রবীন্দ্র বীক্ষায় শিব

স্বপ্নেশ গুপ্ত


 

whatsapp image 2026 05 13 at 11.28.04 am

রবীন্দ্র নাথ ধর্ম বিশ্বাসের দিক থেকে ব্রাহ্ম ছিলেন। খুব স্বাভাবিক ভাবেই তাই তিনি পৌত্তলিকতায় বিশ্বাস করতেন না। এমন কী সারা জীবনের বিভিন্ন সময়ে তিনি মূর্তি পূজোর বিরোধিতা করেছেন। কিন্তু একই সঙ্গে এও লক্ষ্যনীয় তিনি শিবের বন্দনা করেছেন। ধ্যান মন্ত্র এমন কী বিবিধ পুরাণে শিবের যে ভিন্ন ভিন্ন রূপ বৈশিষ্টের বার্ণনা আছে রবীন্দ্র নাথ তাঁর কবিতায়, গানে, প্রবন্ধে সেই রূপ গুলির এবং শিবের ভিন্ন ভিন্ন বৈশিষ্টের প্রতি তাঁর প্রণতি নিবেদন করেছেন। আসলে সত্য, সুন্দরের পূজারী কবি সত্যম, শিবম, সুন্দরমের প্রতি অর্ঘ্য নিবেদন করেছেন সুর, তাল, ছন্দ এবং শব্দের উপাচারে।

অবশ্য একমাত্র শিব ই নয়, হিন্দু শাস্ত্র মতে সৃষ্টি কর্তা ব্রম্ভা র  প্রতি প্রণতি নিবেদন করে তিনি শব্দ মালা গাঁথছেন -দেশ শূন্য, কাল শূন্য জ্যোতি শূন্য মহাশূন্য ‘পরি /চতুর্মুখ করিছেন ধ্যান,/মহা অন্ধ অন্ধকার রয়েছে দাঁড়াইয়া /কবে দেব খুলিবে নয়ান। স্পষ্টতই এ যে ব্রম্ভার বন্দনা তা বুঝতে অসুবিধা হয় না।

কাল চক্র আবর্তিত হচ্ছে সৃষ্টি -স্থিতি -প্রলয় -এই ক্রমানুসারে। হিন্দু শাস্ত্র মতে ব্রম্ভা সেখানে সৃষ্টি কর্তা। সৃষ্টির পরে স্থিতি। বিষ্ণু সেই স্থিতির অধিশ্বর। “অনন্ত আকাশে দাঁড়াইয়া /চারিদিকে চারিহাত দিয়া /বিষ্ণু আসি মন্ত্র পড়ি দিলা /বিষ্ণু আসি কৈলা আশীর্বাদ।”অর্থাৎ কবি সৃষ্টির পালন কর্তা চতুর্ভুজ বিষ্ণুর প্রতি শব্দাঞ্জলী নিবেদন করলেন মনের মাধুরী মিশিয়ে।সৃষ্টি স্থিতি লাভ করলো। আর স্থিতি মানেই  বন্ধন।

তাই সেই বন্ধন মুক্তির জন্য ‘অতি ভৈরব হরষে ‘রুদ্রের আগমন হয়। বৈদিক রূদ্র আর শিব এক, অভিন্ন। বেজে ওঠে প্রলয় বিষাণ, প্রণব নাদে ব্রম্ভান্ডে বাজে কালের মন্দিরা, বেজে ওঠে মহাকালের ডমরু।

“প্রলয় বিষাণ তুলি করে ধরিলেন শুলী /পদতলে জগৎ চাপিয়া…/ছিঁড়িয়া পড়িয়া গেল /জগতের সমস্ত বাঁধন।”শুরু হল তান্ডব।”কে কোথায় ছুটে গেল /ভেঙে গেল টুটে গেল /সৃজনের আরম্ভ সময়ে /আছিল অনাদি অন্ধকার /সৃজনের ধ্বংস যুগান্তরে /রহিল অসীম হুতাশন /মহাদেব মুদি ত্রিনয়ন /করিতে লাগিলেন ধ্যান।”

whatsapp image 2026 05 13 at 11.28.05 am (1)

