উপলতির “ডাক্তার বাড়ি “র দুর্গাপূজা।

বুদ্ধদেব মুখোপাধ্যায়


 

whatsapp image 2026 10 18 at 6.23.54 pm

অবিভক্ত বঙ্গ দেশে তাহেরপুরের রাজা কংস নারায়ন বঙ্গদেশে প্রথম জাঁকজমকপূর্ণভাবে দুর্গা পুজো শুরু করেছিলেন বলে জানতে পারা যায়।

বর্তমানে আমি যে পরিবারের দুর্গা পূজার কথা বলতে চলেছি তা হল পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা এক নম্বর ব্লকের সুলতানপুর অঞ্চলের উপলতি গ্রামের আজ থেকে প্রায় আড়াইশো বছর পূর্বেকার অভিজাত্য ঐতিহ্য বহনকারী ডাক্তার বাড়ী তথা জমিদার বাড়ির পূজা। যদিও এই দুর্গাপূজার নামকরণ প্রায় একশ বছর আগে ডাক্তার বাড়ির পূজা বলেই খ্যাত। এই ডাক্তারবাড়ির পারিবারিক পদবী মুখার্জি বা মুখোপাধ্যায়।
এই পরিবারের পূর্বপুরুষগণ সকলেই সংস্কৃতজ্ঞ পণ্ডিত ছিলেন বলে পারিবারিক
সূত্রে জানতে পারা যায়। ফলে তাদের পাড়া বিস্তীর্ণ এলাকায় “তর্কালঙ্কার পাড়া” বলে পরিচিত ছিল বা আছে।

এই পরিবারের প্রথম আরাধ্যা দেবী “মা কালী” রূপে পূজিতা হতেন। কিন্তু পরবর্তীকালে মা কালীর সাথে দেবী মহামায়ার ও পুজোর শুরু করা হয়।

এই পরিবারের প্রতিমা এক চালের। দেবী মূর্তির বাম পাশে বিদ্যার দেবী সরস্বতী এবং ডান পাশে ধনের দেবী লক্ষী প্রায় মায়ের সম উচ্চতায় প্রতিষ্ঠিতা।
ডানদিকে তারই নিচে সিদ্ধিদাতা গণেশ এবং বাম দিকের নিচে দেব সেনাপতি কার্তিক অধিষ্ঠিত। মাতা দুর্গা দেবী সিংহের উপর এক পদ ও অপর পদ অসুর স্কন্ধে রেখে চামুণ্ডা রূপে দন্ডায়মান এবং তার ত্রিশুলে বিদ্ধ করছেন মহিষাসুর কে। তবে এখানে মহিষের কোন পূর্ণ মূর্তি থাকেনা,থাকে শুধু মহিষের কাটা মুন্ডু ৷ ছোট আকারে ইঁদুর পেঁচা হাস ময়ূর প্রভৃতি সকল বাহনকেই দেখা যায়। তবে দেব সেনাপতি কার্তিকের ময়ূর- ই বাহনদের মধ্যে সর্বাপেক্ষা দৃষ্টিগোচর এবং মাতা দুর্গার সিংহ। এছাড়া মায়ের হাতে ধরা বিষাক্ত নাগের অসুর আক্রমণও দৃষ্টি এড়ায় না।
গণেশের ডান পাশে কলা বউ যা নবপত্রিকা, ধান্য লক্ষ্মী, মায়ের ঘটের সামনে পারিবারিক “শ্রীধর” নারায়ণ শিলা সিংহাসনে উপবিষ্ট থাকেন চারদিন । এখানে মা দেবী মূর্তি হলেও টানা টানা চোখের ভয়ঙ্কর বহ্নি দৃষ্টিতে তাকে সত্যই চামুণ্ডা বলে মনে হয়।

পঞ্চমীর দিন থেকে সরাসরি এই পূজার আয়োজন চলে। অবশ্য এই পূজার প্রস্তুতি পর্ব
সারা বছর ধরে চলতে থাকে।

মন্দিরটি আগে বাঁশ ও মাটি দিয়ে নির্মিত হলেও বর্তমানে পারটেক্স ও সাদা মার্বেল পাথরের ছোঁয়ায় বর্তমানে পারটেক্স ও সাদা মার্বেল পাথরের ছোঁয়ায় অতি সুন্দরভাবে সজ্জিত।

