কাটোয়ার বনেদি বাড়ির পুজো পরিক্রমা

কাটোয়ার বনেদি বাড়ির পুজো পরিক্রমা

প্রবীর আচার্য

viui2056 scaled (1)

বহু পুরনো শহর কাটোয়ায় অনেকগুলি বনেদি পুজো বাড়ি আছে যেখানে এখনও দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হয়। সেসব বাড়িগুলির কাঠামো প্রায় একই রকম। বড়ো বড়ো থামওয়ালা মূল পূজামণ্ডপ। মণ্ডপের সামনে চুন-সুড়কির ফুলকারি। পূজা মণ্ডপের সামনে বাঁধানো চত্বর বা অঙ্গন। চত্বর বা অঙ্গন থেকে পূজামণ্ডপ প্রায় এক মানুষের ওপর উঁচু। বেশিরভাগ পুজো বাড়ির অঙ্গনেও রয়েছে দোতলা সমান উঁচু ছাদ এবং তার ওপর আলো বাতাস চলাচলের জন্য কাচ বসানো গবাক্ষ। অঙ্গনের চারদিক ঘিরে উঁচু দোতালা দালান। দু’তলার এই অলিন্দগুলির খড়খড়ি লাগানো জানলা, সেখানে মহিলাদের বসার জায়গা রয়েছে। পুজোর সময় সেগুলিতে আলো, ঝালর এবং কলার ছড়া, ডাব এসব ঝোলানো হয়। তাছাড়া অঙ্গনের উপর থেকে ঝাড়বাতি এবং বেলোয়ারি কাচের সাজসজ্জা ঝোলানো হয়। এই সরঞ্জামগুলি বহু পুরনো, সারা বছর যত্ন সহকারে সংরক্ষণ করে রাখা হয়, কেবল পূজার সময় বের করা হয়। তবে পুরনো মোমবাতি দিয়ে জ্বালানো বড়ো বড়ো বেলোয়ারি ঝাড়বাতিগুলো অধিকাংশ বাড়িতেই নষ্ট হয়ে গেছে। পরিবর্তে এসেছে বৈদ্যুতিক ঝাড়বাতি।
ব্যবসা-বাণিজ্যের সুবাদে কাটোয়া মহকুমার গ্রাম-গঞ্জ থেকে বহু পরিবার উঠে এসে কাটোয়ায় বসতি স্থাপন করে। ব্যবসায় প্রতিষ্ঠা লাভ করায় তাঁরা সম্পন্ন গৃহস্থ হয়ে ওঠেন এবং পারিবারিকভাবে দুর্গাপূজা দোল উৎসব ইত্যাদি প্রবর্তন করেন। সেই সব পুজো গুলোই বর্তমানে শরিকি পুজো হিসেবে টিকে আছে, আবার অনেক পুজো বন্ধও হয়ে গেছে। বেশিরভাগ পুজোই ১৫০/ ২০০ বছরের পুরনো। এই ১৪৩৩ বঙ্গাব্দে যে ১৮টি পুজো এখনও কাটোয়া শহরে আড়ম্বর সহকারে টিকে রয়েছে তাদেরই অতি সংক্ষিপ্ত পরিচয় দেওয়া হল।
১। কাটোয়া কাছারিপাড়া এবং কুমোর পাড়ার সংযোগস্থলে রয়েছে সাহা বাড়ির দুর্গা পুজো। সাহা বংশের নদের চাঁদ সাহা ১৯০৫ সালে এই দুর্গাপূজার প্রতিষ্ঠা করেন। এই বাড়ির সবচেয়ে বরিষ্ঠ সদস্য মানস সাহার (৮৮) বক্তব্য অনুসারে এঁদের আদি বাড়ি ছিল কাটোয়ার নিকটবর্তী হরিপুর গ্রামে। পুজোর জন্য ২৫ বিঘা লাখরাজ দেবোত্তর সম্পত্তিও ছিল। সে সব থেকে এখন কোনও আয় হয় না। তবে কাটোয়া বাজারে কিছু জায়গা আছে যেখান থেকে বছরে প্রায় ৩৬,০০০/- টাকা মতো আয় হয়। সে টাকা পুজোতেই খরচ হয়।
