আমার ভালোবাসার দুর্গাপুজো
সুদীপ ঘোষাল
কলকাতা ও কাটোয়া শহরের পুজো দু একবার দেখেছি। কিন্তু দুর্গাপুজো এলেই পুরোনো বন্ধুরা, দেশ বিদেশ থেকে গ্রামে চলে আসে। একসঙ্গে পুজো দেখা হয়।
আমার গ্রামের নাম পুরুলিয়া। কেতুগ্রাম থানার অন্তর্গত এই ছোট্ট গ্রামটি দুর্গাপুজোর সময় যেন নতুন রূপে সেজে ওঠে। সারা বছর আমরা যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত থাকি, কিন্তু শরৎ এলেই গ্রামের বাতাসে উৎসবের গন্ধ ছড়িয়ে পড়ে। কাশফুল দোলে, আকাশে সাদা মেঘের ভেলা ভেসে বেড়ায়।
আমাদের গ্রামে মোট চারটি দুর্গাপুজো হয়,ভট্টাচার্য পাড়া, রায়পাড়া, মণ্ডপতলা ও সর্দার পাড়ায়। সবথেকে প্রাচীন পুজো ভট্টাচাৰ্য পাড়া, মন্ডপতলা ও রায়পাড়ার পুজো। তখনকার জমিদার এই পুজোর প্রচলন করেন।
পাড়াগুলোর আলাদা আলাদা পুজো থাকলেও উৎসবের আনন্দে সবাই ভাগ নেয়। পুজোর আগে থেকেই পাড়ায় পাড়ায় প্রস্তুতি শুরু হয়। কেউ মণ্ডপ সাজায়, কেউ আলো লাগায়। ছোটরা আগ্রহ নিয়ে মণ্ডপের সাজসজ্জা দেখতে যায়, আর বড়রা ব্যস্ত থাকেন অতিথি আপ্যায়ন ও পুজোর আয়োজন নিয়ে।ছোটো ছেলেমেয়ে ও বড়দের নতুন বস্ত্রের সুগন্ধে পুজো প্রাঙ্গনে এক আলাদা পরিবেশ গড়ে ওঠে। আর আরতি দেখার জন্য ভিড় বেশি হয় মানুষের।
ষষ্ঠীর দিন থেকেই উৎসব যেন সত্যি শুরু হয়। মণ্ডপে মণ্ডপে আলো জ্বলে, ঢাকের আওয়াজ শোনা যায়, আর দেবী দুর্গার প্রতিমা দেখতে মানুষজন ভিড় করেন। নতুন জামাকাপড় পরে শিশু-কিশোরেরা বন্ধুদের সঙ্গে পুজো দেখতে বেরোয়। বাড়িতে বাড়িতে আত্মীয়স্বজন আসেন। বহুদিন পর দেখা হওয়া মানুষদের সঙ্গে কুশল বিনিময়, গল্প আর একসঙ্গে খাওয়াদাওয়ায় আনন্দ আরও বেড়ে যায়। গ্রামের পরিচিত পথঘাটও তখন উৎসবের সাজে অপরিচিত ও সুন্দর লাগে।
চারটি পুজোর মণ্ডপ ঘুরে দেখা আমাদের গ্রামের মানুষের প্রিয় আনন্দের একটি আনন্দ। এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় যেতে যেতে দেখা হয় পরিচিত মানুষদের সঙ্গে। কোথাও ঢাকের তালে মন নেচে ওঠে, কোথাও আবার মণ্ডপের আলোয় এখন সেলফি তোলার ভিড়। ছোটদের আনন্দের শেষ থাকে না। তারা নতুন জামা পরে কখনও পরিবারের সঙ্গে, কখনও বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরে বেড়ায়। বড়রা পুজোর আয়োজন সামলান, কেউ অতিথিদের সঙ্গে সময় কাটান, আবার কেউ মণ্ডপে বসে গল্প করেন। পুজোয় বয়সের ব্যবধান যেন অনেকটাই মুছে যায়। ধুনুচি নাচ অন্যতম আকর্ষণ।
আমাদের গ্রামের,চারটি পুজো আলাদা হলেও গ্রামের মানুষ একসঙ্গে আনন্দ করেন। এক পাড়ার মানুষ অন্য পাড়ার পুজোয় যান, একে অপরকে সাহায্য করেন, আর উৎসবের আনন্দ ভাগ করে নেন। পুজোর কয়েকটি দিন গ্রামের সবাই যেন একই পরিবারের সদস্য হয়ে ওঠেন। কারও বাড়িতে অতিথি এলে অন্যরাও খোঁজ নেন। কোথাও কোনও কাজে সাহায্য দরকার হলে পাড়ার মানুষ এগিয়ে আসেন। এই মিলেমিশে থাকার আনন্দই আমাদের পুজোকে বিশেষ করে তোলে।
