তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথাসাহিত্যে জাতিভিত্তিক ভাবনা

কাঞ্চন ঘোষ

গবেষক, সিকম স্কিলস্‌ ইউনিভার্সিটি, কেন্দ্র ডাঙ্গাল, বোলপুর, বীরভূম


 

tarasankar

          বাংলা সাহিত্যে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় একেবারে মাটির কাছ থেকে মাটির সঙ্গে মিশে সাহিত্য রচনায় ব্রতী ছিলেন। তাই তিনি মাটির শিল্পী প্রবৃত্তি ও নিয়তির বিচিত্র লীলার সার্থক রূপকার। গ্রামের সমস্ত সম্প্রদায়ের মানুষের কথা তিনি উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। হিন্দু মুসলমান  প্রভৃতি সম্প্রদায়ের মানুষের কথা বিশেষ করে নিম্নবিত্ত মানুষের কথা বেশি করে উপন্যাসে স্থান পেয়েছে। তিনি মানুষের সঙ্গে মিশে মানুষের ধর্ম, বিশ্বাস, লোক ভাবনা, নীতি পরিচয়, মানবিক বোধ সমস্ত কিছুই বর্ণনা করেছেন। সেই জন্য তাঁর উপন্যাসে প্রাণের কথা, মনের কথা বেশি করে ফুটে উঠেছে।

         বিভিন্ন গল্প উপন্যাসে তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় বিশেষ বিশেষ  শ্রেণি সম্প্রদায়ের কথা তুলে ধরেছেন। “মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তিজাত আবেগের আর এক ধরনের প্রকাশ ঘটেছে তারাশঙ্করের নিম্নতর শ্রেণি-কেন্দ্রিক গল্পগুলোতে। লক্ষণীয় এই যে তারাশঙ্কর বেদেনী, সাঁপুড়ে, ডোম, বৈষ্ণবী প্রভৃতি এমন সব সম্প্রদায় থেকে চরিত্র সংগ্রহ করেছেনযাদের জীবন-যাত্রা কমবেশি রহস্যময় এবং স্থিতিস্থাপকতা হীন।”১ তাদের জীবনযাপনের কথা বলতে গিয়ে তাদের বিশ্বাস, ধর্মভাবনা সমস্ত কিছুই আলোচনা করেছেন। বিশেষ বিশেষ সম্প্রদায়কে এক এক গল্প-উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। ‘রাধা’ ও ‘রাইকমল’ উপন্যাসে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের কথা লিখেছেন। বৈষ্ণবীয় আচরণ ও ধর্মচেতনা লৌকিক রূপ উপন্যাস দুটির সমস্ত অংশে বর্তমান। ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’ উপন্যাসে  বেদে সম্প্রদায়ের কথা, তাদের জীবন যাপনের কথা নিখুঁতভাবে বর্ণিত হয়েছে। কাহার সম্প্রদায়ের জীবন যাপনের যে কঠিন সংগ্রাম ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাস পড়লে সম্পূর্ণভাবে জানা যায়। আবার ‘মঞ্জরী অপেরা’য় যাত্রা পার্টি বা যাত্রাদলের বিশেষ জীবনরীতি যা বিশেষ সম্প্রদায়ের বলে করা যেতেই পারে। এইভাবে ‘রসকলি’, ‘প্রসাদ মালা’, ‘ডাইনির বাঁশি’, ‘বাউল’, ‘নারী ও নাগিনী’, ‘চৌকিদার’, ‘ডাইনি’, ‘বেদিনী’ ‘কুলীনের মেয়ে’, ‘রাতি দিদি’, ‘মালাকার’, ‘তারিণী মাঝি’, ‘যাদুকরী’, ‘সাপুড়ের গল্প’, ‘মাঝির গল্প’, ‘বাবুরামের বাবুয়া’ প্রভৃতি গল্প-উপন্যাসে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের  বৃত্তি জীবি মানুষের কথা মনে করিয়ে দেয়। বিভিন্ন উপন্যাসের বিভিন্ন সম্প্রদায় গত  বৃত্তিজীবী মানুষের কথা এখন আলোচনা করব।

