কালনার রথের ইতিহাস

কালনার রথের ইতিহাস অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় আজকে উল্টো রথ সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে। কালনার জন্য এটি একটি শুভ দিন, কারণ এ বছর এই রথযাত্রা সরকারি সাহায্য পেয়েছে। রথের দিন কালনাবাসী খুব আনন্দ করেছে ৷ আসুন একবার দেখে নিই কবে থেকে কালনাতে রথযাত্রার সূচনা হয়েছিল।কালনা ছিল বর্ধমান রাজ পরিবারের কাছে বারানসী সমতূল্য পবিত্র স্থান ৷ পূর্ববর্ধমান জেলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান কালনা ৷ কালনার প্রথম রথযাত্রা জগন্নাথ বাড়ি থেকে। কালনার পশ্চিম প্রান্তে ভাগীরথীর ধারে এই জগন্নাথ বাড়ি বা মন্দির অবস্থিত। ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে রাজমাতা ব্রজকিশোরী দেবী দ্বিতীয়বার যখন পুরীধামে জগন্নাথ দর্শন করতে গমন করেছিলেন, সে সময় তার নিজের মনের মধ্যে কালনাতে গঙ্গার তীরে একটি জগন্নাথ দেবের মন্দির প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা তৈরি হয়। তার এই ইচ্ছাকে মর্যাদা দিতে রাজা কীর্তিচন্দ্র আনুমানিক ১৭৩২—৩৩ খ্রিস্টাব্দে অম্বিকা কালনার গঙ্গার খাত থেকে উচ্চ স্থানে জগন্নাথ দেবের দালান কোঠা মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। পরের বছরেই দুটি বিশাল রথও নির্মাণ করা হয়েছিল। গঙ্গার ধারে বিশাল এই দুটি রথের অবস্থান দেখে গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণরত রেভারেন্ড জেমস লং লিখেছিলেন যে,ভাগীরথীর তীরে তিনি যে দুটি বিশাল, বিশাল রথ দেখেছিলেন, তা এত বড় ছিল যে, এর নিচে ডাকাতেরা মানুষ খুন করে লুকিয়ে থাকতে পারে। জগন্নাথ দেবের মন্দির প্রতিষ্ঠার আগে জানা যায়, ওই স্থানে একটি ছোট আকারের জগন্নাথ মন্দির ছিল। শোনা যায়, রাজা কীর্তিচাঁদ হুগলি জেলায় অবস্থিত ভান্ডারহাটির জমিদারি লুট করে ধনসম্পদের সঙ্গে জমিদারের গৃহদেবতা জগন্নাথ দেবের মূর্তিটি কালনায় নিয়ে এসে গঙ্গার এই স্থানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। লুট করে আনা জগন্নাথ দেবের মূর্তিটিকে সেই সময়ে “লুঠের জগন্নাথ” বলা হতো। রাজা তেজচন্দ্র বাহাদুরের উদ্যোগে যে একটি ছোট রথ তৈরি হয়েছিল, সেই রথে রাধাকৃষ্ণের সাথে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা এনাদেরকেও আরোহণ করিয়ে প্রদক্ষিণ করানো হতো। তা প্রায় উনিশশো সাল পর্যন্ত অস্তিত্ব যুক্ত ছিল। তা যখন বড় দুটো রথ এসে গেল, তখন ছোট রথের জনপ্রিয়তা কমে গেল। এই বড় বড় রথ দুটি বদর সাহেবের ঘাট থেকে জগন্নাথ বাড়ি পর্যন্ত পুরাতন কালনা বর্ধমানের যে রাস্তা, সেই রাস্তা ধরে যাত্রা করত। অর্থাৎ, সেই রাস্তা ধরে রথযাত্রা হত। সেই সড়ক আর বর্তমানে নেই। ভাগীরথী নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তো, ওই সময়ে রথ টানার জন্য বর্ধমান থেকে এই পথ ধরে রাজার হাতি আসত। কালনাতে তখন রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিশাল উন্মাদনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ত। প্রথমে রাজবাড়ির রথের টান সম্পূর্ণ করে, হাতি জগন্নাথ দেবের রথ টানার জন্য চলে আসত। জগন্নাথ দেবের এই রথ ছিল পাঁচ তলা বিশিষ্ট। বিশাল তাদের চেহারা দেখলে সম্ভ্রম জাগতো। একটি রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা এবং অপরটিতে রঘুনাথ ও অন্যান্য দেবতারা আরোহণ করতেন। আনুমানিক ১৯৩৯—৪০ সালে, রথ দুটিকে সমাজ বাড়ির সামনে, দিঘির পাড়ের রাস্তায় নিয়ে আসা হয়েছিল। জগন্নাথ বাড়ি থেকে দেবতাদের এখানে নিয়ে এসে রথে চড়ানো হতো। হাবু সাহার বাড়ির সামনে থেকে জাকেরিয়া বিল্ডিং পর্যন্ত রথ দুটি তখন টানা হতো। উনিশশো ছেচল্লিশ সালে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দাঙ্গা জামালপুর অঞ্চল পূর্বস্থলী থানা থেকে আরম্ভ হয়ে নোয়াখালী, পূর্ব বাংলা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। সম্ভবত নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বর মাস নাগাদ, জনৈক দুষ্কৃতী সন্ধ্যা রাতে কালনার এই দুটি রথের ছাউনিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। পাশের দিঘি থাকা সত্ত্বেও একটি রথ প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। অপরটি অর্ধদগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা বন্ধ হয়ে যায়। কালনায় দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রা ছিল রাজবাড়ীর লালজির রথযাত্রা উৎসব। রাজবাড়িতে তিনটি রথ ছিল এবং তাদের পৃথক পৃথক নামও ছিল। লালজী যেটায় চাপতেন, সেই রথটির নাম ছিল গরুধধ্বজ। উচ্চতায় বাইশ হাত। কৃষ্ণচন্দ্র যেটাই চাপতেন, সেটির নাম ছিল **লাঙ্গলধ্বজ**; উচ্চতা একুশ হাত। এবং গোপালজী যেটাই চাপতেন, সেটির নাম ছিল **পদ্মধ্বজ**; উচ্চতা কুড়ি হাত। এই রথ তিনটি নির্মিত হয়েছিল রানী বিষ্ণুকুমারী দেবীর উদ্যোগে। এই তিনটি রথ টেনে নিয়ে যেতে বর্ধমান রাজাদের হাতি আসতো কালনায় । মহারাজার বন্দুকধারী সিপাহীরা পোশাক পরিহিত অবস্থায় সারিবদ্ধভাবে রথকে রাজকীয় কায়দায় পাহারা দিয়ে নিয়ে যেত। এখানে রথ টান শেষ হলে, এই হাতিগুলি চলে যেত জগন্নাথ বাড়ির রথ টানতে। উনিশশো পঞ্চাশ সাল থেকে বর্ধমানের থেকে হাতি আসা বন্ধ হয়ে গেছিল। লালজি বাড়ির অভ্যন্তরে যে রথগুলি থাকতো, সেগুলি মেরামতের অভাবে ক্রমে ক্রমে স্থবির হয়ে পড়লো। সেগুলি মেরামতির জন্য কোনো উদ্যোগ সে সময় নেওয়া হয়নি। কালক্রমে রথগুলি মাটিতে বসে যায়। সেই অবস্থাতেও কয়েক বছর লালজি, কৃষ্ণচন্দ্র এবং গোপালজিউদের রথে বসিয়ে নিয়ম রক্ষা করে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়েছিল। তারপর উনিশশো সত্তর একাত্তর সালে রাজবাড়িতে অবস্থানরত বন্যাপীড়িত মানুষেরা ভগ্নরথের উই ধরা কাঠ রান্নার কাজে ব্যবহার করে।এইভাবে একটা গৌরবময় ঐতিহ্যপূর্ণ ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল। দীর্ঘ সময় পর, দুই হাজার আট সালে, রাজবাড়ি সংলগ্ন এলাকার অধিবাসীরা পুনরায় রথ কমিটি তৈরি করে রথযাত্রার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগী হন। বর্তমানে কালনার রথটি জনসাধারণের সংগৃহীত টাকাতেই তৈরি। এই লোহার রথটির উচ্চতা পনেরো ফুট। অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় ভাষাপথের সম্পাদক এবং সব রকম লেখার সাথে যুক্ত ৷ বর্তমানের ভাষাপথ বিষয় ভিত্তিক সংখ্যা করছে ৷ বাসভূমি কালনা ৷ পেশা শিক্ষকতা ৷

কালনার রথের ইতিহাস Read More »

