দিয়ে শুনতাম। তিন মহালয়ার সকাল। আগের দিন রাত্রি থেকেই বাড়িতে একটা তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত। ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা ঝুল-ঝাড়া বিছানায় চাদর পাল্টানো ইত্যাদি। বাবা কিন্তু সেদিন সন্ধ্যে থেকে রেডিও নিয়ে পড়তেন। রেডিওটাকে ভালো করে কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করে তার ব্যাটারিগুলো বদলে নতুন ব্যাটারি লাগানো হতো। তারপর এমন একটা জায়গায় রাখা হত যেখানে আমরা সবাই গোল করে বসতে পারি ভোর চারটের সময় উঠে। বাবা এবং মা স্নান করে নিতেন ঘুম থেকে উঠে। আমরা সবাই স্নান না করলেও কাচা জামা প্যান্ট পড়ে রেডিওর সামনে বাবু হয়ে বসে পড়তাম। তারপর অন্ধকার ভোর আর হিমেল হাওয়ার শিরশিরানির মধ্যে ভেসে আসতো বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অমৃত কন্ঠে স্তোত্র পাঠ। এর সঙ্গেই আমাদের স্বপ্ন মাখা কিশোর চোখ আগামী দশ দিনের আনন্দের পরিকল্পনা করতে শুরু করত। নতুন কেনা ববিছাপ জামা, বাটার জুতো সবই আমরা হাতের কাছে নিয়ে বসতাম। আমাদের পুজো সেদিনই শুরু হয়ে যেত রেডিওর হাত ধরে। চার এরপর একটু বড় হয়ে যখন ফুলপ্যান্ট ধরবো ধরবো করছি, সে সময় দাদা সন্ধান দিল রাত্রি ন’টায় রেডিওতে কাউন্ট ড্রাকুলার ধারাবাহিক হয়। ভূতকে আমরা ভীষণ ভয় পেতাম। সন্ধ্যেবেলা হ্যারিকেন নিয়ে শেওড়াতলা দিয়ে আসার সময় বুক দূর দূর করত। সে যাই হোক তাড়াতাড়ি পড়াশোনা করে রেডিওর সামনে বসে পড়লাম সবাই। শুরু হলো ধারাবাহিক কাউন্ট ড্রাকুলা। কখন যে ওই হারহিম করা গল্পের মধ্যে ঢুকে গেছি, ড্রাকুলার হিসহিসে কন্ঠে লুসি লুসি ডাক। সে অভিনয় এতটাই জীবন তো আমরা যেন চোখের সামনে পুরোটাই দেখতে পাচ্ছি। সেই মোবাইলহীন, ওয়েব সিরিজ হীন, টিভিহীন এবং সর্বোপরি বিদ্যুৎহীন রাত্রে যে ভয়টা আমরা পেলাম সেটা আজকের ছোটরা কল্পনাও করতে পারবে না। আর সেই দিনই মাঝ রাত্রে দেড়টা দুটো নাগাদ ঘুম ভাঙলো টয়লেট যাবার প্রয়োজনে। মাকে ঘুম ভাঙ্গিয়ে তুলে নিয়ে বারান্দার শেষ প্রান্তে আমাদের প্রকাণ্ড বাথরুমের মধ্যে যাবার সময়ও কেবলই মনে হচ্ছে চারপাশে অশরীরী ড্রাকুলারা ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাঁচ রেডিও শোনা শুরু হয়েছিল শিশু মহল দিয়ে। ইন্দিরাদির কন্ঠে “ছোট্ট সোনা বন্ধুরা” শুনলেই মনটা ভালো হয়ে যেত। এরপর একটু বড় হয়ে গল্প দাদুর আসর। পার্থদের কন্ঠে “ছোট্ট বন্ধুরা” শোনার পরই আমাদের এক ঘন্টা কথা দিয়ে কেটে যেত। এরপর আস্তে আস্তে “অনুরোধের আসর”, “বোরোলিনের সংসার”, “মঞ্জুষা”, “বর্ণালী”,  বুধবারের যাত্রা, “কৃষিকথার আসর” সবই শুনতাম আমরা। স্কুলের বাইরে আমাদের প্রধান বিনোদন ছিল খেলার মাঠ আর বাড়িতে নানা রকম গল্পের বই আর রেডিও। একবার দুবার অনুরোধ এর আসরে গানের অনুরোধ করে নিজের নাম শুনতে পাওয়ার সেই রোমাঞ্চ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আর ছিল বেতার জগত। শুধু রেডিওকে কেন্দ্র করে এইরকম একটি পত্রিকা আজও আমার মনের মনিকোঠায় জ্বলজ্বল করছে। যুগের সঙ্গে পরিবর্তনকে গ্রহণ করার নামই জীবন। আজ রেডিও অনেকটাই অন্তরালে চলে গেছে আর সামনে প্রতিদিন আসছে নতুন নতুন বিনোদন মাধ্যম। কিন্তু রেডিও তো শুধু বিনোদন ছিল না সে সময়, লোকশিক্ষার একটা বড় মাধ্যম ছিল রেডিও। আজকের হাজারো মাধ্যমে বিতরিত বিনোদনে বেশিরভাগ সময় থাকে শুধুই বাণিজ্য, লোক শিক্ষার ব্যাপারটা চলে যায় অন্তরালে। আমরা যারা দুটি সময়কেই চোখের সামনে দেখেছি, তাদের কাছে রেডিওর এ হেন গুরুত্ব অনস্বীকার্য। দেবব্রত  ঘোষ মলয় ইলশেগুঁড়ি পত্রিকা ও প্রকাশনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক দেবব্রত ঘোষ মলয় নিজে একজন সাহিত্যকর্মী। সম্পাদনার অবকাশে তাঁর কবিতাযাপন এবং গল্পলিখন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য বইগুলি হল কাব্যগ্রন্থ ‘‘মেঘলা গঙ্গার কাদামাটি’’ ও ‘‘মেঘ চিনেছি ঈশানকোণে।” এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে উপন্যাসিকা ‘‘হজমিগুলি হাফপ্যান্ট ও কুলের আচার’’, ‘‘সোনালী দিনের উপাখ্যান’’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘‘ভোরের সূর্যোদয়।’’ প্রকাশিত হতে চলেছে উপন্যাস ‘‘নদী, নারী ও ভালবাসা’’, গল্পগ্রন্থ ‘‘বৃষ্টিধারা’’ এবং কিশোর গ্রন্থ ‘‘ডাংগুলির দুপুরগুলি’’।

রেডিও নিয়ে দুচার কথা_ দেবব্রত ঘোষ মলয় Read More »

রাশিচক্র

রাশিচক্র অয়ন মুখোপাধ্যায়   ১ নদী মানুষের গল্প মনে রাখে না, সে শুধু স্রোতকেই মনে রাখে। মানুষের গল্প ফুরিয়ে যায়, স্রোত ফুরোয় না। ১৯৩০ সালের এক থমথমে রাত। গঙ্গার জল ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। হাওড়া ব্রিজের লোহার রেলিংয়ে হাত রেখে এক তরুণ কালো জলের দিকে তাকিয়ে ছিল। দূরে কলকাতার গ্যাসবাতির আলো বিন্দু বিন্দু হয়ে ছড়িয়ে আছে। বাতাসে ভেসে আসছে জাহাজের সাইরেন। কিন্তু ওই আলো তার মনের অন্ধকারে পৌঁছচ্ছিল না। পেছনে ট্রামের ঘণ্টা বাজছে। ঘোড়ার গাড়ির চাকা পাথুরে রাস্তায় শব্দ তুলে ছুটে যাচ্ছে। মানুষের ভিড় আরও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। অথচ এই বিরাট শহরে তার জন্য এক চিলতে জায়গাও নেই। সন্তোষ নিজেকেই বলেছিল, “আজ রাত এগারোটার মধ্যে যদি চাকরির হিল্লে না হয়, তা হলে এই গঙ্গার কালো জলই হবে আমার শেষ ঠিকানা।” এতে কোনো নাটক ছিল না। ছিল শুধু হিসেব। যেন জীবনের একটা অঙ্ক মেলাতে গিয়ে সে ভুল করেছে, আর এখন খাতা বন্ধ করার সময় হয়েছে।