বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী

বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী মাতৃ সাধক ভবা পাগলা সত্যেন্দ্র প্রসাদ নন্দী যুগে যুগে বাংলা সাহিত্যের সম্ভারকে রত্নখচিত করে তুলেছেন বিভিন্ন মতের সাধক। বৈষ্ণব, বৈষ্ণবসহজিয়া, বাউল, মরমিবাদ, ফকিরি, সুফি এবং শাক্তপদাবলীর বিভিন্ন রচনা। ভবা পাগলা হলেন বিংশ শতাব্দীর এক জন অন্যন্য সাধক। ব্যক্তিত্বগত প্রতিভায় যে স্বাক্ষর রেখেছেন তা শুধু অনস্বীকার্য নয় গবেষকদের গবেষণার বস্তুগত উপাদান। একজন মানুষ থেকে তাঁর সিদ্ধ পুরুষে রূপান্তরের ক্ষেত্রে যে সকল বিশেষণে তাঁকে প্রতীয়মান করা হোক না কেন, সকল বিশেষণই তাঁর কাছে যেন ক্লিশে হয়ে পড়ে। তিনি তাঁর সাধনায় সিদ্ধ সাধক, মহাপুরুষে উত্তোরণ, উত্তর প্রজন্মের কাছে মহামানব। তিনি সমাজ তত্ত্ববিদদের কাছে একজন সমাজ সংস্কারক। সাহিত্য প্রতিভার স্বাক্ষরে কবি, গীতিকার। সঙ্গীত বোদ্ধাদের কাছে একজন সুরসাধক, সঙ্গীতশিল্পী, বেহালা বাদক, হারমোনিয়াম বাদক। এছাড়াও তিনি মৃৎশিল্পী, সূচী শিল্পী। আত্মভোলা এই মহামানব ভবেন্দ্র চৌধুরী থেকে আপামর শিষ্য, ভক্ত, শ্রোতা ও পাঠক সাধারণের কাছে হয়ে ওঠেন ভবা পাগলা। ভবাপাগলার সাধনকালে যে সমস্ত স্বরূপের উদঘাটন করেছেন, সেই সকল ভাবাদর্শের মধ্যে দিয়ে দর্শন ও চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক ভাবনার ভাববাদী বিশ্লেষণ করেছেন। সেই ভাবনা ও বিশ্বাসের পথিকৃত কিন্তু থেকে গেছেন আড়ালে। তাঁর জীবনচারণে যে আলোর সন্ধান করেছেন। সেই আলোর উৎসে নিজেকে নিয়ে গেছেন অসীম থেকে অনন্ত পথে, যা আসলে আজকের এই পৃথিবীর জটিল আবর্তে ঘুরে বেড়ানো মানবের কাছে চর্চিত বিষয় হয়ে পড়েছে। ভক্তি সাধনার বা আরাধনার আঙ্গিক কে নতুন পথের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এই আরাধনার পথেই তাঁর সিদ্ধ পুরুষ হয়ে ওঠার সোপান। নিজেকে জানার জন্য তাঁর প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসা এবং কর্মকান্ডকে তিনি রচনার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। প্রকাশ করেছেন নিজের উপলব্ধি যা আজ মানুষকে ভাবিয়ে তোলে- “যত খুঁজবি হারিয়ে যাবিবই পুস্তক আর চন্ডীগীতাআত্মনির্ভর এই তো ঈশ্বরখুলে দ্যাখ তোর মনের খাতা।” আত্মনির্ভরতা যে ঈশ্বরের নামান্তর সাধক কত সহজে তা বলে দিয়েছেন। মনের মধ্যে নানা রকম সংশয় থাকলে নির্ভরতা যেন সংশয়ের ঘূর্ণিপাকের মধ্যে পড়ে হারিয়ে যাবে। এই ভাবনা যেন আত্মাকে মুক্ত করে ঈশ্বরত্বে অনুধাবন করা। এই রচনাকে সামনে রেখে একটি বিষয় আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভবা পাগলাকে যতই খোঁজার চেষ্টা করা হোক তিনি কিন্তু নিজের কর্মকান্ডকে আড়ালে রেখেই হয়ে উঠেছেন অন্য আর পাঁচজন মানুষের থেকে স্বতন্ত্র। এই স্বতন্ত্র হয়ে ওঠা যেন সময়ের দিন গুনে চলেছিল। বালক বয়সেই মা কালী অবলম্বন করে এগিয়ে চলা। যত বড় হয়েছেন ততই যেন মাতৃজ্ঞানের আধারে মা কালীকে নিয়ে জীবনের ধ্রুব তারা স্বরূপ দিক নির্দিষ্ট করেছেন। জীবনের প্রতিটি কাজের সাথে জড়িয়ে পড়েছে মাতৃরূপের একাত্মতা, খেলার ছলেই হোক বা আত্মনির্ভরতার নিবেদনে, মা-এর কাছেই সকল চাওয়া পাওয়ার আকুতি। বালক বয়স থেকেই মাতৃনামের উপলব্ধিতে গানের মধ্যে দিয়ে জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, ক্রোধ-ভালোবাসা সকল অনুভুতির প্রকাশ করেছেন তাঁর রচনার মাধ্যমে। সঙ্গীতকে করে তুলেছেন মাতৃসাধনার একমাত্র উপাদান বা উপাচার হিসাবে। তিনি তাঁর গানে বলেছেন- “গানই আমার দেবী মূর্তি,গানই আমার স্ফূর্তি।” একজন সাধক তাঁর ঈশ্বর আরাধনায় বিভিন্ন উপাচার ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে সাধনক্রিয়া পরিচালনা করে থাকেন। কিন্তু ভবাপাগলা এখানেই এক নতুন ধারার দিক নির্দেশ করছেন। তিনি উপাচার হিসাবে গানকেই ভেবে নিয়েছেন। সমাজতাত্বিক ভাবনায় অন্য আরও একটি দিক নির্দেশ করে, গানকে মাধ্যম করে সমাজের অভ্যন্তরে মানুষের মধ্যে চেতনার উন্মেষ ঘটানোর প্রবল ইচ্ছা সাধকের মনোজগতে প্রতীয়মান ছিল। সেই সময়কালীন ভারত তথা বাংলা দেশের অবস্থানগত বিষয়গুলি লক্ষ্য করলে দেখা যায় জাত-পাত ধর্মীয় কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, দারিদ্রতা এবং অভাবের তাড়নায় মানুষের জীবন যন্ত্রনা সাধক জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সাধকের কাজ শুধু মাত্র তাঁর সাধনার পথে মানুষের কাছে চেতনার বার্তা তুলে ধরা। এক্ষেত্রে গানই হলো একমাত্র মাধ্যম যা এই মানুষগুলির কাছে বার্তাকে পৌঁছে দেওয়ার কাজে সহজতা তৈরি করে। গ্রাম বাংলার মানুষ লোকায়ত সাধনার নির্যাস লোক আঙ্গিকের গানের মধ্যে দিয়ে নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতার বিনিময় করে চলেছে। ভবাপাগলার মাতৃসাধনার ভাবাদর্শে জারিত হওয়া চেতনার উপলব্ধি গানের সুরে প্রকাশ করতে থাকেন। গ্রাম বাংলা তাঁর গানের কথা ও সুরে ভেসে যেতে থাকলো বিভিন্ন আসরে। তাঁর সেই সুরের নিমগ্নতায় যেন প্রকৃতি যেন ক্রমশ তাঁর কাছে এসে ধরা দিতে চাইছে। ভবাপাগলার জীবন পরিচয় সম্পর্কে যা জানা যায়, তা হল- পিতা গজেন্দ্র মোহন রায় চৌধুরী, মাতা গয়াসুন্দরী দেবী। ‘রায় চৌধুরী’ উপাধী হিসাবে পাওয়া। এই উপাধী হিসাবে রায়চৌধুরী নামের সাথে যুক্ত হওয়া মানেই জমিদারী ব্যবস্থার সাথে ভবাপাগলার পরিবার যে যুক্ত ছিল তা প্রমান হয়। মূল পদবী হলো সাহা। এই ধারণা থেকে বলা যায় ভবাপাগলা জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম কোজাগরী লক্ষী পূর্ণিমা তিথিতে শুক্রবার, তারিখ ১৩০৯ সালের ৩১শে আশ্বিন (ইংরাজী ১৯০২ সালের ১৭ই অক্টোবর)। ঢাকা জেলার ধামরাই থানার আমতা গ্রামে। আসল নাম ভবেন্দ্র মোহন সাহা (রায়চৌধুরী)। গজেন্দ্র মোহন রায় চৌধুরীর তিন পুত্র, গিরীন্দ্র, দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্র এবং এক কন্যা সন্তান সতী আগমনী। দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্র যমজ দুই ভাই। শৈশব জীবনেই ভবেন্দ্রকে দেখে পরিবারের মনে এক শঙ্কা উপস্থিত হয়। তার কারণ ভবেন্দ্র চলা ফেরা এবং পারিবারিক কালীমায়ের প্রতি আত্মমগ্নতা দেখে। আমতা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্রকে ভর্তি করা হলেও তাঁর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল না। এই নিয়ে শিক্ষকদের অভিযোগ শোনা যায়। ভবেন্দ্র পড়াশোনা বাদ দিয়ে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে কোন কিছু একটা খুঁজে চলেছেন। ভাকুটিয়া শ্মশানে যাতায়াত করতে থাকেন। আত্মভোলা ভবেন্দ্র মা কালীর প্রতি ভাবাবেশে নিমগ্ন হয়ে পড়া। এই বিষয়গুলি পরিবারের সকলকে আশঙ্কার মধ্যে রাখতো। এমতবস্থায় তাঁর দাদা গীরিন্দ্রমোহন দুই ভাইকে কলকাতায় নিয়ে এলেন। গিরিন্দ্র মোহন চৌধুরী সে সময় কলকাতায় পাটের একটি গুদামে চাকরী করতেন এবং কীর্তন গায়ক হিসাবে সুনাম অর্জন করেছেন। দুই ভাইকে কলকাতার নাম স্কুলে অর্থাৎ এরিয়ান্স স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু কলকাতায় এসেও ভবেন্দ্রমোহন একই ধারায় পরিচালিত হতে থাকলো পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে বেড়াতে থাকলো। আর তার সঙ্গে উপরি পাওনা হিসাবে দাদার সাথে বিভিন্ন কীর্তন আসরে উপস্থিত থাকা এবং গান গাওয়া। বালক ভবেন্দ্রর গান শুনে সকলেই খুব মুগ্ধ হয়ে পড়তো। কৃষ্ণ নাম ছাড়া বিশেষ করে শ্যামা সংগীতের সময়ে তাঁর ভাবের আবেশে সকলেই যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত স্থির হয়ে বসে থাকতো। মাঝে মাঝে ভবেন্দ্র মধ্যে ভাবে বিভোর হয়ে ধ্যানস্থ হয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতো। ভবাপাগলা শাক্ত সাধক হলেও তিনি বৈষ্ণবসাধনা ও শাক্ত সাধনার মধ্যে কোন প্রভেদ রাখেননি। বরং তিনি অভেদতত্ত্ব ও সমন্বয়িক সুরের জাগরণ ঘটিয়েছেন। যা আধুনিক যুগের শুরু সময়কালের এক সংস্কারমুক্ত জাগ্রত চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এই বিষয়ে একটি ধারণা আমরা দেখতে পাই কবি ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে। হরিহোড়ের আখ্যানে কবি ভারতচন্দ্র দেখিয়েছেন হরি এবং হর বা বিষ্ণু ও শিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ফলে এই সময়কালে শাক্ত কবিদের মধ্যে এই অভেদ তত্ত্বের প্রচলন ঘটেছিল। ফলত ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে কোনো তফাত নেই। এই ভাবনার মধ্যে দিয়ে জারিত হয়েছে ভবাপাগলার জীবনাচারণ। সাধকের সাধকোচিত ভাবনার রসে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এক অকল্পনীয় ছবি তৈরি করে গেছেন। তিনি লীলাকারী শক্তির দ্বারা নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন সমন্বয়ের বাহক। শাক্ত ও বৈষ্ণব বা অন্য কোন মত তাঁর কাছে ধরা মানব জীবনের বাস্তবতার নিরিখে পালনীয় কর্তব্যের ধারামতে।

বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী Read More »