দশমীর দিন আনন্দের সঙ্গে মিশে থাকে বিদায়ের মনখারাপ। মায়ের বিসর্জনের প্রস্তুতি শুরু হলে গ্রামের মানুষ একত্র হন। প্রতিমাগুলিকে রিকশাভ্যানে বসানো হয়। তারপর বিভিন্ন বাজনার তালে তালে, আনন্দে-উচ্ছ্বাসে ঠাকুরদের নিয়ে গ্রামের পথে শোভাযাত্রা বের হয়। ঢাক, কাঁসরসহ নানা বাদ্যের শব্দে চারদিক মুখরিত হয়ে ওঠে। মানুষজন শোভাযাত্রার সঙ্গে হাঁটেন, কেউ হাততালি দেন, কেউ নাচেন, আর শিশুরা বিস্ময়ে সবকিছু দেখে। চারটি পুজোর প্রতিমা একসঙ্গে বিদায় নেওয়ায় সেই দৃশ্য আরও আবেগময় হয়ে ওঠে।
বিসর্জনের সময় অনেকের চোখে জল আসে, কিন্তু সকলের মুখে থাকে একটাই আশা,মা আবার আসবেন। আসছে বছর আবার হবে,এই কথার মধ্যে থাকে অপেক্ষা, ভালোবাসা আর নতুন আনন্দের প্রতিশ্রুতি। বিসর্জনের পরও গ্রামের মানুষের মধ্যে বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় চলতে থাকে। সবাই একে অপরের বাড়িতে যান, মিষ্টিমুখ করেন, আর পুজোর সুন্দর মুহূর্তগুলো মনে করে গল্প করেন।
বিসর্জনের শোভাযাত্রা শেষ হলে গ্রামের মানুষ ধীরে ধীরে ঘরে ফেরেন। প্রতিমা বিসর্জনের পর মণ্ডপে ফিরে আসে এক অদ্ভুত নীরবতা,কিছুক্ষণ আগেও যেখানে ঢাকের বাদ্য, মানুষের হাসি আর আনন্দ কলতানে চারদিক মুখর ছিল, সেখানে তখন শূন্যতা বিরাজ করে।
বাড়ি ফিরে বড়দের প্রণাম করে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানায় ছোটোরা। পাড়ায় পাড়ায় চলে কোলাকুলি, মিষ্টিমুখ আর সৌহার্দ্য বিনিময়। শিশুদের মুখে বিসর্জনের শোভাযাত্রার গল্প, আর বড়দের মনে পরের বছরের পুজোর অপেক্ষা। বিদায়ের সুরে তাই আনন্দও মিশে থাকে,মা আবার আসবেন, এই আশায় সবাই বলে, আসছে বছর আবার হবে।
সুদীপ ঘোষাল
লেখক পরিচিতি – অতি সাধারণ জীবন যাপন লেখকের। সুদীপ ঘোষাল পূর্ববর্ধমান জেলার বড় পুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা প্রভাতকুমার মাতা গীতারাণী। ছোট থেকেই লেখালেখি করেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা প্রথম পছন্দ। তারপর জীবনানন্দ ও বিভূতিভূষণ প্রিয় কবি ও লেখক। পশ্চিমবাংলার ও বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখকের লেখা প্রকাশিত হয়।১৯৮৫ সালে প্রথম উপন্যাস লেখেন মিলনের পথে। তারপর চারটি কাব্যপুস্তিকা ও দুটি গল্পসংকলের পুস্তিকা প্রকাশিত হয়।কলকাতা সৃষ্টিসুখ ও এবং ছাপাছাপি দুটি উপন্যাসিকা- সংকলনের গ্রন্থ প্রকাশিত করেন কলকাতা বইমেলায়। বার্লিন অংশুমালী পত্রিকায়, সিডনী প্রভাতফেরী পত্রিকায় ও পশ্চিমবাংলা ও ঢাকার বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়।গল্প, উপন্যাস লিখতে ভালবাসেন।

জয় মা দুর্গা, দুর্গতি নাশ করো মা।