আগমনী

বিপ্লব ভট্টাচার্য্য


 

agomoni a reunion at durga puja

সময়টা তখন শরৎকাল। আকাশে সাদা মেঘের আনাগোনা। মাঠে মাঠে কাশেরফুলে দোলা আর বাতাসে শিউলি গন্ধ। মহালয়ার সুরের কলতানে রমরম করছে পাড়া পরিবেশ। এই শুভক্ষণেই মুখার্জী বাড়ির বড়ো বৌ উমার প্রসব যন্ত্রণা উঠলো। বাড়িতে নতুন অতিথি আসবে। সবার মনে খুশির বন্যা। সবার মনে আশা উমার গর্ভে নিশ্চয়ই লক্ষ্ণী আসছে। ঘরে লক্ষ্ণী আসবে। স্বামী দেওর উমাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়। সেখানে ফুটফুটে এক পুত্র সন্তানের জন্ম দিয়েই উমার জীবন দ্বীপ নিভে গেল। বোধনের আগেই উমার বিসর্জন হয়ে গেল। পুত্র সন্তানকে কোলে নিয়ে বাবা-কাকারা বাড়ি ফিরে আসে। মা-হারা ছেলে যেনো তেনো ভাবে বড়ো হতে লাগলো। বাবা আদোর নাম রাখলো দীপক। বেশ ভালো ভাবেই চলছিল। কাকা কাকিমা দাদু ঠাকুমাদের স্নেহে বড়ো হতে লাগলো দিপু। স্কুল পাশ করে বাবা তাকে বোর্ডিং এ রাখার ব্যবস্থা করল। সেখান থেকেই পড়াশোনা করতে লাগলো দীপু।

কয়েক বছর যেতে না যেতেই অফিস থেকে ফেরার পথে একটা রোড এক্সিডেন্টে দীপুর বাবা মারা গেল। এবার অবজ্ঞা আর অবহেলার মধ্যে বড়ো হতে লাগলো দিপু। আর তার বোডিং থেকে পড়াশোনা করা হলো না। কাকারা পড়াশোনা করার খরচ চালতে পারবে না বলেই দিল। অগত্যা তার জীবন থেকে পড়াশোনা করার বোধহয় শেষ হবার উপক্রম হতে লাগলো। তবু একটা টিউশানি ধরে পড়ার খরচ জোগানোর ব্যবস্থা দীপু নিজেই করে নিলো। খুব মেধাবী ছাত্র ছিল সে। তাই যেমন করেই হোক পড়াশোনা করতে লাগলো।

একদিন কলেজ বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে দীপু একটা বাড়িতে গেল। দীপু জানতো না সেটা কার বাড়ি? কীসের বাড়ি? সেখানে গিয়ে দেখল যে দীপুর আরও তিন চারজন বন্ধু একসাথে বসে মদ খাচ্ছে। আর একটা মহিলা তাদের মদ দিচ্ছে ঢেলে ঢেলে দিচ্ছে। তার নাম পিয়ালী। দীপু ইতস্তত করছিল। সেখান থেকে পালিয়ে আসার জন্য। কিন্তু হঠাৎ করে সেই মহিলা তাকে বাধা দিয়ে খাটে বসালো। দিপু নিজেকে আড়ষ্ট করে রাখছিল। কী যে করবে বুঝতে পারছিল না। এইভাবে দু-তিন বার দীপু সেখানে এসেছিল। তারপর কেন জানিনা দীপু সেখানে বার বার আসতে লাগলো। সেই ঘরে। কিন্তু কোনো দিনের জন্য দীপুকে একফোঁটাও মদ খাওয়াতে পারেনি পিয়ালী। তবু যে কীসের টানে দীপু তার ঘরে আসতো তা পিয়ালীও বুঝতে পারতো না। দীপু সারাক্ষণ তার মুখের দিকে চেয়ে দেখতো। কিছু একটা খুঁজে বেড়াতো সারাক্ষণ । অনেক বার দীপু বন্ধুদের না জানিয়ে একা একা এই পিয়ালীর বাড়িতে, তার ঘরে এসে ঘন্টার পর ঘণ্টা কাটিয়ে যেতো। একটা পতিতা মেয়ে, যে সমাজের সবার ঘৃণার পাত্র। যাকে সমাজ অতি হীন চোখে দেখে, সেই পতিতা মেয়ের ঘরে দীপু দিনের পর দিন কাটিয়ে যেতো।