অভয়া কে একটি খোলা চিঠি

অভয়া কে একটি খোলা চিঠি স্বপ্নেশ গুপ্ত অভয়া, কোথায় আছেন জানি না। কেমন আছেন তাও জানি না। জানার উপায়ও নেই। এখনো কি আশা করেন? স্বপ্ন দেখেন? নাকি এত দিন ধরে সুবিচার থেকে বঞ্চিত হবার তীব্র বেদনায়, অবসাদে, হতাশায় আপনার আশার মৃত্যু হয়েছে। স্বপ্ন দেখার ইচ্ছা আপনি হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন রাতের পর রাত জেগেও আমাদের চোখে ঘুম নেই। লাঞ্ছনা, অত্যাচার, অপমান, নিগ্রহ, হুমকি, ধমক, চমকানির পরেও আপনার বোনেরা, দিদিরা, মা -কাকিমা রা, দাদা রা ভাইরা, কাকারা, জ্যাঠারা জেগে আছি। প্রতি মুহূর্তে আমরা তীব্র যন্ত্রণায় বিবশ হয়ে গেছি কারণ আমরা দেখেছি আমাদের চোখের সামনে রাজপথে বীর দর্পে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সেই শ্বাপদ রা যারা আপনার হত্যার জন্য পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভাবে দায়ী। অবসাদ, হতাশার অন্ধকারে আমরা প্রতি মুহূর্তে ডুবে গেছি যখন দেখেছি যারা সুপরিকল্পিত ভাবে আপনাকে হত্যা করেছিল, আপনাকে ধর্ষণ করেছিল প্রশাসনের কর্তা রা তাদের কে বাঁচাতে ময়দানে নেমে গিয়েছিল। রাষ্ট্রিক ষড়যন্ত্রর মাধ্যমে আপনার সাথে ঘটা নারকীয় ঘটনার সত্য উদঘাটনে প্রতি পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করেছে। আমরা অবসন্ন হয়েও লড়াই ছাড়িনি, অত্যাচার, অপমান, নিপীড়ন আমাদের দমাতে পারে নি। আমরা হাল ছাড়ি নি। প্রশাসন তার সমস্ত নখ, দাঁত বার করে রাজপথের আন্দোলন কে থামিয়ে দিতে পেরেছে কিন্তু আমাদের বুকের ভেতরের আগুন কে নেভাতে পারে নি। সে আগুন কে নেভানোর ক্ষমতাও প্রশাসনের ছিল না। সেই আগুন আমাদের বুকের ভেতর এত দিন ধরে জ্বলে চলেছে। হ্যাঁ এখনো জ্বলছে। কারণ এখনো সুবিচার অধরা। সেই জ্বলন্ত আগুন আমাদের সংকল্প কে দৃঢ় করেছে। কোন এক অদৃশ্য বিনি সুতোর বন্ধনে বাঁধা পড়ে আমরা তৈরী হয়েছি, ঘরে ঘরে নীরবে জোট বেঁধেছি। আমরা অপেক্ষা করেছি উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত জবাব দেবার জন্য। পূর্বতন শাসক ভেবেছিল দুর্বল দের দমিয়ে দিতে পেরেছে। হ্যাঁ, আমরা নিতান্ত সাধারণ, আমরা দুর্বল। আমাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। কিন্তু “শাসনে যতই ঘেরো আছে বল দুর্বলেরও।” এই সহজ সত্যি টা চিরকালের মতন এবারো শাসক বুঝতে পারে নি। স্বাধীনোত্তর গণতান্ত্রিক, প্রজাতান্ত্রিক ভারতে এই বল আমাদের দিয়েছে আমাদের সংবিধান। একটি ভোটের বল। আপাত ভাবে নিরীহ কিন্তু সেই একটা একটা ভোট যখন গ্রামে, শহরে, জেলায়, রাজ্যে একজোট জয় তখন শাসকের আসন টলিয়ে দেয়। তখন রাজছত্র ভেঙে পরে। ক্ষমতা তখন ভুলুন্ঠিত হয়ে অস্তিত্বহীনতায় ভোগে। আমাদের ভেতরের সেই আগুন এবার ভোটের রূপ ধারণ করে সুনামি হয়ে আছড়ে পড়েছে ই ভি ইম এ।পূর্বতন শাসকদের করেছে ক্ষমতাচ্যুত।আর বর্তমান শাসক কে দিয়েছে সুবিচার করার দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা। আপনার মা আজ জয়ী। আজ তিনি যারা এ রাজ্যের নতুন শাসক হলেন তাদের একজন। মানুষ অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে আপনার মা কে জয়ী করেছেন। বিচার তাঁকে ছিনিয়ে আনতেই হবে। কারণ আপনি এখন আর শুধু রত্না দেবনাথের মেয়ে নন, আমরা সবাই আপনার আপন জন। সুবিচার যত দিন না পাওয়া যাবে ততদিন আমরা সেই দাবী থেকে সরবো না। সেই ষড়যন্ত্রী দের মধ্যে তিনজনের আজ ১৫/০৫/২০২৬ তারিখে মাঝারি মাপের শাস্তি হয়েছে। কিন্তু এরা তো সেই শাসনতন্ত্রের হাত, পা, চোখ, কান। তাই এদের শাস্তি সুবিচার নয়, তবে সুবিচারের পথে দৃঢ় পদক্ষেপ। কিন্তু মাথা অবধি পৌঁছাতে হবে। দিগন্তে লাল আলোর ছটা। কিন্তু এখানেই পথের শেষ নয়, আশার সমাপ্তিও নয়। বরং আরম্ভ। অনেক দূর অবধি যেতে হবে। আমরা আশায় বুক বাঁধছি।”ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে।”কিন্তু সেই আশার যদি সমাধি হয় তাহলে তার পরিণাম কিন্তু বর্তমান শাসকের পক্ষে ভালো হবে না। Justice can be delayed but can not be denied. দেরী অনেক হয়েছে, এবার যেন যত দ্রুত সম্ভব সুবিচার হয়।আর বর্তমান শাসকও যদি পূর্বতন শাসকের ছেড়ে যাওয়া পোষাক গায়ে চাপায় তাহলে তারা অবশ্যই যেন মনে রাখে – “আমাদের শক্তি মেরে তোরাও বাঁচবি নে রে  বোঝা তোর ভারী হলে ডুববে তরী খান। “  নিবেদনান্তে, আমরা যারা আপনার জন্য লড়ে চলেছি। স্বপ্নেশ গুপ্ত নদীয়া জেলার নৃসিংহপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরাজী শিক্ষক ৷ লেখার থেকে পড়াতেই বেশি আগ্রহ ৷ নাট্যকর্মী ৷ শ্রুতি নাটক লিখতে ভালোবাসেন ৷প্রবন্ধও লিখেছেন বেশ কিছু নামি পত্রিকায় ৷বিশেষ পচ্ছন্দ আড্ডা এবং গান শোনা সিনেমা দেখা ৷ঠিকানা — সেন পাড়া ,কালনা ,পূর্ব বর্ধমান ৷

অভয়া কে একটি খোলা চিঠি Read More »

সেদিন কুয়াশা ভোরে

সেদিন কুয়াশা ভোরে মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস   ঘুমটা আমার হঠাৎই ভেঙে গেল৷ এখন শীত শেষে বসন্ত আসব আসব করছে৷ তবু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব আছে বেশ৷ আর আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা তো আছেই৷ মনে হল, বাথরুম গেলে ভাল হয়৷ বোন পাশেই ঘুমে অচেতন৷ ঘরের দরজা খুলে বাইরে এলাম৷      আমাদের একতলা বাড়ি৷ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা৷ সামনে অনেকটা জায়গা নিয়ে আমাদের বাগান৷ বাবা মা আমার বোনের— সকলের প্রিয় শখ বাগান করা৷ মরশুমী ফুলরা এখনও শুকিয়ে যায় নি৷ এবার বেশ দেরী করেই ফুটেছে ডালিয়াও৷          ভেতরে একটা লম্বা গ্রীলঘেরা বারান্দার পাশে আমাদের ঘরগুলো৷ বারান্দার দুপ্রান্তের দুটি ঘর শোবার ঘর হিসাবে ব্যবহৃত হয়৷ মাঝে রান্না-খাবার ঘর, তা ছাড়া আছে একটা বড় ঘর যেটা লোকজন এলে শোয়ার ঘর, না হলে বসার কাজে লাগে৷ আমাদের দু’বোনের পড়ার জন্যও ব্যবহার হয়৷ বাইরে খোলা জায়গায় কলতলা আর সঙ্গে একটা বড়  বাথরুম আছে, তবু ছোট একটা বাথরুম বারান্দার এক প্রান্তে—বাবার ঘরের পাশে আছে, যাতে বারান্দার গ্রীল খুলে  রাতে আর বাইরে যেতে না হয়৷      বারান্দায় পা বাড়িয়ে বুঝলাম হালকা আলো ফুটলেও কুয়াশা কুয়াশা ভাব আছে৷ বারান্দার আলো জ্বালালে ঘুম চটকে যাবে এই আশঙ্কায় কোনো আলো জ্বালালাম না৷ বাথরুম যাবার সময় দেখলাম বাবার ঘরের দরজাটা বন্ধ৷ বাবা ঘরের দরজা সাধারণতঃ খুলেই রাখে, যাতে আমরা প্রয়োজন মত ডাকতে পারি৷ বারোমাস শুধু পর্দাটানা থাকে৷ মা নেই এখন বাড়িতে৷ মামারবাড়ি গেছে দাদু ডেকে পাঠিয়েছেন উকিলের সাথে কী কাজ আছে বলে৷     বাথরুমের কাজ মিটিয়ে আসতে আসতে দেখছি আমার শোবার ঘরের দরজার কাছে পিসিমণি দাঁড়িয়ে আছেন৷ আমার মনে পড়ল মা বলে গেছেন যে পিসিমণি আসবে৷ থাকবে ক’দিন৷ মা এলে তবে ফিরবেন৷ কাল রাতেও বাবা বলেছেন ট্রেন নাকি লেটে চলছে৷ পিসিমণির বাড়ি সেই ইন্দোরে৷ কতদিন পরে আসছেন৷     আমায় দেখে পিসিমণি ঘরে ঢুকে গেলেন৷ দরজাটা আধখোলা ছিল৷ আমি পেছন পেছন ঢুকতে যেতেই পাল্লাটা কাঁধে লাগল৷ ঢুকে দেখি পিসিমণি গদিমোড়া মোড়াটাতে বসে আছেন৷ আমি পিসিমণির দিকে ভাল করে তাকালাম৷ অনেক দিন দেখিনি৷ রোগা পাতলা মানুষ মোটেও নন৷ তবে, আধখোলা পাল্লা দিয়ে ঘরে এলেন কি করে?     এখন তো কথা বলা উচিত৷ মানে মা থাকলে যা আতিথেয়তা করত সে সব করা উচিত৷ কিন্তু আমি খুবই ঘুম কাতুরে মানুষ৷ কথা বললেই ঘুমটার বারোটা বাজবে৷ এই হালকা ঠান্ডায় কম্বল জড়িয়ে ভোর ভোর সেকেন্ড রাউন্ড ঘুম যে কি লোভনীয়!      “পিসিমণি, এত সকালেই পৌঁছে গেলে!”বলতেই সে বলল, “তুমি আমাকে চেন না?”      অবাক কথা৷ না চেনার কি আছে? তবে পিসিমণি তো এমন আটপৌড়ে শাড়ি পরে রাস্তায় যাতায়াত করবে না৷ তবে এনার সঙ্গে কার এত মিল? ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ল৷ আর মনে পড়তেই আমার মনে হল, তা কী করে সম্ভব?     তখন অনেক ছোট ছিলাম৷ দুধঠাকমা রোজ দুধ দিতে আসত আমাদের বাড়ি৷ মাঝে মাঝেই বায়না করতাম দুধঠাকমার বাড়ি যাবার৷ নিয়ে যেতেন৷ গরুর গোয়াল, খড় কাটা, জাবনাপাত্র, দুধ দোওয়ানো এসব দেখে মজা পেতাম৷ আর খেলতাম শিবের সাথে৷ আমারই বয়সী ঠাকমার ছোট নাতি৷ মানুষ যে চোখের পলকে কত কিছু ভাবতে পারে তা ভাবলেও অবাক লাগে৷ চোখের সামনে  মুহূর্তে ভেসে উঠল,গোয়ালঘর, খড়ের পালা, পুকুর ধার, শিবের সাথে লুকোচুরি—এই সব কিছু৷ কিন্তু শিবেরা তো এখানে থাকত না আর৷     সঙ্গে সঙ্গে একটা শিরশিরানি খেলে গেল আমার শিরদাঁড়ায়৷ আমি বোনকে আর বাবাকে ডাকতে ডাকতে তিড়িং বিড়িং লাফে বোনের কম্বলের তলায়৷ কিন্তু বোন কোনো সাড়া দিচ্ছে না৷ আমার গলা দিয়ে আদবেও কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে তো? গলা কেমন যেন আঠা আঠা৷      ঘুম ভাঙলো বোনের ধাক্কাধাক্কিতে৷ “কি রে দিদি আজ এত্ত ঘুমোচ্ছিস! আমাকে সকাল সকাল ডাকতে বলেছিলাম না? আমার পড়তে যাওয়া আছে৷”     চোখ খুলেই বললাম, “পিসিমণি এসে গেছে?” ততক্ষণে বাবা এ ঘরে হাজির৷ বলল, “দাঁড়া, ট্রেনের টাইমের আগে কি করে আসে বল? হাওড়া থেকে বাসে উঠেছে বলল ফোনে৷ একটু পরেই চলে আসবে৷”     বাবার হাতে চাবির গোছা৷ ঘুম থেকে উঠে বাবার প্রথম কাজ বারান্দার গ্রীল,বাইরের গেটসহ সব তালা খোলা৷ আমার আবার মনে হল গেট বন্ধ থাকলে কেউ ঘরে আসবে কি করে?     তখন আমি বাধ্য হয়ে ওদের সব কথা বলেই ফেললাম৷ বোন বলল, “দুধঠাকমা, মানে যিনি কালা হয়ে গেছিলেন? দুধ দিয়ে ফেরার পথে একদিন লাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়েন? আমি তো তাকে দেখিই নি৷ শুধু মাঝে মাঝে মা বলে ওনার কথা৷  তোকে নাকি খুব ভালবাসত?”     বাবা বলল, “ওসব তোমার স্বপ্ন৷ অবচেতন মনে তার কথা ভেবেছ হয়ত৷ তাছাড়া আমার ঘরের দরজা কাল রাতেও যথারীতি খোলাই ছিল৷ যা, হাতমুখ ধুয়ে এসে একটু চা বানা৷ সবাই খাই৷ ফ্রেস লাগবে৷”     বোন পড়তে চলে গেলে আমি বই নিয়ে নোট বানাতে বসলাম৷ কিন্তু মন বসছে না৷ শিবের কথা মনে পড়ছে৷ ঠাকমা মারা যাবার পর ওর বাবা পুঁটে জেঠা ওদের নিয়ে নিজের কাজের জায়গায় চলে গেছিলেন৷ জেঠা ছোটখাট কোনো কাজ করতেন বলেই ঠাকমা কষ্ট করেও দুধের ব্যবসা করতেন৷ কিন্তু আজ এত বছর পরে একথা মনে হল কেন?      পিসিমণি যথা সময়ে হাজির৷ নিজের হাতে তৈরী খাঁটি ঘি এনেছেন৷ আরও কত কি! বাবা ঘি ভালবাসেন৷ বললেন, তুই এলে বিশুদ্ধ ঘিএর স্বাদ পাই৷ এখানে সব ভেজাল৷”     পিসিমণি একথা শুনেই বলে উঠলেন, হ্যাঁ রে ছোড়দা, সেই যে মাসি আমাদের দুধ দিয়ে যেত তার নাতির কি খুব অসুখ?”     বাবা খুব চমকে উঠলেন৷ আমি তো বটেই৷  বাবা মুখে বলল, “কেন? কী হয়েছে শিবের?”      পিসিমণি বলল, বাস থেকে নেমে টোটোর খোঁজ করছি৷ দেখি,পুঁটেদা কাছের একটা নার্সিং হোমের সামনে৷ আমাকে চিনতে পারে নি নিশ্চয়ই৷ শুনলাম, পাশে দাঁড়ানো একজনকে বলছে, ‘এক্ষুনি বেশ খানিকটা টাকার জোগাড় না হলে  ছোট ছেলেটাকে বাঁচাতে পারব না৷’ আমি ভাবলাম তোকে বলব এসে, যদি কোনো ব্যবস্হা হয়৷”     আমি ঝলমলে দিনের আলোয় চোখে যেন অন্ধকার দেখছি৷ প্রচন্ড শীত শীত ভাব নিয়ে পিসিমণিকে জড়িয়ে ধরতে ধরতে দেখলাম, বাবা হন্তদন্ত হয়ে বাইরে বেড়িয়ে গেল৷ মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস জন্ম অবিভক্ত বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমা শহরে ১৯৭৭ সালে । কালনার ঐতিহ্যবাহী হিন্দু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন কাটিয়ে এসে বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশপুর বালিকা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায়রত।বর্তমান নিবাস মেদিনীপুর শহরে।খুব ছোট থেকেই লেখালেখির জগতে আসা ও ছোট পত্র পত্রিকাগুলোর সান্নিধ্য পাওয়া৷ স্বর্গীয় সমরকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত শিশু কিশোর উপযোগী ছড়াপত্র পরত পত্রিকায় সহ সম্পাদনার কাজ করেছেন সম্পাদক বাবার সাথে। অনেক সংকলনেও নানা ধরণের লেখা স্হান পেয়েছে৷ পরিবারের সকলের উৎসাহ লেখার পথে পাথেয়।মূলতঃ ছড়া কিশোর কবিতা লিখলেও পাশাপাশি কবিতা, গল্প, নাটক এই সব লিখতেও খুব ভালোবাসেন। ভালো লাগে ছোটদের, বিশেষত: নিজের ছাত্রীদের নানান সাংস্কৃতিক কাজে উৎসাহিত করতে৷ এই কারণে জড়িয়ে পরেছেন আরও অনেক পত্রিকার সাথে। আগামীর ছোটরা সুস্হ সবুজ পরিবেশে ও সংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে উঠবে এই স্বপ্ন দেখেন । প্রকাশিত গ্রন্থ : ছড়াক্কা ছন্দে পুরস্কার: পল্লীবাসী পত্রিকা প্রদত্ত পল্লীকমল পুরস্কার, শ্রী অনীশ দেব স্মৃতি পুরস্কার, গোপা চক্রবর্তী স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার প্রতিযোগিতা ইত্যাদি। গোপা চক্রবর্তী স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০২৪তৃতীয় পুরস্কার কবিতা