নাগিনী কন্যার কাহিনীঃ 

   “যে সমস্ত অনার্য  জাতি ক্রমশ হিন্দু সমাজভুক্ত হইয়া আর্য ধর্মের অধ্যাত্মবাদ প্রধান নিয়ম সংযমের সহিত  তাহাদের প্রাচীন  সমাজপ্রথা ও জীবনবোধকে এক উদ্ভট সমন্বয়ে গ্রথিত করিয়াছিল বেদে সম্প্রদায় তাহাদের মধ্যে অন্যতম।”২— শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় এর এই বক্তব্যে স্পষ্টতই ধরা পড়েছে যে ‘নাগিনী কন্যার কাহিনী’ তে বেদেদের মূলত বিষবেদেদের জীবন কাহিনী নিখুতভাবে অঙ্কিত হয়েছে। বেদে সম্প্রদায়ের ধ্যান-ধারণা,বিধি-নিষেধ ও আচার-ব্যবহার পরিপূর্ণ চিত্র পাওয়া যায় উপন্যাসে। একটি সম্প্রদায় হিসেবে বেদেদের জীবন যাত্রা আচার-ব্যবহার সমস্ত কিছু উল্লেখ আছে এখানে। মনসামঙ্গলের কাহিনীতে শিববৈদ্য বা শিরবেদে নামে এক শ্রেণীর বেদে সম্প্রদায় আছে, সেই সম্প্রদায়ের শ্রেণীবিভাগ কার্যকলাপ ও সামাজিক দায়িত্বের বিবরণ পাওয়া যায় উপন্যাসে। বিষবেদেদের জীবন যাপনের কথা খুব সুন্দর ভাবে লেখক বলেছেন শবলা ও পিঙ্গলার মুখ দিয়ে। সবলা ও পিঙ্লার উৎপত্তির অলৌকিক আবরণে এদের  মানুষী সত্তা চাপা থাকে। বেদে সমাজের সমাজপতি কে বলা হয় শিরবেদে। এখানে শবলার শিরবেদে মহাদেব আর পিঙলার শিরবেদে গঙ্গারাম। এই শিরবেদেরা যেহেতু তাদের সমাজের দণ্ডমুণ্ডের কর্তা, সেহেতু এদের ক্ষেত্রে কোনো বাধা-নিষেধ নেই। এরা সমাজের মাথার উপর পা দিয়ে চলে আর যে কোন  ব্যভিচার এরা করতে পারে। কারণ তাদের পাপ মুক্তির জন্য নাগিনী কন্যারা আছে, নাগিনী কন্যার পুণ্যে তাদের পাপক্ষালন ঘটে। তাই নাগিনী কন্যার ধর্ম যাতে অটুট থাকে— সেদিকে তাদের অতন্ত্র দৃষ্টি। তবে নাগিনী কন্যারা যেহেতু দেবী স্বরূপিনী সেহেতু মা  বিষহরির  ভয়ে তারা এদের কাছে ঘেষতে পারেনা। নাগিনী কন্যার ধর্ম ব্রহ্মচারিণীর ধর্ম।  মা মনসার মেয়েরা— এদের উপর মা মনসার ‘ভর’ হয়। এই ‘ভর’ অবস্থায় তাদের মুখ থেকে নিঃসৃত বাণী হল দৈববাণী বা দেবীর প্রত্যাদেশ, সেখানে সমাজপতি শিরবেদেরও কোন কথা চলবে না। সেক্ষেত্রে সমাজে নাগিনী কন্যার সবার উপরে। শিরবেদে সর্বদা সতর্ক থাকেন  নাগিনী কন্যার ধর্ম রক্ষার জন্য—- যাতে কোনো পুরুষ নাগিনী কন্যা কে স্পর্শ করতে না পারে। তাহলেই সে সমাজে পতিত হবে— সমাজেরও পতন ঘটবে। বিশেষ করে সমাজের সমস্ত পাপ নীলকন্ঠের মত ধারণ করে নাগিনী কন্যা তার পুণ্য কর্ম ফলে।