২। কাটোয়া নিশান তলার কাছে মল্লিক বাড়ির পুজো একটি বিখ্যাত পুজো। মল্লিকদের আদি বাড়ি ছিল সুদপুরের কাছে বিজয় নগরে। ১২৫ বছর আগে পুজোর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন রাধিকাপ্রসাদ মল্লিক। প্রতিষ্ঠাতার ষষ্ঠ পুরুষ বর্তমান বয়স্ক ব্যক্তি প্রবীর মল্লিকের (৬৫) বক্তব্য অনুসারে দুর্গামন্দির তৈরি হয়েছিল ডাবের জল দিয়ে। এখানে কুমারী পূজা, লক্ষ্মীপূজা ও কালীপূজাও হয়। দেবীর নামে কোনও দেবোত্তর সম্পত্তি ছিল না। আগে অষ্টমী নবমী দুদিন মহোৎসবে দরিদ্র নারায়ণ সেবা করা হত। বর্তমানে শরিকরা পালাক্রমে পুজো করেন। এদের পুজোয় কোনও বলিদান হয় না।
৩। হাড়িবাড়ির দুর্গাপূজা হাজরা সম্প্রদায়ের পারিবারিক পূজা হলেও কাটোয়া শহর ছাড়াও দূরদূরান্তের মানুষের কাছেও এই পূজার মাহাত্ম্য প্রচারিত। যার জন্য বহু মানুষ এখানে মানসিক করে। সামাজিকভাবেও এই পূজার গুরুত্ব অনেক বেশি। এই বংশের বরিষ্ঠ সদস্যা ৺যশোদামণির বৌমা বিজলি হাজরার মতে এই বংশের পূর্বপুরুষরা স্বপ্নাদেশ পেয়ে আনুমানিক ৩০০ বছর আগে এই পূজার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। এখানে কোনও বলিদান হয় না। মূলত ভক্তদের মানসিকের দানে পুজোর খরচ চলে।
৪। তাঁতিপাড়া সাহাবাড়ির দূর্গাপূজার প্রতিষ্ঠাতা মতিলাল, হরিলাল, রাজেন্দ্রলাল প্রমুখ পাঁচ ভাই। এঁদের বংশের বরিষ্ঠ সদস্যা লতিকা সাহা(৮২)। অনিমেষ সাহার মতে এই পুজো প্রায় ৩৫০ বছরের পুরনো। এঁদের পুজো শরিকী হলেও সকলে মিলে যৌথভাবে পুজো করেন, বছর বছর পালাক্রমে আলাদা আলাদা পরিবার দায়িত্ব গ্রহণ করেন না। দেবোত্তর সম্পত্তি বলতে কাটোয়া ঠাকুরপুকুর এবং ঝঙ্কার ক্লাবের পাশে সেনেগড়ের অংশ রয়েছে। তবে সেখান থেকে বিশেষ কোনও আয় হয় না।
৫। তাঁতিপাড়া দাসেদের পুজোবাড়ির দুর্গাপূজা আনুমানিক ২০০ বছরের পুরনো। এই পুজো বাড়ির বৈশিষ্ট্য হল চতুর্থীর দিন থেকে পূজো হয়, কিন্তু কোনও বলি হয় না। পাকা মন্দির প্রতিষ্ঠিত হয়েছে ১৩০২ সালে, আগে খড়ের চালের ঘরে পুজো হত। বংশের বরিষ্ঠ সদস্য অশোক কুমার দাসের মতে কাটোয়া বর্ধমান রোডের পাশে কেশিয়া-বান্দ্রার দিঘিটি তাঁদের দেবীর দেবোত্তর সম্পত্তি।
৬। তাঁতিপাড়া দত্ত বাড়ির পুজো আনুমানিক ২০৪ বছরের পুরনো। পূজা মণ্ডপের পুরনো কড়িকাঠে প্রতিষ্ঠা লিপি খোদাই ছিল ১২৩১ বঙ্গাব্দ। প্রতিষ্ঠাতা নিবাসচন্দ্র দত্ত। তাঁর সপ্তম পুরুষ বর্তমান বরিষ্ঠ সদস্য সুনীল কুমার দত্ত ও মলয় কুমার দত্ত। এই বংশের এককড়ি দত্ত ছিলেন স্বাধীনতা সংগ্রামী। শরিকী পুজো হলেও যৌথ উদ্যোগে পুজো হয়। নবমীর দিন কুমারী পুজো হয়। চাউলপটি এবং নিচু বাজারে কিছু দেবোত্তর সম্পত্তি আছে।
