প্রবন্ধ
মন্দিরময় পাথরার কথা
সুতনু ঘোষ
Archeological Survey of India এর অন্তর্ভুক্ত পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি স্থল পাথরা , মন্দিরময় পাথরা।
পাথরার বয়স্কদের মুখে প্রবাদের মতো প্রচলিত একটি ছড়া – “শিব মন্দির ছিল ঊনআশি, আশি হলেই হয়ে যেত কাশি।” অর্থাৎ এককালে কি বিপুল সংখ্যক পুরোণো মন্দিরের উপস্থিতি ছিল। বর্তমানে যে গ্রামে প্রাচীন চৌত্রিশটি মন্দিরের অবস্থান , যেখানে এলে বাংলার মন্দির শৈলীর প্রায় সবগুলিরই ( চালা , রত্ন , দেউল , মঞ্চ , দালান ) দর্শন হয়ে যায় তার আগে মন্দিরময় শব্দটি এমনিতেই যুক্ত হয়ে যায় ।

মেদিনীপুর সদরের অন্তর্গত পাথরা গ্রামের দক্ষিণে প্রবহমান কংসাবতী নদী । নদীর পাড়ে চাষের ক্ষেত । আর ছড়িয়ে থাকা মন্দিরের সারি । গুপ্তযুগে তাম্রলিপ্ত বন্দরের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এই স্থান । পালযুগে এখানে হিন্দু , বৌদ্ধ ও জৈনদের উপস্থিতি লক্ষনীয় ।
এখান থেকে যে কয়েকটি প্রাচীন পুরাবস্তুর সন্ধান মিলেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষ্ণু লোকশ্বর মূর্তিটি । মজে যাওয়া জমিদার দীঘি থেকে ১৯৬১ সালে পাওয়া গিয়েছিল মূর্তিটি । এই মূর্তিটি দশম শতকের বলে অনুমান করা হচ্ছে । এছাড়া এখানে প্রাচীন শিখর মন্দিরের আমলক শিলা দেখতে পাওয়া গিয়েছে ।জেমস রেনেলের ম্যাপে পাথরাকে কংসাবতীর তীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখানো রয়েছে । যেখানে , তিনটি প্রাচীন রাস্তা এসে মিলেছে পাথরাতে ।
বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁ এর সময়ে রতনচক পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিল পাথরা । এই স্থানের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন বিদ্যানন্দ ঘোষাল। তার একটি জমিদারিও ছিল পাথরাতে ।

তিনি বেশ কয়েকটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন এখানে । এরপর বিদ্যানন্দের বংশধরেরা এখানে জমিদারি এবং নীল ও রেশমের ব্যবসা সামলাতে থাকে । ঘোষাল বংশের পরে মজুমদার , বন্দ্যোপাধ্যায় , চট্টোপাধ্যায়েরা এখানে জমিদারি দেখাশোনা করত। তারা ব্যবসার লাভের অর্থে মন্দির নির্মাণ করে গিয়েছে ।
আজ পর্যন্ত কটি মন্দির তারা নির্মাণ করেছিল তা জানা যায় না । কয়েক দশেক আগে এখানে যে বাজারপাড়া ছিল , তার চিহ্নও মুছে গিয়েছে ।
তবে এখনও পর্যন্ত যে কয়েকটি মন্দির ও অন্যান্য প্রাচীন স্থাপত্য অবশিষ্ট রয়েছে তার
সংখ্যা চৌত্রিশটি । এগুলির গায়ে টেরাকোটার অলঙ্করণগুলি অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গিয়েছে । পাথরার বেশ কয়েকটি মন্দিরে টেরাকোটার দ্বারপালগুলি তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে ।