 উপন্যাসের সমস্ত অংশেই বেদেদের জীবন কথা, সেই কথা নাগিনী বলেছে— “ আমার মা দিয়েছেন ধন্বন্তরিবিদ্যার ওপরে নতুন মন্ত্র, যে মন্ত্রে পৃথিবীর জন্তু-জানোয়ার সব বস মানবে। নাগের দংশন সে যেমন হোক, যদি বিধির লেখা মৃত্যুদণ্ডের দংশন না হয়, তবে সে মন্ত্রে নাগের বিষ উড়ে যাবে কর্পূরের মত। আর মা দিলেন তোমাকে নতুন অধিকার, তুমি নিতে পাবে  গৃহস্থের কাছে পেটের অন্নের জন্য চাল, অঙ্গ ঢাকবার জন্য বস্ত্র। আর দিয়েছেন অধিকার আমার বিষের উপর— এই বিষ গেলে নিয়ে তুমি বিক্রি করবে বৈদ্যদের কাছে, তোমার হাতের গেলে নেওয়া বিষ তারা শোধন করে নিলে হবে অমৃত। সে অমৃত সূচ পরিমাণ দিলে মরতে মরতে মানুষ বেঁচে উঠবে। বাক বন্ধের বাক ফুটবে, পঙ্গুর দেহে সাড় আসবে। আর বাবা আমি যে হয়েছিলাম কাল তোমার  কন্যে, চিরকাল তাই থাকবো। ঝাঁপিতে থাকবো নাগিনী মূর্তিতে, তুমি আমাকে নাচাবে, আমি নাচব; তোমাদের ঘরে সত্যিকারের কন্যে হয়েও জন্মাব।”৩ বেদে জাতির জীবন এই ভাবেই কালনাগিনীর কন্যার কথামতো চলেছে সাড়া উপন্যাসে।নাগিনী কন্যার জীবনের কথা বলতে বলতে ধন্বন্তরির কথা, থানা-পুলিশের কথা, হিজল বিলের কথা, বেদেদের ভ্রষ্টাচার এর কথা, প্রবৃত্তিগত আকাঙ্ক্ষার জ্বালার কথা, জোয়ান বেদের ছেলে ও নাগু ঠাকুরের ভালোবাসার কথা বর্ণনা করেছেন লেখক।

 হাঁসুলী বাঁকের উপকথাঃ 

        রাঢ় অঞ্চলের একটি অংশে কাহার সম্প্রদায়ের বসবাস। সেই সম্প্রদায়ের গ্রামীণ জীবনের পুরো কাহিনী অবলম্বনে ‘হাঁসুলী বাঁকের উপকথা’ উপন্যাসটি লেখক রচনা করেছেন।এ প্রসঙ্গে অচ্যুত গোস্বামী বলেছেন — “ হাঁসুলী নদীর বাঁকে বসবাসকারী কাহার সমাজ এই বইয়ের উপজীব্য বিষয়। তারা হিন্দু সমাজের অন্তর্ভুক্ত একটি উপজাতীয় গোষ্ঠী; তাদের রীতিনীতি ধর্মবিশ্বাস তাদের নিজস্ব।”৪ কাহার জাতির মধ্যে শিক্ষিত সমাজের আলোকের লেশমাত্র ছটা লাগেনি। তাদের মধ্যে ঈর্ষা- হিংসা- মারামারি প্রভৃতি  আদিম প্রবৃত্তি গুলি যখন জেগে ওঠে তখন তারা দিশেহারা হয়ে যায়। জ্ঞানের আলো তাদের মধ্যে না থাকার জন্য তারা নিজেদের আদিম প্রবৃত্তিগুলোর স্রোত থেকে সরিয়ে আনতে পারেনা।

 “হাঁসুলী বাঁকে বাঁশবনের তলায় পৃথিবীর আদিম কালের অন্ধকার বাসা বেঁধে থাকে। সুযোগ পেলেই দ্রুতগতিতে ধেয়ে ঘনিয়ে আসে সে, অন্ধকার বাঁশবন থেকে বসতির মধ্যে। প্রদীপটা নিভে যেতেই সে অন্ধকার ছুটে এলো যেন কোপাই এর বুক থেকে হড়পা বানের মত। সেই তমশার মধ্যে মদের নেশায় উত্তেজিত বনোয়ারী এবং কালো শশী বিলুপ্ত হয়ে গেল।” ৫

এই বর্ণনায় বোঝা যায় কাহারদের সমাজ কতটা অন্ধকারের মধ্যে নিমজ্জিত ছিল। সন্ধ্যার পর কাহার সমাজের আর কোনো অস্তিত্ব থাকে না। তখন তারা বন্য পশুর মত হয়ে যায়। তাদের তখন আর ব্যক্তিগত কোন পরিচয় থাকে না।

উপন্যাসের মূল কাহিনী আবর্তিত হয়েছে অদৃশ্য  কর্তাবাবাও তার বাহন চন্দ্রবোড়া কে কেন্দ্র করে। সেই কাহিনীর সঙ্গে সমান ভাবে জড়িয়ে গেছে তাদের ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন কাহিনী। আদিম তাড়না তাদের এক থেকে অন্যের প্রতি তাড়িত করে। তারা সমাজ বা লোকনিন্দার ভয় করেনা, বরং মনের মানুষের জন্য পুরোনো ঘর ভাঙতে, নতুন নাগরের সঙ্গে চলে যেতে, কুল ধর্ম ত্যাগ করতে সবসময় প্রস্তুত।পাখি আসক্ত করালীর সঙ্গে, পাখির মা চৌধুরী বাবুর ছেলের প্রতি আসক্ত, বনোয়ারি ভালোবাসতো কালো শশী কে, সুবাসী আবার বনোয়ারী কে বিয়ে করেও চলে গেল করালীর সঙ্গে। এছাড়াও আদিম প্রবৃত্তি সবাইকে তাড়িত করে।  কাহার কুলে এটা কোন দোষের কথা নয়। তাই–