৭। সিদ্ধেশ্বরীতলা মুহুরি বাড়ির পুজো আনুমানিক ৩৫০ বছরের পুরনো। এই বংশের বরিষ্ঠ সদস্যা হিরা মুহুরি। এঁদের পারিবারিক পদবী ছিল ব্যানার্জি। এঁরা দোনা-পাঁজোয়া গ্রাম থেকে এসে কাটোয়ায় বসতি স্থাপন করেন। শরিকরা পালাক্রমে এক এক বছর পূজো করেন। এখানে বলিদান প্রথা চালু আছে। দুর্গাপুজো ছাড়াও এই মণ্ডপে কালীপূজা, কার্তিকপূজা, জগদ্ধাত্রী পূজা হয়। পাশেই এঁদের মাতুল বংশের পাঠক বাড়ির পারিবারিক দুর্গাপুজো ১৯৯২ সালে বন্ধ হয়ে গেছে।
৮। নিচু বাজার চৌধুরী বাড়ির পুজো ১৯০ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন মুচিরাম দত্ত। বর্তমানে তাঁদের দৌহিত্র বংশের বরিষ্ঠ সদস্যা এবং সদস্য হলেন সবিতা চৌধুরী (৯৪) এবং সন্দীপ চৌধুরী (৭৫)। দত্তদের আদি বাড়ি ছিল মাজিগ্রাম। সেখানে এখনও দেবীর নামে চাকরান সম্পত্তি আছে।
৯। শাঁখারীপটি চাটুজ্জে বাড়ির পুজোর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন দীনদয়াল চট্টোপাধ্যায়। এঁদের অনেক শরিক থাকলেও তাঁরা পুজোয় অংশগ্রহণ করেন না। দেবীর নামে কোনও দেবোত্তর সম্পত্তি নেই। এঁদের বংশের বরিষ্ঠ সদস্য হলেন প্রাক্তন বিধায়ক অঞ্জন চট্টোপাধ্যায়। এঁদের পুজো মণ্ডপে জগদ্ধাত্রী পুজোও হয়। পাশেই রয়েছে রাধাগোবিন্দ মন্দির, সে কারণেই পুজোয় বলি প্রথা নেই। সেখানে প্রতিষ্ঠাতা দীনদয়াল চট্টোপাধ্যায়ের মূর্তিও রয়েছে।
১০। নিচুবাজার ঝাউতলা গলির দে বাড়ির পূজা প্রায় ১৯০ বছরের পুরনো। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন গৌরহরি দের পুত্র রঙলাল দে। এঁদের আয়ুর্বেদ ওষুধ ও কাপড়ের ব্যবসা রয়েছে নিচু বাজারে এবং সেখানে কয়েকটি ঘর রয়েছে দেবোত্তর সম্পত্তি হিসেবে। বয়স্ক সদস্য অপূর্ব দে (৬৫) বললেন, সেখান থেকে কিছু ভাড়া আদায় হয়। এঁদের পুজোতেও বলি প্রথা নেই। নবমীতে কুমারী পূজা হয়। একই মণ্ডপে লক্ষ্মী ও কালীপুজোও হয়।
১১। নিচু বাজার দত্ত বাড়ির পুজোর প্রতিষ্ঠাতা ভগবান দত্ত। প্রায় ১৮০ বছর আগে তিনি পুজোর প্রতিষ্ঠা করেন। এঁদের পূর্বপুরুষ নদীয়ার কালিগঞ্জ থেকে কাটোয়ায় এসে ব্যবসা করতেন। দত্তদের শরিকরা পালাক্রমে বছর বছর পুজো করেন। বর্তমান বরিষ্ঠ সদস্যা অঞ্জলি দত্ত দেবীর (৮৬) মতে এঁদের পুজোয় বলিদান হয় না। পুজোর জন্য রাখা দেবোত্তর সম্পত্তি বিক্রি করে এঁরা টাকা ব্যাংকে জমা রেখেছেন। আগে এই বাড়িতে মহোৎসব হত, এখন নিমন্ত্রিতদের খাওয়ানো হয়।
