দুর্গতিনাশিনী!
সোমনাথ ব্যানার্জী
দুর্গাপুজোর ষষ্ঠীর সন্ধ্যা। আলোকিত চারদিক। পাড়ায় বক্সে তথাকথিত বাংলা গান চলছে। ছোট ছেলেমেয়েরা চকোলেট বোমা ফাটাচ্ছে। যুবক-যুবতীরা নতুন জামাকাপড় পরে পাড়ায় পাড়ায় দুর্গাপ্রতিমা দেখতে বেড়িয়েছে। বড়রা একসঙ্গে জটলা করে নানা পুরোনো কথার স্মৃতিচারণ করছেন।
আলোকিত বারোয়ারি মণ্ডপ থেকে একটু দূরেই, খেলার মাঠের ধারে, একটা ছোট ভাঙা শিবমন্দির। সেখানে আলো তেমন নেই। মন্দিরের সিঁড়িতে বসে আছে নীল। পুজোর আবহ তার ভিতরে প্রবেশ করতে পারেনি। সে বসে বসে রাতের আকাশের তারার দিকে চেয়ে আছে। তার দৃষ্টিতে কোনো চাহনি নেই, আছে শুধু ব্যাকুলতা, অসহায়তা।
ঠিক এই সময় একজন সাইকেল চালিয়ে মন্দিরের সামনে এল। নীলের বন্ধু, স্বর্ণাভ।
নীল তাকিয়ে বলল, “হয়ে গেল?”
সাইকেল থেকে নেমে স্বর্ণাভ বলল, “হ্যাঁ।” এই বলে মন্দিরের সিঁড়িতে বসে পড়ল।
নীল বলল, “পেলি কিছু?”
স্বর্ণাভ একটা সিগারেট ধরিয়ে বলল, “নাঃ, অর্ধেক তো আসেনি। এ মাসে তিনজন দিয়েছে। তোর হল?”
নীল বলল, “বাহ্! আমারও সেই এক। তবে, কামাই করেনি। কিন্তু কিছু বলেওনি।”
স্বর্ণাভ বলল, “দূর, বেকার সব! সারা বছর পড়াব, কিন্তু দরকারে মাইনেটাও দেয় না।”
নীল বলল, “দিতে না পারা আর দিতে না চাওয়ার মধ্যে বেশ তফাত আছে, জানিস তো!”
স্বর্ণাভ সিগারেটের ধোঁয়াটা ছেড়ে বলল, “তাই তো বুঝি। তোর কটা ডিউ আছে?”
নীল বলল, “একজনের তিন মাস, চারজনের দু’মাস। আর পুজোর মাসে তো একজন দিয়েছে। দু’জন বলেছে, পুজোর মধ্যে দেবে। এবার সে পুজো কোন পুজো, ওরাই জানে। তোর কটা?”
স্বর্ণাভ বলল, “আমার তিনজন দু’মাসের মাইনে দিয়ে দিয়েছে। কয়েকজন এ মাসেরটা দিয়ে দিয়েছে। আর বাকি সব বাকি!”
নীল বলল, “কিছু কিনলি?”
স্বর্ণাভ বলল, “মামা টাকা পাঠাল, একটা জিনস কিনলাম। তুই?”
নীল বলল, “একটা জামা হয়ে গেছে। মিটে গেছে। বাড়িতে কিছু তো দেওয়াই হয় না, কয়েক বছর ধরে।”
স্বর্ণাভ বলল, “ওসব অত ভাবিস না। মাথাটা খারাপ হয়ে যাবে। আমার মায়ের ওষুধ জোগাড় করতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছি। কিন্তু কী করব? বেশি চিন্তা করলে তো নিজের জন্যও ওষুধের ব্যবস্থা করতে হবে। আলাদা খরচ!”
