মহালয়া ও চন্ডীপাঠ
অনিল চক্রবর্তী
ভাদ্রমাসের প্রতিপদ তিথি থেকে পরবর্তী অমাবস্যা পর্যন্ত পনেরো দিনের সময়টাকে ধরা হয় পিতৃপক্ষ হিসাবে।পুরাণ মতে এই সময় পূর্বপুরুষেরা মনুষ্যলোকের কাছাকাছি চলে আসেন। কিছু উৎসর্গ করলে সহজেই তাঁরা পেয়ে যান। পিতৃপক্ষের শেষদিন ও দেবীপক্ষের আগমনের সন্ধিক্ষণ হ’ল মহালয়া যেদিন পিতৃপুরুষদের স্মরণ ও মননের মাধ্যমে তর্পণ করা হয়। তবে আজও মহালয়া বলতে মানুষ বোঝে বেতারে ভোর চারটে র “মহিষাসুর মর্দ্দিনী”। আপনা থেকেই ঘুম ভেঙে যায়। কানে এসে ধাক্কা দেয় সেই চেনা ভাষ্য—আশ্বি-নের শারদ প্রাতে…
ছোটখাটো মানুষটির বড় মাপের আওয়াজ। এক ও অদ্বিতীয় বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র তথা বীরূপাক্ষর গলা। এই স্মরণীয় সময়টির জন্য অনেকেই পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করে রেডিওটি এনে বসাতেন নির্দিষ্ট আসনে। বয়স্ক-বয়স্কা অনেকেই স্নান সেরে শুদ্ধ বস্ত্রে হাতে ফুল নিয়ে বসতেন চন্ডী পাঠ শুনতে। সারা বছর ফাঁকা থাকলেও মহালয়ার কয়েকদিন আগে রেডিও মেরামতির দোকানে ভীড়। প্রতিটি কাজই শেষ করতে হবে মহালয়া
র আগের দিন। “মহিষাসুর মর্দ্দিনী”র কাহিনী রচনা করেছেন শ্রী বৈদ্যনাথ ভট্টাচাৰ্য যিনি বাণীকুমার নামেই সুপরিচিত। সঙ্গীত পরিচালনার ভার
পড়েছিল শ্রী পঙ্কজ কুমার মল্লিকের উপর। বিভিন্ন গানে নামী দামী শিল্পীর গলা শোনা যায় যেমন দ্বিজেন মুখোপাধ্যায়, মানবেন্দ্র মুখোপাধ্যায়, শ্যামল মিত্র, সুপ্রীতি ঘোষ, শিপ্রা বসু, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, উৎপলা সেন, আরতি মুখোপাধ্যায় প্রমুখ। বাদ্যযন্ত্রে সহযোগিতা করেছিলেন সুপ্রতিষ্ঠিত শিল্পীবৃন্দ। তবে শুধুমাত্র বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্রের
স্তোত্র পাঠই অনুষ্ঠান টির মেরুদন্ড। ১৯৩৭ সাল থেকে সম্প্রচারিত অনুষ্ঠানটি আজও সমানে হয়ে চলেছে। বাঙালির দুর্গাপূজা সূচনা হচ্ছে।
একঘেয়ে হয়ে যাওয়ার ভয়ে মাঝে আকাশবাণী কর্তৃ-পক্ষ ১৯৭৬ সালে
পন্ডিত ধ্যানেশ নারায়ণ চক্রবর্তী ও ড: গোবিন্দ গোপাল মুখোপাধ্যায় রচিত “দেবী দুর্গতি হারিনী” সম্প্রচার করেছিল। শ্রদ্ধেয় হেমন্ত মুখোপাধ্যায়- এর পরিচালনায় সঙ্গীতে কণ্ঠদান করেছিলেন লতা মঙ্গেশকর, আশা ভোঁসলে, আরতি মুখোপাধ্যায়, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়, মান্না
দে-র মতো শিল্পীরা। ভাষ্যপাঠ করেছিলেন মহানায়ক উত্তমকুমার ও বসন্ত
চৌধুরী। জনগণের প্রতিক্রিয়া কি হয়েছিল তা সকলের জানা। বেতারকেন্দ্র
ঘেরাও হয়েছিল। পুনরায় আকাশবাণী সম্প্রচার করেছিল “মহিষাসুর মর্দ্দিনী” তথা বীরেন্দ্র কৃষ্ণ ভদ্র-র পাঠ… আশ্বি-নের শারদ প্রাতে…. ও চন্ডীপাঠ।
লেখক পরিচিতি — ঠিকানা কালনা , পূর্ব বর্ধমান ৷ অবসর প্রাপ্ত ব্যাঙ্ক ম্যানেজার ৷ একসময় ক্যুইজ প্রতিযোগিতা সঞ্চালনা করে এসেছেন একচেটিয়া ৷ পরে লেখালিখির সাথে যুক্ত হয়ে কবিতা গল্প ও প্রবন্ধ লিখতে শুরু করেন ৷ইতিমধ্যে তার দুটি বইও প্রকাশ পেয়েছে ৷