১২। খড়ের বাজার জেলে পাড়ার গলিতে হয় চারহাত দুর্গাপূজা। দাস পরিবারের বংশপরম্পরায় পুজিত এই চতুর্ভুজ দুর্গাপূজা স্থাপিত হয়েছিল ১৮৩৪ খ্রিস্টাব্দে। প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন শশীভূষণ দাস, জ্ঞানচন্দ্র দাস, ভোলানাথ দাস এবং নিত্যগোপাল দাস। বর্তমানে মন্দির নতুন করে স্থাপিত হয়েছে।
১৩। হরগৌরি পাড়ার সাহা বাড়ি পুজো আনুমানিক ৩০০ বছরের পুরনো। বর্তমান বয়স্ক সদস্যা জয়াবতী সাহার (৯০) সাত পুরুষ আগে হরে কৃষ্ণ সাহা এই পুজোর প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পুজোর আগের দিন রাত্রিবেলা কেউ বাড়ির সামনে প্রতিমা রেখে দিয়ে গেছিলেন। সেই থেকে পুজোর সূত্রপাত। এঁদের বংশে তেলের ঘানি এবং ভুসিমালের পারিবারিক ব্যবসা রয়েছে। গঙ্গার ধারে পূর্বাচল সিনেমার পাশে এদের দেবোত্তর সম্পত্তি ছিল। পুজোর সমস্ত বাসনপত্র ছিল চাঁদির তৈরি। বেলজিয়াম কাঁচের বেলহাঁড়ি এবং ঝাড়বাতি ছিল অনেক। আগে এখানে মহোৎসব হত।
১৪। হরগৌরী পাড়ার গাঙ্গুলি বাড়ির পুজো প্রায় আড়াইশো বছর আগে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ঊমেশ কুমার গাঙ্গুলি। তখন বৈষ্ণব মতে পূজা হত, পরে উত্তরসূরীর নৃসিংহ প্রসাদ গাঙ্গুলির সময় থেকে তান্ত্রিক মতে পুজো হয়। কিন্তু বলি প্রথা বন্ধ হয়ে গেছে। এঁদের কোনও শরিক নেই, দেবোত্তর সম্পত্তিও নেই, তবে অনেক যজমান রয়েছেন। এঁদের বলিষ্ঠ সদস্য মানত মুখার্জির মতে মহাষ্টমীতে জোড়া ইলিশের ভোগ হয় এবং সিঁদুরে ঢাকা রেকাবিতে দেবীর পায়ের ছাপ পড়ে। অষ্টমী এবং নবমী তিথিতে পাড়ার সকলকে নিমন্ত্রণ করা হত। গত বছর থেকে বন্ধ হয়ে গেছে।
১৫। হরগৌরী পাড়ায় রয়েছে হরগৌরী দেবীর স্থায়ী মন্দির। সেখানে পাথরের শিবের কোলে অষ্টধাতুর গৌরী দেবী অধিষ্ঠান করছেন। পাশে দাঁড়িয়ে রয়েছে নন্দী এবং ভৃঙ্গী। এই মূর্তি তৈরি করেছিলেন কাটোয়ার প্রস্তরশিল্পী গোকুল ভাস্কর। হরগৌরীর নিত্য পূজা হয়, আগে সেবায়িত ছিলেন কেনারাম বন্দ্যোপাধ্যায়। কয়েক বছর আগে তিনি মারা যাওয়ায় এবং তাঁর কোনও উত্তরসূরী না থাকায়, বর্তমানে নতুন কমিটি তৈরি হয়েছে এবং পুরনো মন্দিরটি ভেঙ্গে নতুন মন্দির তৈরি হয়েছে। মন্দিরের পুরনো গুরুত্বপূর্ণ প্রস্তর ফলকগুলি এখন আর নেই। দুর্গাপূজার চারদিন এখানে ধুমধাম সহকারে দুর্গাপূজাও হয়। এই ১৪৩৩ বঙ্গাব্দের ২২শে বৈশাখ সুদপুর বিজয়নগরের স্বপন