এখানে লক্ষ্যণীয় অপৌত্তলিক রবীন্দ্রনাথ শুধুমাত্র শিবের রূপই পরিস্ফুটিত করছেন না, একই সাথে হিন্দু পুরাণে বর্ণিত ব্রম্ভা, বিষ্ণু, মহেশ্বরকে নিয়ে গাথা, কাহিনীকে শিল্প সুষমামন্ডিত ভাবে প্রকাশ করছেন। হিন্দু পুরাণানুসারে চর্তুমুখ প্রজাপতি ব্রম্ভা সৃষ্টিকর্তা। আদিতে তিনি একা ছিলেন। তিনি ব্রম্ভান্ড সৃষ্টি করলেন। তারপর চর্তুভুজ শঙ্খ, চক্র, পদ্ম, গদাধারী বিষ্ণু সেই সৃষ্টির পালন করলেন। জগধিতায় শ্রীকৃষ্ণায়, গোবিন্দায় নমঃ নমঃ। এর পর কালের মন্দিরার তালে তালে নাচেন নটরাজ।

whatsapp image 2026 05 13 at 11.28.05 am

তিনিই বিশ্ব সংসারের নিয়ামক। কবি বিশ্বাস করতেন নটরাজের নৃত্যের ছন্দই আসলে ব্রম্ভান্ডের ছন্দ।”তোমার বিশ্ব নাচের দোলায় /বাঁধন খোলায়, বাঁধন পরায়।”আরো পরিস্ফুট করতে তিনি লিখছেন -“কাঁপে ছন্দে ভালো মন্দ তালে তালে /নাচে জন্ম, নাচে মৃত্যু পাছে পাছে /তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ /কী আনন্দ কী আনন্দ /দিবা রাত্রি নাচে মুক্তি নাচে বন্ধ /সে তরঙ্গে ছুটি রঙ্গে পাছে পাছে তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ তাতা থৈ থৈ। “

পুরাণের এই নটরাজ যিনি সুর গুরু, নৃত্য গুরু, বাদ্য গুরু তিনিই স্রষ্টা ও শিল্পী রবীন্দ্র নাথের হৃদয়জুড়ে বিরাজমান ছিল। “সংসারের রক্ত আকাশের মাঝখানে তোমার রবিকরোদ্দীপ্ত তৃতীয় নয়ন যেন ধ্রুব জ্যোতিতে আমার অন্তর কে উদ্ভাসিত করে তোলে।” তিনি সেই সংহার কর্তা কে আহ্বান করছেন -“নৃত্য কর, হে উন্মাদ নৃত্য করো। হে মৃত্যুঞ্জয়, আমাদের সমস্ত ভালো এবং সমস্ত মন্দের মধ্যে তোমারই জয় হউক “।

এই প্রচন্ড কে তিনি আবাহন করে লিখছেন -রূদ্র, তোমার দারুণ দীপ্তি /এসেছে দুয়ার ভেদিয়া,/বক্ষে বেজেছে বিদ্যুৎ বান /স্বপ্নের জাল ছেদিয়া।/ভৈরব তুমি কী বেশে এসেছ /ললাটে ফুঁসিছে নাগিনী /রূদ্র বীণায় এই কি বাজিল সুপ্ৰভাতের রাগিনী?”কিন্তু এই সুপ্ৰভাত কি প্রতিদিনের রাত শেষের নতুন ভোর? অথবা জাগতিক ভোর? নাহ, এ ভোর অপার্থিব, মহাজাগতিক ভোর।তাই তিনি লিখছেন -“বহুকাল পরে হঠাৎ  যেন রে /অমানিশা গেল কাটিয়া “। তার পরেই বোঝা যায় তিনি কোন অমানিশার কথা বলতে চাইছেন।”তোমার খড়্গ আঁধার মহিষে দুখানা করিল কাটিয়া /ব্যথায় ভুবন ভরিছে /ঝর ঝর করি রক্ত আলোক গগনে গগনে ঝরিছে “।এরপরে সমস্ত সংশয়ের অবসান ঘটিয়ে

 

তিনি লিখলেন -“হে রূদ্র, তব সংগীত আমি /কেমনে গাহিব কহি দাও স্বামী -/মরণ নৃত্যে ছন্দ মিলায়ে /হৃদয় ডমরু বাজাব। অর্থাৎ রুদ্রের সেই প্রচন্ড রূপের আরাধনার ব্যাকুলতা। সেই সংহার কর্তার সম্যক পরিচয় পাবার আকুতি ধ্বনিত হল কবির কণ্ঠে -জীবন দুঃখে ডালি ভরে লয়ে /তোমার অর্ঘ্য সাজাব।এসেছে প্রভাত এসেছে /তিমিরান্তক শিব শঙ্কর /কী অট্ট হাস হেসেছে। আর তারপর একেবারে ভক্তিরসে সিক্ত হয়ে তিনি লিখলেন -“জীবন সপিয়া, জীবনেশ্বর /পেতে হবে তব পরিচয় /তোমার ডঙ্কা হবে যে /সকল শঙ্কা করি জয়।”আর শেষের পংক্তি তে মৃত্যুঞ্জয়ের বরাভয়ে সকল ভয়, দ্বিধা, দ্বন্দ্ব কাটিয়ে তিনি উচ্চারণ করলেন অমৃতের বাণী -“মৃত্যুরে লব অমৃত করিয়া /তোমার চরণ ছোঁয়ায়।”

whatsapp image 2026 05 13 at 11.28.05 am (2)