রথ এবং রথযাত্রা

ইতিহাস, পুরাণ এবং ধর্মতত্ত্বের প্রেক্ষাপটে জগন্নাথদেব রথ এবং রথযাত্রা সিদ্ধেশ্বর আচার্য্য রথ একটি প্রাচীন যান। বৈদিক এবং রামায়ণ মহাভারতের যুগে এই যানটির উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন গ্রীস, রোম সাম্রাজ্যে এই যানটি যুদ্ধ বিগ্রহ এবং মনুষ্য স্থানান্তরের কাজে ব্যবহার করা হত। প্রাচীন মিশরেও এই যানটির ব্যবহার দেখা যায়। প্রায় সব দেশের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে এবং মহাকাব্যে রথ নামক যানটির নির্মাণের কৃৎ কৌশল ও গঠনের বর্ণনা দেওয়া আছে। বেনহুর চলচ্চিত্রে রথের (Chariot) প্রতিযোগিতার দৃশ্যে প্রাচীন কালে রোমান সাম্রাজ্যের রথের অবয়ব সম্বন্ধে একটা স্পষ্ট ধারণা করা যায়। আমাদের দেশে রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী গ্রন্থে যোদ্ধাদের রথ আকাশ পথে পুষ্পক রথ আখ্যায়িত হয়ে শূণ্য মার্গে  পরিভ্রমণ করতো। সাত ঘোড়ায় টানা রথে সূর্যদেব প্রতিদিন বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড পরিভ্রমণ করে চলেছেন। আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থে এই সব রথের যে বর্ণনা দেওয়া থাকে তার সঙ্গে বর্তমান জগন্নাথ দেবের রথ এবং ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে দেবদেবীকে বিভিন্ন সময়ে যে রথে চাপানো হয় তার আকৃতি এবং গঠন এক নয়। প্রাচীনকালে ভারতে বা ইউরোপে রথের চেহারার বর্ণনা সাধারণত দেখা যায় একটি দু চাকার যান, মাথার উপরে একটি ছত্র থাকে, (ইউরোপে ছত্র প্রায় থাকে না) পিছনের দিক আচ্ছাদন থাকে এবং তিনদিক উন্মুক্ত। এক বা দুজন আরোহী এবং একজন চালকের স্থান সংকুলান হয়। আদিম সভ্যতায় চাকা আবিষ্কারের পরই মানুষ গতিকে আয়ত্ব করতে সক্ষম হয়েছিল। চাকা ব্যবহারের বিবর্তনের ফল স্বরুপ দুই এবং দুয়ের অধিক চাকা যুক্ত করে নানা ধরণের যান নির্মাণ হয়েছে। এই রথ (Chariot) হল আদিম যানের রূপান্তরিত শকট। মনে হয় সর্বপ্রথম এই আদিম যানটির সঙ্গে দুই এবং ততোধিক চাকা যুক্ত করে যানটি পাটাতনের উপর মন্দির (দারু নির্মিত) স্থাপনা করে রথ (Chariot) যানটির নব রূপায়ন এই ভারতবর্ষেই আবিষ্কার (Discover) হয়েছিল। ভারতীয় এই রথকে অনেক ঐতিহাসিক Temple Car হিসাবে নামকরণ করেছেন। ভারতে দেবতারা যে রথে আরোহন করেন সেটি মন্দিরযান। শব্দকল্পদ্রুম থেকে জানা যায় সূর্যদেব যে রথটি ব্যবহার করেন সেটি হল পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন রথ (কোনারকের সূর্য মন্দির রথ দ্রষ্টব্য)। ভবিষ্য পুরাণ মতে ভাদ্রমাসের শুক্ল পঞ্চমী তিথিতে সূর্যদেবের রথযাত্রার বিধি পালনের নির্দেশ রয়েছে। ঐ পুরাণেই উল্লেখ আছে ভক্ত প্রহ্লাদ বিষ্ণুর রথ প্রথম টেনেছিলেন, পরে গন্ধর্বরা টেনেছিলেন। বামদেবেশ্বর তন্ত্রে দেবী ভগবতীর প্রতি মাসেই রথ যাত্রার কথা বলা আছে। এই জাতীয় ষোল প্রকার রথযাত্রার উল্লেখ এই পুরাণ গ্রন্থে রয়েছে। এই সব ধর্মগ্রন্থে বলা আছে মানুষ রথযাত্রায় অংশ গ্রহণ করলে সংসার চক্র থেকে চিরকালের জন্য মুক্তি প্রাপ্ত হয়। “রথস্থং বামনং দৃষ্টবা/পুনঃ জন্ম ন বিদ্যতে।” যাত্রাতত্ত্ব গ্রন্থে বিষ্ণুর বারো রকম রথ যাত্রার উল্লেখ আছে। হরিভক্তি বিলাস গ্রন্থে কার্ত্তিক মাসে বিষ্ণুর রথ উৎসবের বর্ণনা দেওয়া আছে। শিবের রথযাত্রার কথা গদাধর পদ্ধতিতে রয়েছে। তাঁর রথের বিশেষত্ব হল রথটির রং সাদা এবং চার তোরণের চারটি স্বর্ণকলস ও স্বর্ণদীপ দ্বারা সজ্জিত থাকে। প্রতিবেশী হিন্দু রাজ্য (বর্তমানে প্রজাতন্ত্র) নেপালে দেবী যাত্রা, কুমারী যাত্রা, ভৈরব যাত্রা, মৎসেন্দ্রনাথ যাত্রা এই রকম বিভিন্ন প্রকার রথযাত্রা বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু ধর্ম ছাড়া বৌদ্ধ ধর্মেও রথযাত্রার উল্লেখ আছে। বুদ্ধদেবের মূর্তি রথে বসিয়ে হর্ষবর্দ্ধনের রাজত্বকালে (৬০৬-৬৪৭ খ্রীঃ) রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বৈশাখী পূর্ণিমায় রথযাত্রার কথা ভারত ভ্রমণকারী ফা হিয়েনের বিবরণে পাওয়া যায়। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন জগন্নাথ দেবের অন্যস্থানে (মাসির বাড়ি) কিছু দিনের অবস্থান বৌদ্ধ ধর্মের আচরণের অঙ্গীভূত অনুষ্ঠান। কিছু ঐতিহাসিকের মতে বৌদ্ধ ত্রিরত্নের মধ্যে সংঘ নারী রূপে বুদ্ধদেব এবং ধর্মের মধ্যস্থলে অবস্থান করায় জগন্নাথদেবের মূর্ত্তি ত্রিরত্নের রূপান্তরিত এক দেবতা। তিব্বতে লামারা ছোট তুলসী মঞ্চের মতন কালো, হলুদ এবং সাদা রং-এর স্তুপ ত্রিরত্ন বা পরমেশ্বরা (পরমেশ্বর) বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘের প্রতীক হিসাবে পূজা করেন। এই স্তুপগুলির প্রত্যেকটিতে চোখ এবং ঠোট এঁকেছিলেন ওনারা জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা কল্পনায়। অনেক ঐতিহাসিক জগন্নাথ দেবকে বুদ্ধের অবতার বলে মনে করেন (কাশ্মীর ও তিব্বতে স্বামী অভেদানন্দ) অর্থাৎ জগন্নাথ বিগ্রহ বুদ্ধদেবেরই রূপান্তর। Chember’s Encyclopedia (Vol-II) বলা হয়েছে ‘There is much in rites at Puri to countenance the idea that though professedly Hindu if is realy a Bud-dhist shrine.’। শ্রীকৃষ্ণ বুদ্ধরূপে জগন্নাথ নামে প্রতিষ্ঠিত এই তত্ব দারুব্রহ্ম এবং শূন্য সংহিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উড়িষ্যায় এক সময় বৌদ্ধ প্রভাব প্রবল ছিল (সম্রাট অশোকের সিংহাসন লাভ ২৭৩ খ্রীঃ পূর্বাব্দে) এবং ২৬০ খ্রীঃ পূর্বাব্দে কলিঙ্গ জয়)। বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবতা তারা, হেরুক, অপরাজিতা প্রভৃতি হিন্দুদেরও পূজ্য দেবতা। ড. মায়া ধর মনে করেন রামানুজ বুদ্ধ এবং বিষ্ণুকে একত্রিত করেছেন। এটা ঐতিহাসিক ভাবে স্বীকৃত হিন্দু তন্ত্রশাস্ত্রের বহুমত যেমন বৌদ্ধধর্মে অনুপ্রবেশ করেছে তেমনি বৌদ্ধ ধর্মের বহু ধারণা হিন্দু ধর্মও ধারণ করেছে। বৌদ্ধ পূর্ব্ববর্তী ধর্ম জৈন ধর্মের মধ্যে রথযাত্রার প্রচলন ছিল। পুরাণ মতে জরা নামে এক ব্যাধের বাণে শ্রীকৃষ্ণর মৃত্যু হলে তিনি দেহটি সমুদ্রতীরে ফেলে রেখে পঞ্চভূতে বিলিন হয়ে স্বর্গে চলে যান। পৃথিবীর নিয়মানুসারে তার দেহটি ধ্বংস হলেও তাঁর হৃৎপিণ্ডটি একটি কাষ্ঠ খন্ডে রূপান্তরিত হয়ে সমুদ্রতীরে পরে থাকার পর স্কন্ধ পুরাণের উৎকল এবং পুরুষোত্তম খন্ডে বর্ণিত মতানুসারে শবরপতি বিশ্বাবসু স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত হয়ে ঐ কাষ্ঠ খন্ডটি নীলগিরি পর্ব্বতের এক গুহায় স্থাপনা করে দীর্ঘদিন নীল মাধব জ্ঞানে পূজা করেছিলেন। বিশ্বাবসু জাতিতে অনার্য ছিলেন। তাঁর তিরোধানের পর নীলমাধবও গুহা থেকে অন্তর্হিত হন। পরে পুরীধামে জগন্নাথ মূর্ত্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন (Evolution of Sakti Cult & Tara)। এই সূত্রানুসারে জগন্নাথদেব হলেন মূলত অনার্য দেবতা তাই জগন্নাথদেবের ভোগের উপাচারে এবং শ্রীক্ষেত্রে আচার বিচারে কিছু অনার্য রীতিনীতি বিদ্যমান রয়েছে। পুরীতে স্পর্শদোষ নেই এবং মধ্যযুগীয় হিন্দু সংস্কার এঁটো এবং একাদশীর নিয়মকানুন এখানে অচল। যদিও মন্দিরে অহিন্দুর প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, কিন্তু রথযাত্রা উপলক্ষ্যে পুরীধামে উচ্চনীচ সর্ব্ব ধর্মের সকল মানুষ রথের কাছি স্পর্শ করতে পারেন। হিন্দু দর্শনে মনুষ্য দেহকে রথের সঙ্গে তুলনা করেছে। কথোপনিষদে বলা হয়েছে..   “আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেবতু। বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি মনঃ প্রগ্রহমেব চ।।” আত্মাকে রথস্বামী এবং নিজ দেহকে রথ বলে উপলব্ধি করতে হবে। দেহরূপ রথে অবস্থান করছেন আত্মা যিনি পরমাত্মার অংশ দেবতা স্বরূপ। সৎবুদ্ধি দ্বারা মনকে সঠিক পথে পরিচালনা করলে মনুষ্যশরীর রূপ রথে অবস্থান আত্মা সঠিক পথ গমন করে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হতে পারে। আবার শাস্ত্রে একথাও বলা হয়েছে… “ইন্দ্রযানি হয়ানাপুর্বিষয়াং স্তেষু গোচরান। আত্মেন্দ্রিয় মনোযুক্তং ভোক্তেত্যাহুর্মনী যিনঃ।।” বিবেকবান ব্যক্তিরা শরীরের ইন্দ্রিয় সমূহকে দেহ রথের অশ্বরূপ কল্পনা করেন আর আমাদের চারিদিকে ভোগ্য বিষয়বস্তু হল সেই পথ যার মধ্য দিয়ে আমাদের দেহ রথ গমন করে। শরীর ইন্দ্রিয় এবং মন, এই ত্রয়ীর সমন্বয়ে আত্মা সুখ ও দুঃখ অনুভব করে থাকে। মন সংযত না হলে দেহের ইন্দ্রিয় সকল সংযত হয় না। সকল ধর্মের নির্দেশিকায় বলা রয়েছে নিজেকে সংযত কর। এবং সংযমী হও। রথযাত্রা নিছক অন্ধভাবে ধর্ম পালন নয়, গভীর তত্বজ্ঞানের বিষয়। আরো একটু গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে জগন্নাথ সপরিবারে নিজ মন্দিরালয় থেকে বাহির হয়ে মাসির বাড়ীর উদ্দেশ্যে (পুরীধামে গুন্ডিচা বাড়ি) গমন এবং সেখানে ৭দিন অবস্থান করে অষ্টমদিনে নিজ আলয়ে প্রত্যাবর্তন, পৃথিবীতে কোন দেবতার এই ধরণের ভ্রমণের নজির নেই যেখানে পুজিত দেবতারা নিজ আলয় (মন্দির) থেকে বাৎসরিক ভ্রমণে বাহির হন।

রথ এবং রথযাত্রা Read More »