২ গুপ্তিপাড়ার সেই পুরনো দিনগুলো এখন ঝাপসা। বাড়িটা খুব বড় ছিল না, কিন্তু মান-সম্মান ছিল। বারান্দায় বসে থাকতেন তার বাবা, সামনে খোলা হিসেবের খাতা। বাবা ঠিকাদারি করতেন। কিন্তু মানুষের হিসেবের বাইরেও আর-একটা হিসেব থাকে। সেখানে লাভের অঙ্কে হঠাৎ লোকসান এসে বসে। দু-একটা ভুল চুক্তি, তার সঙ্গে চেনা মানুষের বেইমানি—সব মিলিয়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল সব। দেনা বাড়ল। জমি গেল। সেই চরম অভাবের মধ্যেও সন্তোষকে দেখা যেত এক কোণে বসে পুরনো পঞ্জিকা আর জ্যোতিষের বই নিয়ে থাকতে। একদিন বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, “সন্তোষ, সংসারটা কি ওই গোল গোল গ্রহ-নক্ষত্রের ছকেই চলবে? একবার এই কঠিন বাস্তবটাও দেখবি না?” সন্তোষ কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু মনে মনে ভেবেছিল, এই দুনিয়ার সব জগাখিচুড়ির আড়ালেও বুঝি একটা নিয়ম আছে। সবাই সেটা দেখতে পায় না। ৩ পরদিন ভোরে বাবার কাছ থেকে সামান্য কিছু টাকা নিয়ে সন্তোষ বেরিয়ে পড়ল। হাতে একটা পুরনো ঘড়ি, কাঁধে গামছা, আর সঙ্গে একখানা বাড়তি ধুতি। কুয়াশাভরা গুপ্তিপাড়ার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে জানত না, ফিরে আসার পথগুলো তার জন্য একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। কলকাতা শহর তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। সে দরজায় দরজায় ঘুরল। সরকারি অফিস, বড়বাজারের গদি, সাহেবি দোকান—সব জায়গায় একই কথা, “লোক লাগবে না।” পকেটের শেষ পয়সাটাও যখন ফুরিয়ে গেল, তখনই সে হাওড়া ব্রিজে দাঁড়িয়ে মরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেই সন্ধ্যায় সে ক্লান্ত হয়ে ফুটপাথে বসেছিল। এমন সময় এক ভদ্রলোক সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি গুপ্তিপাড়ারই লোক। কলকাতায় ডাক বিভাগে কাজ করেন। সন্তোষকে চিনে তিনি বললেন, “তুই এভাবে পথে বসে আছিস কেন? তোর বাবা আমার বন্ধু ছিলেন। কী হয়েছে, বল তো?” সব শুনে তিনি বললেন, “চল, আমার সঙ্গে চল। আমাদের আপিসে একটা পিয়নের কাজ খালি আছে।” সে রাতে নদী তাকে ছাড়াই বয়ে গিয়েছিল। সন্তোষ মুখার্জির আর মরা হয়নি।৪ চাকরি পাওয়ার পর জীবনটা একটু ছন্দে ফিরল। দিনে সে চিঠির বস্তা বাছাই করে, খামের ওপরের ঠিকানা পড়ে, এক শহরের খবর আর-এক শহরে পাঠিয়ে দেয়। আর রাতে তার আঙুল চলে নক্ষত্রের ছকে। অফিসের বন্ধুরা হাসত। বলত, “চিঠি বিলি করবি, না কপাল গুণবি?” সন্তোষ হেসে বলত, “সময় হলে দেখবে।” ধীরে ধীরে লোকের মুখে মুখে তার গণনার কথা ছড়িয়ে পড়ল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তার কাছে আসতে লাগল। কিন্তু সে কোনো দিন একটি পয়সাও নিল না। সে বলত, “ভাগ্যকে বাজারে বেচলে তার জোর কমে যায়।” ৫ ১৯৩৫ সালের শেষ দিক। একদিন খবর এল, ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ খুব অসুস্থ। কাগজে কাগজে লেখা