সেদিন কুয়াশা ভোরে

মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস


 

gemini generated image 6z0gaq6z0gaq6z0g

ঘুমটা আমার হঠাৎই ভেঙে গেল৷ এখন শীত শেষে বসন্ত আসব আসব করছে৷ তবু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব আছে বেশ৷ আর আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা তো আছেই৷ মনে হল, বাথরুম গেলে ভাল হয়৷ বোন পাশেই ঘুমে অচেতন৷ ঘরের দরজা খুলে বাইরে এলাম৷ 
     আমাদের একতলা বাড়ি৷ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা৷ সামনে অনেকটা জায়গা নিয়ে আমাদের বাগান৷ বাবা মা আমার বোনের— সকলের প্রিয় শখ বাগান করা৷ মরশুমী ফুলরা এখনও শুকিয়ে যায় নি৷ এবার বেশ দেরী করেই ফুটেছে ডালিয়াও৷ 
         ভেতরে একটা লম্বা গ্রীলঘেরা বারান্দার পাশে আমাদের ঘরগুলো৷ বারান্দার দুপ্রান্তের দুটি ঘর শোবার ঘর হিসাবে ব্যবহৃত হয়৷ মাঝে রান্না-খাবার ঘর, তা ছাড়া আছে একটা বড় ঘর যেটা লোকজন এলে শোয়ার ঘর, না হলে বসার কাজে লাগে৷ আমাদের দু’বোনের পড়ার জন্যও ব্যবহার হয়৷ বাইরে খোলা জায়গায় কলতলা আর সঙ্গে একটা বড়  বাথরুম আছে, তবু ছোট একটা বাথরুম বারান্দার এক প্রান্তে—বাবার ঘরের পাশে আছে, যাতে বারান্দার গ্রীল খুলে  রাতে আর বাইরে যেতে না হয়৷
      বারান্দায় পা বাড়িয়ে বুঝলাম হালকা আলো ফুটলেও কুয়াশা কুয়াশা ভাব আছে৷ বারান্দার আলো জ্বালালে ঘুম চটকে যাবে এই আশঙ্কায় কোনো আলো জ্বালালাম না৷ বাথরুম যাবার সময় দেখলাম বাবার ঘরের দরজাটা বন্ধ৷ বাবা ঘরের দরজা সাধারণতঃ খুলেই রাখে, যাতে আমরা প্রয়োজন মত ডাকতে পারি৷ বারোমাস শুধু পর্দাটানা থাকে৷ মা নেই এখন বাড়িতে৷ মামারবাড়ি গেছে দাদু ডেকে পাঠিয়েছেন উকিলের সাথে কী কাজ আছে বলে৷
     বাথরুমের কাজ মিটিয়ে আসতে আসতে দেখছি আমার শোবার ঘরের দরজার কাছে পিসিমণি দাঁড়িয়ে আছেন৷ আমার মনে পড়ল মা বলে গেছেন যে পিসিমণি আসবে৷ থাকবে ক’দিন৷ মা এলে তবে ফিরবেন৷ কাল রাতেও বাবা বলেছেন ট্রেন নাকি লেটে চলছে৷ পিসিমণির বাড়ি সেই ইন্দোরে৷ কতদিন পরে আসছেন৷
     আমায় দেখে পিসিমণি ঘরে ঢুকে গেলেন৷ দরজাটা আধখোলা ছিল৷ আমি পেছন পেছন ঢুকতে যেতেই পাল্লাটা কাঁধে লাগল৷ ঢুকে দেখি পিসিমণি গদিমোড়া মোড়াটাতে বসে আছেন৷ আমি পিসিমণির দিকে ভাল করে তাকালাম৷ অনেক দিন দেখিনি৷ রোগা পাতলা মানুষ মোটেও নন৷ তবে, আধখোলা পাল্লা দিয়ে ঘরে এলেন কি করে?
     এখন তো কথা বলা উচিত৷ মানে মা থাকলে যা আতিথেয়তা করত সে সব করা উচিত৷ কিন্তু আমি খুবই ঘুম কাতুরে মানুষ৷ কথা বললেই ঘুমটার বারোটা বাজবে৷ এই হালকা ঠান্ডায় কম্বল জড়িয়ে ভোর ভোর সেকেন্ড রাউন্ড ঘুম যে কি লোভনীয়! 
     “পিসিমণি, এত সকালেই পৌঁছে গেলে!”
বলতেই সে বলল, “তুমি আমাকে চেন না?”
      অবাক কথা৷ না চেনার কি আছে? তবে পিসিমণি তো এমন আটপৌড়ে শাড়ি পরে রাস্তায় যাতায়াত করবে না৷ তবে এনার সঙ্গে কার এত মিল? ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ল৷ আর মনে পড়তেই আমার মনে হল, তা কী করে সম্ভব?
     তখন অনেক ছোট ছিলাম৷ দুধঠাকমা রোজ দুধ দিতে আসত আমাদের বাড়ি৷ মাঝে মাঝেই বায়না করতাম দুধঠাকমার বাড়ি যাবার৷ নিয়ে যেতেন৷ গরুর গোয়াল, খড় কাটা, জাবনাপাত্র, দুধ দোওয়ানো এসব দেখে মজা পেতাম৷ আর খেলতাম শিবের সাথে৷ আমারই বয়সী ঠাকমার ছোট নাতি৷ মানুষ যে চোখের পলকে কত কিছু ভাবতে পারে তা ভাবলেও অবাক লাগে৷