“কাহার পারায় স্বামী যদি স্ত্রী থাকতে বিয়ে করে তবে স্ত্রীর সঙ্গে সঙ্গে শাখা আর নোয়া খুলে ছুড়ে ফেলে দিয়ে স্বামীকে গাল দিতে দিতে চলে যায়– অন্য কোন কাহার মরদের  ঘরে গিয়ে ওঠে। সতীনের সঙ্গে ঘর কাহার মেয়েরা করে না।”৬

 বিবাহ ব্যাপার নিয়ে কোনো নিষ্ঠা নেই– বাঁধন নেই  কাহারদের মধ্যে। দেহজ প্রবৃত্তির দাম তারা বেশি করে মনে রাখে, তাকে নিয়ম কঠোরতা দিয়ে বেঁধে রাখে না।

 সাঁওতাল আদিবাসীদের মতো জীবন যাপন করে কাহাররা। সেই জন্য  ঈর্ষা, হিংসা, ক্রোধ, হঠাৎ উত্তেজিত হয়ে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার প্রবণতা  প্রভৃতির চিত্র সহজ ও স্বাভাবিক—

“ এটি একটি বিশেষত্ব হাঁসুলী বাঁকের কাহার পাড়ার। ঝগড়া  হলে সে  ঝগড়া একদিনে মেটেনা। দিনের পর দিন তার জের চলতে থাকে এবং  প্রাতঃকালে উঠেই  এই গালিগালাজের জেরটি টেনে তারা শুরু করে রাখে। কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত হয়ে থামে। আবার জিরিয়ে নিয়ে অবসর সময়ে নিজের ঘরের সীমানায় দাড়িয়ে বিপক্ষ পক্ষের বাড়ির দিকে মুখ করে এক এক দফা গালিগালাজ করে।  এবং কাহারদের ঝগড়াই এই গালিগালাজের বাঁধুনিটি পুরুষানুক্রমে চলে আসছে — একে কলহ- সংস্কৃতি বলা চলে।”৭

 কর্তাবাবার প্রতি অন্ধ বিশ্বাস, ধর্মের প্রতি বিশ্বাস এর মত কাহার দের ন্যায়-অন্যায়বোধ টনটনে। ধর্মের কথায়, প্রেমের কথায়, জমিদারদের কার্যকলাপে, পারস্পারিক সম্পর্কের মধ্যে– সর্বত্র কাহারদের মধ্যে ন্যায়-অন্যায়বোধ বর্তমান। এভাবেই  লেখক কাহার সম্প্রদায়ের সামগ্রিক জীবনের নিখুঁত দলিল এঁকেছেন উপন্যাসে।

রাইকমলঃ

রাই কমল উপন্যাস বৈষ্ণবধর্ম, বৈষ্ণব দর্শনের প্রেক্ষাপটে রচিত হয়েছে। এই উপন্যাসের মাধ্যমে বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের জীবন দর্শন প্রকাশিত হয়েছে। বৈষ্ণব ধর্মের রাধা হৃদয়ে কৃষ্ণপ্রেম  কালের পটভূমিতে  রাই কমল এর জীবনীতে ধরা আছে। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের নানান সাম্প্রদায়িক  বিশ্বাস, ধ্যান ধারণা, রীতিনীতি যা সমাজের মানুষের জীবনের আচরণ নিয়ন্ত্রিত বা সীমিত করে– সমস্ত কিছুই উপন্যাসের ছত্রে ছত্রে গাঁথা আছে।

 বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের ধ্যান-ধারণার সঙ্গে সঙ্গে  চাষী হিসাবে মোড়ল মহেশ্বর ও তার পুত্র রঞ্জন গ্রামের মানুষ আর জমিদার— এদের মধ্য দিয়েই উপন্যাসের ঘটনাপ্রবাহ আবর্তিত হয়েছে। বৈষ্ণব সম্প্রদায়ের প্রচলিত রীতির কথা উল্লেখ করে লেখক বলেছেন—

