বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী
বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী মাতৃ সাধক ভবা পাগলা সত্যেন্দ্র প্রসাদ নন্দী যুগে যুগে বাংলা সাহিত্যের সম্ভারকে রত্নখচিত করে তুলেছেন বিভিন্ন মতের সাধক। বৈষ্ণব, বৈষ্ণবসহজিয়া, বাউল, মরমিবাদ, ফকিরি, সুফি এবং শাক্তপদাবলীর বিভিন্ন রচনা। ভবা পাগলা হলেন বিংশ শতাব্দীর এক জন অন্যন্য সাধক। ব্যক্তিত্বগত প্রতিভায় যে স্বাক্ষর রেখেছেন তা শুধু অনস্বীকার্য নয় গবেষকদের গবেষণার বস্তুগত উপাদান। একজন মানুষ থেকে তাঁর সিদ্ধ পুরুষে রূপান্তরের ক্ষেত্রে যে সকল বিশেষণে তাঁকে প্রতীয়মান করা হোক না কেন, সকল বিশেষণই তাঁর কাছে যেন ক্লিশে হয়ে পড়ে। তিনি তাঁর সাধনায় সিদ্ধ সাধক, মহাপুরুষে উত্তোরণ, উত্তর প্রজন্মের কাছে মহামানব। তিনি সমাজ তত্ত্ববিদদের কাছে একজন সমাজ সংস্কারক। সাহিত্য প্রতিভার স্বাক্ষরে কবি, গীতিকার। সঙ্গীত বোদ্ধাদের কাছে একজন সুরসাধক, সঙ্গীতশিল্পী, বেহালা বাদক, হারমোনিয়াম বাদক। এছাড়াও তিনি মৃৎশিল্পী, সূচী শিল্পী। আত্মভোলা এই মহামানব ভবেন্দ্র চৌধুরী থেকে আপামর শিষ্য, ভক্ত, শ্রোতা ও পাঠক সাধারণের কাছে হয়ে ওঠেন ভবা পাগলা। ভবাপাগলার সাধনকালে যে সমস্ত স্বরূপের উদঘাটন করেছেন, সেই সকল ভাবাদর্শের মধ্যে দিয়ে দর্শন ও চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক ভাবনার ভাববাদী বিশ্লেষণ করেছেন। সেই ভাবনা ও বিশ্বাসের পথিকৃত কিন্তু থেকে গেছেন আড়ালে। তাঁর জীবনচারণে যে আলোর সন্ধান করেছেন। সেই আলোর উৎসে নিজেকে নিয়ে গেছেন অসীম থেকে অনন্ত পথে, যা আসলে আজকের এই পৃথিবীর জটিল আবর্তে ঘুরে বেড়ানো মানবের কাছে চর্চিত বিষয় হয়ে পড়েছে। ভক্তি সাধনার বা আরাধনার আঙ্গিক কে নতুন পথের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এই আরাধনার পথেই তাঁর সিদ্ধ পুরুষ হয়ে ওঠার সোপান। নিজেকে জানার জন্য তাঁর প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসা এবং কর্মকান্ডকে তিনি রচনার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। প্রকাশ করেছেন নিজের উপলব্ধি যা আজ মানুষকে ভাবিয়ে তোলে- “যত খুঁজবি হারিয়ে যাবিবই পুস্তক আর চন্ডীগীতাআত্মনির্ভর এই তো ঈশ্বরখুলে দ্যাখ তোর মনের খাতা।” আত্মনির্ভরতা যে ঈশ্বরের নামান্তর সাধক কত সহজে তা বলে দিয়েছেন। মনের মধ্যে নানা রকম সংশয় থাকলে নির্ভরতা যেন সংশয়ের ঘূর্ণিপাকের মধ্যে পড়ে হারিয়ে যাবে। এই ভাবনা যেন আত্মাকে মুক্ত করে ঈশ্বরত্বে অনুধাবন করা। এই রচনাকে সামনে রেখে একটি বিষয় আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভবা পাগলাকে যতই খোঁজার চেষ্টা করা হোক তিনি কিন্তু নিজের কর্মকান্ডকে আড়ালে রেখেই হয়ে উঠেছেন অন্য আর পাঁচজন মানুষের থেকে স্বতন্ত্র। এই স্বতন্ত্র হয়ে ওঠা যেন সময়ের দিন গুনে চলেছিল। বালক বয়সেই মা কালী অবলম্বন করে এগিয়ে চলা। যত বড় হয়েছেন ততই যেন মাতৃজ্ঞানের আধারে মা কালীকে