তারপর সিগারেটটা ফেলে দিয়ে বলল, “যাক গে, বাদ দে। চা খেতে যাচ্ছি, চল।”
নীল বলল, “নারে, বাড়িতে একটু কাজ আছে। তুই যা।”
স্বর্ণাভ ‘ঠিক আছে’ বলে কাঁধ ঝাঁকিয়ে চলে গেল। স্বর্ণাভ জানত, নীল যাবে না।
নীল জানে, পরিস্থিতি খারাপ থাকলেও স্বর্ণাভ পরিস্থিতিকে খুব একটা আমল দেয় না। তাই ওর চলে যেতে নীল নিজের বাড়ির দিকে চলে গেল।
বাড়িতে ঢুকতেই নীলের মা নীলকে ডেকে বললেন, “নীল, শোন।”
নীল বলল, “হ্যাঁ, মা বলো।”
নীলের মা বললেন, “আজ বিকেলে আশুদা এসেছিল। পুজোয় আমাদের জন্য কিছু দিয়ে গেছে। একটু দেখে নে।”
নীল বলল, “কখন এল? সকালেই তো কথা হল। কিছু তো বলল না।”
নীলের মা বললেন, “সময় ছিল না। তাড়াহুড়ো করে চলে গেল। রীনা পিসির বাড়ি যাবে বলল।”
নীল ম্লান হেসে বলল, “ওহ্, তাহলে আজ ওখানেই থাকবে।”
নীলের মা জামাকাপড় দেখালেন। নীল ওর বাবার জামাটা হাতে তুলে দেখল।
নীলের বাবা বললেন, “আমি আর এসব পরে কী করব! তুই পরে নিস।”
নীল কোনও কথা বলল না। জামাটা প্যাকেট থেকে বের করে দেখছিল। জামার সামনের ট্যাগে চোখ পড়ল। ম্যানুফ্যাকচারিং ডেট তিন বছর আগের। এবার ওর নিজের জামাটার ট্যাগও দেখল। সেটাও দু’বছর আগের।
নীল যখন বিষয়টা দেখাল, নীলের মা বললেন, “এই রে! বলতে হবে। মনে হয়, ভুল করে এনে ফেলেছে।”
নীল শুধু বলল, “যে নিজে থেকে যা দিচ্ছে, সেটা অ্যাকসেপ্ট করে নাও। এটা রীনা পিসির বাড়ি নয় যে বললে গুরুত্ব পাবে।”
নীলের বাবা বললেন, “ঠিক বলেছিস। ‘গুরুত্ব’ এখন একটা দামি শব্দ। তাই গুরুত্ব সবার হয় না। এ বাজারে শুধু আর্থিকভাবে দামিদেরই গুরুত্ব আছে।”
একসময় নীলের বাবাও সচ্ছল ব্যবসায়ী ছিলেন। আজ ব্যবসা নেই, তাই তিনি সেই সময়ের পাশাপাশি সময়ের সঙ্গে মানুষের ব্যবহারের পরিবর্তনটাও দেখেছেন।
নীলের বাবা শেষে একটা কথাই বললেন, “শোন, নীল। মানুষের জীবনে একটাই কাজ আছে—লড়াই। যে কোনও সময়ে, যে কোনও কাজের জন্য লড়াই। এই মানসিকতাটা রেখে যা। বাকি সময় কথা বলবে।”
রাতে খাওয়াদাওয়া শেষ হওয়ার পর, রাত এগারোটা নাগাদ নীলের একটা ফোন এল। স্ক্রিনে নাম উঠল—বৃষ্টি।
বৃষ্টির সঙ্গে নীলের রোজ এই সময়েই কথা হয়। কারণ, নীলের টিউশনের সময় আর বৃষ্টির স্কুলের ক্লাসের সময় সম্পূর্ণ আলাদা। তাই এই সময়টুকুই তারা কথা বলার সুযোগ পায়।
ফোন তুলল নীল।
ওদিক থেকে বৃষ্টি বলল, “Miscellaneous-এর মেনসের রেজাল্ট বেরিয়েছে, চেক করলি?”
নীল বলল, “হ্যাঁ।”
বৃষ্টি উত্তেজিত হয়ে বলল, “কী খবর হল?”
নীল বলল, “নাম নেই।”
বৃষ্টি বলল, “তুই বললি, পরীক্ষা ভালো হয়েছে!”