একদিন পিয়ালী দীপুকে জিজ্ঞেস করে বসলো। তুমি কী জন্য আমার ঘরে প্রায় আসো? এসে তো মদ খাও না? আমার গান শোন না? তাহলে কীসের টানে আসো? তুমি কী দেখেছো আমার মধ্যে? আমি একটা পতিতা, বেশ্যা। সঙ্গে সঙ্গে দীপু তার মুখে হাত চাপা দিল। এই প্রথম দীপু তাকে স্পর্শ করল। আর সেই স্পর্শেই প্রমিলার সারা শরীরে যেন বিদ্যুৎ চমকে গেল। চুপ! আর এমন কথা আর একবারও বলবে না। বলে দীপু ডুকরে কেঁদে ফেললো। এ কী! তুমি কাঁদছো কেন? একটা নোংরা মেয়ে, পতিতা মেয়ে। তারজন্য তুমি কাঁদছ? হ্যাঁ কাঁদছি। আমি কেন তোমার কাছে বার বার আসি জানো? আমি যে তোমার মধ্যে আমার মা’কে দেখতে পাই। চমকে ওঠে পিয়ালী! না! না! না! তুমি এসব কী বলছো?
ঠিকই বলছি। তোমাকে আমি কখনও ঘৃণার চোখে দেখিনি। যখনই আমি তোমার চোখের দিকে দেখি মনে হয় যেন, আমি আমার মাকে দেখছি। আমি আমার মাকে কোন দিন দেখিনি। আমার জন্মের পরেই আমার মা মারা গেছে। আমি শুধু বাড়িতে মায়ের ছবি দেখেছি। কিন্তু সেই ছবি, আর তুমি কখন যেন এক হয়ে গেছো। আচ্ছা তুমি কি পারবে না? এই ঘৃণ্য জীবন ছেড়ে আমার সাথে চলে যেতে? বলো না বলো? আমি তোমাকে এখান থেকে নিয়ে যাবো। তোমাকে সসন্মানে আমার কাছে রাখবো।
চুপ করো তুমি? এসব ভাবাও পাপ। আমরা যে পতিতা, বেশ্যা। এই সমাজের সবচেয়ে নোংরা, সবচেয়ে ঘৃণ্য জীবন আমাদের। আমাদের কোনো আশা নেই ভালোবাসা নেই। স্বামী সন্তান কেউ থাকতে নেই। তুমি জানো না আমি কীভাবে এই জীবনে এসেছি। আমারও স্বামী ছিল, সন্তান ছিল। আমার পাঁচ বছরের ছেলে টুকাই মাত্র কয়েক দিনের জ্বরে আমাকে ছেড়ে চলে গেছে। আমি তাকে ধরে রাখতে পারিনি। তারপর আমি আর কোনোদিন মা হতে পারিনি। তাই আমার বেইমান, অকৃতজ্ঞ স্বামী আমাকে এই পথে নিয়ে এসেছে। তাই মা হওয়ার সাধ আমার চিরতরে ঘুচে গেছে। তুমি চলে যাও এখান থেকে। আর কোনো দিন যেন আসবে না। কোনদিন না। দীপু সেদিন নিদারুণ অভিমান নিয়ে চলে গিয়েছিল। সারারাত ঘুমাতে পারেনি। মাস খানেক যাবার পর আবার একদিন দীপু সেখানে গেল। গিয়ে শুনলো যে কিছুদিন আগেই পিয়ালী সেখান থেকে চলে গেছে। কোথায় গেছে তারা কেউ জানেনা। দীপুর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। কোথায় খুজবে তাকে? অগত্যা বাড়ি ফিরে আসে।