সেদিন কুয়াশা ভোরে Read More »

রবীন্দ্র বীক্ষায় শিব

রবীন্দ্র বীক্ষায় শিব স্বপ্নেশ গুপ্ত   রবীন্দ্র নাথ ধর্ম বিশ্বাসের দিক থেকে ব্রাহ্ম ছিলেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাই তিনি পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস করতেন না। এমন কী সারা জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি মূর্তি পূজোর বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এও লক্ষ্যনীয় তিনি শিবের বন্দনা করেছেন। ধ্যান মন্ত্র এমন কী বিবিধ পুরাণে শিবের যে ভিন্ন ভিন্ন রূপ বৈশিষ্টের বার্ণনা আছে রবীন্দ্র নাথ তাঁর কবিতায়, গানে, প্রবন্ধে সেই রূপ গুলির এবং শিবের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টের প্রতি তাঁর প্রণতি নিবেদন করেছেন। আসলে সত্য, সুন্দরের পূজারী কবি সত্যম, শিবম, সুন্দরমের প্রতি অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন সুর, তাল, ছন্দ এবং শব্দের উপাচারে। অবশ্য একমাত্র শিব ই নয়, হিন্দু শাস্ত্র মতে সৃষ্টি কর্তা ব্রম্ভা র  প্রতি প্রণতি নিবেদন করে তিনি শব্দ মালা গাঁথছেন -দেশ শূন্য, কাল শূন্য জ্যোতি শূন্য মহাশূন্য ‘পরি /চতুর্মুখ করিছেন ধ্যান,/মহা অন্ধ অন্ধকার রয়েছে দাঁড়াইয়া /কবে দেব খুলিবে নয়ান। স্পষ্টতই এ যে ব্রম্ভার বন্দনা তা বুঝতে অসুবিধা হয় না। কাল চক্র আবর্তিত হচ্ছে সৃষ্টি -স্থিতি -প্রলয় -এই ক্রমানুসারে। হিন্দু শাস্ত্র মতে ব্রম্ভা সেখানে সৃষ্টি কর্তা। সৃষ্টির পরে স্থিতি। বিষ্ণু সেই স্থিতির অধিশ্বর। “অনন্ত আকাশে দাঁড়াইয়া /চারিদিকে চারিহাত দিয়া /বিষ্ণু আসি মন্ত্র পড়ি দিলা /বিষ্ণু আসি কৈলা আশীর্বাদ।”অর্থাৎ কবি সৃষ্টির পালন কর্তা চতুর্ভুজ বিষ্ণুর প্রতি শব্দাঞ্জলী নিবেদন করলেন মনের মাধুরী মিশিয়ে।সৃষ্টি স্থিতি লাভ করলো। আর স্থিতি মানেই  বন্ধন। তাই সেই বন্ধন মুক্তির জন্য ‘অতি ভৈরব হরষে ‘রুদ্রের আগমন হয়। বৈদিক রূদ্র আর শিব এক, অভিন্ন। বেজে ওঠে প্রলয় বিষাণ, প্রণব নাদে ব্রম্ভান্ডে বাজে কালের মন্দিরা, বেজে ওঠে মহাকালের ডমরু। “প্রলয় বিষাণ তুলি করে ধরিলেন শুলী /পদতলে জগৎ চাপিয়া…/ছিঁড়িয়া পড়িয়া গেল /জগতের সমস্ত বাঁধন।”শুরু হল তান্ডব।”কে কোথায় ছুটে গেল /ভেঙে গেল টুটে গেল /সৃজনের আরম্ভ সময়ে /আছিল অনাদি অন্ধকার /সৃজনের ধ্বংস যুগান্তরে /রহিল অসীম হুতাশন /মহাদেব মুদি ত্রিনয়ন /করিতে লাগিলেন ধ্যান।” এখানে লক্ষ্যণীয় অপৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র শিবের রূপই পরিস্ফুটিত করছেন না, একই সাথে হিন্দু পুরাণে বর্ণিত ব্রম্ভা, বিষ্ণু, মহেশ্বরকে নিয়ে গাথা, কাহিনীকে শিল্প সুষমামন্ডিত ভাবে প্রকাশ করছেন। হিন্দু পুরাণানুসারে চর্তুমুখ প্রজাপতি ব্রম্ভা সৃষ্টিকর্তা। আদিতে তিনি একা ছিলেন। তিনি ব্রম্ভান্ড সৃষ্টি করলেন। তারপর চর্তুভুজ শঙ্খ, চক্র, পদ্ম, গদাধারী বিষ্ণু সেই সৃষ্টির পালন করলেন। জগধিতায় শ্রীকৃষ্ণায়, গোবিন্দায় নমঃ নমঃ। এর পর কালের মন্দিরার তালে তালে নাচেন নটরাজ। তিনিই বিশ্ব সংসারের নিয়ামক। কবি বিশ্বাস করতেন নটরাজের নৃত্যের ছন্দই আসলে ব্রম্ভান্ডের ছন্দ।”তোমার বিশ্ব নাচের দোলায় /বাঁধন খোলায়, বাঁধন পরায়।”আরো পরিস্ফুট করতে তিনি লিখছেন -“কাঁপে ছন্দে ভালো মন্দ তালে তালে /নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু পাছে পাছে /তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ /কী আনন্দ কী আনন্দ /দিবা রাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ /সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ। “ পুরাণের এই নটরাজ যিনি সুর গুরু, নৃত্য গুরু, বাদ্য গুরু তিনিই স্রষ্টা ও শিল্পী রবীন্দ্র নাথের হৃদয়জুড়ে বিরাজমান ছিল। “সংসারের রক্ত আকাশের মাঝখানে তোমার রবিকরোদ্দীপ্ত তৃতীয় নয়ন যেন ধ্রুব জ্যোতিতে আমার অন্তর কে উদ্ভাসিত করে তোলে।” তিনি সেই সংহার কর্তা কে আহ্বান করছেন -“নৃত্য কর, হে উন্মাদ নৃত্য করো। হে মৃত্যুঞ্জয়, আমাদের সমস্ত ভালো এবং সমস্ত মন্দের মধ্যে তোমারই জয় হউক “। এই প্রচন্ড কে তিনি আবাহন করে লিখছেন -রূদ্র, তোমার দারুণ দীপ্তি /এসেছে দুয়ার ভেদিয়া,/বক্ষে বেজেছে বিদ্যুৎ বান /স্বপ্নের জাল ছেদিয়া।/ভৈরব তুমি কী বেশে এসেছ /ললাটে ফুঁসিছে নাগিনী /রূদ্র বীণায় এই কি বাজিল সুপ্ৰভাতের রাগিনী?”কিন্তু এই সুপ্ৰভাত কি প্রতিদিনের রাত শেষের নতুন ভোর? অথবা জাগতিক ভোর? নাহ, এ ভোর অপার্থিব, মহাজাগতিক ভোর।তাই তিনি লিখছেন -“বহুকাল পরে হঠাৎ  যেন রে /অমানিশা গেল কাটিয়া “। তার পরেই বোঝা যায় তিনি কোন অমানিশার কথা বলতে চাইছেন।”তোমার খড়্গ আঁধার মহিষে দুখানা করিল কাটিয়া /ব্যথায় ভুবন ভরিছে /ঝর ঝর করি রক্ত আলোক গগনে গগনে ঝরিছে “।এরপরে সমস্ত সংশয়ের অবসান ঘটিয়ে   তিনি লিখলেন -“হে রূদ্র, তব সংগীত আমি /কেমনে গাহিব কহি দাও স্বামী -/মরণ নৃত্যে ছন্দ মিলায়ে /হৃদয় ডমরু বাজাব। অর্থাৎ রুদ্রের সেই প্রচন্ড রূপের আরাধনার ব্যাকুলতা। সেই সংহার কর্তার সম্যক পরিচয় পাবার আকুতি ধ্বনিত হল কবির কণ্ঠে -জীবন দুঃখে ডালি ভরে লয়ে /তোমার অর্ঘ্য সাজাব।এসেছে প্রভাত এসেছে /তিমিরান্তক শিব শঙ্কর /কী অট্ট হাস হেসেছে। আর তারপর একেবারে ভক্তিরসে সিক্ত হয়ে তিনি লিখলেন -“জীবন সপিয়া, জীবনেশ্বর /পেতে হবে তব পরিচয় /তোমার ডঙ্কা হবে যে /সকল শঙ্কা করি জয়।”আর শেষের পংক্তি তে মৃত্যুঞ্জয়ের বরাভয়ে সকল ভয়, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব কাটিয়ে তিনি উচ্চারণ করলেন অমৃতের বাণী -“মৃত্যুরে লব অমৃত করিয়া /তোমার চরণ ছোঁয়ায়।” কবির সৃষ্টির পথ তাই আকীর্ণ শিব চেতনায়, শিব স্তুতিতে। তিনি কবির কাছে নানান সময় নানা ভাবে ধরা দিচ্ছেন। কখনো নটরাজ ,কখনো রূদ্র, কখনো ভৈরব, কখনো মহাকাল আবার কখনো ভোলানাথ, কখনো বা শিব শম্ভু। কবি চেতনায়, মননে সেই রূদ্রের, ভৈরবের, মহাকালের  ধারাবাহিক উপস্থিতি। সেই কারণেই খর বৈশাখের মধ্যে তিনি সাজুয্য পান শুষ্ক বল্কল ধারী বৈরাগী মহাদেবের। আবার বাদল দিনে তাঁর মানসপটে পরিস্ফুটিত হয় মহাকালের সেই বিশাল, বিপুল অচঞ্চল রূপ -“বাদলার দিন মেঘদূতের দিন নয়, এ যে অচলতার দিন-চঞ্চল কালের প্রবল রূপ দেখছিনে বটে, কিন্তু অচঞ্চল দেশের বৃহৎ রূপ দেখা যাচ্ছে। শ্যামাকে দেখলুম না, কিন্তু শিবের দর্শন মিলিল। “আর এই অনন্ত বিশ্ব বীজের প্রতি তাঁর বন্দনা বাণীরূপ গ্রহণ করলো – ধন্য ধন্য তুমি মহেশ, ধন্য গাহে সর্বদেশ – অন্ত নাহি জানে -মহাকাল, মহাকাশ, গীত ছন্দে করে প্রদক্ষিণ তব অভয় চরণে শরণাগত দীন হীন হে রাজা, বিশ্ববন্ধু। স্বপ্নেশ গুপ্ত নদীয়া জেলার নৃসিংহপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরাজী শিক্ষক ৷ লেখার থেকে পড়াতেই বেশি আগ্রহ ৷ নাট্যকর্মী ৷ শ্রুতি নাটক লিখতে ভালোবাসেন ৷প্রবন্ধও লিখেছেন বেশ কিছু নামি পত্রিকায় ৷বিশেষ পচ্ছন্দ আড্ডা এবং গান শোনা সিনেমা দেখা ৷ঠিকানা — সেন পাড়া ,কালনা ,পূর্ব বর্ধমান ৷

রবীন্দ্র বীক্ষায় শিব Read More »