কবির সৃষ্টির পথ তাই আকীর্ণ শিব চেতনায়, শিব স্তুতিতে। তিনি কবির কাছে নানান সময় নানা ভাবে ধরা দিচ্ছেন। কখনো নটরাজ ,কখনো রূদ্র, কখনো ভৈরব, কখনো মহাকাল আবার কখনো ভোলানাথ, কখনো বা শিব শম্ভু।

কবি চেতনায়, মননে সেই রূদ্রের, ভৈরবের, মহাকালের  ধারাবাহিক উপস্থিতি। সেই কারণেই খর বৈশাখের মধ্যে তিনি সাজুয্য পান শুষ্ক বল্কল ধারী বৈরাগী মহাদেবের। আবার বাদল দিনে তাঁর মানসপটে পরিস্ফুটিত হয় মহাকালের সেই বিশাল, বিপুল অচঞ্চল রূপ -“বাদলার দিন মেঘদূতের দিন নয়, এ যে অচলতার দিন-চঞ্চল কালের প্রবল রূপ দেখছিনে বটে, কিন্তু অচঞ্চল দেশের বৃহৎ রূপ দেখা যাচ্ছে। শ্যামাকে দেখলুম না, কিন্তু শিবের দর্শন মিলিল। “আর এই অনন্ত বিশ্ব বীজের প্রতি তাঁর বন্দনা বাণীরূপ গ্রহণ করলো –

ধন্য ধন্য তুমি মহেশ, ধন্য গাহে সর্বদেশ –

অন্ত নাহি জানে -মহাকাল, মহাকাশ,

গীত ছন্দে করে প্রদক্ষিণ

তব অভয় চরণে শরণাগত দীন হীন

হে রাজা, বিশ্ববন্ধু।

whatsapp image 2026 05 13 at 11.28.06 am

swapnesh gupta

স্বপ্নেশ গুপ্ত

নদীয়া জেলার নৃসিংহপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরাজী শিক্ষক ৷ লেখার থেকে পড়াতেই বেশি আগ্রহ ৷ নাট্যকর্মী ৷ শ্রুতি নাটক লিখতে ভালোবাসেন ৷প্রবন্ধও লিখেছেন বেশ কিছু নামি পত্রিকায় ৷বিশেষ পচ্ছন্দ আড্ডা এবং গান শোনা সিনেমা দেখা ৷
ঠিকানা — সেন পাড়া ,কালনা ,পূর্ব বর্ধমান ৷

7 thoughts on “রবীন্দ্র বীক্ষায় শিব”

  1. খুব সুন্দর লেখা, সমৃদ্ধ হলাম। লেখক ও সম্পাদক কে অনেক শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানাই।

    1. Bhasapath Patrika

      খুব ভালো লাগলো ৷ এভাবেই পাশে থাকুন আমাদের ৷

  2. তাই বুঝি সেই মহাকাল তাঁকে অমরত্বের বর প্রদান করেছেন । যুগে-যুগে , জন্মে-জন্মান্তরে ঋষিকবি তাঁর অমরত্ব নিয়ে আমাদের মধ্যে বিরাজিত থাকবেন ।
    খুব ভালো লাগলো ।

  3. Shampa mandal

    খুব খুব ভালো লেখা। সমৃদ্ধ হলাম। এরকম আরো অনেক অনেক লেখা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম। 😊

  4. JAYANTA SAHA ROY

    খুব সুন্দর প্রবন্ধ,
    রবীন্দ্রনাথ ধর্ম বিশ্বাসে ব্রাহ্ম ছিলেন ।এই ব্রাহ্ম ধর্ম বিশ্বাস
    নিয়ে আগামী দিনে বিস্তারিত জানার ইচ্ছা রইলো।

    ডাক্তার জয়ন্ত সাহা রায়।

  5. JAYANTA SAHA ROY

    খুব সুন্দর প্রবন্ধ,
    রবীন্দ্রনাথ ধর্ম বিশ্বাসে ব্রাহ্ম ছিলেন ।এই ব্রাহ্ম ধর্ম বিশ্বাস
    নিয়ে আগামী দিনে বিস্তারিত জানার ইচ্ছা রইলো।

    ডাক্তার জয়ন্ত সাহা রায়।

  6. JAYANTA SAHA ROY

    খুব সুন্দর প্রবন্ধ,
    রবীন্দ্রনাথ ধর্ম বিশ্বাসে ব্রাহ্ম ছিলেন ।এই ব্রাহ্ম ধর্ম বিশ্বাস
    নিয়ে আগামী দিনে বিস্তারিত জানার ইচ্ছা রইলো।

    ডাক্তার জয়ন্ত সাহা রায়।
    16/05/2026

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top