মাতৃ রূপা মায়েরও সাজসজ্জা
অনেকটাই উন্নত, রুপোর মুকুট সোনার জল করা। এটি উন্নত করনের একটি উদাহরণ হিসাবে তুলে ধরা যেতে পারে।

এই পূজা পূর্বের বহুদিন ধরে প্রচলিত হলেও এই বংশের সর্বাপেক্ষা সুসন্তান ডাক্তার মন্মথনাথ মুখোপাধ্যায়ের আমলে এই পূজার জৌলুস সর্বাপেক্ষা বৃদ্ধি পেয়েছিল।
কিন্তু পেশায় ডাক্তার হলেও নেশায় ছিলেন সম্পদ বৃদ্ধি কারী এক ব্যক্তি। শোনা যায় তিনি তার জীবন কালে প্রায় ১৮০০ বিঘা সম্পত্তির অধিকারী হয়েছিলেন।
তার আমলে প্রায় পার্শ্ববর্তী ১০ থেকে ১৫ টি গ্রামের মানুষের কাছে দুর্গাপুজোর চারটে দিন ছিল খুব আনন্দের। কারণ এই চারদিন তাদের বাড়িতে রান্না চাপত না। তারা সকলেই মায়ের ভোগ খেতেন মায়ের সামনে টিনের নির্মিত আটচালার নিচে। এমনকি সন্ধ্যা বেলা আরতির পর চাকরি করে লুচি বাতাসা কখনো বা বোদে মিষ্টির ব্যবস্থা এই মন্মথবাবুই চালু করেছিলেন। তাছাড়া তিনি বস্ত্র দান করতেন বলেও জানা গেছে।
আটচালা অগ্নিকোণে বেল গাছের নিচে তৈরি বোধন ঘরে পঞ্চমী থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত পুজো হয়।
সপ্তমীর দিন সকালে নবপত্রিকা স্নান করানো হয় বাবুদের দিঘিতে, যার আয়তন প্রায় সাড়ে সাত একরের মতো।
এখন পুরোহিত মশাই নিজ কাঁধে নবপত্রিকা চাপিয়ে রওনা হন ঢাকের শব্দে। শোনা যায় আগে পাল্কির ব্যবস্থা ছিল।
নবপত্রিকা স্নানে সব তো সাগরের জলের ব্যবহার অতি লক্ষণীয়। নবপত্রিকাকে গণেশের বউ বলে অনেকে ভুল করে থাকেন, আসলে ইহা মা দুর্গারই একটি রূপ ৷ অশ্বথ্থ দাড়িম্ব মান কচু হলুদ ধান ইত্যাদি গাছের সাথে কলা গাছকে বাধা হয়। বাংলার লোকজনের দুবেলা দুমুঠো অন্নের প্রতীক এ যেন এক আকুতি ” মা তুমি আমাদের আহার দিও, ভালো রেখো”।
সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত আধঘন্টা করে সন্ধ্যেবেলার আরতির দৃশ্য অতি মনোরম।
ষোড়শ উপচারে পূজা হয়। সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত নিরামিষ ভোগ প্রদান করা হয়, প্রায় ৩২ রকম। শুধুমাত্র নবমীর দিন মাছ ভোগ দেওয়া হয়। পঞ্চগ্রাম ভোজন থেকে কমে ১০০ জন হলেও পুজোর প্রতিদিন পাতা পড়ে। আগের সে জাঁকজমক না থাকলেও আভিজাত্য ও বনেদিয়ানা আছে। সর্বোপরি আছে অকুণ্ঠ ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা ভক্তি।

অষ্টমীর দিন নিত্য ক্রিয়ার পুজো শেষে শুরু হয় সন্ধিক্ষণের পূজা। এ সময় ৪৮ মিনিটে ১০৮ পদ্ম নিবেদন সহ
মানসিক পূজা করা কঠিনতর।

