দ্য ল্যুভর (The Louvre)

মৈত্রেয়ী বন্দ্যোপাধ্যায়


 

louvre

আমার অনেকদিনের ইচ্ছে একবার ল্যুভর মিউজিয়ামটি দেখতে যাবার l এতো নামী দামী শিল্পীদের আঁকা ছবি এবং ভাস্কর্য সেখানে রয়েছে যে প্রত্যে কেরই হয়তো সে ইচ্ছে থেকে যায় l এবারের গ্রীষ্মের ছুটিতে তাই ভাবলাম বহুদিনের শখ যখন রয়েই গেছে তাহলে এবার সেটা পূর্ণ করেই নিই l তাই চল লাম প্যারিসের উদ্দেশ্যে l প্রথমে লন্ডনে পৌঁছে কদিন ঘোরাঘুরি করে ভিক্টরিয়া বাসস্ট্যান্ড থেকে টুরিস্ট বাসে চেপে ডোভার পোর্ট I সেখানে জাহাজের ভেতরেই বাস ঢুকে গেলো ,আরো অনেক বাস গাড়ি সব রয়েছে l louvre photos (6) আমাদে র সিট্ ছিল পাঁচতলায় ,ওখানে বসে কফি আর স্ন্যান্কস খেতে খেতে ইংলিশ চ্যানেল পার হতে থাকলাম l ইংলিশ চ্যানেলের তলা দিয়ে পাতাল রেলের ব্যবস্থাও আছে কিন্তু জাহাজে করে যাওয়ার মজাই আলাদাl ঘন্টা খানেক সময় লাগলো, ইংলিশ চ্যানেল পার হতে, ওপা রে গিয়ে পৌছুলাম ক্যালে পোর্টেl সেখান থেকে আর অন্য কোথাও না গিয়ে সোজা প্যারিস l পর দিন সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে সোজা বিখ্যাত ল্যুভর মিউজিয়ামেl

louvre photos (5)প্রকৃতপক্ষে ল্যুভর মিউজিয়াম টি ছিল একটি রাজপ্রাসাদ lষোড়শ শতাব্দীতে এটিকে মিউজিয়াম হিসাবে পরিণত করা হয় l রাজা প্রথম ফ্রান্সিস
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা বিখ্যাত মোনালিসা ছবিটি কেনেন ও নিজের সংগ্রহশালায় রাখেন l ফরাসি বিপ্লবের পর ঠিক হয় এটিকে মিউজিয়াম বানানো হবে এবং সাধারণ মানুষের দেখার জন্য এটিকে খুলে দেওয়া হবে l সতেরোশো তিরানব্বই সালে দশই আগস্ট পাঁচশো সাঁইত্রিশটি ছবি নিয়ে সংগ্রহশালাটি খোলা হয় lল্যুভ রে মোট আটত্রিশ হাজার ছবি ও ভাস্কর্য আছে l মোট আটটি বিভাগে ভাগ করে এগুলিকে রাখা আছে l ল্যুভরে লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসটি অত্যন্ত সুরক্ষিত ভাবে ব্যারিকে ড করে বুলেট প্রুফ কাচ দিয়ে ঢাকা আছে,এটি আঁকতে আট বছর সময় লেগেছিলো l ল্যুভরে যা যা ছবি ও ভাস্কর্য আছে সব দেখা সম্ভব নয় তবুও গোগ্রাসে গেলার মত দেখতে লাগলামl আমার চোখে অপুর্ব লাগলো louvre photos (8)
লিওনার্দো দ্য ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসা ,দ্য ভার্জিন অব দ্য রকস ,পোর্ট্রেট অব এ লেডি ফ্রম দ্য কোর্ট অব মিলান, সেন্ট জন দ্য ব্যাপ্টিস্ট l বতিচেলির দ্য ভার্জিন এন্ড চাইল্ড স্যারাউ ন্ডেড বাই ফাইভ এঞ্জেল l টিটি য়ানের ল্য কনসার্ট চ্যাম্পেত্রে ,দ্য এনটুম্বমেন্ট অব ক্রাইস্ট ,ইন পেনিটেন্স ,সেন্ট জেরম ,বিখ্যাত ক্রাইস্ট ক্রাউন্ড উইথ থর্নস l এ ছাড়া রুবেন,মনে , ভ্যান গঘ,রাফায়েল ,মানে, গগা , ডেগাস, সিজানে এঁদের আঁকা ছবি,মিকলেঞ্জলোর সিস্টাইন চ্যাপেল অপূর্ব l মিকলেঞ্জলোর  স্থাপত্য ডাইং স্লেভ ,ডেভিড , আলেকজান্ডার এন্টিওকের ভেনাস দ্য মেলো এগুলো না দেখা পর্যন্ত বোঝা যায় না এতদিন কি দেখিনি l ল্যুভর মিউজিয়ামের প্রতিটি louvre photos (7) ছবি ও ভাস্কর্য ভালোভাবে দেখতে হলে কত সময় যে লাগবে তা আমার ধারণা নেই তবে গাইড বললেন তিন মাসেরও বেশি সময় লাগবে l ল্যুভর মিউজিয়ামের প্রবেশ দ্বারে একটি কাচের পিরামিড স্থাপিত আছে এটি উনিশশো উননব্বই সালে আমেরিকান শিল্পী আই .এম .পেইয়ের দ্বারা নির্মিত হয় l জানা গেলো এই কাচের পিরামিডের আলোয় মাটির নিচের তলা পর্যন্ত আলো কিত হয় l ল্যুভরের যতটুকু দে খার সাতদিনের মধ্যেই দেখে নিতে হলো কারণ এরপর আ বার ফিরে যেতে হবে অন্য দর্শনীয় স্থানগুলি দেখতেl