রবীন্দ্রনাথ ও ধর্ম

রবীন্দ্রনাথ ও ধর্ম অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়   প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের দেশ বৈচিত্রের ধাম ৷ ধর্ম এবং সংস্কৃতির বিচরণক্ষেত্র ৷ ভাববাদ থেকে বস্তুবাদ ,কর্মবাদ থেকে জড়বাদ সব মতবাদের মিলন স্থল ভারতবর্ষ ৷তাই এখানের সাহিত্য এত বৈচিত্রধর্মী ৷সভ্যতা এত উন্নত ৷ সংস্কৃতি ,সভ্যতা ও ধর্ম যেন অঙ্গাঙ্গি ভাবে জড়িত ৷ কিন্তু প্রশ্ন হল যা বলা হয় এরা কি ঠিক ততটাই পরস্পরের পরিপূরক হয়ে উঠতে পেরেছে ? একথা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, ধর্মের উপর সভ্যতা দাঁড়িয়ে আছে বা সভ্যতার উপর ধর্ম। তবু এদের মধ্যে গড়ে উঠেছে এক অবিচ্ছেদ্দ আত্মীয়তা। যে আত্মীয়তায় মানুষের ধর্মবোধ সভ্যতাকে সুন্দর করে আবার সভ্যতার বিভিন্ন প্রকরণ ও অনুষঙ্গগুলি ধর্মকে গড়ে তোলে এবং সতত চলিষ্ণু রাখে। অন্যভাবে বলা যায় আমাদের জীবন সাধারণ ভাবে, ধর্মের অভিঘাত সাম্প্রদায়িক আচার আচরণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। বংশ পরম্পরায় কতগুলি নির্ধারিত ক্রিয়াকর্মের মধ্যেই আমাদের ধর্মবোধ একটি অতি সংকীর্ণ গণ্ডীতেই আবদ্ধ থাকে। এবং সেই আবদ্ধতাকেই আমরা আস্তিকতা এবং ধার্মিকতা মনে করে প্রশ্নহীন একটি মুখস্থ জীবন কাটিয়ে দিতে পারার মধ্যেই ধর্মাচারণের সার্থকতা অনুভব করি, ও আত্মপ্রসাদ লাভ করি। অধিকাংশ মানুষের জীবনেই এ কথা সত্য; সভ্যতার আবহমান প্রবাহতার বাস্তবতায়। কিন্তু তিনি রবীন্দ্রনাথ। ক্ষুদ্র আমির গণ্ডী কেটে বৃহৎ আমির অভিমুখী তীর্থযাত্রার দূরন্ত অভিযাত্রী। তিনি প্রচলিত ধারার প্রশ্নহীন অনুকারক নন। তাই তাঁর ধর্মবোধ তো স্বতন্ত্র হতেই হবে। কবি জন্মেছিলেন ব্রাহ্ম সমাজের একেবারে অন্দরমহলে। বৃটিশ শাসনের একেবারে প্রথম দিকেই হিন্দু ধর্মের অবক্ষয়ের বিরুদ্ধাচারনের সূত্রপাতে রাজা রামমোহন রায়ের হাত ধরে আত্মপ্রকাশ করে প্রগতিশীল ব্রাহ্ম সমাজ। সেই সমাজের পরবর্তী নেতৃত্বস্থানীয় প্রধান পুরুষ ছিলেন কবির পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর। ফলে শৈশব থেকেই যুক্তিবাদী দার্শনিক আবহাওয়ার মধ্যেই গড়ে উঠতে থাকে রবীন্দ্রমনন। প্রথম দিকে মহর্ষির ধর্ম সাধনা, কেশবচন্দ্র সেনের নেতৃত্ব, এ সবই তরুণ কবির উপর বিশেষ প্রভাব ফেলে। যৌবনের প্রারম্ভেই কবি ব্রাহ্মসমাজের একজন বিশিষ্ট ব্যাখ্যাতা হয়ে ওঠেন। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের কাছে কবির প্রথম উপনিষদ শিক্ষা। উপনিষদের যুক্তিবাদ এবং গভীর দার্শনিক প্রজ্ঞা তৎসহ অসীম আধ্যাত্মিক উপলব্ধি রবীন্দ্রনাথকে বিশেষ ভাবেই প্রভাবিত করেছিল। যা কবির পরবর্তী জীবনে তাঁর ভাবনা রাজ্যে ও কর্মজীবনে বিপুলভাবেই সহায়ক হয়ে উঠেছিল। এর ফলে কবি প্রচলিত সমাজ ব্যবস্থায় মানুষের জীবনে ধর্মের অবক্ষয়ের নিদারুণ প্রভাব সম্বন্ধে গভীর ভাবেই অবহিত হয়ে ওঠেন। তিনি বুঝতে পারেন সমাজদেহের অভ্যন্তরে ধর্মের কোনো অস্তিত্বই আর অবশিষ্ট নেই। যা আছে তা যুক্তিহীন কতগুলি আচার বিচার যা বংশ পরম্পরায় চলে আসছে। তিনি দেখলেন সেগুলির ধর্মান্ধ অনুকরণে ও অনুসরণের মধ্যে দিয়ে মানুষ সংকীর্ণ গণ্ডী বদ্ধতায় আটক।পরে যখন তিনি মানুষের ধর্ম বা Religion Of Man প্রবন্ধ লিখলেন সেখানেও উপনিষদ থেকে ধর্মকে খুঁজতে শুরু করেছিলেন ৷ তিনি দেখতে পেলেন এই প্রশ্নহীন অনুকরণ ও অনুসরণ এবং অন্ধ আনুগত্য প্রবৃত্তি সমাজদেহে ও ব্যক্তি জীবনে ধর্মকে আর সজীব থাকতে দেয় না। ধর্ম কেবলি কতগুলি প্রাতিষ্ঠানিক আচার বিচার পদ্ধতির অন্ধভাবে প্রতিপালনের নিছক ক্রিয়াকর্মই হয়ে ওঠে মাত্র। যার সাথে ব্যক্তি জীবনের যোগ হয় নিতান্তই পোশাকি। এই সব ধর্মীয় আচার বিচার পালন, এই বিশ্বজগতের সাথে ব্যক্তি জীবনের কোনো সংযোগ সেতু হয়ে উঠতে পারে না। এবং এইগুলিই মানুষকে কেবলি ছোট ছোট গণ্ডীতে আবদ্ধ করে ফেলে। বাধা দেয় বিশ্বমৈত্রীর পথে হাঁটতে। বিচ্ছিন্ন করে তোলে প্রত্যেক ধর্মীয় গোষ্ঠীকেগুলিকে, সাম্প্রদায়িক বিভেদের শক্তিতে। এসবই হয় কালের খেয়ায় বংশ পরম্পরায়। ধর্ম সম্বন্ধে, এই সংকীর্ণ গোষ্ঠীবদ্ধতার সীমানায় ধর্মান্ধ ভাবে শুষ্ক আচার বিচারের প্রতি প্রশ্নহীন আনুগত্য ও বংশ পরম্পরায় তার অনুকরণ ও অনুসরণ, রবীন্দ্রনাথের সংবেদনশীল ও প্রগতিশীল আধুনিক মনকে গভীর ভাবেই পীড়িত এবং ব্যথিত করেছিল। তিনি অনুধাবন করলেন প্রকৃত জ্ঞানবিজ্ঞান চর্চার অভাবজনিত কারণ এবং সমাজের সকল স্তরে সার্বিক শিক্ষা বিস্তারের অভাবই এই পরিণতির জন্য দায়ী। তাঁর সুবিশাল কর্মকাণ্ডে এবং সৃষ্টিশীল সাহিত্যজীবনে তাই তিনি বারবার নানা ভাবে সমাজের প্রচলিত ধর্ম গুলির এই সীমাবদ্ধতার প্রতি মননশীল আলোকপাত করে গেছেন। আচারবিচারের ঘেরাটোপ থেকে বেড়িয়ে প্রকৃত ধর্মবোধে উদ্বুদ্ধ হতে নিরন্তর অনুপ্রাণিত করে গেছেন। “আত্মপরিচয়” গ্রন্থে এক স্থানে কবি বলছেন, “সকল মানুষেরই আমার ধর্ম বলে একটা বিশেষ জিনিস আছে। কিন্তু সেইটাকেই সে স্পষ্ট করে জানে না। সে জানে আমি খ্রীস্টান, আমি মুসলমান, আমি শাক্ত, আমি বৈষ্ণব ইত্যাদি। আসলে মানুষের জীবনদর্শন বা চরিত্র, যা তার ব্যক্তিত্বের ভেতর থেকে জেগে ওঠে তাই ধর্ম।” এই “মানুষের ধর্মেরই” অন্তহীন সুর বাজিয়ে গিয়েছেন কবি তাঁর বিস্তৃত সৃজনশীল বাঁশিতে দীর্ঘ জীবন পরিক্রমায়। বিশিষ্ট প্রাবন্ধিক শ্যামল সেনগুপ্তের মতে, কবির ধর্মচেতনায় বৈষ্ণবের প্রেমভক্তি, বৌদ্ধের মৈত্রী-করুণা কিংবা খ্রিস্টানের ক্ষমাশীলতা একাকার হয়ে রাবীন্দ্রিক মানবধর্মেরই রূপ গ্রহণ করেছে। “Talks In China” গ্রন্থে কবি বললেন, “The specific meaning of dharma is that principle which holds us firm together and leads us to our best welfare. The general meaning of this word is the essential quality of thing.” এই যে সার্বিক সুস্থতার লক্ষ্যে সমবেত উৎকর্ষতার উদ্বোধন, রবীন্দ্রনাথের “মানুষের ধর্ম”-এর এই হল ভরকেন্দ্র। এইখান থেকেই গড়ে উঠবে আধুনিক সভ্যতা। তেমনি স্বপ্ন দেখতেন কবি। এই কারণেই তিনি বারবার মানুষের ধর্মবোধ জাগ্রত করার ওপর বিশেষ জোর দিয়েছেন। যে ধর্মবোধকেই তিনি মনুষত্ব বা সভ্যতা বলে বুঝতে চেয়েছেন। যে ধর্মবোধে মানুষের সাথে মানুষের আত্মীয়তায় গড়ে উঠবে বিশ্বমৈত্রী। বসুধৈবকুটুম্বিকম। সমাজ প্রচলিত ধর্ম ব্যবস্থা সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথের তীব্র ক্ষোভের প্রকাশ দেখি কাদম্বিনী দেবীকে বোলপুর থেকে লেখা (২০শে আষাঢ় ১৩১৭) পত্রে; কবি বলছেন, “…আমাদের দেশে ধর্মই মানুষের সাথে মানুষের প্রভেদ ঘটিয়েছে, আমরাই মানুষের নাম করে পরস্পরকে ঘৃণা করেচি, স্ত্রীলোককে হত্যা করেচি, শিশুকে জলে ফেলেচি, বিধবাকে নিতান্তই অকারণে তৃষ্ণায় দগ্ধ করেচি, নিরীহ পশুদের বলিদান করেচি, এবং সকল প্রকার বুদ্ধি যুক্তিকে একেবারে লঙ্ঘন করে এমন সকল নির্থকতার সৃষ্টি করেচি যাতে মানুষকে মূঢ় করে ফেলে। আমরা ধর্মের নামেই অপরিচিত মুমূর্ষুকে পথের ধারে পড়ে মরে যেতে দিই পাছে জাত যায়। (এ আমার জানা)” কেন এমন হয় প্রশ্ন করেছিলেন কবি। উত্তরও তিনিই দিয়েছেন। হেমন্তবালা দেবীকে দার্জিলিং থেকে লেখা (৯ই কার্তিক ১৩৩৮) এর পত্রে। বলছেন, “মানুষের ধর্ম মানুষের পরিপূর্ণতা, এই পরিপূর্ণতাকে কোনো এক অংশে বিশেষভাবে খণ্ডিত করে তাকে ধর্ম নাম দিয়ে আমরা মনুষ্যত্বকে আঘাত করি। এই জন্যেই ধর্মের নাম দিয়ে পৃথিবীতে যত নিদারুণ উপদ্রব ঘটেচে এমন বৈষয়িক লোভের তাগিদেও নয়। ধর্মের আক্রোশে যদি বা উপদ্রব নাও করি তবে ধর্মের মোহে মানুষকে নির্জ্জীব করে রাখি, তার বুদ্ধিকে নিরর্থক জড় অভ্যাসের নাগপাশে অস্থিতে মজ্জাতে নিস্পিষ্ট করে ফেলি – দৈবের প্রতি দূর্বল ভাবে আসক্ত করে।” এই ভাবে ধর্মের ধ্বজা উড়িয়ে মনুষ্যত্বের অপমানের মধ্যেই তিনি সভ্যতার অসুস্থতার কারণ খুঁজেছেন। বস্তুত রবীন্দ্রনাথ মানুষের সমগ্রতায় বিশ্বাসী ছিলেন। সেই সমগ্রতা থেকে মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে খণ্ড সত্যের সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ করার, প্রচলিত সাম্প্রদায়িক ধর্মগুলির প্রাণান্তকর প্রয়াসের বিরুদ্ধেই ছিল তাঁর অভিযান। এই ভাবে মানুষকে সাম্প্রদায়িক গণ্ডীতে আবদ্ধ করে রাখার বিশ্বব্যাপী মৌলবাদী মানসিকতার বিরুদ্ধেই আজীবন সোচ্চার ছিলেন কবি। ঠিক যে কারণেই আশৈশব লালিত ব্রাহ্ম সমাজেও যখন এই সংকীর্ণতার সাম্প্রদায়িক চরিত্র লক্ষণ ফুটে উঠতে শুরু করেছিল, মধ্য যৌবনের সেই পর্বেই সেই ব্রাহ্ম সমাজের গণ্ডীবদ্ধতা থেকেও নিজেকে মুক্ত করে নেন কবি। তিনি এও বুঝে ছিলেন ধর্মবোধ ছাড়া

রবীন্দ্রনাথ ও ধর্ম Read More »