নীল বলল, “হয়েছিল তো।”
বৃষ্টি বলল, “উফ্! এইভাবে কী করে চলে?”
নীল সম্পূর্ণ চুপ।
বৃষ্টি তখন একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত গলায় বলল, “আজ একটা কথা বলি, শোন। তুই আমাকে ভালোবাসিস, আর আমি তোকে পছন্দ করি সেই কলেজ থেকেই। কিন্তু গাছে কাঁঠাল আর গোঁফে তেল দিয়ে তো আর জীবন চলে না। তাই আমি বলি, এবার এদিকের আশা ছেড়ে দে। কিছু সম্পর্ক বন্ধুত্বের মধ্যেই থেকে যায়। আর আমাদের বিষয়টাও তাই। আমার হয়তো কয়েক মাসের মধ্যেই বিয়ের ডেট পাকা হয়ে যাবে। আমার স্কুলের এক কলিগের বাড়ি থেকে প্রস্তাব এসেছে। বাড়িতেও সবাই রাজি আছে। তাই বলছি, এবার তুই এদিকের বিষয়টা নিয়ে আর ভাবিস না। সবাই সব পাবে, এমনটা কি হয়? হ্যালো, শুনছিস?”
নীল কোনও জবাব দিল না। সে চুপ করে খাটে শুয়ে থাকল। মাথার ওপর চলন্ত ফ্যানটার দিকে তাকিয়ে রইল।
হঠাৎ করেই সে নিজেকে চারদিক থেকে শূন্যতার মেঘে ঘিরে যেতে দেখল। চোখের কোণে জল জমতে শুরু করল।
এবার তার খুব আশা ছিল, পরীক্ষাটায় পাশ করবে। আর একটা ধাপ পেরিয়ে যেতে পারলেই সব সমস্যার সমাধান। চাকরি পাবে, বৃষ্টির বাড়িতে কোনও রকম সমস্যা থাকবে না। বাড়িতে বাবা-মা একটু স্বস্তি পাবে।
কিন্তু এই একটা রাত তার সব পরিকল্পনায় জল ঢেলে দিল।
কখন বৃষ্টির ফোন কেটে গেল, কখন সে ঘুমিয়ে পড়ল, বুঝতেই পারল না।
পরের দিন সকালে বাড়ির পাশের বারোয়ারি মণ্ডপে ঢাকের আওয়াজে ঘুম ভেঙে গেল। বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। দুর্গাদালানে উঠে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইল।
মনে মনে বলে উঠল, “মা দুর্গা নাকি দুর্গতিনাশিনী?”
চোখ ঝাপসা হয়ে এল।
সোমনাথ ব্যানার্জী
পরিচিতি : লেখক সমকালীন ভাবনায় বিশ্বাসী এক তরুণ লেখক। সহজ ভাষায় গভীর অনুভূতি ও চিন্তার প্রকাশই তাঁর লেখার অন্যতম বৈশিষ্ট্য। ইতিহাস, দেশপ্রেম, মানবিক অনুভূতি এবং মানুষের মানসিক টানাপোড়েন তাঁর লেখার প্রধান বিষয়।
বাস্তব ইতিহাসের ঘটনা ও চরিত্রকে কল্পনার সঙ্গে মিলিয়ে পাঠকের সামনে নতুনভাবে তুলে ধরতে তিনি আগ্রহী। তাঁর লেখায় অতীতের ঘটনাপ্রবাহের পাশাপাশি বর্তমান সমাজ ও মানুষের চিন্তাভাবনাও বিশেষ গুরুত্ব পায়।
ইতিমধ্যেই তাঁর “সেই সময় ইউক্রেনে” এবং “আবার দেখা হবে…” গল্প দুটি প্রকাশিত হয়েছে। প্রতিটি রচনায় ভিন্ন ভিন্ন প্রেক্ষাপট ও অনুভূতির মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন, সম্পর্ক এবং সমাজকে দেখার চেষ্টা করেছেন তিনি।