ল্যুভর দেখা শেষ করে চলে গেলাম রঁদার মিউজিয়ামে , মিউজিয়ামের সামনেই ওনার বিখ্যাত ‘ থিঙ্কার ‘ স্ট্যাচু টি বসানো আছে l খুব একটা বড় মিউজিয়াম নয় ঠিকই তবুও দেখার মতোই l এরপর চলে গেলাম প্লেস দ্য ল কনকোয়ার্ড এ l ফরাসি বিপ্লবের সময় এখা নে যে স্ট্যাচুটি ছিল পরে সেটির বদলে লিবার্টি নামে একটি নতু ন স্ট্যাচু বসানো হয় এবং এই জায়গার নাম হয় প্লেস দ্য ল রিভুল্যয়েসন l একসময়ে এখা নে গিলেটিন যন্ত্র বসানো ছিল l  whatsapp image 2026 04 22 at 10.59.56 pm (1)
সেখানে রানী আঁতোয়েন ,রাজা ষোড়শ লুই ,এবং একহাজার একশো উনিশ জনকে ওই গিলে টিন যন্ত্রে হত্যা করা হয় l ইজি প্টের ভাইসরয় লুই ফিলিপিকে ওবেলিস্ক পেডাস্টাল নামে এক টি সৌধ উপহার দেন ,এর উচ্চ তা পঁচাত্তর ফুট এই সৌধটি এখানে স্থাপিত হয় l এর পরের গন্তব্য আর্চ দ্য ট্রামফ l নেপোলি য়ন যখন অস্ট্রিয়ান ও তুর্কিদের সঙ্গে যুদ্ধে জয়লাভ করেন সেই উদ্দেশ্যে তিনি এটি তৈরিকরাতে শুরু করেন কিন্তু এটি শেষ হবা র আগেই তাঁকে নির্বাসিত করা হয় l এই যুদ্ধে যাঁরা শহীদ হন আর্চের গায়ে তাঁদের নাম খোদা ই করা আছে l whatsapp image 2026 04 22 at 10.59.55 pm আর্চটি ছেচল্লিশ ফুট উঁচু এবং দেড়শো ফুট লম্বা l এই আর্চটি চার্লস দ্য গল নামে বড় সার্কুলার স্কোয়ারের মাঝে অবস্থিত l এখান থেকে বিভিন্ন দিকে মোট বারোটি রাস্তা বেরি য়েছে l এখান থেকে গেলাম এলিসিয়া ফিল্ড রাস্তায়, গ্রিক পু রাণে এলিসিয়া এমন একটি জায়গা যেখানে যোদ্ধারা যুদ্ধ থেকে ফিরে বিশ্রাম করে l এই রাস্তাটি আর্চ এর সামনে এবং প্লেস দ্য ল কনকোয়ার্ড পর্যন্ত যুক্ত ,বর্তমানে এই রাস্তার নাম পরিবর্তিত হয়ে হয়েছে সাঁজ এ লিজে l এই রাস্তাটির ওপর বহু থিয়েটার হল ,সিনেমা হল ,কফি সপ ,প্রচুর শৌখিন দোকান রয়ে ছে l নিউ ইয়ার ,চোদ্দই জুলাই সমস্ত উৎসব এই রাস্তারওপরেই অনুষ্ঠিত হয় l এই রাস্তার বিশেষ ত্ব হল যে রাস্তার দুপাশে একই দূরত্বে গাছ লাগানো আছে এবং একই উচ্চতায় গাছগুলি সমান মাপে ছাঁটা , দুপাশে ঘর -বাড়ির একই ডিজাইন একই রং ,ইচ্ছে থাকলেও অন্য রং বা ডিজাইন করা যাবে না l