সংখ্যা চৌত্রিশটি । এগুলির গায়ে টেরাকোটার অলঙ্করণগুলি অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গিয়েছে । পাথরার বেশ কয়েকটি মন্দিরে টেরাকোটার দ্বারপালগুলি তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে ।আরও কত কিছু যে কালের গর্ভে ও কংসাবতীর গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে তার হিসেব পাওয়া দুষ্কর ।
বর্তমান মন্দিরগুলির মধ্যে কয়েকটি সংরক্ষণ করে রেখেছে Archeological Survey of India এর Kolkata Circle . তারা এগুলিকে চারটি Temple Complex এ ভাগ করেছে ।
প্রথমটি , Dharmaraj Temple Complex ( N-WB-102)। ধর্মরাজ মন্দিরটি রাস্তার দক্ষিণদিকে একটু দূরে কংসাবতীর পাড়ে অবস্থিত । মন্দিরটি দক্ষিণমুখী , পঞ্চরত্ন রীতির । অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে মন্দিরটি তৈরী হয়েছিল । বর্তমানে মন্দিরটি বিগ্রহহীন , বিগ্রহটি পুরোহিতের বাড়িতে নিত্যপূজিত ।
দ্বিতীয়টি , Nabaratna Temple Complex & Kalachand Temple Complex ( N-WB-105 )
এটি ধর্মরাজ মন্দিরের কিছু পূর্বে অবস্থিত । Nabaratna Complex এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মন্দিরটি মজুমদার পরিবারের পশ্চিমমুখী নবরত্ন মন্দির । অষ্টাদশ শতকের কোনও এক সময় প্রতিষ্ঠার আগে মন্দিরে বাজ পড়ার ফলে মন্দিরটি অভিশপ্ত মনে করায় পরিত্যক্ত হয়ে যায় ।

তার উত্তর দিকে দালান রীতির চারটি শিবালয় আছে । আগে নাকি , এরকম আরও আটটি , মোট বারোটি শিবালয় ছিল নবরত্ন মন্দিরের চারপাশ ঘিরে । এখানে একটি ছোট আকারের তুলসীমঞ্চ দেখা যায় ।
নবরত্ন মন্দিরের পেছনের দিকে একটি আটচালা শিবালয় রয়েছে । তার ভেতরের ছাদে লাল হলুদ রঙ দিয়ে যে নকশাটি রয়েছে , সেটি এখানকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ।
Kalachand Complex – এর কালাচাঁদ মন্দিরটি দালান রীতির । এই মন্দিরটির উত্তরে পাশাপাশি তিনটি পুবমুখী আটচালা মন্দির রয়েছে , এর মধ্যে দুটি মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৪৯ ও ১৮৫১ খ্রীষ্টাব্দ ।
এছাড়া চালা ও রত্ন রীতির আরও কয়েকটি মন্দির আছে এখানে ।
কালাচাঁদ চত্বরের একেবারে উত্তরে একটি মাকড়া পাথরের প্রাচীন ভাঙা স্থাপত্য রয়েছে । এটি ছিল মজুমদার পরিবারের দুর্গামন্ডপ ।তৃতীয়টি , Sitala Temple Complex ( N-WB-104 )
দক্ষিণমুখী শীতলা মন্দিরটি সপ্তরথ দেউল আকারে নির্মিত । অষ্টাদশ শতকে এটি নির্মিত হয়েছিল । একসময় এখানেই মজুমদার বংশের গৃহদেবতার পুজো হত ।
চতুর্থটি , Banerjee Temple Complex ( N-WB-103 )
এখানে ঢুকতে ডানদিকে রয়েছে তিনটি পঞ্চরত্ন রীতির শিব মন্দির । এদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তর দিকের মন্দিরটি ১৮১৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
কিছুটা এগিয়ে গেলে একটি দোতলা কাছারি বাড়ি ও তার কাছে দালান রীতির দুটি শিব মন্দির রয়েছে ।