মন্দিরময় পাথরার কথা_সুতনু ঘোষ

মন্দিরময় পাথরার কথা সুতনু ঘোষ    Archeological Survey of India এর অন্তর্ভুক্ত পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি স্থল পাথরা ,  মন্দিরময় পাথরা। পাথরার বয়স্কদের মুখে প্রবাদের মতো প্রচলিত একটি ছড়া – “শিব মন্দির ছিল ঊনআশি, আশি হলেই হয়ে যেত কাশি।” অর্থাৎ এককালে কি বিপুল সংখ্যক পুরোণো মন্দিরের উপস্থিতি ছিল। বর্তমানে যে গ্রামে প্রাচীন চৌত্রিশটি মন্দিরের অবস্থান , যেখানে এলে বাংলার মন্দির শৈলীর প্রায় সবগুলিরই ( চালা , রত্ন ,  দেউল , মঞ্চ , দালান ) দর্শন হয়ে যায় তার আগে মন্দিরময় শব্দটি এমনিতেই যুক্ত হয়ে যায় । মেদিনীপুর সদরের অন্তর্গত পাথরা গ্রামের দক্ষিণে প্রবহমান কংসাবতী নদী । নদীর পাড়ে চাষের ক্ষেত । আর ছড়িয়ে থাকা মন্দিরের সারি । গুপ্তযুগে তাম্রলিপ্ত বন্দরের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এই স্থান । পালযুগে এখানে হিন্দু , বৌদ্ধ ও জৈনদের উপস্থিতি লক্ষনীয় । এখান থেকে যে কয়েকটি প্রাচীন পুরাবস্তুর সন্ধান মিলেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষ্ণু লোকশ্বর মূর্তিটি । মজে যাওয়া জমিদার দীঘি থেকে ১৯৬১ সালে পাওয়া গিয়েছিল মূর্তিটি । এই মূর্তিটি দশম শতকের বলে অনুমান করা হচ্ছে । এছাড়া এখানে প্রাচীন শিখর মন্দিরের আমলক শিলা দেখতে পাওয়া গিয়েছে । জেমস রেনেলের ম্যাপে পাথরাকে কংসাবতীর তীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখানো রয়েছে । যেখানে , তিনটি প্রাচীন রাস্তা এসে মিলেছে পাথরাতে । বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁ এর সময়ে রতনচক পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিল পাথরা । এই স্থানের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন বিদ্যানন্দ ঘোষাল। তার একটি জমিদারিও ছিল পাথরাতে । তিনি বেশ কয়েকটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন এখানে । এরপর বিদ্যানন্দের বংশধরেরা এখানে জমিদারি এবং নীল ও রেশমের ব্যবসা সামলাতে থাকে । ঘোষাল বংশের পরে মজুমদার , বন্দ্যোপাধ্যায় , চট্টোপাধ্যায়েরা এখানে জমিদারি দেখাশোনা করত। তারা ব্যবসার লাভের অর্থে মন্দির নির্মাণ করে গিয়েছে । আজ পর্যন্ত কটি মন্দির তারা নির্মাণ করেছিল তা জানা যায় না । কয়েক দশেক আগে এখানে যে বাজারপাড়া ছিল , তার চিহ্নও মুছে গিয়েছে । তবে এখনও পর্যন্ত যে কয়েকটি মন্দির ও অন্যান্য প্রাচীন স্থাপত্য অবশিষ্ট রয়েছে তার সংখ্যা চৌত্রিশটি । এগুলির গায়ে টেরাকোটার অলঙ্করণগুলি অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গিয়েছে । পাথরার বেশ কয়েকটি মন্দিরে টেরাকোটার দ্বারপালগুলি তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে । আরও কত কিছু যে কালের গর্ভে ও কংসাবতীর গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে তার হিসেব পাওয়া দুষ্কর । বর্তমান মন্দিরগুলির মধ্যে কয়েকটি সংরক্ষণ করে রেখেছে Archeological Survey of India এর Kolkata Circle . তারা এগুলিকে চারটি Temple Complex এ ভাগ করেছে । প্রথমটি , Dharmaraj Temple Complex ( N-WB-102)। ধর্মরাজ মন্দিরটি রাস্তার দক্ষিণদিকে একটু দূরে কংসাবতীর পাড়ে অবস্থিত । মন্দিরটি দক্ষিণমুখী , পঞ্চরত্ন রীতির । অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে মন্দিরটি তৈরী হয়েছিল । বর্তমানে মন্দিরটি বিগ্রহহীন , বিগ্রহটি পুরোহিতের বাড়িতে নিত্যপূজিত । দ্বিতীয়টি , Nabaratna Temple Complex & Kalachand Temple Complex ( N-WB-105 ) এটি ধর্মরাজ মন্দিরের কিছু পূর্বে অবস্থিত । Nabaratna Complex এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মন্দিরটি মজুমদার পরিবারের পশ্চিমমুখী নবরত্ন মন্দির । অষ্টাদশ শতকের কোনও এক সময় প্রতিষ্ঠার আগে মন্দিরে বাজ পড়ার ফলে মন্দিরটি অভিশপ্ত মনে করায় পরিত্যক্ত হয়ে যায় । তার উত্তর দিকে দালান রীতির চারটি শিবালয় আছে । আগে নাকি , এরকম আরও আটটি , মোট বারোটি শিবালয় ছিল নবরত্ন মন্দিরের চারপাশ ঘিরে । এখানে একটি ছোট আকারের তুলসীমঞ্চ দেখা যায় । নবরত্ন মন্দিরের পেছনের দিকে একটি আটচালা শিবালয় রয়েছে । তার ভেতরের ছাদে লাল হলুদ রঙ দিয়ে যে নকশাটি রয়েছে , সেটি এখানকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ । Kalachand Complex – এর কালাচাঁদ মন্দিরটি দালান রীতির । এই মন্দিরটির উত্তরে পাশাপাশি তিনটি পুবমুখী আটচালা মন্দির রয়েছে , এর মধ্যে দুটি মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৪৯ ও ১৮৫১ খ্রীষ্টাব্দ । এছাড়া চালা ও রত্ন রীতির আরও কয়েকটি মন্দির আছে এখানে । কালাচাঁদ চত্বরের একেবারে উত্তরে একটি মাকড়া পাথরের প্রাচীন ভাঙা স্থাপত্য রয়েছে । এটি ছিল মজুমদার পরিবারের দুর্গামন্ডপ । তৃতীয়টি , Sitala Temple Complex ( N-WB-104 ) দক্ষিণমুখী শীতলা মন্দিরটি সপ্তরথ দেউল আকারে নির্মিত । অষ্টাদশ শতকে এটি নির্মিত হয়েছিল । একসময় এখানেই মজুমদার বংশের গৃহদেবতার পুজো হত । চতুর্থটি , Banerjee Temple Complex ( N-WB-103 ) এখানে ঢুকতে ডানদিকে রয়েছে তিনটি পঞ্চরত্ন রীতির শিব মন্দির । এদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তর দিকের মন্দিরটি ১৮১৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। কিছুটা এগিয়ে গেলে একটি দোতলা কাছারি বাড়ি ও তার কাছে দালান রীতির দুটি শিব মন্দির রয়েছে । কাছারি বাড়ির দক্ষিণ পূর্ব কোণে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যের দেখা মেলে । সেটি হল নবরত্ন অষ্টকোণাকৃতি একটি রাসমঞ্চ । ১৮৩২ খ্রীষ্টাব্দে যাদবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রাসমঞ্চটির নির্মাণ করেছিলেন । একই সময়ে নির্মিত একটি পিতলের রথ ছিল এখানে , যার গায়ে এচিং এর কারুকাজ ছিল । বর্তমানে তার কোনও চিহ্ন নেই । এই মন্দিরগুলির কিছু উত্তরে হাটতলায় বন্দ্যোপাধ্যায়দের রেশমের কুঠী ছিল । এখানে রয়েছে আরও চারটি পঞ্চরত্ন শিব মন্দির । এগুলির একটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দ। পাথরায় ঢুকতেই আরও দুটি মন্দির দেখা যায় গোলমাতা ও শিব মন্দির। এগুলি বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের মন্দির। দালান রীতির গোলমাতা মন্দিরটি ভেঙে পড়লে সেখানেই একটি নতুন মন্দির করা হয়। তার পাশে রয়েছে আটচালা শিব মন্দির। মন্দিরটি জীর্ণ হয়ে পড়লে সংস্কার করা হয়। এছাড়াও রয়েছে জীর্ণ সূর্য মন্দির, পঞ্চরত্ন সর্বমঙ্গলা মন্দির, রত্নেশ্বর শিব মন্দির, দশমহাবিদ্যা মন্দির প্রভৃতি। মন্দিরময় পাথরার প্রাণপুরুষ বলা হয় ইয়াসিন পাঠানকে । তিনিই প্রথম পাথরা গ্রামের মন্দিরগুলি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আন্দোলন শুরু করেন । পার্শ্ববর্তী সকল ধর্মের মানুষকে এই কাজে যুক্ত করতে পেরেছিলেন । গড়ে উঠেছিল পাথরা পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ কমিটি । তাদের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পর ২০০৩ সালে Archaeological Survey of India পাথরার ৩৪ টি মন্দির ও সংলগ্ন কিছু জমি অধিগ্রহণ করে । ইয়াসিন পাঠান তার কাজের জন্য রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মার কাছ থেকে ” কবীর ” পুরষ্কার পেয়েছেন । তার লেখা দুটি উল্লেখযোগ্য বই “Archeological list and map of district Paschim Medinipur ” এবং ” মন্দিরময় পাথরার ইতিবৃত্ত ” । বর্তমানে পাথরা পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক – মহঃ ইয়াসিন পাঠান এবং সভাপতি – জয়ন্ত কুমার সামন্ত ।     তথ্যসূত্র :   অবহেলিত পুরাকীর্তির প্রাচুর্য : পাথরার দেবদেউল – তারাপদ সাঁতরা   পুরাকীর্তি সমীক্ষা ( মেদিনীপুর ) – তারাপদ সাঁতরা   পশ্চিমবঙ্গের মন্দির – শম্ভু ভট্টাচার্য  সুতনু ঘোষ জন্ম- ১৬ জুন ১৯৯৫ সালে খড়গপুর শহরে। ডিপ্লোমা ইন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন কাঁথির কন্টাই পলিটেকনিক থেকে। সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পুরাতত্ত্ব বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ আছে। ক্ষেত্রসমীক্ষা করেন , তথ্য সংগ্রহ করেন। প্রবন্ধ ও কবিতা লেখেন। প্রথম বই – খড়গপুরের ইতিহাস ও বিবিধ প্রসঙ্গ, ২০২৫।ইতিহাস বিষয়ক ইউটিউব ভিডিও করেন । যোগাযোগ 7583947498

মন্দিরময় পাথরার কথা_সুতনু ঘোষ Read More »

দ্য ল্যুভর (The Louvre)