সবাই ভালো

সবাই ভালো শ্রী রায় গ্রামের ধানক্ষেতের মাঝখানে, পাকারাস্তা থেকে একটু ভিতরে একটা তালগাছ ছিল। বেঁটে খাটো গাছ। তাল হতো না। কেবল জট বের হতো। ওগুলো আসলে তালগাছের ফুলের মঞ্জরী। শুকিয়ে গেলে জটার মতো দেখতে হতো। জোরে বাতাস বইলে ঝরে পড়ত মাটিতে। সেই গাছটায় বছর দুয়েক ধরে একটা একপেয়ে একানড়ে এসে বসবাস করতে শুরু করেছে। মাঠে চাষ করার সময় চাষীরা বুঝতে পারত ঐ গাছটায় কিছু একটা আছে। অনেকে আবার রাতের অন্ধকারে ফাঁকা মাঠে তালগাছটা থেকে ঝুরঝুর করে আগুনের ফুলকি ঝরে পড়তেও দেখেছে।ভূতটা অশরীরী হয়েই ছিল, কাউকে দেখা দেয়নি কোনো অনিষ্টও করেনি বরং ও আসার ফলে চাষবাসের উন্নতি দেখা দিল। ফলে গ্রামের মানুষেরা আদর করে একানড়েটাকে তালভূত বলে ডাকতে লাগল। একদিন এক চাষীবউ নয়নতারা নাম, সে তার চাষী বরকে দুপুরের খাবার দিতে এসেছিল। তারসঙ্গে ছিল ভাত, ডাল আর আলুভাজা। চাষী সেগুলো সপ সপ্ করে খেয়ে নিল। ভাত খাওয়ার পর চাষী বউ তার শাড়ির কোঁচড় থেকে ছোট্ট একটা কৌটো বের করল। তার মধ্যে ছিল নটা তালের বড়া। চারটে চাষী খেল চারটে খেল চাষীর বউ। বাকি রইল একটা। চাষী বউ বলর-এটা কে খাবে? চাষী বসেছিল ঐ তালগাছটার নীচে। একবার উপর দিকে তাকাল। তারপর চোখ নামিয়ে একটু ভেবে বলল। -বউ, দিয়ে দে ওটা তালভূতকে। খাক্ বেচারা। বউয়ের মন খুব দরদী, সে একটা বড়া তালগাছের গোড়ায় রেখে ‘ভূতদাদা খাও’ বলে চলে গেল। চাষীওকাজে মন দিল।একটু পরে মাঠ ফাঁকা হলে তালভূত গাছ থেকে নামল। দেহ ধারণ করে বড়াটা খেয়ে দেখল। সে ভূত হবার পর কোনোদিন তালের বড়া খায় নি। খেয়ে এতো ভালো লাগল যে, আরো কটা খাবার লোভ হল। দিনেরবেলা গ্রামের ভিতরে যাবার সাহস হল না। সন্ধ্যে হলে পর গায়ে একটা সাদা ময়লা কাপড় জড়িয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে ঘুরে ঘুরে খুঁজতে লাগল চাষির বাড়ি। গ্রামে অল্প কটাই বাড়ি ছিল। এক বাড়িতে শুনতে পেল শাশুড়ি তার ছেলের বউকে খুব বকছে।-তুমি এই কাজটা একদম ঠিক করোনি বউমা। তালের বড়া কেন তালভূতকে খাওয়াতে গেলে? -মা, আপনার ছেলেই তো বলল। -আমার ছেলে বলল আর তুমি করলে? একটা কথাও তো কারো শোনো না। ও কিছু জানে নাকি? তুমি তো জানো যাকে তাকে তালের বড়া খাওয়াতে নেই আকর্ষণ হয়। মানুষ হলেও না হয় হোতো, ভূতকে গেলে খাওয়াতে? সাহস তো মন্দ নয়! -আমি এটা জানতাম না।-কিছুই শেখোনি দেখছি বাপমায়ের কাছ থেকে। এবার দেখো কী হয়। আমাকেও তো একবার জিজ্ঞাসাকরতে পারতে ? -ভুল হয়ে গেছে। এবার থেকে আর কাউকে দেবো না। এসব কথা বলে ওরা দুজনে রান্নঘরের আলো নিভিয়ে শিকল তুলে দিল।তালভূত আড়ালে একপায়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। বুঝতে পারল এই সেই বউ যে তাকে বড়া খাইয়েছিল। সে রান্নাঘরের শিকল খুলে ভিতরে ঢুকে বাসনপত্র নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগল আর বড়া আছে কিনা। একটা বাটিতে তিন চারটে ছিল। পা ছড়িয়ে মজা করে সেগুলি খেল তারপর যেই উঠতে যাবে অন্ধকার ঘরে কিছু দেখতে না পেয়ে মাথাটা তাকে রাখা একটা মাটির হাঁড়ির সাথে ঠুকে গেল। হাঁড়িটা ঠাস্ করে পড়ল আর ভাঙল।শাশুড়ি আর বউমা হ্যারিকেন হাতে ছুটে এসে দেখে সাদা কাপড় পরে কে একটা রান্নাঘরে দাঁগিয়ে আছে, সরু একখানিমাত্র পা। পা টা বড়ো দেহটা তুলনায় ছোটো, লম্বা লম্বা হাত। গায়ের রং কালচে চোখগুলো রসগোল্লার মতো। ও বাবাগো মাগো বলে দুজনে বিকট চিৎকার আরম্ভ করল।তালভূতটা বলল-ভয় পেয়ো না গো, ভয় পেয়ো না। আমি তালের বড়া খেতে এসেছিলাম। -তুই কে? না বলে ঘরে ঢুকেছিস? -আমি গো গিন্নিমা আমি। তোমাদের গাঁয়ের অতিথি। তোমাদের বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে আবার আসব। আমার ভাগটা যেন রাখতে ভুলোনা। না বলে ঘরে ঢুকেছি বলে কিছু মনে কোরোনা, চাইতে সাহস পাইনি। বউদিমণি ভালো মেয়ে তাকে বোকো না। দাদাকেও না। বলতে বলতে ভূতটা হাওয়ার মতো শাশুড়ির গা ঘেঁসে হুস করেবেরিয়ে গেল। মিলিয়ে গেল কোথায়। এদিকে শাশুড়িমা হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসল-কী সব্বোনাশ হল গো কী সব্বোনাশ হল। শেষে মাঠের ভূত ঘরে ঢুকল? যেমনি আমার ছেলেটা আস্ত গাধা, তেমনি জুটেছে তার বউটা! এখন আমাকেই একটা কিছু করতে হবে। পরদিন সকালেই ছেলের সাথে কথা বলে বউকে দিল বাপের বাড়ি পাঠিয়ে।তিনদিন পর ছেলেকে বলল-চঞ্চল বাবা যাতো, মাঠে গিয়ে তোর নতুন দাদাকে নেমন্তন্ন করে আয়। সন্ধ্যার সময় একটু ভোজ দেব। চঞ্চলকুমার মায়ের বাধ্য ছেলে, ঠিকঠাক নেমন্তন্ন করে এল। ফিরে এসে মায়েরকথামতো মামারবাড়ি গেল দাদুকে দেখতে।সেদিন বিকাল থেকেই তোড়জোড় শুরু হল। বড়ো তে আঠিয়া তাল ছুলে তাতে নারকেল কোড়া, চালের গুঁড়ো, আরো সব ভালো ভালো জিনিস দিয়ে তালের বড়া ভাজতে বসল চঞ্চলের মা পরীবালা দাসী। সুন্দর খাবারের গন্ধে বাতাস ম ম করছে ছেলে বুড়ো ছুটে এল খাবে বলে। পরীবালা সক্কলকে ফিরিয়ে দিল ‘কালকে এসো’ বলে, আজ আমার ঘরে অতিথি আসবে। তাকে না দিয়ে কাউকে দিতে পারব না।এদিকে একানড়েটা গন্ধে গন্ধে ঠিক এসে হাজির হল। জিভ দিয়ে টস্ টস্ করে জল ঝরছে কৈ হল তোমাদের? ও গিন্নিমা, দাও শিগগির। আর তো পারি না ক্ষিদে চাপতে। কী জিনিস খাওয়ালেগো, আমিও পাগল বেনে গেছি।-এই তো বাছা, হয়ে এসেছে। তা তোর কটা ফুলুরি লাগবে বলতো? এই ধরো পঁচিশটা মতো হলেই হবে তার বেশি না। খেয়ে মনের আশ মেটেনি কিনা তাই -বা,বা,বা, তাই হবে। তুই কিন্তু ঘরে ঢুকবি না। জানলা দিয়ে হাত পাতবি। আমি একটা একটা করেদেবো, তুই খাবি। ভূতটা রান্নাঘরের পিছনে জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াল। হাতটাকে লম্বা করে জানালার শিকের মাঝখান দিয়ে গলিয়ে দিল। গিন্নিমা একটা একটা করে ভাজছে আর তেল থেকে তুলেই গরম গরম ওর হাতে দিচ্ছে। উঃ আঃ করে উঠল ভূতটা। বড্ড গরম বড্ড গরম! বেশ খেতে বেশ খেতে! জিভটা পুড়ে গেল, বড্ড গরম।এই করে পাঁচ নম্বর বড়া খাওয়ার জন্য যেই আবার হাত পেতেছে গিন্নিমা বলল- চোখটা বন্ধ কর তাহলে আর গরম লাগবে না। ভূতটা বিশ্বাস করে চোখ বন্ধ করেছে ওমনি চঞ্চলের মা বড়ো লোহার ডাবু হাতাটা, যেটা দিয়ে ভাজছিল, তাতে করে অনেকটা গরম তেল কড়াই থেকে তুলে ভূতের হাতে বেশ করে ঢেলে দিল।ভূতটার প্রায় গোটা হাতটাই ঝলসে গেল। বড়ো বড়ো ফোস্কা গজিয়ে উঠল দেখতে দেখতে। আর সে কী ছটফটানি! সে কী দাপাদাপি! সে কী কাতরানি। কী করলে গো গিন্নিমা কী করলে? এমন কাজ কেউ করে? নেমন্তন্ করে এনে এমনি সাজা দিলে? দুটো তো খেতেই এসেছিলাম, ক্ষতি করতে তো আসিনি! এখন আমার কী হবে? খুঁতো হয়ে গেলাম যে, কে আমাকে মানবে? সবাই টিটকারি দেবে এখন। পরীবালা হাসি আর চেপে রাখতে পারে না। ফিক্ ফিক্ করে হাসি দমকে দমকে বেরিয়ে আসছে। দেখ কেমন মজা! আর আসবি আমাদের বাড়ি? আবার যদি এবাড়ির ত্রিসীমানায় পা দিয়েছিস; কী আমার ছেলে, ছেলেবউয়ের দিকে নজর দিয়েছিস; এর থেকেও ভয়ানক কিছু হবে বলে দিলাম। আমার নাম পরীবালা! আমাকে সবাই যমের মতো ভয় খায়। তুই তো কোন ছাড়! তোর বাপঠাকুরদাও তোকে বাঁচাতে পারবে না।ভূতটা এবার বেজায় রেগে গেল। একে পোড়ার জ্বালা তার উপর পরীবালার কথার

সবাই ভালো Read More »

জীবন কৃতী সম্মান সিদ্ধেশ্বর আচার্য্যর

জীবন কৃতী সম্মান সিদ্ধেশ্বর আচার্য্যর বেশ কিছু দিন ধরেই অসুস্থ অবস্থায় বাড়িতে আছেন ৷ এর মধ্যে কিডনি জনিত অপারেশনও হয়েছে কলকাতার একটি নামী বেসরকারী হাসপাতালে ৷ কালনাতেও ভর্ত্তি ছিলেন একটি নার্সিংহোমে ৷ এ অবস্থায় তিনি বাইরের জগতের থেকে অনেকটাই দূরে আছেন ৷ এ অবস্থায় গত ০৭ই জুন ২০২৬-এ সিদ্ধেশ্বর বাবুর বাড়ি গিয়ে তাঁকে সম্মানিত করে এলেন ভাষাপথের একদল সদস্য ৷ উল্লেখ্য তিনি নিজেও ভাষাপথের প্রধান উপদেষ্টা ৷ তাঁর বাড়িতে গিয়ে সস্ত্রীক সিদ্ধেশ্বর বাবুকে সম্মানিত করে আসেন পত্রিকা সম্পাদক অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় , কালনা মহকুমা ইতিহাস ও পুরাতত্ব চর্চা কেন্দ্রের সম্পাদক বিশ্বজিৎ গাইন , কালনা যোগা সেন্টারের কর্নধার অদীপ চট্টোপাধ্যায় এবং থ্যালাসেমিয়া যোদ্ধা মধুসুদন দাস ৷ শ্রী সিদ্ধেশ্বর আচার্য্য বহুদিন থেকেই কালনাতে বসে ইতিহাস ও অন্যান্য পুরাতত্ব বিষয়ে গবেষণা চালিয়ে যাচ্ছেন ৷ নিয়মিত লেখাও তিনি লিখেছেন সারা ভারতের ছোটো বড় পত্রপত্রিকাতে , বেশকিছু বই আছে তাঁর ৷ তাঁর দীর্ঘদিনের এই লেখালিখি এবং পত্রিকা পরিচালনাতে প্রত্যক্ষ সহযোগিতার জন্য ভাষাপথ থেকে দেওয়া হল জীবনকৃতী সম্মাননা এবং একটি টেরাকোটার ফলক জানালেন সম্পাদক অভিজিৎ বাবু ৷ কালনার প্রতাপেশ্বর মন্দিরের টেরাকোটা র আদলে পোড়ামাটির ফলকটি তৈরি করেছেন শিল্পী ও শিক্ষক দেবব্রত রায় ৷ পুরস্কার গ্রহণ করার পর সিদ্ধেশ্বর বাবু ভাষাপথ পরিবারের সকলকে অনেক কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান ৷

জীবন কৃতী সম্মান সিদ্ধেশ্বর আচার্য্যর Read More »

ডলারের দম্ভ বনাম ফ্লেমিঙ্গোর ডানা:

ডলারের দম্ভ বনাম ফ্লেমিঙ্গোর ডানা: ট্রাম্পের জামাইয়ের বিলাসবহুল রিসর্ট ও এক অবরুদ্ধ রাজধানীর রূপকথা অয়ন মুখোপাধ্যায় দূর আলবেনিয়ার সমুদ্র উপকূল। নোনা বাতাস আজ ভারী। সেখানে হঠাৎ ডানা ঝাপটাচ্ছে একঝাঁক ফ্লেমিঙ্গো। এই গোলাপি ডানা আজ শুধু ওড়ার জন্য ছটফট করছে না। তারা যেন এক কর্পোরেট কফিনের ওপর মৃত্যুর পরোয়ানা লিখছে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার অলিন্দে জ্যারেড কুশনারের বাস। সম্পর্কে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই। এই কুশনারের লোভী চোখ পড়েছে আলবেনিয়ার শান্ত প্রকৃতির বুকে। কুশনার সাহেবদের ডলারের পাহাড় আছে। তাঁদের কাছে আলবেনিয়ার এই নোনা জল আর পরিযায়ী পাখির কলকাকলি নেহাতই এক ফালতু বিলাসিতা। তাই সেখানে মাথা তুলবে দশ হাজার ঘরের এক দানবীয় বিলাসবহুল রিসর্ট। প্রকৃতির ফুসফুসটা খুবলে নিতে চাইছে কুসনার সাহেব। সেখানে বসানো হবে কংক্রিটের এক কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড। কিন্তু হিসাবের খাতায় একটা মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছেন এই মার্কিন ধনকুবের। তিনি ভুলে গেছেন এক আশ্চর্য আদিম প্রতিরোধের কথা। পুঁজির দম্ভ যেখানেই প্রকৃতিকে রক্তগঙ্গায় ভাসাতে চাইছে, ঠিক সেখানেই গড়ে উঠছে প্রতিরোধ । বলকান অঞ্চলের এই ছোট দেশটার সাধারণ মানুষ আজ ঘর ছেড়ে রাজপথে নেমেছেন। রাজধানী তিরানা আজ অবরুদ্ধ। কোনো সেনাবাহিনীর বুটের তলায় এই অবরোধ হয়নি। রাজপথ থমকে গেছে খেটে খাওয়া আমজনতার এক অভূতপূর্ব মিছিলে। তাদের হাতে কোনো মারণাস্ত্র নেই। বুকে ধরা রয়েছে স্রেফ এক-একটা ফ্লেমিঙ্গো পাখির ছবি। এ লড়াই শুধু জল আর জমির নয়। এ লড়াই আসলে এক করপোরেট মস্তানির বিরুদ্ধে মানবতার শেষ জেহাদ। এই কর্পোরেট বাবুদের মানসিকতা দুনিয়ার সব প্রান্তেই এক রকম। ওয়াশিংটনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে আলবেনিয়ার ম্যাপের ওপর পেনসিল দিয়ে দাগ কাটা হচ্ছিল। তখন কুশনার বা তাঁর পারিষদদের মাথায় ছিল স্রেফ খাঁটি মুনাফার অঙ্ক। কতগুলো ঘর হলে কত ডলার আসবে, কোন কোন অ্যাঙ্গেল থেকে সমুদ্রের ভিউ সবচেয়ে ভালো পাওয়া যাবে— এই ছিল তাঁদের গবেষণার বিষয়। অথচ ভাবুন ওই জলাভূমির তলায় কত হাজার বছর ধরে একটা আস্ত বাস্তুতন্ত্র বেঁচে রয়েছে, তা নিয়ে তাঁদের কোনও মাথাব্যথা নেই। কত বিপন্ন প্রাণীর ওটাই শেষ আশ্রয়, সেই খতিয়ান দেখার সময় ও তাঁদের নেই। পুঁজিবাদ কখনো প্রকৃতির ভাষা বোঝে না। সে বোঝে শুধু লভ্যাংশের ভাষা।তারা ভেবেছিল একটা অনুন্নত দেশের সরকারকে পকেটে পুরে নিলেই কেল্লাফতে। আইন বদলে যাবে। পরিবেশের ছাড়পত্র চলে আসবে। আর চটজলদি তৈরি হয়ে যাবে ধনীদের ফুর্তি করার স্বর্গরাজ্য। কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যাওয়া এই আন্তর্জাতিক ফাটকাবাজরা মানুষের ভেতরের বারুদটাকে চিনতে ভুল করেন। তাঁরা ভাবেননি যে একটা পাখির জন্য মানুষ নিজের জীবন বাজি রাখতে পারে। এক চিলতে জলাভূমির জন্য মানুষ রাজপথে নেমে আসতে পারে। তিরানার রাজপথ আজ কুশনার সাহেবদের সেই অহংকারকে এক মস্ত বড় থাপ্পড় মেরেছে। তিরানার রাস্তা দিয়ে যদি আজ কেউ হেঁটে যান, তবে তিনি এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী থাকবেন। কোনো উগ্র স্লোগান নেই। নেই কোনো ভাঙচুরের তাণ্ডব। অথচ এক অমোঘ, নিরেট স্তব্ধতায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে গোটা রাজধানী। স্তব্ধতাও যে কত বড় প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে, আলবেনিয়ার জনতা আজ তা বিশ্বকে শেখাচ্ছে। বুড়ো থেকে শিশু, স্কুল শিক্ষক থেকে দিনমজুর— সবার হাতে শুধু ফ্লেমিঙ্গোর ছবি। এই ছবিটা আজ আর শুধু একটা সুন্দর পাখির অবয়ব নয়। এই গোলাপি ডানা আজ হয়ে উঠেছে শোষণের বিরুদ্ধে শোষিতের এক আন্তর্জাতিক প্রতীক। যখন রাষ্ট্র পুঁজির কাছে মাথা নোয়ায়, তখন সাধারণ মানুষই হয়ে ওঠে প্রকৃতির শেষ রক্ষাকবচ। শাসকেরা যখন বহুজাতিক সংস্থার দালালি করতে ব্যস্ত থাকে, তখন জনতা ঢাল হয়ে সামনে দাঁড়ায়। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, তিরানার রাজপথ মার্কিন ডলারের কাছে বিক্রি হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। যে জনতা এতকাল নিজেদের দৈনন্দিন রুটি-রুজির লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকত, তারা আজ এক মহত্তর উদ্দেশ্যে একজোট হয়েছে। আর এই একক লক্ষ্য যখন হাজার হাজার মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে, তখন সেখানে এমন এক আশ্চর্য শক্তির জন্ম হয়, যার সামনে পৃথিবীর বড় বড় সাম্রাজ্যও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য। ইতিহাস সাক্ষী, এই লড়াই নতুন কিছু নয়। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাঁচানোর লড়াই থেকে শুরু করে আমাজনের জঙ্গল রক্ষার আন্দোলন— সর্বত্রই খলনায়কের চেহারাটা এক। শুধু তার নাম আর পোশাকটা বদলে যায়। আজ আলবেনিয়ায় সেই খলনায়কের নাম জ্যারেড কুশনার। তিনি ভাবছেন ট্রাম্পের নাম ভাঙিয়ে আর করপোরেট ক্ষমতার দাপটে এই গণবিক্ষোভকে বুটের তলায় পিষে দেবেন। কিন্তু জনতা যখন একবার বুঝতে পারে যে তাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত আসছে, তখন তারা সমস্ত ভয়ডর ঝেড়ে ফেলে। এক অলৌকিক প্রাচীর তৈরি করে। আলবেনিয়ার মানুষ আজ সেই প্রাচীরটাই তুলে ধরেছে তিরানার বুকে। একটা দেশের রাজধানী স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মানে শুধু ট্রাফিকের চাকা থমকে যাওয়া নয়। ওটা আসলে শোষক শ্রেণীর হৃৎকম্পনের শব্দ কে থামিয়ে দেওয়া। মার্কিন ক্যাপিটালিজমের থাবা কতদূর বিস্তৃত, তা আমরা জানি। কিন্তু আমরা এটাও জানি যে সাধারণ মানুষের একতার চেয়ে বড় কোনো শক্তি আজ পর্যন্ত কোনো ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়নি। কুশনার সাহেবরা ডলার ছড়াতে পারেন। কিন্তু মানুষের এই আদিম, অকৃত্রিম আবেগকে কিনে নেওয়ার মতো রেস্ত তাঁদের ব্যাঙ্কে নেই। লড়াইটা হয়তো দীর্ঘ হবে। একদিকে থাকবে আধুনিকতম প্রযুক্তি, আইনি মারপ্যাঁচ আর রাষ্ট্রশক্তির পরোক্ষ মদত। অন্যদিকে থাকবে স্রেফ খালি হাত, কিছু প্ল্যাকার্ড আর বুকভরা জেদ। কিন্তু এই অসম লড়াইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য। আলবেনিয়ার এই আন্দোলন আজ সীমান্ত ছাড়িয়ে পৃথিবীর সমস্ত পরিবেশপ্রেমী, সমস্ত মুক্তিকামী মানুষের বুকে এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। এটা প্রমাণ করেছে যে দুনিয়াটা এখনো পুরোপুরি করপোরেটদের চারণभूमि হয়ে যায়নি। এখনো কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রকৃতির কান্না শুনতে পান। যাঁরা একটা পাখির ডানা মেলার अधिकार রক্ষা করতে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতে পারেন। তিরানার অবরুদ্ধ রাজপথ আজ বিশ্ব পুঁজিবাদের মুখে এক জ্বলন্ত প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে। শেষ পর্যন্ত এই লড়াইয়ের শেষ কোথায়, তা হয়তো ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কুশনারের সংস্থা হয়তো আরও অনেক আইনি চাল চালবে। হয়তো ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তর থেকে চাপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার। আলবেনিয়ার মানুষ অলক্ষ্যে একটা মস্ত বড় জয় ইতিমধ্যেই হাসিল করে ফেলেছে। তারা প্রমাণ করে দিয়েছে যে ঐক্যবদ্ধ জনতা যখন কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, তখন ক্ষমতার সিংহাসনও কাঁপতে শুরু করে। জ্যারেড কুশনার আলবেনিয়ার বুকে তাঁর বিলাসবহুল রিসর্টের একটা ইটও গাঁথতে পারবেন কিনা তা নিয়ে মস্ত বড় সংশয় তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু তার অনেক আগেই, তিরানার রাজপথে রাজপথে সাধারণ মানুষেরা প্রতিরোধের যে অভেদ্য, আশ্চর্য মিনার গড়ে তুলেছে, তার গায়ে আঁচড় কাটার সাধ্য কোনো ডোনাল্ড ট্রাম্প বা তাঁর ধনকুবের জামাইয়ের নেই। ফ্লেমিঙ্গোর গোলাপি ডানার সেই প্রতিবাদের আলোয় আজ বিশ্ব দেখছে এক নতুন রূপকথা। এখানে ডলারের দম্ভ হেরে যাচ্ছে প্রকৃতির আদিম টানে। আর শোষকের বন্দুক থমকে গেছে একজোড়া পাখির ছবির সামনে। ছবিসমৃহীত অর্ক ভাদুড়ীর দেওয়াল থেকে।  অয়ন মুখোপাধ্যায় লেখক পরিচিতি – কবি ও লেখক অয়ন মুখোপাধ্যায়। ঠিকানা – বলাগড়, হুগলী। যে সমম্ত পত্রিকাতে লিখে চলেছেন —  পরম্পরা ,বাংলা স্ট্রিট অনলাইন , গুরুচণ্ডালী  , বাংলা স্পিয়ার ,কেতাব ,ভারতের কণ্ঠ  বাঙালা নেটওয়ার্ক ,আবর্ত , আপনপাঠ , বিকল্প ,গণশক্তি ,জলদর্চি ৷

ডলারের দম্ভ বনাম ফ্লেমিঙ্গোর ডানা: Read More »

বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী

বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী মাতৃ সাধক ভবা পাগলা সত্যেন্দ্র প্রসাদ নন্দী যুগে যুগে বাংলা সাহিত্যের সম্ভারকে রত্নখচিত করে তুলেছেন বিভিন্ন মতের সাধক। বৈষ্ণব, বৈষ্ণবসহজিয়া, বাউল, মরমিবাদ, ফকিরি, সুফি এবং শাক্তপদাবলীর বিভিন্ন রচনা। ভবা পাগলা হলেন বিংশ শতাব্দীর এক জন অন্যন্য সাধক। ব্যক্তিত্বগত প্রতিভায় যে স্বাক্ষর রেখেছেন তা শুধু অনস্বীকার্য নয় গবেষকদের গবেষণার বস্তুগত উপাদান। একজন মানুষ থেকে তাঁর সিদ্ধ পুরুষে রূপান্তরের ক্ষেত্রে যে সকল বিশেষণে তাঁকে প্রতীয়মান করা হোক না কেন, সকল বিশেষণই তাঁর কাছে যেন ক্লিশে হয়ে পড়ে। তিনি তাঁর সাধনায় সিদ্ধ সাধক, মহাপুরুষে উত্তোরণ, উত্তর প্রজন্মের কাছে মহামানব। তিনি সমাজ তত্ত্ববিদদের কাছে একজন সমাজ সংস্কারক। সাহিত্য প্রতিভার স্বাক্ষরে কবি, গীতিকার। সঙ্গীত বোদ্ধাদের কাছে একজন সুরসাধক, সঙ্গীতশিল্পী, বেহালা বাদক, হারমোনিয়াম বাদক। এছাড়াও তিনি মৃৎশিল্পী, সূচী শিল্পী। আত্মভোলা এই মহামানব ভবেন্দ্র চৌধুরী থেকে আপামর শিষ্য, ভক্ত, শ্রোতা ও পাঠক সাধারণের কাছে হয়ে ওঠেন ভবা পাগলা। ভবাপাগলার সাধনকালে যে সমস্ত স্বরূপের উদঘাটন করেছেন, সেই সকল ভাবাদর্শের মধ্যে দিয়ে দর্শন ও চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক ভাবনার ভাববাদী বিশ্লেষণ করেছেন। সেই ভাবনা ও বিশ্বাসের পথিকৃত কিন্তু থেকে গেছেন আড়ালে। তাঁর জীবনচারণে যে আলোর সন্ধান করেছেন। সেই আলোর উৎসে নিজেকে নিয়ে গেছেন অসীম থেকে অনন্ত পথে, যা আসলে আজকের এই পৃথিবীর জটিল আবর্তে ঘুরে বেড়ানো মানবের কাছে চর্চিত বিষয় হয়ে পড়েছে। ভক্তি সাধনার বা আরাধনার আঙ্গিক কে নতুন পথের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এই আরাধনার পথেই তাঁর সিদ্ধ পুরুষ হয়ে ওঠার সোপান। নিজেকে জানার জন্য তাঁর প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসা এবং কর্মকান্ডকে তিনি রচনার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। প্রকাশ করেছেন নিজের উপলব্ধি যা আজ মানুষকে ভাবিয়ে তোলে- “যত খুঁজবি হারিয়ে যাবিবই পুস্তক আর চন্ডীগীতাআত্মনির্ভর এই তো ঈশ্বরখুলে দ্যাখ তোর মনের খাতা।” আত্মনির্ভরতা যে ঈশ্বরের নামান্তর সাধক কত সহজে তা বলে দিয়েছেন। মনের মধ্যে নানা রকম সংশয় থাকলে নির্ভরতা যেন সংশয়ের ঘূর্ণিপাকের মধ্যে পড়ে হারিয়ে যাবে। এই ভাবনা যেন আত্মাকে মুক্ত করে ঈশ্বরত্বে অনুধাবন করা। এই রচনাকে সামনে রেখে একটি বিষয় আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভবা পাগলাকে যতই খোঁজার চেষ্টা করা হোক তিনি কিন্তু নিজের কর্মকান্ডকে আড়ালে রেখেই হয়ে উঠেছেন অন্য আর পাঁচজন মানুষের থেকে স্বতন্ত্র। এই স্বতন্ত্র হয়ে ওঠা যেন সময়ের দিন গুনে চলেছিল। বালক বয়সেই মা কালী অবলম্বন করে এগিয়ে চলা। যত বড় হয়েছেন ততই যেন মাতৃজ্ঞানের আধারে মা কালীকে নিয়ে জীবনের ধ্রুব তারা স্বরূপ দিক নির্দিষ্ট করেছেন। জীবনের প্রতিটি কাজের সাথে জড়িয়ে পড়েছে মাতৃরূপের একাত্মতা, খেলার ছলেই হোক বা আত্মনির্ভরতার নিবেদনে, মা-এর কাছেই সকল চাওয়া পাওয়ার আকুতি। বালক বয়স থেকেই মাতৃনামের উপলব্ধিতে গানের মধ্যে দিয়ে জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, ক্রোধ-ভালোবাসা সকল অনুভুতির প্রকাশ করেছেন তাঁর রচনার মাধ্যমে। সঙ্গীতকে করে তুলেছেন মাতৃসাধনার একমাত্র উপাদান বা উপাচার হিসাবে। তিনি তাঁর গানে বলেছেন- “গানই আমার দেবী মূর্তি,গানই আমার স্ফূর্তি।” একজন সাধক তাঁর ঈশ্বর আরাধনায় বিভিন্ন উপাচার ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে সাধনক্রিয়া পরিচালনা করে থাকেন। কিন্তু ভবাপাগলা এখানেই এক নতুন ধারার দিক নির্দেশ করছেন। তিনি উপাচার হিসাবে গানকেই ভেবে নিয়েছেন। সমাজতাত্বিক ভাবনায় অন্য আরও একটি দিক নির্দেশ করে, গানকে মাধ্যম করে সমাজের অভ্যন্তরে মানুষের মধ্যে চেতনার উন্মেষ ঘটানোর প্রবল ইচ্ছা সাধকের মনোজগতে প্রতীয়মান ছিল। সেই সময়কালীন ভারত তথা বাংলা দেশের অবস্থানগত বিষয়গুলি লক্ষ্য করলে দেখা যায় জাত-পাত ধর্মীয় কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, দারিদ্রতা এবং অভাবের তাড়নায় মানুষের জীবন যন্ত্রনা সাধক জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সাধকের কাজ শুধু মাত্র তাঁর সাধনার পথে মানুষের কাছে চেতনার বার্তা তুলে ধরা। এক্ষেত্রে গানই হলো একমাত্র মাধ্যম যা এই মানুষগুলির কাছে বার্তাকে পৌঁছে দেওয়ার কাজে সহজতা তৈরি করে। গ্রাম বাংলার মানুষ লোকায়ত সাধনার নির্যাস লোক আঙ্গিকের গানের মধ্যে দিয়ে নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতার বিনিময় করে চলেছে। ভবাপাগলার মাতৃসাধনার ভাবাদর্শে জারিত হওয়া চেতনার উপলব্ধি গানের সুরে প্রকাশ করতে থাকেন। গ্রাম বাংলা তাঁর গানের কথা ও সুরে ভেসে যেতে থাকলো বিভিন্ন আসরে। তাঁর সেই সুরের নিমগ্নতায় যেন প্রকৃতি যেন ক্রমশ তাঁর কাছে এসে ধরা দিতে চাইছে। ভবাপাগলার জীবন পরিচয় সম্পর্কে যা জানা যায়, তা হল- পিতা গজেন্দ্র মোহন রায় চৌধুরী, মাতা গয়াসুন্দরী দেবী। ‘রায় চৌধুরী’ উপাধী হিসাবে পাওয়া। এই উপাধী হিসাবে রায়চৌধুরী নামের সাথে যুক্ত হওয়া মানেই জমিদারী ব্যবস্থার সাথে ভবাপাগলার পরিবার যে যুক্ত ছিল তা প্রমান হয়। মূল পদবী হলো সাহা। এই ধারণা থেকে বলা যায় ভবাপাগলা জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম কোজাগরী লক্ষী পূর্ণিমা তিথিতে শুক্রবার, তারিখ ১৩০৯ সালের ৩১শে আশ্বিন (ইংরাজী ১৯০২ সালের ১৭ই অক্টোবর)। ঢাকা জেলার ধামরাই থানার আমতা গ্রামে। আসল নাম ভবেন্দ্র মোহন সাহা (রায়চৌধুরী)। গজেন্দ্র মোহন রায় চৌধুরীর তিন পুত্র, গিরীন্দ্র, দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্র এবং এক কন্যা সন্তান সতী আগমনী। দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্র যমজ দুই ভাই। শৈশব জীবনেই ভবেন্দ্রকে দেখে পরিবারের মনে এক শঙ্কা উপস্থিত হয়। তার কারণ ভবেন্দ্র চলা ফেরা এবং পারিবারিক কালীমায়ের প্রতি আত্মমগ্নতা দেখে। আমতা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্রকে ভর্তি করা হলেও তাঁর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল না। এই নিয়ে শিক্ষকদের অভিযোগ শোনা যায়। ভবেন্দ্র পড়াশোনা বাদ দিয়ে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে কোন কিছু একটা খুঁজে চলেছেন। ভাকুটিয়া শ্মশানে যাতায়াত করতে থাকেন। আত্মভোলা ভবেন্দ্র মা কালীর প্রতি ভাবাবেশে নিমগ্ন হয়ে পড়া। এই বিষয়গুলি পরিবারের সকলকে আশঙ্কার মধ্যে রাখতো। এমতবস্থায় তাঁর দাদা গীরিন্দ্রমোহন দুই ভাইকে কলকাতায় নিয়ে এলেন। গিরিন্দ্র মোহন চৌধুরী সে সময় কলকাতায় পাটের একটি গুদামে চাকরী করতেন এবং কীর্তন গায়ক হিসাবে সুনাম অর্জন করেছেন। দুই ভাইকে কলকাতার নাম স্কুলে অর্থাৎ এরিয়ান্স স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু কলকাতায় এসেও ভবেন্দ্রমোহন একই ধারায় পরিচালিত হতে থাকলো পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে বেড়াতে থাকলো। আর তার সঙ্গে উপরি পাওনা হিসাবে দাদার সাথে বিভিন্ন কীর্তন আসরে উপস্থিত থাকা এবং গান গাওয়া। বালক ভবেন্দ্রর গান শুনে সকলেই খুব মুগ্ধ হয়ে পড়তো। কৃষ্ণ নাম ছাড়া বিশেষ করে শ্যামা সংগীতের সময়ে তাঁর ভাবের আবেশে সকলেই যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত স্থির হয়ে বসে থাকতো। মাঝে মাঝে ভবেন্দ্র মধ্যে ভাবে বিভোর হয়ে ধ্যানস্থ হয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতো। ভবাপাগলা শাক্ত সাধক হলেও তিনি বৈষ্ণবসাধনা ও শাক্ত সাধনার মধ্যে কোন প্রভেদ রাখেননি। বরং তিনি অভেদতত্ত্ব ও সমন্বয়িক সুরের জাগরণ ঘটিয়েছেন। যা আধুনিক যুগের শুরু সময়কালের এক সংস্কারমুক্ত জাগ্রত চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এই বিষয়ে একটি ধারণা আমরা দেখতে পাই কবি ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে। হরিহোড়ের আখ্যানে কবি ভারতচন্দ্র দেখিয়েছেন হরি এবং হর বা বিষ্ণু ও শিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ফলে এই সময়কালে শাক্ত কবিদের মধ্যে এই অভেদ তত্ত্বের প্রচলন ঘটেছিল। ফলত ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে কোনো তফাত নেই। এই ভাবনার মধ্যে দিয়ে জারিত হয়েছে ভবাপাগলার জীবনাচারণ। সাধকের সাধকোচিত ভাবনার রসে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এক অকল্পনীয় ছবি তৈরি করে গেছেন। তিনি লীলাকারী শক্তির দ্বারা নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন সমন্বয়ের বাহক। শাক্ত ও বৈষ্ণব বা অন্য কোন মত তাঁর কাছে ধরা মানব জীবনের বাস্তবতার নিরিখে পালনীয় কর্তব্যের ধারামতে।

বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী Read More »

অভয়া কে একটি খোলা চিঠি

অভয়া কে একটি খোলা চিঠি স্বপ্নেশ গুপ্ত অভয়া, কোথায় আছেন জানি না। কেমন আছেন তাও জানি না। জানার উপায়ও নেই। এখনো কি আশা করেন? স্বপ্ন দেখেন? নাকি এত দিন ধরে সুবিচার থেকে বঞ্চিত হবার তীব্র বেদনায়, অবসাদে, হতাশায় আপনার আশার মৃত্যু হয়েছে। স্বপ্ন দেখার ইচ্ছা আপনি হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন রাতের পর রাত জেগেও আমাদের চোখে ঘুম নেই। লাঞ্ছনা, অত্যাচার, অপমান, নিগ্রহ, হুমকি, ধমক, চমকানির পরেও আপনার বোনেরা, দিদিরা, মা -কাকিমা রা, দাদা রা ভাইরা, কাকারা, জ্যাঠারা জেগে আছি। প্রতি মুহূর্তে আমরা তীব্র যন্ত্রণায় বিবশ হয়ে গেছি কারণ আমরা দেখেছি আমাদের চোখের সামনে রাজপথে বীর দর্পে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সেই শ্বাপদ রা যারা আপনার হত্যার জন্য পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভাবে দায়ী। অবসাদ, হতাশার অন্ধকারে আমরা প্রতি মুহূর্তে ডুবে গেছি যখন দেখেছি যারা সুপরিকল্পিত ভাবে আপনাকে হত্যা করেছিল, আপনাকে ধর্ষণ করেছিল প্রশাসনের কর্তা রা তাদের কে বাঁচাতে ময়দানে নেমে গিয়েছিল। রাষ্ট্রিক ষড়যন্ত্রর মাধ্যমে আপনার সাথে ঘটা নারকীয় ঘটনার সত্য উদঘাটনে প্রতি পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করেছে। আমরা অবসন্ন হয়েও লড়াই ছাড়িনি, অত্যাচার, অপমান, নিপীড়ন আমাদের দমাতে পারে নি। আমরা হাল ছাড়ি নি। প্রশাসন তার সমস্ত নখ, দাঁত বার করে রাজপথের আন্দোলন কে থামিয়ে দিতে পেরেছে কিন্তু আমাদের বুকের ভেতরের আগুন কে নেভাতে পারে নি। সে আগুন কে নেভানোর ক্ষমতাও প্রশাসনের ছিল না। সেই আগুন আমাদের বুকের ভেতর এত দিন ধরে জ্বলে চলেছে। হ্যাঁ এখনো জ্বলছে। কারণ এখনো সুবিচার অধরা। সেই জ্বলন্ত আগুন আমাদের সংকল্প কে দৃঢ় করেছে। কোন এক অদৃশ্য বিনি সুতোর বন্ধনে বাঁধা পড়ে আমরা তৈরী হয়েছি, ঘরে ঘরে নীরবে জোট বেঁধেছি। আমরা অপেক্ষা করেছি উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত জবাব দেবার জন্য। পূর্বতন শাসক ভেবেছিল দুর্বল দের দমিয়ে দিতে পেরেছে। হ্যাঁ, আমরা নিতান্ত সাধারণ, আমরা দুর্বল। আমাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। কিন্তু “শাসনে যতই ঘেরো আছে বল দুর্বলেরও।” এই সহজ সত্যি টা চিরকালের মতন এবারো শাসক বুঝতে পারে নি। স্বাধীনোত্তর গণতান্ত্রিক, প্রজাতান্ত্রিক ভারতে এই বল আমাদের দিয়েছে আমাদের সংবিধান। একটি ভোটের বল। আপাত ভাবে নিরীহ কিন্তু সেই একটা একটা ভোট যখন গ্রামে, শহরে, জেলায়, রাজ্যে একজোট জয় তখন শাসকের আসন টলিয়ে দেয়। তখন রাজছত্র ভেঙে পরে। ক্ষমতা তখন ভুলুন্ঠিত হয়ে অস্তিত্বহীনতায় ভোগে। আমাদের ভেতরের সেই আগুন এবার ভোটের রূপ ধারণ করে সুনামি হয়ে আছড়ে পড়েছে ই ভি ইম এ।পূর্বতন শাসকদের করেছে ক্ষমতাচ্যুত।আর বর্তমান শাসক কে দিয়েছে সুবিচার করার দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা। আপনার মা আজ জয়ী। আজ তিনি যারা এ রাজ্যের নতুন শাসক হলেন তাদের একজন। মানুষ অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে আপনার মা কে জয়ী করেছেন। বিচার তাঁকে ছিনিয়ে আনতেই হবে। কারণ আপনি এখন আর শুধু রত্না দেবনাথের মেয়ে নন, আমরা সবাই আপনার আপন জন। সুবিচার যত দিন না পাওয়া যাবে ততদিন আমরা সেই দাবী থেকে সরবো না। সেই ষড়যন্ত্রী দের মধ্যে তিনজনের আজ ১৫/০৫/২০২৬ তারিখে মাঝারি মাপের শাস্তি হয়েছে। কিন্তু এরা তো সেই শাসনতন্ত্রের হাত, পা, চোখ, কান। তাই এদের শাস্তি সুবিচার নয়, তবে সুবিচারের পথে দৃঢ় পদক্ষেপ। কিন্তু মাথা অবধি পৌঁছাতে হবে। দিগন্তে লাল আলোর ছটা। কিন্তু এখানেই পথের শেষ নয়, আশার সমাপ্তিও নয়। বরং আরম্ভ। অনেক দূর অবধি যেতে হবে। আমরা আশায় বুক বাঁধছি।”ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে।”কিন্তু সেই আশার যদি সমাধি হয় তাহলে তার পরিণাম কিন্তু বর্তমান শাসকের পক্ষে ভালো হবে না। Justice can be delayed but can not be denied. দেরী অনেক হয়েছে, এবার যেন যত দ্রুত সম্ভব সুবিচার হয়।আর বর্তমান শাসকও যদি পূর্বতন শাসকের ছেড়ে যাওয়া পোষাক গায়ে চাপায় তাহলে তারা অবশ্যই যেন মনে রাখে – “আমাদের শক্তি মেরে তোরাও বাঁচবি নে রে  বোঝা তোর ভারী হলে ডুববে তরী খান। “  নিবেদনান্তে, আমরা যারা আপনার জন্য লড়ে চলেছি। স্বপ্নেশ গুপ্ত নদীয়া জেলার নৃসিংহপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরাজী শিক্ষক ৷ লেখার থেকে পড়াতেই বেশি আগ্রহ ৷ নাট্যকর্মী ৷ শ্রুতি নাটক লিখতে ভালোবাসেন ৷প্রবন্ধও লিখেছেন বেশ কিছু নামি পত্রিকায় ৷বিশেষ পচ্ছন্দ আড্ডা এবং গান শোনা সিনেমা দেখা ৷ঠিকানা — সেন পাড়া ,কালনা ,পূর্ব বর্ধমান ৷