“ লোকে কপালে তিলক কাটিত, গলায় তুলসী কাঠের মালা ধারণ করিত; আজও সে তিলক মালা তাহাদের আছে। পুরুষেরা শিখা রাখিত, আজও রাখে; মেয়েরা চুড়া করিয়া চুল বাধিত। এখন নানা ধরনের খোপা বাধার রেওয়াজ হইয়াছে, কিন্তু স্নানের পর এখনো মেয়েরা দিনান্তে একবারও অন্তত চুড়া করিয়া চুল বাঁধে। আজও রাত্রে বাঁশের বাঁশির সুর শুনিলে এ অঞ্চলের এক সন্তানের জননী  যাহারা, তাহারা জলগ্রহণ করে না। পুত্র বিরহবিধুরা যশোদার কথা তাহাদের মনে পড়িয়া যায়।”৮

 বৈষ্ণবদের রাধা ভাবের মহিমা একমাত্র হৃদয়ে উপলব্ধি করা ছাড়া পথ নাই। বৈষ্ণব ভাবের রাধা কৃষ্ণ তত্ত্ব কে পার্থিব দৃষ্টিতে প্রেমময় পুরুষ প্রেমিকা বলেই শেষ করা যায় না। তাতে মানুষ জীবনের অনাচার এসে যায়। ভক্ত ভগবানের সম্পর্ক ও ভক্তিবাদ মূল কথা। 

রসিক ও রাইকমল দুজনেই বৈষ্ণব সাধনার পথে অনেকটাই এগিয়ে। রাই কমল না জানিয়ে  হঠাৎ গোসাই এর গলায় মালা দিলেও দুজনেই পার্থিব জীবনের সম্পর্কে বড়ই ক্লেশভোগ করেছে। মনে কারও শান্তি নেই। তবে মানব জীবনের জীবন সত্য কে বাদ দিয়ে ঈশ্বর সাধনার পথ বড়ই কঠিন। মানসিক প্রেম অতিক্রম করে ঈশ্বর প্রেম সহজ নয়। সম্পূর্ণ বৈরাগ্য ছাড়া তা সম্ভব নয়। জোড়া লতার মতো, রাধামাধব এর মত দুজনের সাধনা সার্থক হতে পারে নি। তাই কমল রঞ্জন কে বলেছে—

“………. অনেক ভেবে দেখলাম– বাউল বল, দেবতা বল, সবার ভেতর দিয়ে তোমাকেই চেয়ে  এসেছি এতদিন।”৯

এই ভাবের মধ্য দিয়েই মানবিক জীবনের সার্থকতা আসতে পারে। এখন কমল সেটা বুঝেছে তাই—–

“ মানুষ বলেই মানুষের জন্য পাগল হয়েছি, মানুষের জন্য মমতা না করে যে পারিনা।”১০

 মানব প্রেমের উপর গড়ে ওঠে ঈশ্বর প্রেম– কৃষ্ণপ্রেম। বৈষ্ণব সাধনার এই হল প্রেম প্রতিমা।

মঞ্জরী  অপেরাঃ

       ‘মঞ্জরী অপেরা’ উপন্যাস আসলে একটি যাত্রাদলের জীবন কথা। যাত্রা দলের মধ্যে যে সমস্ত মানুষ থাকে তাদের সবাইকে নিয়ে একটি পরিবার সৃষ্টি হয়। সেই পরিবারে বিভিন্ন জাতির মানুষ থাকে। কিন্তু সমস্ত রকমের মানুষই এখানে এসে এক সম্প্রদায়ের মানুষ হয়ে যায়, তা হল যাত্রাদল সম্প্রদায়। এদের জীবনের সুখ-দুঃখ, সুবিধা-অসুবিধা, আহার- নিদ্রা সমস্ত কিছুর জীবন্ত দলিল এই ‘মঞ্জরী  অপেরা’ উপন্যাস।

যাত্রাদলে যে যে ভূমিকায় অভিনয় করুক না কেন সবাই কিন্তু একই সঙ্গে খাওয়া- দাওয়া, বিশ্রাম মিলে মিশে  ভাগ করে নেয়—

“ কলকাতার বড় যাত্রার দলের একটা মৌখিক শর্ত থাকে— অন্তত দু খানা ঘর দিতে হয়। ব্রহ্মা, বিষ্ণু, শিব, ইন্দ্র, চন্দ্র, বায়ু,বরুণদের মত বড় এক্টরদের জন্য আলাদা ঘর এবং বাকি সকলের জন্য একখানা বড় ঘর দিতে হয়। মেয়ে যাত্রার দলের জন্য তিনখানা লাগে– একখানা মেয়েদের জন্য ।”১১