gemini generated image tlpeiktlpeiktlpe
চোখের সামনে  মুহূর্তে ভেসে উঠল,গোয়ালঘর, খড়ের পালা, পুকুর ধার, শিবের সাথে লুকোচুরি—এই সব কিছু৷ কিন্তু শিবেরা তো এখানে থাকত না আর৷
     সঙ্গে সঙ্গে একটা শিরশিরানি খেলে গেল আমার শিরদাঁড়ায়৷ আমি বোনকে আর বাবাকে ডাকতে ডাকতে তিড়িং বিড়িং লাফে বোনের কম্বলের তলায়৷ কিন্তু বোন কোনো সাড়া দিচ্ছে না৷ আমার গলা দিয়ে আদবেও কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে তো? গলা কেমন যেন আঠা আঠা৷
      ঘুম ভাঙলো বোনের ধাক্কাধাক্কিতে৷ “কি রে দিদি আজ এত্ত ঘুমোচ্ছিস! আমাকে সকাল সকাল ডাকতে বলেছিলাম না? আমার পড়তে যাওয়া আছে৷”
     চোখ খুলেই বললাম, “পিসিমণি এসে গেছে?” ততক্ষণে বাবা এ ঘরে হাজির৷ বলল, “দাঁড়া, ট্রেনের টাইমের আগে কি করে আসে বল? হাওড়া থেকে বাসে উঠেছে বলল ফোনে৷ একটু পরেই চলে আসবে৷”
     বাবার হাতে চাবির গোছা৷ ঘুম থেকে উঠে বাবার প্রথম কাজ বারান্দার গ্রীল,বাইরের গেটসহ সব তালা খোলা৷ আমার আবার মনে হল গেট বন্ধ থাকলে কেউ ঘরে আসবে কি করে?
     তখন আমি বাধ্য হয়ে ওদের সব কথা বলেই ফেললাম৷ বোন বলল, “দুধঠাকমা, মানে যিনি কালা হয়ে গেছিলেন? দুধ দিয়ে ফেরার পথে একদিন লাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়েন? আমি তো তাকে দেখিই নি৷ শুধু মাঝে মাঝে মা বলে ওনার কথা৷  তোকে নাকি খুব ভালবাসত?”
     বাবা বলল, “ওসব তোমার স্বপ্ন৷ অবচেতন মনে তার কথা ভেবেছ হয়ত৷ তাছাড়া আমার ঘরের দরজা কাল রাতেও যথারীতি খোলাই ছিল৷ যা, হাতমুখ ধুয়ে এসে একটু চা বানা৷ সবাই খাই৷ ফ্রেস লাগবে৷”
     বোন পড়তে চলে গেলে আমি বই নিয়ে নোট বানাতে বসলাম৷ কিন্তু মন বসছে না৷ শিবের কথা মনে পড়ছে৷ ঠাকমা মারা যাবার পর ওর বাবা পুঁটে জেঠা ওদের নিয়ে নিজের কাজের জায়গায় চলে গেছিলেন৷ জেঠা ছোটখাট কোনো কাজ করতেন বলেই ঠাকমা কষ্ট করেও দুধের ব্যবসা করতেন৷ কিন্তু আজ এত বছর পরে একথা মনে হল কেন?
      পিসিমণি যথা সময়ে হাজির৷ নিজের হাতে তৈরী খাঁটি ঘি এনেছেন৷ আরও কত কি! বাবা ঘি ভালবাসেন৷ বললেন, তুই এলে বিশুদ্ধ ঘিএর স্বাদ পাই৷ এখানে সব ভেজাল৷”
     পিসিমণি একথা শুনেই বলে উঠলেন, হ্যাঁ রে ছোড়দা, সেই যে মাসি আমাদের দুধ দিয়ে যেত তার নাতির কি খুব অসুখ?”
     বাবা খুব চমকে উঠলেন৷ আমি তো বটেই৷  বাবা মুখে বলল, “কেন? কী হয়েছে শিবের?”
      পিসিমণি বলল, বাস থেকে নেমে টোটোর খোঁজ করছি৷ দেখি,পুঁটেদা কাছের একটা নার্সিং হোমের সামনে৷ আমাকে চিনতে পারে নি নিশ্চয়ই৷ শুনলাম, পাশে দাঁড়ানো একজনকে বলছে, ‘এক্ষুনি বেশ খানিকটা টাকার জোগাড় না হলে  ছোট ছেলেটাকে বাঁচাতে পারব না৷’ আমি ভাবলাম তোকে বলব এসে, যদি কোনো ব্যবস্হা হয়৷”
     আমি ঝলমলে দিনের আলোয় চোখে যেন অন্ধকার দেখছি৷ প্রচন্ড শীত শীত ভাব নিয়ে পিসিমণিকে জড়িয়ে ধরতে ধরতে দেখলাম, বাবা হন্তদন্ত হয়ে বাইরে বেড়িয়ে গেল৷