অভয়া কে একটি খোলা চিঠি Read More »

সেদিন কুয়াশা ভোরে

সেদিন কুয়াশা ভোরে মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস   ঘুমটা আমার হঠাৎই ভেঙে গেল৷ এখন শীত শেষে বসন্ত আসব আসব করছে৷ তবু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব আছে বেশ৷ আর আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা তো আছেই৷ মনে হল, বাথরুম গেলে ভাল হয়৷ বোন পাশেই ঘুমে অচেতন৷ ঘরের দরজা খুলে বাইরে এলাম৷      আমাদের একতলা বাড়ি৷ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা৷ সামনে অনেকটা জায়গা নিয়ে আমাদের বাগান৷ বাবা মা আমার বোনের— সকলের প্রিয় শখ বাগান করা৷ মরশুমী ফুলরা এখনও শুকিয়ে যায় নি৷ এবার বেশ দেরী করেই ফুটেছে ডালিয়াও৷          ভেতরে একটা লম্বা গ্রীলঘেরা বারান্দার পাশে আমাদের ঘরগুলো৷ বারান্দার দুপ্রান্তের দুটি ঘর শোবার ঘর হিসাবে ব্যবহৃত হয়৷ মাঝে রান্না-খাবার ঘর, তা ছাড়া আছে একটা বড় ঘর যেটা লোকজন এলে শোয়ার ঘর, না হলে বসার কাজে লাগে৷ আমাদের দু’বোনের পড়ার জন্যও ব্যবহার হয়৷ বাইরে খোলা জায়গায় কলতলা আর সঙ্গে একটা বড়  বাথরুম আছে, তবু ছোট একটা বাথরুম বারান্দার এক প্রান্তে—বাবার ঘরের পাশে আছে, যাতে বারান্দার গ্রীল খুলে  রাতে আর বাইরে যেতে না হয়৷      বারান্দায় পা বাড়িয়ে বুঝলাম হালকা আলো ফুটলেও কুয়াশা কুয়াশা ভাব আছে৷ বারান্দার আলো জ্বালালে ঘুম চটকে যাবে এই আশঙ্কায় কোনো আলো জ্বালালাম না৷ বাথরুম যাবার সময় দেখলাম বাবার ঘরের দরজাটা বন্ধ৷ বাবা ঘরের দরজা সাধারণতঃ খুলেই রাখে, যাতে আমরা প্রয়োজন মত ডাকতে পারি৷ বারোমাস শুধু পর্দাটানা থাকে৷ মা নেই এখন বাড়িতে৷ মামারবাড়ি গেছে দাদু ডেকে পাঠিয়েছেন উকিলের সাথে কী কাজ আছে বলে৷     বাথরুমের কাজ মিটিয়ে আসতে আসতে দেখছি আমার শোবার ঘরের দরজার কাছে পিসিমণি দাঁড়িয়ে আছেন৷ আমার মনে পড়ল মা বলে গেছেন যে পিসিমণি আসবে৷ থাকবে ক’দিন৷ মা এলে তবে ফিরবেন৷ কাল রাতেও বাবা বলেছেন ট্রেন নাকি লেটে চলছে৷ পিসিমণির বাড়ি সেই ইন্দোরে৷ কতদিন পরে আসছেন৷     আমায় দেখে পিসিমণি ঘরে ঢুকে গেলেন৷ দরজাটা আধখোলা ছিল৷ আমি পেছন পেছন ঢুকতে যেতেই পাল্লাটা কাঁধে লাগল৷ ঢুকে দেখি পিসিমণি গদিমোড়া মোড়াটাতে বসে আছেন৷ আমি পিসিমণির দিকে ভাল করে তাকালাম৷ অনেক দিন দেখিনি৷ রোগা পাতলা মানুষ মোটেও নন৷ তবে, আধখোলা পাল্লা দিয়ে ঘরে এলেন কি করে?     এখন তো কথা বলা উচিত৷ মানে মা থাকলে যা আতিথেয়তা করত সে সব করা উচিত৷ কিন্তু আমি খুবই ঘুম কাতুরে মানুষ৷ কথা বললেই ঘুমটার বারোটা বাজবে৷ এই হালকা ঠান্ডায় কম্বল জড়িয়ে ভোর ভোর সেকেন্ড রাউন্ড ঘুম যে কি লোভনীয়!      “পিসিমণি, এত সকালেই পৌঁছে গেলে!”বলতেই সে বলল, “তুমি আমাকে চেন না?”      অবাক কথা৷ না চেনার কি আছে? তবে পিসিমণি তো এমন আটপৌড়ে শাড়ি পরে রাস্তায় যাতায়াত করবে না৷ তবে এনার সঙ্গে কার এত মিল? ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ল৷ আর মনে পড়তেই আমার মনে হল, তা কী করে সম্ভব?     তখন অনেক ছোট ছিলাম৷ দুধঠাকমা রোজ দুধ দিতে আসত আমাদের বাড়ি৷ মাঝে মাঝেই বায়না করতাম দুধঠাকমার বাড়ি যাবার৷ নিয়ে যেতেন৷ গরুর গোয়াল, খড় কাটা, জাবনাপাত্র, দুধ দোওয়ানো এসব দেখে মজা পেতাম৷ আর খেলতাম শিবের সাথে৷ আমারই বয়সী ঠাকমার ছোট নাতি৷ মানুষ যে চোখের পলকে কত কিছু ভাবতে পারে তা ভাবলেও অবাক লাগে৷ চোখের সামনে  মুহূর্তে ভেসে উঠল,গোয়ালঘর, খড়ের পালা, পুকুর ধার, শিবের সাথে লুকোচুরি—এই সব কিছু৷ কিন্তু শিবেরা তো এখানে থাকত না আর৷     সঙ্গে সঙ্গে একটা শিরশিরানি খেলে গেল আমার শিরদাঁড়ায়৷ আমি বোনকে আর বাবাকে ডাকতে ডাকতে তিড়িং বিড়িং লাফে বোনের কম্বলের তলায়৷ কিন্তু বোন কোনো সাড়া দিচ্ছে না৷ আমার গলা দিয়ে আদবেও কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে তো? গলা কেমন যেন আঠা আঠা৷      ঘুম ভাঙলো বোনের ধাক্কাধাক্কিতে৷ “কি রে দিদি আজ এত্ত ঘুমোচ্ছিস! আমাকে সকাল সকাল ডাকতে বলেছিলাম না? আমার পড়তে যাওয়া আছে৷”     চোখ খুলেই বললাম, “পিসিমণি এসে গেছে?” ততক্ষণে বাবা এ ঘরে হাজির৷ বলল, “দাঁড়া, ট্রেনের টাইমের আগে কি করে আসে বল? হাওড়া থেকে বাসে উঠেছে বলল ফোনে৷ একটু পরেই চলে আসবে৷”     বাবার হাতে চাবির গোছা৷ ঘুম থেকে উঠে বাবার প্রথম কাজ বারান্দার গ্রীল,বাইরের গেটসহ সব তালা খোলা৷ আমার আবার মনে হল গেট বন্ধ থাকলে কেউ ঘরে আসবে কি করে?     তখন আমি বাধ্য হয়ে ওদের সব কথা বলেই ফেললাম৷ বোন বলল, “দুধঠাকমা, মানে যিনি কালা হয়ে গেছিলেন? দুধ দিয়ে ফেরার পথে একদিন লাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়েন? আমি তো তাকে দেখিই নি৷ শুধু মাঝে মাঝে মা বলে ওনার কথা৷  তোকে নাকি খুব ভালবাসত?”     বাবা বলল, “ওসব তোমার স্বপ্ন৷ অবচেতন মনে তার কথা ভেবেছ হয়ত৷ তাছাড়া আমার ঘরের দরজা কাল রাতেও যথারীতি খোলাই ছিল৷ যা, হাতমুখ ধুয়ে এসে একটু চা বানা৷ সবাই খাই৷ ফ্রেস লাগবে৷”     বোন পড়তে চলে গেলে আমি বই নিয়ে নোট বানাতে বসলাম৷ কিন্তু মন বসছে না৷ শিবের কথা মনে পড়ছে৷ ঠাকমা মারা যাবার পর ওর বাবা পুঁটে জেঠা ওদের নিয়ে নিজের কাজের জায়গায় চলে গেছিলেন৷ জেঠা ছোটখাট কোনো কাজ করতেন বলেই ঠাকমা কষ্ট করেও দুধের ব্যবসা করতেন৷ কিন্তু আজ এত বছর পরে একথা মনে হল কেন?      পিসিমণি যথা সময়ে হাজির৷ নিজের হাতে তৈরী খাঁটি ঘি এনেছেন৷ আরও কত কি! বাবা ঘি ভালবাসেন৷ বললেন, তুই এলে বিশুদ্ধ ঘিএর স্বাদ পাই৷ এখানে সব ভেজাল৷”     পিসিমণি একথা শুনেই বলে উঠলেন, হ্যাঁ রে ছোড়দা, সেই যে মাসি আমাদের দুধ দিয়ে যেত তার নাতির কি খুব অসুখ?”     বাবা খুব চমকে উঠলেন৷ আমি তো বটেই৷  বাবা মুখে বলল, “কেন? কী হয়েছে শিবের?”      পিসিমণি বলল, বাস থেকে নেমে টোটোর খোঁজ করছি৷ দেখি,পুঁটেদা কাছের একটা নার্সিং হোমের সামনে৷ আমাকে চিনতে পারে নি নিশ্চয়ই৷ শুনলাম, পাশে দাঁড়ানো একজনকে বলছে, ‘এক্ষুনি বেশ খানিকটা টাকার জোগাড় না হলে  ছোট ছেলেটাকে বাঁচাতে পারব না৷’ আমি ভাবলাম তোকে বলব এসে, যদি কোনো ব্যবস্হা হয়৷”     আমি ঝলমলে দিনের আলোয় চোখে যেন অন্ধকার দেখছি৷ প্রচন্ড শীত শীত ভাব নিয়ে পিসিমণিকে জড়িয়ে ধরতে ধরতে দেখলাম, বাবা হন্তদন্ত হয়ে বাইরে বেড়িয়ে গেল৷ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস জন্ম অবিভক্ত বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমা শহরে ১৯৭৭ সালে । কালনার ঐতিহ্যবাহী হিন্দু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন কাটিয়ে এসে বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশপুর বালিকা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায়রত।বর্তমান নিবাস মেদিনীপুর শহরে।খুব ছোট থেকেই লেখালেখির জগতে আসা ও ছোট পত্র পত্রিকাগুলোর সান্নিধ্য পাওয়া৷ স্বর্গীয় সমরকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত শিশু কিশোর উপযোগী ছড়াপত্র পরত পত্রিকায় সহ সম্পাদনার কাজ করেছেন সম্পাদক বাবার সাথে। অনেক সংকলনেও নানা ধরণের লেখা স্হান পেয়েছে৷ পরিবারের সকলের উৎসাহ লেখার পথে পাথেয়।মূলতঃ ছড়া কিশোর কবিতা লিখলেও পাশাপাশি কবিতা, গল্প, নাটক এই সব লিখতেও খুব ভালোবাসেন। ভালো লাগে ছোটদের, বিশেষত: নিজের ছাত্রীদের নানান সাংস্কৃতিক কাজে উৎসাহিত করতে৷ এই কারণে জড়িয়ে পরেছেন আরও অনেক পত্রিকার সাথে। আগামীর ছোটরা সুস্হ সবুজ পরিবেশে ও সংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে উঠবে এই স্বপ্ন দেখেন । প্রকাশিত গ্রন্থ : ছড়াক্কা ছন্দে পুরস্কার: পল্লীবাসী পত্রিকা প্রদত্ত পল্লীকমল পুরস্কার, শ্রী অনীশ দেব স্মৃতি পুরস্কার, গোপা চক্রবর্তী স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। গোপা চক্রবর্তী স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০২৪তৃতীয় পুরস্কার কবিতা