নিয়ে জীবনের ধ্রুব তারা স্বরূপ দিক নির্দিষ্ট করেছেন। জীবনের প্রতিটি কাজের সাথে জড়িয়ে পড়েছে মাতৃরূপের একাত্মতা, খেলার ছলেই হোক বা আত্মনির্ভরতার নিবেদনে, মা-এর কাছেই সকল চাওয়া পাওয়ার আকুতি। বালক বয়স থেকেই মাতৃনামের উপলব্ধিতে গানের মধ্যে দিয়ে জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, ক্রোধ-ভালোবাসা সকল অনুভুতির প্রকাশ করেছেন তাঁর রচনার মাধ্যমে। সঙ্গীতকে করে তুলেছেন মাতৃসাধনার একমাত্র উপাদান বা উপাচার হিসাবে। তিনি তাঁর গানে বলেছেন- “গানই আমার দেবী মূর্তি,গানই আমার স্ফূর্তি।” একজন সাধক তাঁর ঈশ্বর আরাধনায় বিভিন্ন উপাচার ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে সাধনক্রিয়া পরিচালনা করে থাকেন। কিন্তু ভবাপাগলা এখানেই এক নতুন ধারার দিক নির্দেশ করছেন। তিনি উপাচার হিসাবে গানকেই ভেবে নিয়েছেন। সমাজতাত্বিক ভাবনায় অন্য আরও একটি দিক নির্দেশ করে, গানকে মাধ্যম করে সমাজের অভ্যন্তরে মানুষের মধ্যে চেতনার উন্মেষ ঘটানোর প্রবল ইচ্ছা সাধকের মনোজগতে প্রতীয়মান ছিল। সেই সময়কালীন ভারত তথা বাংলা দেশের অবস্থানগত বিষয়গুলি লক্ষ্য করলে দেখা যায় জাত-পাত ধর্মীয় কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, দারিদ্রতা এবং অভাবের তাড়নায় মানুষের জীবন যন্ত্রনা সাধক জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সাধকের কাজ শুধু মাত্র তাঁর সাধনার পথে মানুষের কাছে চেতনার বার্তা তুলে ধরা। এক্ষেত্রে গানই হলো একমাত্র মাধ্যম যা এই মানুষগুলির কাছে বার্তাকে পৌঁছে দেওয়ার কাজে সহজতা তৈরি করে। গ্রাম বাংলার মানুষ লোকায়ত সাধনার নির্যাস লোক আঙ্গিকের গানের মধ্যে দিয়ে নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতার বিনিময় করে চলেছে। ভবাপাগলার মাতৃসাধনার ভাবাদর্শে জারিত হওয়া চেতনার উপলব্ধি গানের সুরে প্রকাশ করতে থাকেন। গ্রাম বাংলা তাঁর গানের কথা ও সুরে ভেসে যেতে থাকলো বিভিন্ন আসরে। তাঁর সেই সুরের নিমগ্নতায় যেন প্রকৃতি যেন ক্রমশ তাঁর কাছে এসে ধরা দিতে চাইছে। ভবাপাগলার জীবন পরিচয় সম্পর্কে যা জানা যায়, তা হল- পিতা গজেন্দ্র মোহন রায় চৌধুরী, মাতা গয়াসুন্দরী দেবী। ‘রায় চৌধুরী’ উপাধী হিসাবে পাওয়া। এই উপাধী হিসাবে রায়চৌধুরী নামের সাথে যুক্ত হওয়া মানেই জমিদারী ব্যবস্থার সাথে ভবাপাগলার পরিবার যে যুক্ত ছিল তা প্রমান হয়। মূল পদবী হলো সাহা। এই ধারণা থেকে বলা যায় ভবাপাগলা জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম কোজাগরী লক্ষী পূর্ণিমা তিথিতে শুক্রবার, তারিখ ১৩০৯ সালের ৩১শে আশ্বিন (ইংরাজী ১৯০২ সালের ১৭ই অক্টোবর)। ঢাকা জেলার ধামরাই থানার আমতা গ্রামে। আসল নাম ভবেন্দ্র মোহন সাহা (রায়চৌধুরী)। গজেন্দ্র মোহন রায় চৌধুরীর তিন পুত্র, গিরীন্দ্র, দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্র এবং এক কন্যা সন্তান সতী আগমনী। দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্র