mousumi di

মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস

জন্ম অবিভক্ত বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমা শহরে ১৯৭৭ সালে । কালনার ঐতিহ্যবাহী হিন্দু বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবন কাটিয়ে এসে বর্তমানে পশ্চিম মেদিনীপুর জেলার কেশপুর বালিকা উচ্চমাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকতায়রত।
বর্তমান নিবাস মেদিনীপুর শহরে।
খুব ছোট থেকেই লেখালেখির জগতে আসা ও ছোট পত্র পত্রিকাগুলোর সান্নিধ্য পাওয়া৷ স্বর্গীয় সমরকুমার চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত শিশু কিশোর উপযোগী ছড়াপত্র পরত পত্রিকায় সহ সম্পাদনার কাজ করেছেন সম্পাদক বাবার সাথে। অনেক সংকলনেও নানা ধরণের লেখা স্হান পেয়েছে৷ পরিবারের সকলের উৎসাহ লেখার পথে পাথেয়।
মূলতঃ ছড়া কিশোর কবিতা লিখলেও পাশাপাশি কবিতা, গল্প, নাটক এই সব লিখতেও খুব ভালোবাসেন। ভালো লাগে ছোটদের, বিশেষত: নিজের ছাত্রীদের নানান সাংস্কৃতিক কাজে উৎসাহিত করতে৷ এই কারণে জড়িয়ে পরেছেন আরও অনেক পত্রিকার সাথে। আগামীর ছোটরা সুস্হ সবুজ পরিবেশে ও সংস্কৃতিক পরিমন্ডলে বেড়ে উঠবে এই স্বপ্ন দেখেন ।

প্রকাশিত গ্রন্থ : ছড়াক্কা ছন্দে
পুরস্কার: পল্লীবাসী পত্রিকা প্রদত্ত পল্লীকমল পুরস্কার, শ্রী অনীশ দেব স্মৃতি পুরস্কার, গোপা চক্রবর্তী স্মৃতি সাহিত্য পুরস্কার প্রতিযোগিতা ইত্যাদি।

গোপা চক্রবর্তী স্মৃতি সাহিত্য প্রতিযোগিতা ২০২৪
তৃতীয় পুরস্কার কবিতা

2 thoughts on “সেদিন কুয়াশা ভোরে”

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top