সেদিন কুয়াশা ভোরে Read More »

রবীন্দ্র বীক্ষায় শিব

রবীন্দ্র বীক্ষায় শিব স্বপ্নেশ গুপ্ত   রবীন্দ্র নাথ ধর্ম বিশ্বাসের দিক থেকে ব্রাহ্ম ছিলেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাই তিনি পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস করতেন না। এমন কী সারা জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি মূর্তি পূজোর বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এও লক্ষ্যনীয় তিনি শিবের বন্দনা করেছেন। ধ্যান মন্ত্র এমন কী বিবিধ পুরাণে শিবের যে ভিন্ন ভিন্ন রূপ বৈশিষ্টের বার্ণনা আছে রবীন্দ্র নাথ তাঁর কবিতায়, গানে, প্রবন্ধে সেই রূপ গুলির এবং শিবের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টের প্রতি তাঁর প্রণতি নিবেদন করেছেন। আসলে সত্য, সুন্দরের পূজারী কবি সত্যম, শিবম, সুন্দরমের প্রতি অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন সুর, তাল, ছন্দ এবং শব্দের উপাচারে। অবশ্য একমাত্র শিব ই নয়, হিন্দু শাস্ত্র মতে সৃষ্টি কর্তা ব্রম্ভা র  প্রতি প্রণতি নিবেদন করে তিনি শব্দ মালা গাঁথছেন -দেশ শূন্য, কাল শূন্য জ্যোতি শূন্য মহাশূন্য ‘পরি /চতুর্মুখ করিছেন ধ্যান,/মহা অন্ধ অন্ধকার রয়েছে দাঁড়াইয়া /কবে দেব খুলিবে নয়ান। স্পষ্টতই এ যে ব্রম্ভার বন্দনা তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। কাল চক্র আবর্তিত হচ্ছে সৃষ্টি -স্থিতি -প্রলয় -এই ক্রমানুসারে। হিন্দু শাস্ত্র মতে ব্রম্ভা সেখানে সৃষ্টি কর্তা। সৃষ্টির পরে স্থিতি। বিষ্ণু সেই স্থিতির অধিশ্বর। “অনন্ত আকাশে দাঁড়াইয়া /চারিদিকে চারিহাত দিয়া /বিষ্ণু আসি মন্ত্র পড়ি দিলা /বিষ্ণু আসি কৈলা আশীর্বাদ।”অর্থাৎ কবি সৃষ্টির পালন কর্তা চতুর্ভুজ বিষ্ণুর প্রতি শব্দাঞ্জলী নিবেদন করলেন মনের মাধুরী মিশিয়ে।সৃষ্টি স্থিতি লাভ করলো। আর স্থিতি মানেই  বন্ধন। তাই সেই বন্ধন মুক্তির জন্য ‘অতি ভৈরব হরষে ‘রুদ্রের আগমন হয়। বৈদিক রূদ্র আর শিব এক, অভিন্ন। বেজে ওঠে প্রলয় বিষাণ, প্রণব নাদে ব্রম্ভান্ডে বাজে কালের মন্দিরা, বেজে ওঠে মহাকালের ডমরু। “প্রলয় বিষাণ তুলি করে ধরিলেন শুলী /পদতলে জগৎ চাপিয়া…/ছিঁড়িয়া পড়িয়া গেল /জগতের সমস্ত বাঁধন।”শুরু হল তান্ডব।”কে কোথায় ছুটে গেল /ভেঙে গেল টুটে গেল /সৃজনের আরম্ভ সময়ে /আছিল অনাদি অন্ধকার /সৃজনের ধ্বংস যুগান্তরে /রহিল অসীম হুতাশন /মহাদেব মুদি ত্রিনয়ন /করিতে লাগিলেন ধ্যান।” এখানে লক্ষ্যণীয় অপৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র শিবের রূপই পরিস্ফুটিত করছেন না, একই সাথে হিন্দু পুরাণে বর্ণিত ব্রম্ভা, বিষ্ণু, মহেশ্বরকে নিয়ে গাথা, কাহিনীকে শিল্প সুষমামন্ডিত ভাবে প্রকাশ করছেন। হিন্দু পুরাণানুসারে চর্তুমুখ প্রজাপতি ব্রম্ভা সৃষ্টিকর্তা। আদিতে তিনি একা ছিলেন। তিনি ব্রম্ভান্ড সৃষ্টি করলেন। তারপর চর্তুভুজ শঙ্খ, চক্র, পদ্ম, গদাধারী বিষ্ণু সেই সৃষ্টির পালন করলেন। জগধিতায় শ্রীকৃষ্ণায়, গোবিন্দায় নমঃ নমঃ। এর পর কালের মন্দিরার তালে তালে নাচেন নটরাজ। তিনিই বিশ্ব সংসারের নিয়ামক। কবি বিশ্বাস করতেন নটরাজের নৃত্যের ছন্দই আসলে ব্রম্ভান্ডের ছন্দ।”তোমার বিশ্ব নাচের দোলায় /বাঁধন খোলায়, বাঁধন পরায়।”আরো পরিস্ফুট করতে তিনি লিখছেন -“কাঁপে ছন্দে ভালো মন্দ তালে তালে /নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু পাছে পাছে /তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ /কী আনন্দ কী আনন্দ /দিবা রাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ /সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ। “ পুরাণের এই নটরাজ যিনি সুর গুরু, নৃত্য গুরু, বাদ্য গুরু তিনিই স্রষ্টা ও শিল্পী রবীন্দ্র নাথের হৃদয়জুড়ে বিরাজমান ছিল। “সংসারের রক্ত আকাশের মাঝখানে তোমার রবিকরোদ্দীপ্ত তৃতীয় নয়ন যেন ধ্রুব জ্যোতিতে আমার অন্তর কে উদ্ভাসিত করে তোলে।” তিনি সেই সংহার কর্তা কে আহ্বান করছেন -“নৃত্য কর, হে উন্মাদ নৃত্য করো। হে মৃত্যুঞ্জয়, আমাদের সমস্ত ভালো এবং সমস্ত মন্দের মধ্যে তোমারই জয় হউক “। এই প্রচন্ড কে তিনি আবাহন করে লিখছেন -রূদ্র, তোমার দারুণ দীপ্তি /এসেছে দুয়ার ভেদিয়া,/বক্ষে বেজেছে বিদ্যুৎ বান /স্বপ্নের জাল ছেদিয়া।/ভৈরব তুমি কী বেশে এসেছ /ললাটে ফুঁসিছে নাগিনী /রূদ্র বীণায় এই কি বাজিল সুপ্ৰভাতের রাগিনী?”কিন্তু এই সুপ্ৰভাত কি প্রতিদিনের রাত শেষের নতুন ভোর? অথবা জাগতিক ভোর? নাহ, এ ভোর অপার্থিব, মহাজাগতিক ভোর।তাই তিনি লিখছেন -“বহুকাল পরে হঠাৎ  যেন রে /অমানিশা গেল কাটিয়া “। তার পরেই বোঝা যায় তিনি কোন অমানিশার কথা বলতে চাইছেন।”তোমার খড়্গ আঁধার মহিষে দুখানা করিল কাটিয়া /ব্যথায় ভুবন ভরিছে /ঝর ঝর করি রক্ত আলোক গগনে গগনে ঝরিছে “।এরপরে সমস্ত সংশয়ের অবসান ঘটিয়ে   তিনি লিখলেন -“হে রূদ্র, তব সংগীত আমি /কেমনে গাহিব কহি দাও স্বামী -/মরণ নৃত্যে ছন্দ মিলায়ে /হৃদয় ডমরু বাজাব। অর্থাৎ রুদ্রের সেই প্রচন্ড রূপের আরাধনার ব্যাকুলতা। সেই সংহার কর্তার সম্যক পরিচয় পাবার আকুতি ধ্বনিত হল কবির কণ্ঠে -জীবন দুঃখে ডালি ভরে লয়ে /তোমার অর্ঘ্য সাজাব।এসেছে প্রভাত এসেছে /তিমিরান্তক শিব শঙ্কর /কী অট্ট হাস হেসেছে। আর তারপর একেবারে ভক্তিরসে সিক্ত হয়ে তিনি লিখলেন -“জীবন সপিয়া, জীবনেশ্বর /পেতে হবে তব পরিচয় /তোমার ডঙ্কা হবে যে /সকল শঙ্কা করি জয়।”আর শেষের পংক্তি তে মৃত্যুঞ্জয়ের বরাভয়ে সকল ভয়, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব কাটিয়ে তিনি উচ্চারণ করলেন অমৃতের বাণী -“মৃত্যুরে লব অমৃত করিয়া /তোমার চরণ ছোঁয়ায়।” কবির সৃষ্টির পথ তাই আকীর্ণ শিব চেতনায়, শিব স্তুতিতে। তিনি কবির কাছে নানান সময় নানা ভাবে ধরা দিচ্ছেন। কখনো নটরাজ ,কখনো রূদ্র, কখনো ভৈরব, কখনো মহাকাল আবার কখনো ভোলানাথ, কখনো বা শিব শম্ভু। কবি চেতনায়, মননে সেই রূদ্রের, ভৈরবের, মহাকালের  ধারাবাহিক উপস্থিতি। সেই কারণেই খর বৈশাখের মধ্যে তিনি সাজুয্য পান শুষ্ক বল্কল ধারী বৈরাগী মহাদেবের। আবার বাদল দিনে তাঁর মানসপটে পরিস্ফুটিত হয় মহাকালের সেই বিশাল, বিপুল অচঞ্চল রূপ -“বাদলার দিন মেঘদূতের দিন নয়, এ যে অচলতার দিন-চঞ্চল কালের প্রবল রূপ দেখছিনে বটে, কিন্তু অচঞ্চল দেশের বৃহৎ রূপ দেখা যাচ্ছে। শ্যামাকে দেখলুম না, কিন্তু শিবের দর্শন মিলিল। “আর এই অনন্ত বিশ্ব বীজের প্রতি তাঁর বন্দনা বাণীরূপ গ্রহণ করলো – ধন্য ধন্য তুমি মহেশ, ধন্য গাহে সর্বদেশ – অন্ত নাহি জানে -মহাকাল, মহাকাশ, গীত ছন্দে করে প্রদক্ষিণ তব অভয় চরণে শরণাগত দীন হীন হে রাজা, বিশ্ববন্ধু। স্বপ্নেশ গুপ্ত নদীয়া জেলার নৃসিংহপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরাজী শিক্ষক ৷ লেখার থেকে পড়াতেই বেশি আগ্রহ ৷ নাট্যকর্মী ৷ শ্রুতি নাটক লিখতে ভালোবাসেন ৷প্রবন্ধও লিখেছেন বেশ কিছু নামি পত্রিকায় ৷বিশেষ পচ্ছন্দ আড্ডা এবং গান শোনা সিনেমা দেখা ৷ঠিকানা — সেন পাড়া ,কালনা ,পূর্ব বর্ধমান ৷

রবীন্দ্র বীক্ষায় শিব Read More »