যাত্রাদলে যারা  আছে তারা স্বভাবতঃ বাউন্ডুলে, মেয়েরা নিম্নশ্রেণির দেহ ব্যবসায়িনী। এইসব যাত্রাদলে যেন শিক্ষিত রুচীমান ছেলে বা শিক্ষিত ভদ্র বাড়ির মেয়ের কোন স্থান নেই এই ধারনা সকলেরই । তাই নতুন মেয়ে নেওয়ার কথায় মঞ্জরী ‘কিন্তু’ প্রকাশ করে। 

‘মঞ্জরী অপেরা’ যাত্রা দলে সকলে মিলে একটি সম্প্রদায়। সামাজিক সম্প্রদায়ের মত না হলেও এরা সকলে একসঙ্গে সমস্ত ভালো-মন্দের  অংশীদার। এদের মধ্যেও আর অন্যান্য সম্প্রদায়ের মত আনন্দ- হাসি- কান্না, ভালোবাসা- স্নেহ- মমতা, ঈর্ষা- হিংসা-বিদ্বেষ সমস্ত কিছুই আছে। তবে যাত্রাদলে দলবদ্ধ জীবন যাপনের যে মানসিকতা ধারণা বা বিশ্বাস নিয়ে থাকতে হয়, যে আচার-আচরণ অবলম্বন করতে হয় তার সুন্দর বর্ণনা আছে ‘মঞ্জরী অপেরা’য়। পারস্পারিক একটা সম্পর্কের সূত্র গড়ে তোলা, পাত্রভেদে রঙ্গ রসিকতা করা, ঠাট্টা-বিদ্রুপ তো আছেই, মদ্যপানের অভ্যাস, পারস্পারিক অনুরাগ, গ্রাম্য প্রবাদ মেনে চলা, জাতপাত জ্ঞান না করা, জীবনের পরিনিতি ও বিকৃতি— এসমস্তই উপন্যাসে বর্ণিত হয়েছে এবং তা যাত্রা দলের বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিত্রিত হয়েছে।

যাত্রা দলের মধ্যে অভিনয় করতে করতে মনের মিল ঘটে যায়। একজনকে ছেড়ে অন্য জনে মন মজে। যেমন বংশী ও  আশা। এসব নিতান্তই স্বাভাবিক বিশ্বাসে সবাই গ্রহণ করে। গোপাল ও ডালিমের জুটি  আসর মাত করত। গোপাল যেন ডালিমের বক্ষের উত্তাল মরমিয়ার ঢেউয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলত, মাদকতা লাগতো তার অন্তরে। এই ডালিমই মরবার সময় যাত্রা জীবনের প্রকৃত সত্যটি  গোপাল কে বলেছিল— 

“দেখ, তুই যেন এ লাইনের কারুর সঙ্গে জুটিসনে। বরং বিয়ে করিস। আমার ক’ খানা গয়না, তোকে দিলাম তাকে দিস।……বিয়ে করিস। যারা বিয়ে করল ধর্ম তাদের রক্ষা করে। আমাদের তো ধর্ম বাঁচায় না।”১২

অরণ্যবহ্নিঃ 

        তারাশঙ্করের কথাসাহিত্যের রচনা দর্শন সম্বন্ধে এককথায় বলতে গেলে বলা যায়, তাঁর লেখনীর মূলমন্ত্র হলো ব্রাত্য সমাজের মানুষের চিত্রাংকন। সেইসব অন্ত্যজ  শ্রেণীর মানুষের কথা তিনি সাহিত্যের মৌলিক কেন্দ্রবিন্দুতে এনে দেখিয়েছেন যে এরাও মানুষ, সামগ্রিক বঙ্গ সংস্কৃতির অংশীদার। উপন্যাসে সেই রকমই এক শ্রেণীর বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেছেন— 

“এদের ভয় করবেন না। এরা অন্য মানুষ, কালো রঙ, পরনে মাত্র  এক ফালি কাপড়, মাথায় বাবরি চুল, তাতে ফুল গোঁজে, পুঁতির মালা গলায় পরে হীরে মণি-মাণিক্যের কন্ঠহার পড়ার আনন্দ উপভোগ করে। এরা বাঘ মারে, ভাল্লুক মারে,  কিন্তু এরা চোর নয়, লুটেরা নয়; বাঘ, ভাল্লুক, সাপ ছাড়া এ অঞ্চলের মানুষের কাছে কোন ভয় নেই।”১৩                                                                                                     