দ্য ল্যুভর (The Louvre) মৈত্রেয়ী বন্দ্যোপাধ্যায়   আমার অনেকদিনের ইচ্ছে একবার ল্যুভর মিউজিয়ামটি দেখতে যাবার l এতো নামী দামী শিল্পীদের আঁকা ছবি এবং ভাস্কর্য সেখানে রয়েছে যে প্রত্যে কেরই হয়তো সে ইচ্ছে থেকে যায় l এবারের গ্রীষ্মের ছুটিতে তাই ভাবলাম বহুদিনের শখ যখন রয়েই গেছে তাহলে এবার সেটা পূর্ণ করেই নিই l তাই চল লাম প্যারিসের উদ্দেশ্যে l প্রথমে লন্ডনে পৌঁছে কদিন ঘোরাঘুরি করে ভিক্টরিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে টুরিস্ট বাসে চেপে ডোভার পোর্ট I সেখানে জাহাজের ভেতরেই বাস ঢুকে গেলো ,আরো অনেক বাস গাড়ি সব রয়েছে l আমাদে র সিট্ ছিল পাঁচতলায় ,ওখানে বসে কফি আর স্ন্যান্কস খেতে খেতে ইংলিশ চ্যানেল পার হতে থাকলাম l ইংলিশ চ্যানেলের তলা দিয়ে পাতাল রেলের ব্যবস্থাও আছে কিন্তু জাহাজে করে যাওয়ার মজাই আলাদাl ঘন্টা খানেক সময় লাগলো, ইংলিশ চ্যানেল পার হতে, ওপা রে গিয়ে পৌছুলাম ক্যালে পোর্টেl সেখান থেকে আর অন্য কোথাও না গিয়ে সোজা প্যারিস l পর দিন সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে সোজা বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়ামেl প্রকৃতপক্ষে ল্যুভর মিউজিয়াম টি ছিল একটি রাজপ্রাসাদ lষোড়শ শতাব্দীতে এটিকে মিউজিয়াম হিসাবে পরিণত করা হয় l রাজা প্রথম ফ্রান্সিস লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা বিখ্যাত মোনালিসা ছবিটি কেনেন ও নিজের সংগ্রহশালায় রাখেন l ফরাসি বিপ্লবের পর ঠিক হয় এটিকে মিউজিয়াম বানানো হবে এবং সাধারণ মানুষের দেখার জন্য এটিকে খুলে দেওয়া হবে l সতেরোশো তিরানব্বই সালে দশই আগস্ট পাঁচশো সাঁইত্রিশটি ছবি নিয়ে সংগ্রহশালাটি খোলা হয় lল্যুভ রে মোট আটত্রিশ হাজার ছবি ও ভাস্কর্য আছে l মোট আটটি বিভাগে ভাগ করে এগুলিকে রাখা আছে l ল্যুভরে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ভাবে ব্যারিকে ড করে বুলেট প্রুফ কাচ দিয়ে ঢাকা আছে,এটি আঁকতে আট বছর সময় লেগেছিলো l ল্যুভরে যা যা ছবি ও ভাস্কর্য আছে সব দেখা সম্ভব নয় তবুও গোগ্রাসে গেলার মত দেখতে লাগলামl আমার চোখে অপুর্ব লাগলো লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসা ,দ্য ভার্জিন অব দ্য রকস ,পোর্ট্রেট অব এ লেডি ফ্রম দ্য কোর্ট অব মিলান, সেন্ট জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট l বতিচেলির দ্য ভার্জিন এন্ড চাইল্ড স্যারাউ ন্ডেড বাই ফাইভ এঞ্জেল l টিটি য়ানের ল্য কনসার্ট চ্যাম্পেত্রে ,দ্য এনটুম্বমেন্ট অব ক্রাইস্ট ,ইন পেনিটেন্স ,সেন্ট জেরম ,বিখ্যাত ক্রাইস্ট ক্রাউন্ড উইথ থর্নস l এ ছাড়া রুবেন,মনে , ভ্যান গঘ,রাফায়েল ,মানে, গগা , ডেগাস, সিজানে এঁদের আঁকা ছবি,মিকলেঞ্জলোর সিস্টাইন চ্যাপেল অপূর্ব l মিকলেঞ্জলোর  স্থাপত্য ডাইং স্লেভ ,ডেভিড , আলেকজান্ডার এন্টিওকের ভেনাস দ্য মেলো এগুলো না দেখা পর্যন্ত বোঝা যায় না এতদিন কি দেখিনি l ল্যুভর মিউজিয়ামের প্রতিটি ছবি ও ভাস্কর্য ভালোভাবে দেখতে হলে কত সময় যে লাগবে তা আমার ধারণা নেই তবে গাইড বললেন তিন মাসেরও বেশি সময় লাগবে l ল্যুভর মিউজিয়ামের প্রবেশ দ্বারে একটি কাচের পিরামিড স্থাপিত আছে এটি উনিশশো উননব্বই সালে আমেরিকান শিল্পী আই .এম .পেইয়ের দ্বারা নির্মিত হয় l জানা গেলো এই কাচের পিরামিডের আলোয় মাটির নিচের তলা পর্যন্ত আলো কিত হয় l ল্যুভরের যতটুকু দে খার সাতদিনের মধ্যেই দেখে নিতে হলো কারণ এরপর আ বার ফিরে যেতে হবে অন্য দর্শনীয় স্থানগুলি দেখতেl ল্যুভর দেখা শেষ করে চলে গেলাম রঁদার মিউজিয়ামে , মিউজিয়ামের সামনেই ওনার বিখ্যাত ‘ থিঙ্কার ‘ স্ট্যাচু টি বসানো আছে l খুব একটা বড় মিউজিয়াম নয় ঠিকই তবুও দেখার মতোই l এরপর চলে গেলাম প্লেস দ্য ল কনকোয়ার্ড এ l ফরাসি বিপ্লবের সময় এখা নে যে স্ট্যাচুটি ছিল পরে সেটির বদলে লিবার্টি নামে একটি নতু ন স্ট্যাচু বসানো হয় এবং এই জায়গার নাম হয় প্লেস দ্য ল রিভুল্যয়েসন l একসময়ে এখা নে গিলেটিন যন্ত্র বসানো ছিল l  সেখানে রানী আঁতোয়েন ,রাজা ষোড়শ লুই ,এবং একহাজার একশো উনিশ জনকে ওই গিলে টিন যন্ত্রে হত্যা করা হয় l ইজি প্টের ভাইসরয় লুই ফিলিপিকে ওবেলিস্ক পেডাস্টাল নামে এক টি সৌধ উপহার দেন ,এর উচ্চ তা পঁচাত্তর ফুট এই সৌধটি এখানে স্থাপিত হয় l এর পরের গন্তব্য আর্চ দ্য ট্রামফ l নেপোলি য়ন যখন অস্ট্রিয়ান ও তুর্কিদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়লাভ করেন সেই উদ্দেশ্যে তিনি এটি তৈরিকরাতে শুরু করেন কিন্তু এটি শেষ হবা র আগেই তাঁকে নির্বাসিত করা হয় l এই যুদ্ধে যাঁরা শহীদ হন আর্চের গায়ে তাঁদের নাম খোদা ই করা আছে l আর্চটি ছেচল্লিশ ফুট উঁচু এবং দেড়শো ফুট লম্বা l এই আর্চটি চার্লস দ্য গল নামে বড় সার্কুলার স্কোয়ারের মাঝে অবস্থিত l এখান থেকে বিভিন্ন দিকে মোট বারোটি রাস্তা বেরি য়েছে l এখান থেকে গেলাম এলিসিয়া ফিল্ড রাস্তায়, গ্রিক পু রাণে এলিসিয়া এমন একটি জায়গা যেখানে যোদ্ধারা যুদ্ধ থেকে ফিরে বিশ্রাম করে l এই রাস্তাটি আর্চ এর সামনে এবং প্লেস দ্য ল কনকোয়ার্ড পর্যন্ত যুক্ত ,বর্তমানে এই রাস্তার নাম পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে সাঁজ এ লিজে l এই রাস্তাটির ওপর বহু থিয়েটার হল ,সিনেমা হল ,কফি সপ ,প্রচুর শৌখিন দোকান রয়ে ছে l নিউ ইয়ার ,চোদ্দই জুলাই সমস্ত উৎসব এই রাস্তারওপরেই অনুষ্ঠিত হয় l এই রাস্তার বিশেষ ত্ব হল যে রাস্তার দুপাশে একই দূরত্বে গাছ লাগানো আছে এবং একই উচ্চতায় গাছগুলি সমান মাপে ছাঁটা , দুপাশে ঘর -বাড়ির একই ডিজাইন একই রং ,ইচ্ছে থাকলেও অন্য রং বা ডিজাইন করা যাবে না l প্যারিসের আরো একটি দ্রষ্টব্য স্থান হল ভার্সাই প্যালেস l চতু র্দশ লুই থেকে ষোড়শ লুই পর্যন্ত এই রাজবাড়িতেই কাটিয়েছেনl এই ভার্সাই রাজবাড়ী মধ্য প্যারি স থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত l রাজবাড়ীর ভেতরের কারুকার্য অসাধারণ ,বাইরের কাজও দেখার মতই তাতে কোনো সন্দেহ নেই l আলাদা টিকিট কিনে প্রাসাদের ভেতরে ঢুকতে হয় l রাজবাড়ীর উদ্যান টির দুপাশে একই রকম ডিজাইন করা ,মাঝে মাঝে জলাধার বানানো আছে সেখানে ফোয়ারা লাগানো আছে ,অনবরত জল ঝরছে আর জলাধারের ভেতরে নানা ধরণের মূর্তি বসানো আছে l এক এক জায়গায় এক এক ধরণের ভাস্কর্য এবং ফোয়ারায় সারাক্ষন জল ঝরছে l দুপাশের বাগানে একই মাপ এবং একই ডিজাইন করে গাছগুলি ছাঁটা l কোনটি নারীমূর্তি ,কোনটি নর্তকী ,কোনটি পশুর আদল l সব মিলিয়ে ভারী সুন্দর l এত বড় উদ্যানটি বয়স্ক বা শিশুদের পক্ষে হেঁটে ঘুরে দেখা সম্ভব নয় তাই ব্যাটারি চালিত গাড়ি আছে l উপযুক্ত মূল্য দিয়ে তাতে চেপে শিশু এবং বৃদ্ধরা অনায়াসে উদ্যানটি পরিক্রমা করতে পারে, অবশ্য মূল্য দিলে যে কেউই তাতে চাপতে পারে ,ওখানে বয়স্ক মানুষদের কেই চাপতে দেখলাম l গার্ডেনের ভেতরে অনেক সিমেন্টের বেঞ্চ করা আছে বিশ্রাম নেবার জন্যl রাজ প্রাসাদ এবং প্রাসাদের বাগানের সীমানা বরাবর প্রাচীর দেওয়া l প্রাচীরের ওপরের দিকে লোহা বা ওই জাতীয় ধাতু দিয়ে কারু কার্য করা ,প্রাচীরের ওপরের দিকে কাজকরা চূড়াগুলি সোনা দিয়ে মোড়ানো দেখতেও সত্যিই অপূর্ব l ওখান থেকে বেরিয়ে লাঞ্চ প্যাক খুলে খাবার খেয়ে নিয়ে দেখে এলাম নতরেদাম ক্যাথিড্রাল ও টুইলারিস গার্ডেন l এবার আমাদের ফেরার পালা বেশ কদিন প্যারিসে কাটিয়ে, রাস্তায় ঘাটেও নানারকম ভাস্কর্য দেখে

দ্য ল্যুভর (The Louvre) Read More »

