দশেরা ও বিজয়া দশমী
ড. সোমালি চৌধুরী
দশেরা ও বিজয়া দশমী মূলত আশ্বিন মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে পালিত একই দিনের দুটি আঞ্চলিক নাম। উত্তর, মধ্য ও পশ্চিম ভারতে দিনটি দশেরা নামে পরিচিত; আর বাংলায় এটি বিজয়া দশমী নামে দুর্গাপুজোর সমাপ্তি হিসেবে পালিত হয়।
*দশেরা অর্থাৎ ‘দশের বিনাশ’-এর পৌরাণিক তাৎপর্য-
উত্তর ও মধ্য ভারতে দশেরা প্রধানত শ্রীরামচন্দ্রের লঙ্কাধিপতি রাবণের উপর বিজয়ের উৎসব। রাবণ সীতাকে অপহরণ করলে শ্রীরাম তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন এবং দীর্ঘ যুদ্ধের শেষে দশমী তিথিতে রাবণ পরাজিত ও নিহত হন। তাই দশেরায় রাবণ, কুম্ভকর্ণ ও মেঘনাদের কুশপুতুল দাহ করা হয়। এর মাধ্যমে বোঝানো হয়-
শেষ পর্যন্ত সত্যের জয় হয়,
ন্যায় অন্যায়ের উপর বিজয়ী হয়,
অহংকার, লোভ, ক্রোধ ও অত্যাচারের শেষ পরিণতি হলো ধ্বংস,
জ্ঞান ও শক্তি থাকলেও নৈতিকতা না থাকলে পতন অনিবার্য।
রাবণের দশটি মাথাতে মানুষের দশটি নেতিবাচক প্রবৃত্তির প্রতীক হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়-কাম, ক্রোধ, লোভ, মোহ, মদ, মাৎসর্য, অহংকার, হিংসা, স্বার্থপরতা ও অন্যায়বোধ। রাবণদহন একটি পৌরাণিক চরিত্রের প্রতীকী বিনাশ নয়; এটি মানুষের নিজের অন্তরের অশুভ প্রবৃত্তি দমনেরও আহ্বান।
*বিজয়া দশমীর তাৎপর্য-
বাংলায় দশমী বিশেষভাবে বিজয়া দশমী নামে পরিচিত। পুরাণকথা অনুযায়ী, দেবী দুর্গা মহিষাসুরের সঙ্গে যুদ্ধ করে তাকে পরাজিত করেন। তাই দশমী হল দেবী দুর্গার বিজয়ের দিন অর্থাৎ দিনটি দেবী শক্তির কাছে অশুভ শক্তির পরাজয়ের প্রতীক। ‘বিজয়া’ অর্থ বিজয়, যাকে শুধু কোন পৌরাণিক যুদ্ধের ফল হিসেবে দেখলে তার গভীর অর্থ প্রকাশ পায় না। বিজয়া দশমী বাহ্যিক বিজয়ের পাশাপাশি আত্মজয়ের প্রতীক। বিজয়া কেবল ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য, ক্ষমা ও পুনর্মিলনের উৎসব। দশমীতে দেবীকে বিদায় দেওয়া মানে ভক্তির অবসান নয়; বরং তাঁর শক্তি ও আদর্শকে নিজের জীবনে ধারণ করে এগিয়ে যাওয়া।
তাই দশেরা ও বিজয়া দশমীর মূল বার্তাকে এক কথায় বলা যায়: অশুভকে জয় করে শুভের পথে এগিয়ে চলাই প্রকৃত বিজয়। শরৎকালে অন্ধকারের অবসান ঘটিয়ে নতুন আলোর আগমন এবং মনের সমস্ত কলুষতা দূর করে নতুন ও সৎ জীবনের শপথ নেওয়ার নামই বিজয়া বা দশেরা।
কলমের সাথে সখ্যতা মেয়েবেলা থেকে। আজও একইভাবে নিয়মিত লিখে চলেছি। কবিতা দিয়ে লেখার যাত্রা শুরু হলেও বর্তমানে গবেষণামূলক প্রবন্ধ নিয়েই কাজ করি। কলমের আঁচড়ে প্রাপ্তির ঝুলিতে আছে বিশেষ কিছু পুরস্কার। রয়েছে নিজস্ব ও সম্পাদিত বেশ কিছু গ্রন্থ। পাঠকের ভালোবাসা লিখে যাওয়ার একমাত্র অনুপ্রেরণা