 অরণ্যের মধ্যে অথবা পাশে বসবাসকারী মানুষদের কাছে  থেকে লেখক এই ঘটনা বর্ণনা করেছেন। অরন্যের মেয়েদের কথা বলতে  গিয়ে বলেছেন— 

“মেয়েরা কষ্ঠি পাথরে খোদাই করা  সুঠাম গঠন নারীমূর্তি,ডাগর চোখ, কপাল ছোট, মাথায় চুল ঘন কিন্তু লম্বায় তেমন দীর্ঘ নয়। সিঁথি কাটে না, সমান করে টেনে চুল পাকিয়ে  খোঁপা বাধে।”১৪

এইভাবে সাঁওতাল জীবনের বাস্তব সম্মত বর্ণনা লেখক আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন। কোম্পানির সঙ্গে এ দেশীয় ব্যবসায়ী মহাজন, জমিদার প্রভৃতির সঙ্গে সাঁওতালদের  বিরোধের কথাও  উঠে এসেছে উপন্যাসে। ইতিহাসের পটভূমিতে মানুষ হিসেবে সাঁওতাল সম্প্রদায়ের জীবনযাপনের নানান  নিখুঁত ধারণা চিত্রিত হয়েছে। 

তৎকালীন সময়ে যে সাঁওতাল বিদ্রোহ হয়েছিল উপন্যাসে তার বিবরণ আছে। সাঁওতাল সম্প্রদায়ের চাওয়া- পাওয়া, ভালো- মন্দ লাগার ব্যাপারটা খুবই সাধাসিধে। তারা যা পায় তাতেই মোটামুটি সন্তুষ্ট। তাদের ওপরে সেই সময়ের শাসক গোষ্ঠী ও সমাজের বিশিষ্ট শ্রেণীর মানুষ যারা সর্বদিক দিয়ে সাঁওতালদের নির্যাতন ও  নিষ্পেষণের মাধ্যমে সর্বহারা,সর্বরিক্ত করে তুলে তাদের জীবন দুঃসহ বেদনায় ভরিয়ে দিয়েছিল। অন্যায়-অবিচারের মাত্রাতিরিক্ত অবস্থাকে রুখতেই এই বিদ্রোহ। ঝাড়খণ্ডের ভাগলপুর থেকে বীরভূমের উত্তর সীমানা পর্যন্ত সাঁওতালদের অসংখ্য গ্রাম অবস্থিত। সেইসব গ্রামের সাঁওতাল কুলি-মজুররা  রাস্তা তৈরির কাজ করে, ঘরবাড়ি তৈরির কাজ করে,ইট তৈরির ফ্যাক্টরিতে কাজ করে, চাষী গৃহস্থবাড়িতে থেকে ক্ষেতের জন্ মজুরির কাজ করে। এই সহজ সরল মানুষদের উপরেও জমিদার শ্রেণী অকথ্য অত্যাচার চালাত। সেই অত্যাচারে জর্জরিত হয়েই এই বিদ্রোহের সূত্রপাত হয়।

 সাঁওতাল মাঝিদের গ্রামে শিক্ষিত সমাজের মত সামাজিক নিয়মকানুনও আছে। সামাজিক বন্ধনের একটা সুস্থ নিয়ম মাঝি সমাজে প্রচলিত আছে—

“প্রতি দল যেখানে বাস করিল সেখানে ছোট বা বড় গ্রাম গড়িল। তাহাদের একজন  দলপতি বা মাঝি বলিয়া মনোনীত  হইল।……..আবার কতগুলি গ্রামের মাঝি থেকে একজন বুদ্ধিমান ও  বিচক্ষণ মাঝিকে তাহাদের  দলপতি বা  পরগনাইত বিবেচনা করিল।……. সাঁওতালরা দেওয়ানী বা ফৌজদারি আদালত পছন্দ করেনা।তাহারা নিজেরাই দলবদ্ধ হইয়া যাহা বিচার করে  তাহাই মানিয়া লয়।…….পরগনাইতরায় সকল কার্য করিয়া থাকে।”১৫

 এইভাবে সামাজিক বন্ধনের মাধ্যমে সাঁওতালরা জীবন যাপন করে। সাঁওতাল পুরুষ মেয়েদের গৃহস্থালী কাজের চিত্রও উপন্যাসে বর্তমান—–