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে  জাতিভিত্তিক ভাবনা

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে জাতিভিত্তিক ভাবনা কাঞ্চন ঘোষ গবেষক, সিকম স্কিলস্‌ ইউনিভার্সিটি, কেন্দ্র ডাঙ্গাল, বোলপুর, বীরভূম             বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় একেবারে মাটির কাছ থেকে মাটির সঙ্গে মিশে সাহিত্য রচনায় ব্রতী ছিলেন। তাই তিনি মাটির শিল্পী প্রবৃত্তি ও নিয়তির বিচিত্র লীলার সার্থক রূপকার। গ্রামের সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষের কথা তিনি উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। হিন্দু মুসলমান  প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষের কথা বিশেষ করে নিম্নবিত্ত মানুষের কথা বেশি করে উপন্যাসে স্থান পেয়েছে। তিনি মানুষের সঙ্গে মিশে মানুষের ধর্ম, বিশ্বাস, লোক ভাবনা, নীতি পরিচয়, মানবিক বোধ সমস্ত কিছুই বর্ণনা করেছেন। সেই জন্য তাঁর উপন্যাসে প্রাণের কথা, মনের কথা বেশি করে ফুটে উঠেছে।          বিভিন্ন গল্প উপন্যাসে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বিশেষ বিশেষ  শ্রেণি সম্প্রদায়ের কথা তুলে ধরেছেন। “মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিজাত আবেগের আর এক ধরনের প্রকাশ ঘটেছে তারাশঙ্করের নিম্নতর শ্রেণি-কেন্দ্রিক গল্পগুলোতে। লক্ষণীয় এই যে তারাশঙ্কর বেদেনী, সাঁপুড়ে, ডোম, বৈষ্ণবী প্রভৃতি এমন সব সম্প্রদায় থেকে চরিত্র সংগ্রহ করেছেনযাদের জীবন-যাত্রা কমবেশি রহস্যময় এবং স্থিতিস্থাপকতা হীন।”১ তাদের জীবনযাপনের কথা বলতে গিয়ে তাদের বিশ্বাস, ধর্মভাবনা সমস্ত কিছুই আলোচনা করেছেন। বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়কে এক এক গল্প-উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। ‘রাধা’ ও ‘রাইকমল’ উপন্যাসে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কথা লিখেছেন। বৈষ্ণবীয় আচরণ ও ধর্মচেতনা লৌকিক রূপ উপন্যাস দুটির সমস্ত অংশে বর্তমান। ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’ উপন্যাসে  বেদে সম্প্রদায়ের কথা, তাদের জীবন যাপনের কথা নিখুঁতভাবে বর্ণিত হয়েছে। কাহার সম্প্রদায়ের জীবন যাপনের যে কঠিন সংগ্রাম ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাস পড়লে সম্পূর্ণভাবে জানা যায়। আবার ‘মঞ্জরী অপেরা’য় যাত্রা পার্টি বা যাত্রাদলের বিশেষ জীবনরীতি যা বিশেষ সম্প্রদায়ের বলে করা যেতেই পারে। এইভাবে ‘রসকলি’, ‘প্রসাদ মালা’, ‘ডাইনির বাঁশি’, ‘বাউল’, ‘নারী ও নাগিনী’, ‘চৌকিদার’, ‘ডাইনি’, ‘বেদিনী’ ‘কুলীনের মেয়ে’, ‘রাতি দিদি’, ‘মালাকার’, ‘তারিণী মাঝি’, ‘যাদুকরী’, ‘সাপুড়ের গল্প’, ‘মাঝির গল্প’, ‘বাবুরামের বাবুয়া’ প্রভৃতি গল্প-উপন্যাসে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের  বৃত্তি জীবি মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিভিন্ন উপন্যাসের বিভিন্ন সম্প্রদায় গত  বৃত্তিজীবী মানুষের কথা এখন আলোচনা করব। নাগিনী কন্যার কাহিনীঃ     “যে সমস্ত অনার্য  জাতি ক্রমশ হিন্দু সমাজভুক্ত হইয়া আর্য ধর্মের অধ্যাত্মবাদ প্রধান নিয়ম সংযমের সহিত  তাহাদের প্রাচীন  সমাজপ্রথা ও জীবনবোধকে এক উদ্ভট সমন্বয়ে গ্রথিত করিয়াছিল বেদে সম্প্রদায় তাহাদের মধ্যে অন্যতম।”২— শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এর এই বক্তব্যে স্পষ্টতই ধরা পড়েছে যে ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’ তে বেদেদের মূলত বিষবেদেদের জীবন কাহিনী নিখুতভাবে অঙ্কিত হয়েছে। বেদে সম্প্রদায়ের ধ্যান-ধারণা,বিধি-নিষেধ ও আচার-ব্যবহার পরিপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় উপন্যাসে। একটি সম্প্রদায় হিসেবে বেদেদের জীবন যাত্রা আচার-ব্যবহার সমস্ত কিছু উল্লেখ আছে এখানে। মনসামঙ্গলের কাহিনীতে শিববৈদ্য বা শিরবেদে নামে এক শ্রেণীর বেদে সম্প্রদায় আছে, সেই সম্প্রদায়ের শ্রেণীবিভাগ কার্যকলাপ ও সামাজিক দায়িত্বের বিবরণ পাওয়া যায় উপন্যাসে। বিষবেদেদের জীবন যাপনের কথা খুব সুন্দর ভাবে লেখক বলেছেন শবলা ও পিঙ্গলার মুখ দিয়ে। সবলা ও পিঙ্লার উৎপত্তির অলৌকিক আবরণে এদের  মানুষী সত্তা চাপা থাকে। বেদে সমাজের সমাজপতি কে বলা হয় শিরবেদে। এখানে শবলার শিরবেদে মহাদেব আর পিঙলার শিরবেদে গঙ্গারাম। এই শিরবেদেরা যেহেতু তাদের সমাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, সেহেতু এদের ক্ষেত্রে কোনো বাধা-নিষেধ নেই। এরা সমাজের মাথার উপর পা দিয়ে চলে আর যে কোন  ব্যভিচার এরা করতে পারে। কারণ তাদের পাপ মুক্তির জন্য নাগিনী কন্যারা আছে, নাগিনী কন্যার পুণ্যে তাদের পাপক্ষালন ঘটে। তাই নাগিনী কন্যার ধর্ম যাতে অটুট থাকে— সেদিকে তাদের অতন্ত্র দৃষ্টি। তবে নাগিনী কন্যারা যেহেতু দেবী স্বরূপিনী সেহেতু মা  বিষহরির  ভয়ে তারা এদের কাছে ঘেষতে পারেনা। নাগিনী কন্যার ধর্ম ব্রহ্মচারিণীর ধর্ম।  মা মনসার মেয়েরা— এদের উপর মা মনসার ‘ভর’ হয়। এই ‘ভর’ অবস্থায় তাদের মুখ থেকে নিঃসৃত বাণী হল দৈববাণী বা দেবীর প্রত্যাদেশ, সেখানে সমাজপতি শিরবেদেরও কোন কথা চলবে না। সেক্ষেত্রে সমাজে নাগিনী কন্যার সবার উপরে। শিরবেদে সর্বদা সতর্ক থাকেন  নাগিনী কন্যার ধর্ম রক্ষার জন্য—- যাতে কোনো পুরুষ নাগিনী কন্যা কে স্পর্শ করতে না পারে। তাহলেই সে সমাজে পতিত হবে— সমাজেরও পতন ঘটবে। বিশেষ করে সমাজের সমস্ত পাপ নীলকন্ঠের মত ধারণ করে নাগিনী কন্যা তার পুণ্য কর্ম ফলে।  উপন্যাসের সমস্ত অংশেই বেদেদের জীবন কথা, সেই কথা নাগিনী বলেছে— “ আমার মা দিয়েছেন ধন্বন্তরিবিদ্যার ওপরে নতুন মন্ত্র, যে মন্ত্রে পৃথিবীর জন্তু-জানোয়ার সব বস মানবে। নাগের দংশন সে যেমন হোক, যদি বিধির লেখা মৃত্যুদণ্ডের দংশন না হয়, তবে সে মন্ত্রে নাগের বিষ উড়ে যাবে কর্পূরের মত। আর মা দিলেন তোমাকে নতুন অধিকার, তুমি নিতে পাবে  গৃহস্থের কাছে পেটের অন্নের জন্য চাল, অঙ্গ ঢাকবার জন্য বস্ত্র। আর দিয়েছেন অধিকার আমার বিষের উপর— এই বিষ গেলে নিয়ে তুমি বিক্রি করবে বৈদ্যদের কাছে, তোমার হাতের গেলে নেওয়া বিষ তারা শোধন করে নিলে হবে অমৃত। সে অমৃত সূচ পরিমাণ দিলে মরতে মরতে মানুষ বেঁচে উঠবে। বাক বন্ধের বাক ফুটবে, পঙ্গুর দেহে সাড় আসবে। আর বাবা আমি যে হয়েছিলাম কাল তোমার  কন্যে, চিরকাল তাই থাকবো। ঝাঁপিতে থাকবো নাগিনী মূর্তিতে, তুমি আমাকে নাচাবে, আমি নাচব; তোমাদের ঘরে সত্যিকারের কন্যে হয়েও জন্মাব।”৩ বেদে জাতির জীবন এই ভাবেই কালনাগিনীর কন্যার কথামতো চলেছে সাড়া উপন্যাসে।নাগিনী কন্যার জীবনের কথা বলতে বলতে ধন্বন্তরির কথা, থানা-পুলিশের কথা, হিজল বিলের কথা, বেদেদের ভ্রষ্টাচার এর কথা, প্রবৃত্তিগত আকাঙ্ক্ষার জ্বালার কথা, জোয়ান বেদের ছেলে ও নাগু ঠাকুরের ভালোবাসার কথা বর্ণনা করেছেন লেখক।  হাঁসুলী বাঁকের উপকথাঃ          রাঢ় অঞ্চলের একটি অংশে কাহার সম্প্রদায়ের বসবাস। সেই সম্প্রদায়ের গ্রামীণ জীবনের পুরো কাহিনী অবলম্বনে ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসটি লেখক রচনা করেছেন।এ প্রসঙ্গে অচ্যুত গোস্বামী বলেছেন — “ হাঁসুলী নদীর বাঁকে বসবাসকারী কাহার সমাজ এই বইয়ের উপজীব্য বিষয়। তারা হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত একটি উপজাতীয় গোষ্ঠী; তাদের রীতিনীতি ধর্মবিশ্বাস তাদের নিজস্ব।”৪ কাহার জাতির মধ্যে শিক্ষিত সমাজের আলোকের লেশমাত্র ছটা লাগেনি। তাদের মধ্যে ঈর্ষা- হিংসা- মারামারি প্রভৃতি  আদিম প্রবৃত্তি গুলি যখন জেগে ওঠে তখন তারা দিশেহারা হয়ে যায়। জ্ঞানের আলো তাদের মধ্যে না থাকার জন্য তারা নিজেদের আদিম প্রবৃত্তিগুলোর স্রোত থেকে সরিয়ে আনতে পারেনা।  “হাঁসুলী বাঁকে বাঁশবনের তলায় পৃথিবীর আদিম কালের অন্ধকার বাসা বেঁধে থাকে। সুযোগ পেলেই দ্রুতগতিতে ধেয়ে ঘনিয়ে আসে সে, অন্ধকার বাঁশবন থেকে বসতির মধ্যে। প্রদীপটা নিভে যেতেই সে অন্ধকার ছুটে এলো যেন কোপাই এর বুক থেকে হড়পা বানের মত। সেই তমশার মধ্যে মদের নেশায় উত্তেজিত বনোয়ারী এবং কালো শশী বিলুপ্ত হয়ে গেল।” ৫ এই বর্ণনায় বোঝা যায় কাহারদের সমাজ কতটা অন্ধকারের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। সন্ধ্যার পর কাহার সমাজের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তখন তারা বন্য পশুর মত হয়ে যায়। তাদের তখন আর ব্যক্তিগত কোন পরিচয় থাকে না। উপন্যাসের মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে অদৃশ্য  কর্তাবাবাও তার বাহন চন্দ্রবোড়া কে কেন্দ্র করে। সেই কাহিনীর সঙ্গে সমান ভাবে জড়িয়ে গেছে তাদের ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন কাহিনী। আদিম তাড়না তাদের এক থেকে অন্যের প্রতি তাড়িত করে। তারা সমাজ বা লোকনিন্দার ভয় করেনা, বরং মনের মানুষের জন্য পুরোনো ঘর ভাঙতে, নতুন নাগরের সঙ্গে চলে যেতে, কুল ধর্ম ত্যাগ করতে সবসময় প্রস্তুত।পাখি আসক্ত করালীর সঙ্গে, পাখির মা চৌধুরী বাবুর ছেলের প্রতি আসক্ত, বনোয়ারি ভালোবাসতো কালো শশী

তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে  জাতিভিত্তিক ভাবনা Read More »

নববর্ষ , হালখাতা ও প্রাচীন বাংলার বাণিজ্য

নববর্ষ, হালখাতা ও প্রাচীন বাংলার বাণিজ্য অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (ইতিহাস পাঠক ও গবেষক)   ১৪৩৩ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন ১ লা বৈশাখ যতটা না মাঙ্গলিক সংস্কৃতির পরিচায়ক তার চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্নদিন বাংলার ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ৷ বাংলা সন বা বর্ষের ইতিহাস অনেকদিনের ৷বহু প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের বঙ্গে সৌরকেন্দ্রিক বর্ষগননা হত ৷ মুঘল সম্রাট আকবর তার রাজত্বকালে দেখলেন এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন বর্ষপঞ্জী , তখন ভারতে হিজরী সন গননা পদ্ধতিও চলছে ৷ কিন্তু কর আদায়ের ক্ষেত্রে এইসব বর্ষপঞ্জী ঠিকঠাক সুবিধাজনক হচ্ছে না ফলে তিনি তার রাজ জ্যোতিষি আমির ফতেউল্লাহ সিরাজীকে এমন এক ক্যালেন্ডার তৈরি করতে বলেন যা ফসল উৎপাদনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং সৌরকেন্দ্রীক এই পঞ্জিকায় হিজরী সনেরও গুরুত্ব থাকবে ৷এর আগে হিজরী সন অনুযায়ী কর আদায় অসুবিধাজনক ছিল ৷ ফসল উৎপাদনের পর কর নেওয়াই সঠিক নিয়ম কিন্তু এ ব্যবস্থা করা যাচ্ছিল না ৷ সিরাজী সাহেব মুসলিম চন্দ্রগননা পদ্ধতি সৌরকেন্দ্রিক গননা পদ্ধতিতে সংযুক্ত করলেন ৷ ফসলি বর্ষ ক্যালেন্ডার তৈরি হয়ে গেল ১৫৮৪ সাল থেকে ৷ পরবর্তীকালে বছর শেষে পাওনা গণ্ডা মিটিয়ে দেবার রেওয়াজ তৈরি হয় ৷ সারাটা বছর চাষের পর কৃষক যেমন রাজস্ব দেবে তেমনি বণিকদলও তাদের হিসাব নিকাশ বুঝে নেবে বচ্ছরের শেষদিনটিতে ৷ কার কাছে কত পাওনা তার হিসাব লেখা আছে যে খেরোর খাতায় তা দেখে পরদিন সেইসব ক্রেতাদের ডেকে মিষ্টি মুখ করিয়ে টাকাটা বুঝে নেওয়ার বিষয়টি বছর শুরুর প্রথমদিনেই করা হতে লাগলো ৷ ১ লা বৈশাখ তাই বণিকদের কাছেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে গেল ৷ এ দিন বাঙালি ব্যবসায়ীদের মধ্যে মন্দিরে পুজো দেওয়ার হিড়িক পড়ে। একটা লাল সালুতে বাঁধানো দড়ি বাঁধা খাতা কিংবা হাল আমলের কার্ডবোর্ড বাঁধানো গণেশের ছবি দেওয়া একখান খাতা নিয়ে তারা ঢুকে যান মন্দিরে। পুরুতমশাই আবার সেই খাতা খুলে লক্ষ্মী গণেশের কাছে পুজো দিয়ে তার সামনের পাতায় তেল-সিঁদুর দিয়ে এঁকে দেন একখানা স্বস্তিক চিহ্ন আর তারপর একটা পুরানো দু’টাকার কয়েন সিঁদুরে মাখিয়ে তার ছাপ দিয়ে দেন পাতার সামনেই। তারপর প্রসাদ আর খাতা হাতে দোকান খোলেন ব্যবসায়ীরা। দোকান সাজানো হয় শোলার কদমফুল আর আমপাতা দিয়ে। নতুন বছরের প্রথম দিনে অনেকে আবার ক্রেতাদের মিষ্টিমুখও করান। পুরোনো বছরের ধার-বাকি হিসাবের জের টেনে শুরু হয় নতুন খাতা লেখা। কেউ আগের বাকি মিটিয়ে দেন, কেউ নতুন জিনিসপত্র কেনাকাটা করেন – সবই তোলা হয় সেই খাতায়। এরই নাম হালখাতা (Halkhata) । আজ অবশ্য শুধু ব্যবসার সঙ্গেই এই হালখাতার সংস্কৃতি জড়িয়ে রয়েছে, অতীতে কিন্তু তা ছিল না। কৃষিভিত্তিক সমাজে হালখাতা ছিল সম্পূর্ণ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত একটি প্রথা। হালের খাতাই ছিল হালখাতা – এই ‘হাল’ কথার মানে লাঙলের ফলা। আদিম মানুষ ঠিক যে সময় থেকে চাষাবাদ শিখলো, সেই সময় চাষ করা ফসলের বিনিময় প্রথা শুরু করল তারা আর তার জন্যেই হিসাব রাখা হতো একটি খাতায়। সংস্কৃত শব্দ ‘হাল’ মানে লাঙল আর ফারসি ভাষায় ‘হাল’ কথার মানে নতুন। ভাষাবিদরা মনে করেন ‘হাল’ কথাটি সম্ভবত দুটি ভাষা থেকেই বাংলায় এসেছে। এই রীতি বহাল রেখে ছিলেন মোগল সম্রাট আকবর। জমিদারি প্রথা তখনও বহাল রয়েছে বাংলায়। নিয়ম ছিল বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে জমিদারেরা তাদের সমস্ত বকেয়া খাজনা বা রাজস্ব জমা করবেন সম্রাটের ঘরে। সেই বিশেষ দিনে খাজনার হিসাব হালনাগাদ করা হতো। নবাব জমিদার সকলের মধ্যে আকবর এই দিনের জন্য চালু করেছিলেন ‘পুণ্যাহ’ প্রথা। মৌসুমী ফসল বিক্রির টাকা পেতেন এই দিন কৃষকেরা আর তা দিয়ে তারা পুরো বছরের বকেয়া শোধ করতো বিভিন্ন দোকানদারের কাছে। ফলে দোকানদারদের খাতায় সেই হিসেব তুলে রাখতেই হতো। সেটাই ছিল হালখাতার রীতি। তবে কি আমরা বাংলার মানুষ শুধুই কৃষিকাজ করতাম ? শিল্প ও বাণিজ্য কি শুরু হয়েছিল বেনিয়া জাতি ইংরেজদের হাত ধরে ? কারণ কলকাতায় যে বাবু কালচার গড়ে উঠেছিল তার বাবুরা প্রায় সকলেই ছিলেন ইংরেজ অনুগ্রীহিত ব্যবসাদার ৷ তাই মনে করাই স্বাভাবিক ৷ কিন্তু বছরের প্রথমদিন এটা লিখতে বেশ অহংকার বোধ হচ্ছে সেটা হল বাঙালি আসলে ছিল কৃষি ও শিল্প উৎপাদনমূখী ব্যবসায়ী জাতি ৷ বহু বহু প্রাচীন কাল থেকেই তার ব্যবসাবৃত্তির প্রমাণ পাওয়া যায় ৷ একদিকে তাম্রলিপ্ত বন্দর ,অন্যদিকে সপ্তগ্রাম , উত্তরে গৌরের নিচের অংশ এবং প্রাচীন গঙ্গার দক্ষিণ পশ্চিম পাড় এই নিয়ে ছিল রাঢ়ের বাণিজ্য অঞ্চল ৷ যে অঞ্চলের বাণিজ্যের জন্য একসময় (মুঘল শাসনের প্রারম্ভে ) বাংলা সারা পৃথিবীর লক্ষ্য ছিল ৷মঙ্গলকোট , মানকড় , উজানিনগর (কোগ্রাম ) , দাঁইহাট , কাটোয়া , মুর্শীদাবাদ , কালনা এই সমস্ত বাণিজ্য কেন্দ্রগুলি একসময় বাংলার অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল ৷ অজয় ও কুনুরের সঙ্গমস্থলের উজানি থেকেই ধনপতি ও তার পুত্র শ্রীমন্ত সিংহল যাত্রা করেছিলেন ৷এই ধনপতি ছিলেন গন্ধবনিক জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ বণিক ৷ দাঁইহাট , কাটোয়া ,কালনার অবস্থান গঙ্গা তীরবর্তী হওয়ায় বাণিজ্য কেন্দ্র রূপে পরিচিত হয়েছিল ৷ বাণিজ্য সম্মৃদ্ধি সাধরণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে বৃদ্ধি করেছিল বলেই একসময়ের অনুর্ব্বর জঙ্গলাকীর্ণ (রাঢ়ের বেশ কিছু অংশ ) রাঢ় মারাঠা দস্যুদেরও লক্ষ্যবস্তু ছিল ৷ এ অঞ্চলেই বার বার সামন্ত রাজা ও জমিদাররা ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকেই তৈরি হয়েছে ইতিহাস তার সাক্ষী ৷ স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত যে বর্ধমান রাজারা বাংলায় প্রভাব বিস্তার করে এসেছে তারাও মূলত ব্যবসায়ী ছিলেন ৷পশ্চিমপ্রদেশ থেকে ব্যবসা সূত্রে এসে বর্ধমানে স্থায়ী বসবাস করতে লাগেন ৷ গঙ্গা তীরবর্তী হওয়ায় প্রথমে দাঁইহাটকে বর্ধমান রাজারা তাদের পবিত্র স্থান হিসাবে বেছে নিলেও যখন বর্গী আক্রমন হয় তখন তারা দাঁইহাট থেকে তাদের তীর্থ অঞ্চল গুটিয়ে নিয়ে কালনায় চলে আসেন ৷কালনার সাথে এমনিতেই বর্ধমান রাজাদের পুরানো সম্পর্ক ৷ পুরানো বাণিজ্য অঞ্চল তাই কালনাতে গড়ে ওঠে একের পর এক মন্দির , প্রশাসনিক ভবন , স্মৃতি সৌধ ৷ এ গেল একটা দিকের কথা কিন্তু চন্ডীমঙ্গল বা মনসামঙ্গলে যেসব চরিত্রকে মূখ্য রাখা হয়েছিল তারা সকলেই ছিলেন ব্যবসায়িক ৷ উজানি ও চম্পকনগর এদুটি স্থানের কথা মঙ্গলকাব্যে উঠে এসেছে ৷ আর যাই হোক লোক মুখে মুখে তৈরি হওয়া কাহিনি মুকুন্দরামের সুন্দর রচনাতে পরিশীলিত হয়েছে ৷ বনিকদের যে এ বঙ্গে রমরমা ছিল তা বর্ননাগুলো পড়লেই বোঝা যায় ৷ নাম ও বাসস্থান উল্লেখ হয়েছে কাব্যমধ্যে ৷ খুল্লনার পাত্র নির্বাচনে জনার্দন পণ্ডিত বাংলার ব্যবসায়ী সমাজের বিবাহযোগ্য ছেলেদের একটা তালিকাই করে দিলেন ৷ প্রধানত রাঢ় দেশের বর্ধমান ও হুগলী অঞ্চলের বণিকদেরই নাম করেছেন কবিকঙ্কণ ৷সবচাইতে বেশি নাম পাওয়া যায় ধনপতি সওদাগরের পিতৃ শ্রাদ্ধ উপলক্ষ্যে উজানিতে বিভিন্ন স্থান থেকে যে বণিকদের সমাগম হয়েছিল তার তালিকায় ৷একে একে বণিকের কত কব নাম ৷সাত শত বেনে আইসে ধনপতি ধাম ৷বোঝা যাচ্ছে যে ধনপতি সদাগরের নিমন্ত্রণে সেদিন সাতশো বণিক হাজির হয়েছিলেন ৷ কবিকঙ্কণের তালিকা থেকে কিছুটা তুলে ধরছি — বর্ধমানের ধুস দত্ত , চম্পাইনগরের চাঁদসদাগর , লক্ষ্মী সদাগর , কর্জনার নীলাম্বর ও তাঁর সাতভাই ,গনেশপুরের সনাতন চন্দ ও তাঁর ভাই গোপাল , গোবিন্দ , দশঘরার বাসুলা , সপ্তগ্রামের শ্রীধর হাজরা , সাঁকোর শঙ্খ দত্ত ,বিষ্ণু দত্ত ও তাঁর সাত ভাই ,কাইতির যাদবেন্দ্র দাস , জাড়গ্রামের রঘূ দত্ত ,