দিন যায়, মাস যায়। বছর গড়িয়ে চারটে আগমনী পার হয়ে যায়। দিপু এখন একটা চাকরি করে। একটা বাড়ি কিনে একা একাই থাকে। নিজের বাড়ির সাথে সব সম্পর্ক ছিন্ন হয়ে গেছে তার। দাদু ঠাকুমা মারা যাবার পর কাকা কাকিমা তাকে আর বাড়িতে স্থান দেয়নি। তাই নিজের যোগ্যতায় একটা চাকরি পেয়ে একা একাই থাকে।

একদিন কাজ শেষে অফিস থেকে বাড়ি ফিরছিল দীপু। সামনেই পুজো আসছে। বোনাস পেয়েছে। আগমনীর সুর আকাশে বাতাসে। নীল আকাশে সাদা মেঘের ঘনঘটা। অফিসের সামনেই একটা ছোট শিউলি ফুলের গাছ। নিচে কত শিউলি ফুল ঝরে পড়েছে। অফিস থেকে বের হয়ে ট্রেন ধরার জন্য দীপু বার হল। স্টেশনে একটা জরা জীর্ণ ভিখারিনী। শতছিন্ন কাপড়চোপড়। কাছে যেতেই……? একি! কাকে দেখছে দীপু। হাঁটু মুড়ে বসে পরল দীপু। মা? তুমি এখানে এই অস্থায়? ভিখারিনী চোখ তুলে দেখলো দীপুকে। তারপর হাতটা দিপুর মাথায় রাখলো। দুজনের চোখের কোণায় জল। স্টেশন অনেক মানুষ। কে কার দিকে তাকায়? কে কার খবর রাখে? দীপু আস্তে আস্তে তাকে ধরে ট্রেনে তুলে নিল। তারপর বাড়ির পথে চলল। ছুটে চললো ট্রেন। গন্তব্য কোথায় তা আর বলার অপেক্ষা নেই। ট্রেনের জানালা দিয়ে ক্লান্ত অবসন্ন চোখে দুর্গাপুজোর প্যান্ডেল আর প্রতিমা দেখছে পিয়ালীদেবী। আর দীপু দেখছে তার পাশে বসে আছে, তার জীবন্ত প্রতিমা…

bb

বিপ্লব ভট্টাচার্য্য

পরিচিতিঃ বিপ্লব ভট্টাচার্য্যের জন্ম পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা থানার অন্তর্ভুক্ত সহজপুর গ্রামে। বাবার নাম সঞ্জয় ভট্টাচার্য্য এবং মায়ের নাম রেখারাণী ভট্টাচার্য্য। কালনা মহা বিদ্যালয় থেকে সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট। সেইসাথে ডি. এল. এড.। বর্তমানে একটি বেসরকারি স্কুলের শিক্ষক। ছোটোবেলা থেকেই কবিতা আবৃত্তি এবং নাটক বা অ্যামেচার যাত্রাপালায় অভিনয় করে আসছেন। বেশ কয়েকবার কবিতা আবৃত্তি করে ব্লক চ্যাম্পিয়ন হয়েছেন। সেই সাথেই কবিতা ও ছোটগল্প লেখা। ষষ্ঠ শ্রেণিতে স্কুল ম্যাগাজিনে প্রথম কবিতা “নরেন খুড়ো” নামে। ধীরে ধীরে ছোটো পত্রিকায় কবিতা লেখা শুরু। এখনও পর্যন্ত প্রায় কুড়িটি সাহিত্য পত্রিকার সাথে যুক্ত তিনি। তার মধ্যে “আমরা দশভুজা”, “শব্দের ঝংকার”, “বুলবুল”, “উত্তরণ”, ” জ্ঞান ও চেতনা”, “বি রা সা”, “সাহিত্যম”, “কলকাতা চিত্র”, ” ইছামতী”, “দিশা” উল্লেখযোগ্য। প্রসঙ্গত “কল্পকথায় তেরো” নামে কবিসহ তেরো জনকে নিয়ে একটি কবিতা সংকলন প্রকাশিত হয়েছে। সম্প্রতি ভাষাপথ থেকে প্রকাশিত হয়েছে ওনার কাব্যগ্রন্থ স্মৃতিটুকু থাক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top