হচ্ছে, সম্রাটের প্রাণ যায় যায়। লন্ডনের বড় বড় ডাক্তাররা যখন কূলকিনারা পাচ্ছেন না, তখন সন্তোষ নিজের অফিসের ডেস্কে বসে হিসেব কষল। খাতার পাতায় গ্রহদের অবস্থান যেন অন্যরকম ইশারা দিচ্ছিল। সে একটি ইংরেজি কাগজের দপ্তরে চিঠি লিখল— “সম্রাট এখনই মারা যাবেন না। অমুক দিনের পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।” আশ্চর্যের কথা, সন্তোষ যে সময়ের কথা লিখেছিল, ঠিক তার পর থেকেই সম্রাট সেরে উঠতে শুরু করলেন। এই খবর গিয়ে পৌঁছল বড়লাটের কানে। ভারত সচিবের প্রতিনিধি সন্তোষকে ডেকে পাঠালেন বেলভেডিয়ার প্রাসাদে। বিশাল হলঘরের ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় সন্তোষ গিয়ে দাঁড়াল। পরনে সাধারণ ধুতি আর সাদামাটা চাদর। সাহেবি জাঁকজমকের মধ্যে তাকে বেমানান লাগছিল। কিন্তু তার চোখে ছিল শান্ত তেজ। সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “সম্রাট আপনার বিদ্যায় খুব খুশি। আপনি কী পুরস্কার চান? টাকা, জমি, না বড় কোনো খেতাব?” সন্তোষ শান্ত গলায় বলল, “আমি কিছুই চাই না।” সচিব অবাক হয়ে বললেন, “কিছুই না? এমন সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে?” সন্তোষ হেসে বলল, “যিনি প্রাণ দিয়েছেন, তিনিই সব দেবেন। মানুষের কাছে আর কী চাইব?” কয়েক বছর আগের সেই অন্ধকার রাতটা তার মনে পড়ে গিয়েছিল। একমুঠো ভাতের অভাবে যখন সে মরতে বসেছিল, তখনও তো কেউ ছিল না। সচিব তাকে রাতের খাবারের নিমন্ত্রণ করতে চাইলে সন্তোষ সবিনয়ে বলল, “আমি নিজের নিয়ম মেনে চলি। বাইরে খাই না।” সাহেব মুগ্ধ হয়ে বলে উঠলেন, “A true Brahmin indeed সেদিন রাতে অফিস থেকে ফেরার পথে সন্তোষ আবার হাওড়া ব্রিজের ওপর দাঁড়াল। গঙ্গা তখনও আগের মতোই বয়ে যাচ্ছে। সে ভাবল, সেদিন যদি সত্যিই ঝাঁপ দিত, পৃথিবীর কিছুই থামত না। ট্রাম চলত, তারা ঘুরত, শহর তার নিজের মতোই বেঁচে থাকত। শুধু একটি মানুষের গল্প আর লেখা হতো না। তখন সে বুঝল, জ্যোতিষের ছকে গ্রহের অবস্থান যতই নিখুঁত হোক, মানুষের জীবনে সবচেয়ে রহস্যময় আর শক্তিশালী গ্রহের নাম—আশা। এই আশার কথা কোনো কোষ্ঠীতে লেখা থাকে না। এটা শুধু মানুষের ভেতরেই জ্বলে। সন্তোষের মনে হলো নদী সব দেখেছে। সে জানে, মানুষ ভাবে সে ভাগ্য পড়তে শিখেছে। আসলে সে সময়ের অনন্ত বইয়ের একটি মাত্র লাইন পড়তে পেরেছে। বাকি পাতা গুলো এখনও উল্টোনো হয়নি। আর সেগুলো কেউ জানে না।   স্কেচ ছবি — হিরণ মিত্র  অয়ন মুখোপাধ্যায় লেখক পরিচিতি – কবি ও লেখক অয়ন মুখোপাধ্যায়। ঠিকানা – বলাগড়, হুগলী। যে সমম্ত পত্রিকাতে লিখে চলেছেন —  পরম্পরা ,বাংলা স্ট্রিট অনলাইন , গুরুচণ্ডালী  , বাংলা স্পিয়ার ,কেতাব ,ভারতের কণ্ঠ  বাঙালা নেটওয়ার্ক ,আবর্ত , আপনপাঠ , বিকল্প ,গণশক্তি ,জলদর্চি ৷

রাশিচক্র Read More »

Scroll to Top