যমজ দুই ভাই। শৈশব জীবনেই ভবেন্দ্রকে দেখে পরিবারের মনে এক শঙ্কা উপস্থিত হয়। তার কারণ ভবেন্দ্র চলা ফেরা এবং পারিবারিক কালীমায়ের প্রতি আত্মমগ্নতা দেখে। আমতা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্রকে ভর্তি করা হলেও তাঁর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল না। এই নিয়ে শিক্ষকদের অভিযোগ শোনা যায়। ভবেন্দ্র পড়াশোনা বাদ দিয়ে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে কোন কিছু একটা খুঁজে চলেছেন। ভাকুটিয়া শ্মশানে যাতায়াত করতে থাকেন। আত্মভোলা ভবেন্দ্র মা কালীর প্রতি ভাবাবেশে নিমগ্ন হয়ে পড়া। এই বিষয়গুলি পরিবারের সকলকে আশঙ্কার মধ্যে রাখতো। এমতবস্থায় তাঁর দাদা গীরিন্দ্রমোহন দুই ভাইকে কলকাতায় নিয়ে এলেন। গিরিন্দ্র মোহন চৌধুরী সে সময় কলকাতায় পাটের একটি গুদামে চাকরী করতেন এবং কীর্তন গায়ক হিসাবে সুনাম অর্জন করেছেন। দুই ভাইকে কলকাতার নাম স্কুলে অর্থাৎ এরিয়ান্স স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু কলকাতায় এসেও ভবেন্দ্রমোহন একই ধারায় পরিচালিত হতে থাকলো পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে বেড়াতে থাকলো। আর তার সঙ্গে উপরি পাওনা হিসাবে দাদার সাথে বিভিন্ন কীর্তন আসরে উপস্থিত থাকা এবং গান গাওয়া। বালক ভবেন্দ্রর গান শুনে সকলেই খুব মুগ্ধ হয়ে পড়তো। কৃষ্ণ নাম ছাড়া বিশেষ করে শ্যামা সংগীতের সময়ে তাঁর ভাবের আবেশে সকলেই যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত স্থির হয়ে বসে থাকতো। মাঝে মাঝে ভবেন্দ্র মধ্যে ভাবে বিভোর হয়ে ধ্যানস্থ হয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতো। ভবাপাগলা শাক্ত সাধক হলেও তিনি বৈষ্ণবসাধনা ও শাক্ত সাধনার মধ্যে কোন প্রভেদ রাখেননি। বরং তিনি অভেদতত্ত্ব ও সমন্বয়িক সুরের জাগরণ ঘটিয়েছেন। যা আধুনিক যুগের শুরু সময়কালের এক সংস্কারমুক্ত জাগ্রত চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এই বিষয়ে একটি ধারণা আমরা দেখতে পাই কবি ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে। হরিহোড়ের আখ্যানে কবি ভারতচন্দ্র দেখিয়েছেন হরি এবং হর বা বিষ্ণু ও শিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ফলে এই সময়কালে শাক্ত কবিদের মধ্যে এই অভেদ তত্ত্বের প্রচলন ঘটেছিল। ফলত ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে কোনো তফাত নেই। এই ভাবনার মধ্যে দিয়ে জারিত হয়েছে ভবাপাগলার জীবনাচারণ। সাধকের সাধকোচিত ভাবনার রসে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এক অকল্পনীয় ছবি তৈরি করে গেছেন। তিনি লীলাকারী শক্তির দ্বারা নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন সমন্বয়ের বাহক। শাক্ত ও বৈষ্ণব বা অন্য কোন মত তাঁর কাছে ধরা মানব জীবনের বাস্তবতার নিরিখে পালনীয় কর্তব্যের ধারামতে।
বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী Read More »