নববর্ষ , হালখাতা ও প্রাচীন বাংলার বাণিজ্য Read More »

পথপ্রান্তের দেবমূর্তি_তথাগত সেন

পথপ্রান্তের দেবমূর্তি তথাগত সেন   বরাহ, গোকুল নগর যে কোন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নাগাল পেতে হলে সেখানকার অতীত যুগের বিবিধ উপাদানের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়, এই উপাদান গুলি সেই অঞ্চলে বা তার সন্নিহিত অঞ্চলে হয়ত এক দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চিত রয়েছে। এই সঞ্চিত উপাদান বা আরও স্পষ্ট করে বললে বিবিধ প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান সেই অঞ্চলের মানুষের সাংস্কৃতিক ইতিহাস কে বোঝার জন্য একমাত্র বিবেচিত বস্তু হতে পারে। যদিও অনেক সময় প্রচলিত লোককাহিনি বা স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনির ওপর নির্ভর করতে হয়, তবে তা কখনই মূল ইতিহাস রচনার উপাদান নয় বরং এর থেকে সহায়তা নেওয়া যেতে পারে মাত্র। ষণ্ডেশ্বরতলা, সূর্য মূর্তি আমাদের এই বাংলায় সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনার মুল পরিপন্থী হল এখানকার উষ্ণ এবং আর্দ্র আবহাওয়া, যার ফলে বহু উপাদান যেমন পুথি বা প্রাচীন লেখা বা পোড়ামাটির তৈরী উপাদান দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, সে দিক থেকে চিন্তা করলে পাথরের তৈরী প্রত্নবস্তু অনেক বেশিদিন অবিকৃত অবস্থায় থাকে, তাই পাথরের মূর্তি নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে গবেষক একটু হলেও সুবিধা পান যে হাতের কাছে বেশ কিছু ভগ্ন বা অভগ্ন মূর্তি পাওয়া যায়। তবে সংগ্রহালয় গুলিতে এই বিষয়ে বিরাট সংখ্যায় উপাদান মজুত রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল সব সময় সকলের পক্ষে সব সংগ্রহালয় পৌছানো সম্ভব হয় না, আর সব সংগ্রহালয়তেই স্থানাভাবের কারণে সব সংগ্রহ তারা সাধারণ মানুষ কে দেখাতে পারেন না। এই একই স্থানাভাবের সমস্যা রয়েছে আমাদের কলকাতার ভারতীয় সংগ্রহালয়েও। সাধারণ গবেষকদের আরও একটি সমস্যার মুখে পড়তে হয়, সংগ্রহালয়ের সংগ্রহে থাকা মূর্তির ছবি ব্যবহার করতে হলে তা অনুমোদন সাপেক্ষ এবং তার জন্য নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ দিতে হয়, তা সবসময় সাধারণ গবেষকদের পক্ষে ব্যয় করা সম্ভব হয় না, ফলে তাদের কাজের প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে পথে প্রান্তরে বা মাঠে ঘাটে পড়ে থাকা প্রধানত পাথরের বিভিন্ন মূর্তি ভাস্কর্য। বিষ্ণু, মুলাজোড় কালীবাড়ি এইবার আসি সে আলোচনায় যেখানে দেখি কি অনুপম এবং বিচিত্রধর্মী পাথরের মূর্তি আমরা পথে ঘাটে দেখতে পাই, যা আমাদের কাছে হয়ে ওঠে খোলা মাঠের সংগ্রহালয়।আসুন আমরা চলে যাই বাঁকুড়া জেলার জয়পুরের কাছে গোকুলনগরে ৷ এখানকার গোকুলচাঁদের পঞ্চরত্ন মন্দির ছাড়াও আরও একটি প্রত্ন নিদর্শন হল কাছেই খোলা জমিতে অর্ধেক প্রথিত অবস্থায় থাকা একটি পাথরের বরাহ মূর্তি। এই ধরনের মূর্তির মধ্যে এই শিল্প নিদর্শনটি এক কথায় অনবদ্য, বিশেষ করে পরিধেয় অলংকার গুলি বা মাথায় থাকা কোঁকড়ান চুলের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। এবার চলে আসি উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার শ্যামনগরের মূলাজোড় কালীবাড়িতে, এখানে ৩ টি বিষ্ণু মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। এই ৩ টির মধ্যে একটি বিশেষ মূর্তি সকলেরই আলাদা করে চোখে পড়ে, মূর্তিটি মূল মন্দির থেকে নাট মন্দিরে যাওয়ার সময় বাম দিকে পড়ে। এই প্রায় অভগ্ন সমপদস্থানক ভঙ্গিমায় থাকা মূর্তিটির হাতের আয়ুধের সজ্জা অনুসারে দেখলে আশ্চর্য হয়ে যাবেন ৷ পদ্মপুরাণ ও অগ্নিপুরাণ মতে বিষ্ণুর এই রূপের নাম ‘দামোদর’। আমরা এইবার চলে আসি হুগলি জেলায়, সদর শহর চুঁচুড়ার পরিচিত ষন্ডেশ্বরতলায় একটি অসাধারণ সূর্য মূর্তির কথায়। এই মূর্তিটি স্থানীয় ভাবে ষষ্ঠী বলে পূজা করা হয়, কিন্তু আদপে এটি সপ্তাশ্ববাহী রথের ওপর থাকা সূর্য মূর্তি। হুগলি থেকে চলে যাব নদীয়া জেলার রানাঘাটের কাছে চূর্ণি নদীর ধারে অবস্থিত আনুলিয়া গ্রামে, এখানে একটি গাছের নিচে থাকা একটি অনন্য বিষ্ণু মূর্তি স্থানীয় ভাবে বাসুদেব বলে পুজিত হন। মুখের ভাব, অর্ধনিমিলিত চোখ, মাথার মুকুট, ইত্যাদি এই মূর্তিকে আর দশটি মূর্তির থেকে আলাদা করেছে। বিশেষকরে মূর্তির পায়ের কাছে বামে আয়ুধ পুরুষ রূপে শঙ্খ পুরুষ ও ডান দিকে আয়ুধ দেবী রূপে গদা দেবীকে দেখা যায়। বিষ্ণু মূর্তি, আনুলিয়া মোটামুটি ভাবে খুব সংক্ষেপে আমাদের পরিচিত কয়েকটি মূর্তির কথা লিখলাম। চিন্তা করলে এই সবগুলি মূর্তিই কিন্তু খোলা জায়গায় রয়েছে, যদিও খোলা জায়গায় মূর্তি রাখাটার মধ্যে সব সময়ই ঝুঁকি থেকে যায়। কিছুদিন আগেই নদীয়া জেলার দিকনগরের রাঘবেশ্বর মন্দির থেকে এই রকমই একটি বিষ্ণু মূর্তি চুরি হয়ে যায়, একটি অমুল্য প্রত্ন ও শিল্প নিদর্শন হারিয়ে গেল। এইরকম বহু নিদর্শন হারিয়ে যাচ্ছে, অবহেলায় আর গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে। এইরকম উদ্ধার হওয়া অনেক মূর্তির দিনের পর দিন ঠাঁই হয় থানার মালখানায়। আসলে যারা একদম নিজের উদ্যোগে কাজ করতে চান তাদের পক্ষে সব সময় সংগ্রহালয় থেকে ছবি সংগ্রহ বা প্রকাশ করা সম্ভব হয় না, আবার পথে প্রান্তের মূর্তির ছবি ব্যবহার করতে কোন মুল্য দিতে হয় না, ফলে একটি অদ্ভুত অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রাচীন মূর্তির স্থান হওয়া উচিত সংগ্রহালয়ে আর মূর্তির ছবি তোলা ও ছাপানো সংক্রান্ত নিয়মের সরলীকরণ জরুরি, যাতে যারা তাদের নিজের দেশের অতীত ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করতে চান তাদের কাজ সহজতর হয়, এই অনুরোধ সংস্লিষ্ট সকলের কাছেই রইল।প্রবন্ধের সাথে সব ছবিই লেখক নিজে সংগ্রহ করেছেন ৷ তথাগত সেন লেখক পরিচিতি – তথাগত সেন, জন্ম ১৮.০৭.১৯৭৮, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক, বর্তমানে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রযোজনা সংস্থায় কর্মরত। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলার মন্দির নিয়ে কাজ করছেন, এই মন্দিরচর্চার অনুসঙ্গে সম্প্রতি বাংলার মূর্তি ভাস্কর্য নিয়ে চর্চা শুরু করছেন। তার লেখা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বাংলার পুরাতত্ত্ব পত্রিকা, ভাষাপথ, রূপশালি, পুরাবৃত্ত, রাঢ় কথা, বাঁকুড়ার খেয়ালী, ইত্যাদি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, পেয়েছেন নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদ প্রদত্ত “দার্শনিক অরুণ প্রসাদ সেন স্মৃতি পুরস্কার” (২০২২ ও ২০২৩)। রক্তমৃত্তিকা পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক, এ ছাড়া যৌথ ভাবে সম্পাদনা করেছেন বাংলার টেরাকোটা সংক্রান্ত সংকলন গ্রন্থ। বাংলার মন্দিরের “যুগ্মদেহী ও মিশ্রদেহী মূর্তি” নিয়ে তার প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ২০২৪ এ।

পথপ্রান্তের দেবমূর্তি_তথাগত সেন Read More »

Scroll to Top