whatsapp image 2026 04 22 at 11.00.05 pmপ্যারিসের আরো একটি দ্রষ্টব্য স্থান হল ভার্সাই প্যালেস l চতু র্দশ লুই থেকে ষোড়শ লুই পর্যন্ত এই রাজবাড়িতেই কাটিয়েছেনl এই ভার্সাই রাজবাড়ী মধ্য প্যারি স থেকে কুড়ি কিলোমিটার দূরে অবস্থিত l রাজবাড়ীর ভেতরের কারুকার্য অসাধারণ ,বাইরের কাজও দেখার মতই তাতে কোনো সন্দেহ নেই l আলাদা টিকিট কিনে প্রাসাদের ভেতরে ঢুকতে হয় l রাজবাড়ীর উদ্যান টির দুপাশে একই রকম ডিজাইন করা ,মাঝে মাঝে জলাধার বানানো আছে সেখানে ফোয়ারা লাগানো আছে ,অনবরত জল ঝরছে আর জলাধারের ভেতরে নানা ধরণের মূর্তি বসানো আছে l এক এক জায়গায় এক whatsapp image 2026 04 22 at 10.59.56 pmএক ধরণের ভাস্কর্য এবং ফোয়ারায় সারাক্ষন জল ঝরছে l দুপাশের বাগানে একই মাপ এবং একই ডিজাইন করে গাছগুলি ছাঁটা l কোনটি নারীমূর্তি ,কোনটি নর্তকী ,কোনটি পশুর আদল l সব মিলিয়ে ভারী সুন্দর l এত বড় উদ্যানটি বয়স্ক বা শিশুদের পক্ষে হেঁটে ঘুরে দেখা সম্ভব নয় তাই ব্যাটারি চালিত গাড়ি আছে l উপযুক্ত মূল্য দিয়ে তাতে চেপে শিশু এবং বৃদ্ধরা অনায়াসে উদ্যানটি পরিক্রমা করতে পারে, অবশ্য মূল্য দিলে যে কেউই তাতে চাপতে পারে ,ওখানে বয়স্ক মানুষদের কেই চাপতে দেখলাম l গার্ডেনের ভেতরে অনেক সিমেন্টের বেঞ্চ করা আছে বিশ্রাম নেবার জন্যl রাজ প্রাসাদ এবং প্রাসাদের বাগানের সীমানা বরাবর প্রাচীর দেওয়া l প্রাচীরের ওপরের দিকে লোহা বা ওই জাতীয় ধাতু দিয়ে কারু কার্য whatsapp image 2026 04 22 at 11.00.06 pmকরা ,প্রাচীরের ওপরের দিকে কাজকরা চূড়াগুলি সোনা দিয়ে মোড়ানো দেখতেও সত্যিই অপূর্ব l ওখান থেকে বেরিয়ে লাঞ্চ প্যাক খুলে খাবার খেয়ে নিয়ে দেখে এলাম নতরেদাম ক্যাথিড্রাল ও টুইলারিস গার্ডেন l

এবার আমাদের ফেরার পালা বেশ কদিন প্যারিসে কাটিয়ে, রাস্তায় ঘাটেও নানারকম ভাস্কর্য দেখে ফুরফুরে মন নিয়ে ফিরে এলাম আমার চোখে সব থেকে সুন্দর এবং প্রিয় জায়গা আমার নিজের দেশে l

 

মৈত্রেয়ী বন্দোপাধ্যায়

মৈত্রেয়ী বন্দ্যোপাধ্যায়

ঠিকানা – টলিভিও ,6 রামশরণ পোদ্দার লেন মহাবীরতলা, ফ্ল্যাট নং 2এ, নিউ আলিপুর কলকাতা – 53