“ মেয়েরা ঘরের কাজে ব্যস্ত হল। পুরুষেরা গরু-বাছুর, মহিষ, ছাগল, ভেড়া  ছেড়ে দিলে বাধা রইল শুধু চাষির কাঁড়া আর দামরা গুলো। ‘দিগরা’ অর্থাৎ বাচ্চা ছেলেগুলো তাদের নিয়ে চলল গ্রামের ধারে, মাঠে ঘাস খাবে। মুরগিগুলোকে ছাড়লে, মরদেরা তামাক পাতায়, পলাশ পাতায় জড়িয়ে চুটি বানিয়ে চকমকির আগুনে দাঁড়িয়ে ভাঙ্গা ডাল পরিষ্কার করতে লাগলো। সাঁওতাল  পাড়ার জীবন সংসারের চাকা ঘুরতে শুরু করলো।”১৬

 নায়ক চরিত্র সিঁদুর মধ্যে দিয়ে সাঁওতাল বিদ্রোহের ঘটনাকে লেখক উপন্যাসে তুলে ধরেছেন। ‘অরণ্য বহ্নি’ উপন্যাস অরণ্যচারী সাঁওতালদের অন্তরের কথা ও তাদের দ্বারা সমাজের অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করেছেন লেখক।

নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের নিয়েই তারাশঙ্কর বেশি আলোচনা করেছেন। বিশেষত নিম্নশ্রেণির গ্রামীণ মানুষদের যাদের মধ্যে ছিল নিরক্ষরতা ও সাংস্কৃতিক সভ্যতার অন্ধকার তাদের কথায় তারাশঙ্কর বেশিরভাগ উপন্যাসে তুলে ধরেছেন।উপন্যাসের বর্ণনায় কোন কল্পনার রং চাপান নি। তাদের কথায়, আচরণে ,পোশাক-পরিচ্ছদে যে স্বাভাবিক নগ্নতা জড়িয়ে থাকে তাকে সেই ভাবেই স্পষ্ট করে তুলেছেন। এ প্রসঙ্গে রঞ্জিত মুখোপাধ্যায়  মহাশয়ের দৃষ্টি কোনটি স্পষ্ট—–

“ তারাশঙ্করের রচনায় রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক বা ভিন্নতর চেতনা যে পরিমাণেই প্রকাশিত হোক, তাতে অসম্মতি, অপূর্ণতার প্রশ্ন থাকলেও  কথাসাহিত্যে তিনি মূলত একজন জীবনরসিক, জীবনের অপার রহস্যের বিমুগ্ধ দ্রষ্টা।  মানুষের মনের জটিলতার অতলে অবগাহন করে তার মানবীয় সত্তার স্বরূপটি  অনুধাবন করার চেষ্টা করেছেন।”১৭

বাংলার বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষের সঙ্গে মিশে  তাদের জীবনের সমস্ত  কথা লেখক  নিখুঁতভাবে পর্যবেক্ষণ করেছেন।  বিশেষ করে নিম্ন শ্রেণীর মানুষদের সঙ্গে বেশি মিশেছেন…

“ তাই স্বাভাবিক ভাবেই তান্ত্রিক, বাউল,বৈষ্ণব- বৈষ্ণবী, সাপুড়ে, বেদে, ঠ্যাঙারে, ডাকাত, নিরক্ষর চাষী প্রভৃতি অসামাজিক ও ভদ্রেতর মানুষের মধ্যে এই অমার্জিত প্রাণলীলা যেমন দেখাবার  সুযোগ পেয়েছেন, অভিজাত বা মধ্যবিত্ত চরিত্রে ততটা  পাননি।” ১৮ 

কাঞ্চন ঘোষ

কাঞ্চন ঘোষ

লেখক পরিচিতি – পেশায় শিক্ষক ড. কাঞ্চন ঘোষ বীরভূম জেলার একজন বিশিষ্ট গবেষক ও সাহিত্যপ্রেমী। তিনি বীরভূমের প্রখ্যাত কথাসাহিত্যিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়-এর উপন্যাসে প্রতিফলিত বাংলার মানুষের জীবনধারা ও তার বিবর্তন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে গভীর গবেষণা করে আসছেন। তাঁর গবেষণালব্ধ বহু প্রবন্ধ দেশের বিভিন্ন স্বনামধন্য জার্নাল ও গবেষণামূলক পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
সাহিত্যচর্চা তাঁর নেশা ও সাধনা-কবিতা, গল্প ও উপন্যাস রচনার পাশাপাশি তিনি নিয়মিত পাঠ ও মননচর্চায় নিজেকে সমৃদ্ধ করে চলেছেন। তাঁর লেখনীতে গ্রামীণ জীবনের বাস্তবতা, মানবিক অনুভূতি ও সমাজচেতনার এক আন্তরিক প্রতিফলন লক্ষ করা যায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top