কাছারি বাড়ির দক্ষিণ পূর্ব কোণে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যের দেখা মেলে । সেটি হল নবরত্ন অষ্টকোণাকৃতি একটি রাসমঞ্চ । ১৮৩২ খ্রীষ্টাব্দে যাদবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রাসমঞ্চটির নির্মাণ করেছিলেন । একই সময়ে নির্মিত একটি পিতলের রথ ছিল এখানে , যার গায়ে এচিং এর কারুকাজ ছিল । বর্তমানে তার কোনও চিহ্ন নেই ।
এই মন্দিরগুলির কিছু উত্তরে হাটতলায় বন্দ্যোপাধ্যায়দের রেশমের কুঠী ছিল । এখানে রয়েছে আরও চারটি পঞ্চরত্ন শিব মন্দির । এগুলির একটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দ।
পাথরায় ঢুকতেই আরও দুটি মন্দির দেখা যায় গোলমাতা ও শিব মন্দির। এগুলি বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের মন্দির। দালান রীতির গোলমাতা মন্দিরটি ভেঙে পড়লে সেখানেই একটি নতুন মন্দির করা হয়। তার পাশে রয়েছে আটচালা শিব মন্দির। মন্দিরটি জীর্ণ হয়ে পড়লে সংস্কার করা হয়। এছাড়াও রয়েছে জীর্ণ সূর্য মন্দির, পঞ্চরত্ন সর্বমঙ্গলা মন্দির, রত্নেশ্বর শিব মন্দির, দশমহাবিদ্যা মন্দির প্রভৃতি।মন্দিরময় পাথরার প্রাণপুরুষ বলা হয় ইয়াসিন পাঠানকে । তিনিই প্রথম পাথরা গ্রামের মন্দিরগুলি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আন্দোলন শুরু করেন । পার্শ্ববর্তী সকল ধর্মের মানুষকে এই কাজে যুক্ত করতে পেরেছিলেন । গড়ে উঠেছিল পাথরা পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ কমিটি । তাদের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পর ২০০৩ সালে Archaeological Survey of India পাথরার ৩৪ টি মন্দির ও সংলগ্ন কিছু জমি অধিগ্রহণ করে । ইয়াসিন
পাঠান তার কাজের জন্য রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মার কাছ থেকে ” কবীর ” পুরষ্কার পেয়েছেন । তার লেখা দুটি উল্লেখযোগ্য বই “Archeological list and map of district Paschim Medinipur ” এবং ” মন্দিরময় পাথরার ইতিবৃত্ত ” ।
পাঠান তার কাজের জন্য রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মার কাছ থেকে ” কবীর ” পুরষ্কার পেয়েছেন । তার লেখা দুটি উল্লেখযোগ্য বই “Archeological list and map of district Paschim Medinipur ” এবং ” মন্দিরময় পাথরার ইতিবৃত্ত ” ।বর্তমানে পাথরা পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক – মহঃ ইয়াসিন পাঠান এবং সভাপতি – জয়ন্ত কুমার সামন্ত ।
তথ্যসূত্র :
অবহেলিত পুরাকীর্তির প্রাচুর্য : পাথরার দেবদেউল – তারাপদ সাঁতরা
পুরাকীর্তি সমীক্ষা ( মেদিনীপুর ) – তারাপদ সাঁতরা
পশ্চিমবঙ্গের মন্দির – শম্ভু ভট্টাচার্য
সুতনু ঘোষ
জন্ম- ১৬ জুন ১৯৯৫ সালে খড়গপুর শহরে। ডিপ্লোমা ইন কেমিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করেন কাঁথির কন্টাই পলিটেকনিক থেকে। সাহিত্য, ইতিহাস, সংস্কৃতি ও পুরাতত্ত্ব বিষয়ে বিশেষ আগ্রহ আছে। ক্ষেত্রসমীক্ষা করেন , তথ্য সংগ্রহ করেন। প্রবন্ধ ও কবিতা লেখেন। প্রথম বই – খড়গপুরের ইতিহাস ও বিবিধ প্রসঙ্গ, ২০২৫।
ইতিহাস বিষয়ক ইউটিউব ভিডিও করেন । যোগাযোগ 7583947498