ছোট বেলাটা কেটেছে আসামে। এখানে থেকেই গ্রাজুয়েশন।তারপর দীর্ঘদিন সমাজ সেবিকার কাজ। পশ্চিমবঙ্গে এসে দেশ ও রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে ভ্রমণ। বেশ কয়েকটি দেশেও ঘুরেছেন। গল্প এবং ভ্রমনমূলক লেখা লিখেছেন অনেক পত্র পত্রিকায়। ছোট পত্রিকার জগতে পরিচিত মুখ।

18 thoughts on “দ্য ল্যুভর (The Louvre)”

  1. Dr.Indrani Banerjee

    খুব ভালো লাগলো। চমৎকার ভ্রমণের বিবরণ। মনে হল চোখের সামনে সব দেখছি।

    1. Maitreyee banerjee

      অসংখ্য ধন্যবাদ ,লেখাটা ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগলো

    2. Bhasapath Patrika

      অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই ম্যাডাম ৷

  2. Maitreyee Banerjee

    অসংখ্য ধন্যবাদ ,লেখাটা ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগলো l

  3. Maitreyee Banerjee

    অসংখ্য ধন্যবাদ ,লেখাটা ভালো লেগেছে জেনে ভালো লাগলো l

    1. Dr Sachindra Mohan Chatterjee

      ল্যুভর মিউজিয়াম এর নাম ছোট থেকে শুধু শুনেই এসেছি। কিন্তু শরীর বা সামর্থ কোনটাই সাথ‌দেয় নাই। প্যারিস শহরটা স্বপ্নের মাঝে ভাসা ভাসা টুকরো কল্পনা হয়ে রয়ে গিয়েছিল। কিন্তু আজকে মৈত্রীয়ী ব্যানার্জী র লেখা ল্যুভর পড়ে যেন স্বশরীরে স্বচক্ষে প্যারিস ঘোরা ও দেখা হয়ে গেল। এরপ্রত্যেকটি যায়গা এত নিখুঁত ভাবে বর্ননা করা হয়েছে, ভাবা যায় না। মনে হচ্ছিল যেন আমি স্বশরীরে উপস্থিত হয়ে সেই সব চাক্ষুষ করছি, লিওনার্দো দা ভিঞ্চির আঁকা মোনালিসা ভ্যান গগ এর আঁকা দেখা র মুহূর্ত ফুটিয়ে তোলার মতন কঠিন কাজ এক অসাধ্য সাধন। প্যারিস এর গড় বাড়ি এমন কি গাছপালা কিভাবে মেনটেন করছে তাও বলতে বাদ যায়নি। এক কথায় এমন ভ্রমন বর্ননা সত্যি অসাধারণ অনবদ্য। আমদের পাঠকদের এমন একটি উপহার দেবার জন্য ধন্যবাদ।
      Maitrayee এর নামটা typographical problem থাকায় ঠিক করে লিখতে পারলাম না।

      1. Maitreyee Banerjee

        লেখাটা পড়ে তোর ভালো লেগেছে জেনে খুব ভালো লাগলো ,তুই কষ্ট করে বাংলায় অতটা লিখেছিস এটাও অনেক বড় পাওয়া আমার জন্যে l তোকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি না শুধু ভালোবাসা l

  4. Sanchari Banerjee

    Aamar to jaowar soubhagyo hoyni, kintu jemon tomar chokh diye prothom prithibi dekhechilam, thik ek e bhabe, lekha ta pore puro ta chobi r moton chokher samne bhasche….jeno sudhu lekha noy, ekjon painter er painting dekhchi mone holo …..khub khub bhalo laglo 🥰

    1. Bhasapath Patrika

      খুব ভালো মতামত দিয়েছেন ৷ অনেক ধন্যবাদ ৷

    2. Maitreyee Banerjee

      যাও ,একবার ঘুরে দেখে এস না ,কে বারণ করেছে ?

  5. Maitreyee Banerjee

    লেখাটা পড়ে তোর ভালো লেগেছে জেনে খুব ভালো লাগলো ,তুই কষ্ট করে বাংলায় অতটা লিখেছিস এটাও অনেক বড় পাওয়া আমার জন্যে l তোকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি না শুধু ভালোবাসা l

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top