রবীন্দ্রনাথ ও ধর্ম

রবীন্দ্রনাথ ও ধর্ম অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়   প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশ বৈচিত্রের ধাম ৷ ধর্ম এবং সংস্কৃতির বিচরণক্ষেত্র ৷ ভাববাদ থেকে বস্তুবাদ ,কর্মবাদ থেকে জড়বাদ সব মতবাদের মিলন স্থল ভারতবর্ষ ৷তাই এখানের সাহিত্য এত বৈচিত্রধর্মী ৷সভ্যতা এত উন্নত ৷ সংস্কৃতি ,সভ্যতা ও ধর্ম যেন অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত ৷ কিন্তু প্রশ্ন হল যা বলা হয় এরা কি ঠিক ততটাই পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠতে পেরেছে ? একথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, ধর্মের উপর সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে বা সভ্যতার উপর ধর্ম। তবু এদের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক অবিচ্ছেদ্দ আত্মীয়তা। যে আত্মীয়তায় মানুষের ধর্মবোধ সভ্যতাকে সুন্দর করে আবার সভ্যতার বিভিন্ন প্রকরণ ও অনুষঙ্গগুলি ধর্মকে গড়ে তোলে এবং সতত চলিষ্ণু রাখে। অন্যভাবে বলা যায় আমাদের জীবন সাধারণ ভাবে, ধর্মের অভিঘাত সাম্প্রদায়িক আচার আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বংশ পরম্পরায় কতগুলি নির্ধারিত ক্রিয়াকর্মের মধ্যেই আমাদের ধর্মবোধ একটি অতি সংকীর্ণ গণ্ডীতেই আবদ্ধ থাকে। এবং সেই আবদ্ধতাকেই আমরা আস্তিকতা এবং ধার্মিকতা মনে করে প্রশ্নহীন একটি মুখস্থ জীবন কাটিয়ে দিতে পারার মধ্যেই ধর্মাচারণের সার্থকতা অনুভব করি, ও আত্মপ্রসাদ লাভ করি। অধিকাংশ মানুষের জীবনেই এ কথা সত্য; সভ্যতার আবহমান প্রবাহতার বাস্তবতায়। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথ। ক্ষুদ্র আমির গণ্ডী কেটে বৃহৎ আমির অভিমুখী তীর্থযাত্রার দূরন্ত অভিযাত্রী। তিনি প্রচলিত ধারার প্রশ্নহীন অনুকারক নন। তাই তাঁর ধর্মবোধ তো স্বতন্ত্র হতেই হবে। কবি জন্মেছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের একেবারে অন্দরমহলে। বৃটিশ শাসনের একেবারে প্রথম দিকেই হিন্দু ধর্মের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধাচারনের সূত্রপাতে রাজা রামমোহন রায়ের হাত ধরে আত্মপ্রকাশ করে প্রগতিশীল ব্রাহ্ম সমাজ। সেই সমাজের পরবর্তী নেতৃত্বস্থানীয় প্রধান পুরুষ ছিলেন কবির পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ফলে শৈশব থেকেই যুক্তিবাদী দার্শনিক আবহাওয়ার মধ্যেই গড়ে উঠতে থাকে রবীন্দ্রমনন। প্রথম দিকে মহর্ষির ধর্ম সাধনা, কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্ব, এ সবই তরুণ কবির উপর বিশেষ প্রভাব ফেলে। যৌবনের প্রারম্ভেই কবি ব্রাহ্মসমাজের একজন বিশিষ্ট ব্যাখ্যাতা হয়ে ওঠেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কাছে কবির প্রথম উপনিষদ শিক্ষা। উপনিষদের যুক্তিবাদ এবং গভীর দার্শনিক প্রজ্ঞা তৎসহ অসীম আধ্যাত্মিক উপলব্ধি রবীন্দ্রনাথকে বিশেষ ভাবেই প্রভাবিত করেছিল। যা কবির পরবর্তী জীবনে তাঁর ভাবনা রাজ্যে ও কর্মজীবনে বিপুলভাবেই সহায়ক হয়ে উঠেছিল। এর ফলে কবি প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের জীবনে ধর্মের অবক্ষয়ের নিদারুণ প্রভাব সম্বন্ধে গভীর ভাবেই অবহিত হয়ে ওঠেন। তিনি বুঝতে পারেন সমাজদেহের অভ্যন্তরে ধর্মের কোনো অস্তিত্বই আর অবশিষ্ট নেই। যা আছে তা যুক্তিহীন কতগুলি আচার বিচার যা বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। তিনি দেখলেন সেগুলির ধর্মান্ধ অনুকরণে ও অনুসরণের মধ্যে দিয়ে মানুষ সংকীর্ণ গণ্ডী বদ্ধতায় আটক।পরে যখন তিনি মানুষের ধর্ম বা Religion Of Man প্রবন্ধ লিখলেন সেখানেও উপনিষদ থেকে ধর্মকে খুঁজতে শুরু করেছিলেন ৷ তিনি দেখতে পেলেন এই প্রশ্নহীন অনুকরণ ও অনুসরণ এবং অন্ধ আনুগত্য প্রবৃত্তি সমাজদেহে ও ব্যক্তি জীবনে ধর্মকে আর সজীব থাকতে দেয় না। ধর্ম কেবলি কতগুলি প্রাতিষ্ঠানিক আচার বিচার পদ্ধতির অন্ধভাবে প্রতিপালনের নিছক ক্রিয়াকর্মই হয়ে ওঠে মাত্র। যার সাথে ব্যক্তি জীবনের যোগ হয় নিতান্তই পোশাকি। এই সব ধর্মীয় আচার বিচার পালন, এই বিশ্বজগতের সাথে ব্যক্তি জীবনের কোনো সংযোগ সেতু হয়ে উঠতে পারে না। এবং এইগুলিই মানুষকে কেবলি ছোট ছোট গণ্ডীতে আবদ্ধ করে ফেলে। বাধা দেয় বিশ্বমৈত্রীর পথে হাঁটতে। বিচ্ছিন্ন করে তোলে প্রত্যেক ধর্মীয় গোষ্ঠীকেগুলিকে, সাম্প্রদায়িক বিভেদের শক্তিতে। এসবই হয় কালের খেয়ায় বংশ পরম্পরায়। ধর্ম সম্বন্ধে, এই সংকীর্ণ গোষ্ঠীবদ্ধতার সীমানায় ধর্মান্ধ ভাবে শুষ্ক আচার বিচারের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য ও বংশ পরম্পরায় তার অনুকরণ ও অনুসরণ, রবীন্দ্রনাথের সংবেদনশীল ও প্রগতিশীল আধুনিক মনকে গভীর ভাবেই পীড়িত এবং ব্যথিত করেছিল। তিনি অনুধাবন করলেন প্রকৃত জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার অভাবজনিত কারণ এবং সমাজের সকল স্তরে সার্বিক শিক্ষা বিস্তারের অভাবই এই পরিণতির জন্য দায়ী। তাঁর সুবিশাল কর্মকাণ্ডে এবং সৃষ্টিশীল সাহিত্যজীবনে তাই তিনি বারবার নানা ভাবে সমাজের প্রচলিত ধর্ম গুলির এই সীমাবদ্ধতার প্রতি মননশীল আলোকপাত করে গেছেন। আচারবিচারের ঘেরাটোপ থেকে বেড়িয়ে প্রকৃত ধর্মবোধে উদ্বুদ্ধ হতে নিরন্তর অনুপ্রাণিত করে গেছেন। “আত্মপরিচয়” গ্রন্থে এক স্থানে কবি বলছেন, “সকল মানুষেরই আমার ধর্ম বলে একটা বিশেষ জিনিস আছে। কিন্তু সেইটাকেই সে স্পষ্ট করে জানে না। সে জানে আমি খ্রীস্টান, আমি মুসলমান, আমি শাক্ত, আমি বৈষ্ণব ইত্যাদি। আসলে মানুষের জীবনদর্শন বা চরিত্র, যা তার ব্যক্তিত্বের ভেতর থেকে জেগে ওঠে তাই ধর্ম।” এই “মানুষের ধর্মেরই” অন্তহীন সুর বাজিয়ে গিয়েছেন কবি তাঁর বিস্তৃত সৃজনশীল বাঁশিতে দীর্ঘ জীবন পরিক্রমায়। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক শ্যামল সেনগুপ্তের মতে, কবির ধর্মচেতনায় বৈষ্ণবের প্রেমভক্তি, বৌদ্ধের মৈত্রী-করুণা কিংবা খ্রিস্টানের ক্ষমাশীলতা একাকার হয়ে রাবীন্দ্রিক মানবধর্মেরই রূপ গ্রহণ করেছে। “Talks In China” গ্রন্থে কবি বললেন, “The specific meaning of dharma is that principle which holds us firm together and leads us to our best welfare. The general meaning of this word is the essential quality of thing.” এই যে সার্বিক সুস্থতার লক্ষ্যে সমবেত উৎকর্ষতার উদ্বোধন, রবীন্দ্রনাথের “মানুষের ধর্ম”-এর এই হল ভরকেন্দ্র। এইখান থেকেই গড়ে উঠবে আধুনিক সভ্যতা। তেমনি স্বপ্ন দেখতেন কবি। এই কারণেই তিনি বারবার মানুষের ধর্মবোধ জাগ্রত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। যে ধর্মবোধকেই তিনি মনুষত্ব বা সভ্যতা বলে বুঝতে চেয়েছেন। যে ধর্মবোধে মানুষের সাথে মানুষের আত্মীয়তায় গড়ে উঠবে বিশ্বমৈত্রী। বসুধৈবকুটুম্বিকম। সমাজ প্রচলিত ধর্ম ব্যবস্থা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের তীব্র ক্ষোভের প্রকাশ দেখি কাদম্বিনী দেবীকে বোলপুর থেকে লেখা (২০শে আষাঢ় ১৩১৭) পত্রে; কবি বলছেন, “…আমাদের দেশে ধর্মই মানুষের সাথে মানুষের প্রভেদ ঘটিয়েছে, আমরাই মানুষের নাম করে পরস্পরকে ঘৃণা করেচি, স্ত্রীলোককে হত্যা করেচি, শিশুকে জলে ফেলেচি, বিধবাকে নিতান্তই অকারণে তৃষ্ণায় দগ্ধ করেচি, নিরীহ পশুদের বলিদান করেচি, এবং সকল প্রকার বুদ্ধি যুক্তিকে একেবারে লঙ্ঘন করে এমন সকল নির্থকতার সৃষ্টি করেচি যাতে মানুষকে মূঢ় করে ফেলে। আমরা ধর্মের নামেই অপরিচিত মুমূর্ষুকে পথের ধারে পড়ে মরে যেতে দিই পাছে জাত যায়। (এ আমার জানা)” কেন এমন হয় প্রশ্ন করেছিলেন কবি। উত্তরও তিনিই দিয়েছেন। হেমন্তবালা দেবীকে দার্জিলিং থেকে লেখা (৯ই কার্তিক ১৩৩৮) এর পত্রে। বলছেন, “মানুষের ধর্ম মানুষের পরিপূর্ণতা, এই পরিপূর্ণতাকে কোনো এক অংশে বিশেষভাবে খণ্ডিত করে তাকে ধর্ম নাম দিয়ে আমরা মনুষ্যত্বকে আঘাত করি। এই জন্যেই ধর্মের নাম দিয়ে পৃথিবীতে যত নিদারুণ উপদ্রব ঘটেচে এমন বৈষয়িক লোভের তাগিদেও নয়। ধর্মের আক্রোশে যদি বা উপদ্রব নাও করি তবে ধর্মের মোহে মানুষকে নির্জ্জীব করে রাখি, তার বুদ্ধিকে নিরর্থক জড় অভ্যাসের নাগপাশে অস্থিতে মজ্জাতে নিস্পিষ্ট করে ফেলি – দৈবের প্রতি দূর্বল ভাবে আসক্ত করে।” এই ভাবে ধর্মের ধ্বজা উড়িয়ে মনুষ্যত্বের অপমানের মধ্যেই তিনি সভ্যতার অসুস্থতার কারণ খুঁজেছেন। বস্তুত রবীন্দ্রনাথ মানুষের সমগ্রতায় বিশ্বাসী ছিলেন। সেই সমগ্রতা থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে খণ্ড সত্যের সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ করার, প্রচলিত সাম্প্রদায়িক ধর্মগুলির প্রাণান্তকর প্রয়াসের বিরুদ্ধেই ছিল তাঁর অভিযান। এই ভাবে মানুষকে সাম্প্রদায়িক গণ্ডীতে আবদ্ধ করে রাখার বিশ্বব্যাপী মৌলবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধেই আজীবন সোচ্চার ছিলেন কবি। ঠিক যে কারণেই আশৈশব লালিত ব্রাহ্ম সমাজেও যখন এই সংকীর্ণতার সাম্প্রদায়িক চরিত্র লক্ষণ ফুটে উঠতে শুরু করেছিল, মধ্য যৌবনের সেই পর্বেই সেই ব্রাহ্ম সমাজের গণ্ডীবদ্ধতা থেকেও নিজেকে মুক্ত করে নেন কবি। তিনি এও বুঝে ছিলেন ধর্মবোধ ছাড়া

রবীন্দ্রনাথ ও ধর্ম Read More »

Scroll to Top