আগে এই সময় বন্দুকের তোপ ধ্বনি হলেও এখন বাজির ধ্বনি করা হয়। এ সময় ভয় মিশ্রিত একটি শ্রদ্ধার পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
পারিবারিক সূত্র থেকে জানা যায় আজ থেকে বহু বছর আগে যখন সন্ধিক্ষণে পূজা শুরু হয়েছিল এবং “ওম হৃং শ্রিং চামুন্ডায় নমঃ ” বলে ১০৮ পদ্মের নিবেদন চলছিল ঠিক সেই সময় অষ্টমীর সন্ধ্যেতে এককোনে বলি দেবার জন্য যে ছাগ আনা হয়েছিল তা কর্মকারের হাত ছেড়ে মন্ডপ ছেড়ে না পালিয়ে ধ্যানরত পারিবারিক প্রধানের কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। যেন ছাগ শিশুটি বলতে চাইছিল ” হে পারিবারিক প্রধান! আমার এই অকাল মৃত্যু থেকে আপনি বাঁচান। ” ধ্যানস্থ থেকে জাগরিত তিনি হুকুম দেন আজ থেকে সন্ধিক্ষণে ছাগ বলি বন্ধ। তারপর থেকে আর দুর্গাপূজায় কোন ছাগ বলি দেওয়া হয় না। তবে উপস্থিত শিষ্যগণ এই পরিস্থিতি লক্ষ্য করে তারা তাদের বলিকৃত ভাগ প্রেরণ করবে বলে গুরু কে কথা দিয়ে যান। সেজন্য এখনও শ্রীধরপুরের নিকট বড়োঞা থেকে ছাগ বলি শিশু এখনো উপলতিতে ভেট হিসাবে আসে।
নবমীর দিন কুমারী পূজা হয় ৷ধুনা পোড়ানো পরিবারের যেকোনো এক বধূ করে থাকেন। তারপর হোম শেষে পূজা শেষ হয়।

দশমীর দিন সন্ধ্যাবেলা বরণ শেষে সিঁদুর পরানো হয় সিঁদুর খেলা নয়। এ সময় সব ক্রিয়া কর্মশেষে দুর্লভপাড়া থেকে ১০ থেকে কুড়ি জন কাহার এসে তিনটি বাঁশের ওপর একচালা প্রতিমাকে বেঁধে নিয়ে নিরঞ্জনের উদ্দেশ্যে বাবুদের দিঘির সামনে এসে উপস্থিত হয় এবং মাকে নিরঞ্জন করা হয়।
তারপর আবার মন্ডপে ফিরে গিয়ে সমস্ত কাহারা গুড় মুড়ি মুড়কি নারকেলে নাড়ু ও যৎসামান্য পারিশ্রমিক নিয়ে বাড়ি ফেরে। এদিকে বাবুদের বাড়িতে কলাপাতার উপর দুধ ও আলতা দিয়ে “শ্রী শ্রী দূর্গা মাতার সহায়” লেখার সঙ্গে সঙ্গে সিদ্ধি মিশ্রিত দুধ খাওয়া হয়। এরপর পরিবারের সবাই একসাথে পংক্তিভোজনের মাধ্যমে দুর্গোৎসব শেষ হয় ।।

buddhadeb

লেখক বুদ্ধদেব মুখোপাধ্যায় একজন কবি, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও নাট্যকার এবং গল্পকার। কালনা ও কলকাতার সাহিত্য পরি মন্ডলে লেখকের নাম সুপরিচিত ও তিনি নানা পুরস্কারে ভূষিত। জন্ম পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমা শহর। বেড়ে ওঠা সবুজ গাছালি ঘেরা কালনা মহকুমার অন্তর্গত কালনা এক নম্বর ব্লকের সুলতানপুর অঞ্চলের উপলতি গ্রাম। পিতার নাম মধুসূদন মুখোপাধ্যায় এবং মাতা স্বর্গিয়া মাধবী দেবী। বিজ্ঞানে স্নাতক লেখক ছেলেবেলা থেকেই সাহিত্যে নিমগ্ন। বর্তমানে 40 বছর ধরে তার কলম এখনও সাবলীল। বর্তমানে তিনি চিকিৎসা ও শিক্ষার মত মহান কর্মে লিপ্ত। “মনসৃজ” “সিন্ধুতে বিন্দু” “শিক্ষকের উপহার ” “যুবপ্রাণ বিবেকানন্দ” “নানা রূপে নানা দূর্গা ” ইত্যাদি লেখকের বইগুলো পাঠক মহলে বিশেষ আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। তাছাড়া লেখকের এখনও পাঁচটি গবেষণামূলক বই প্রকাশের অপেক্ষায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top