ঘোষাল দুটি প্রস্তর মূর্তি এই মন্দিরে দিয়ে গেছেন সেবা পূজা করার জন্য। এই মূর্তি দুটি তাঁদের পারিবারিক দেবী ছিলেন। কিন্তু তাঁরা বর্তমানে কলকাতার বাসিন্দা হয়ে গেছেন। কালো পাথরের মূর্তিদুটির উচ্চতা প্রায় ১০ ইঞ্চি করে। প্রথম মূর্তিটি অষ্টভুজা মহিষাসুরমর্দিনী। দেবী সামনের বাম হাত দিয়ে মহিষাসুরের চুল ধরে আছেন এবং ডান হাত দিয়ে ত্রিশূল বিদ্ধ করছেন। বাকি ছয় হাতে ধরে রয়েছেন খড়্গ চক্র ইত্যাদি আয়ুধ। তবে পিছনের হাত দুটি স্পষ্ট নয়। দেবীর বাহন সিংহ এবং মহিষের মূর্তিও রয়েছে। এই মূর্তিটি চওড়ায় প্রায় ৭ ইঞ্চি। দ্বিতীয় মুর্তিটি মনসা দেবীর। এটিও কালো পাথরের তৈরি এবং চওড়ায় প্রায় সাড়ে পাঁচ ইঞ্চি। দেবীর মাথায় সাতটি সর্পফণাযুক্ত ছাতা। বাম হাতেও ধরে রয়েছেন একটি সর্প এবং ডানদিকেও রয়েছে একটি সর্প। মূর্তি দুটি কালো পাথরের হলেও কষ্টিপাথর কিনা সঠিক বোঝা যায় না।
১৬। গোয়ালপাড়ায় ঘোষেদের তিনটি আলাদা আলাদা পুরনো পুজো বাড়ি রয়েছে। গোয়ালপাড়া ঘোষ বাড়ির প্রথম পুজটির প্রতিষ্ঠাতা রাসবিহারী ঘোষ। ১৩১০ বঙ্গাব্দে এই পূজা প্রতিষ্ঠিত হয়। এই ঘোষেরাই কাটোয়ায় প্রথম রাইসমিল বা চালকল তৈরি করেন। কুলডাঙ্গা ভাটিগাছায় এঁদের প্রায় ১০০ বিঘা দেবোত্তর সম্পত্তি ছিল। এঁরা যৌথভাবে পারিবারিক পুজো করেন। বর্তমান বয়স্ক সদস্য শরদিন্দু ঘোষ (৬৮) বলেন তাঁরা কাটোয়ার আদিবাসী বাসিন্দা। এঁদের পুজোতেও বলি নেই।
১৭। গোয়ালপাড়ায় দ্বিতীয় ঘোষ বাড়ির দুর্গা পূজারটির প্রতিষ্ঠাতা তারণচন্দ্র ঘোষ। প্রতিষ্ঠাকাল ১৩১০ বঙ্গাব্দ। পরিবারের বয়স্ক সদস্য লক্ষণ চন্দ্র ঘোষ (৭০) বললেন, নদীয়ার বার্ণিয়া গ্রামে তাঁদের আদি পূর্বপুরুষের বাস ছিল। তাদের পূর্বপুরুষ কাটোয়ার জমিদার পুটুবাবুদের গোমস্তা ছিলেন। বার্ণিয়া গ্রামে ১৩টি মৌজায় তাঁদের ১৪০০ বিঘা সম্পত্তি ছিল। তার মধ্যে ৬৪ বিঘা ছিল দেবোত্তর। বর্তমানে কুড়ি বিঘা মতো সম্পত্তি আছে। সামান্য আয় হয়, তাতে পূজার খরচ চলে না। শরিকরা যৌথভাবে পুজো করেন। দুর্গাপূজার পর এই মন্দিরে কালীপূজাও হয়।
১৮। গোয়ালপাড়ায় তৃতীয় ঘোষ বাড়ির পূজাটি একেবারে গঙ্গার ঘাটের কাছেই। ১৩১১ বঙ্গাব্দে এই পূজার প্রতিষ্ঠা করেন বঙ্কু বিহারী ঘোষ। তাঁর আগে বাড়ি ছিল জুরানপুরের কাছে জয়রামপুর। আইনজীবী হিসেবে তিনি কাটোয়া কোর্টে কাজ করতেন সেই সূত্রে কাটোয়ায় বসবাস শুরু করেন। গ্রামে এঁদেরও দেবীর নামে দেবোত্তর সম্পত্তি ছিল। এখন যৌথভাবে শরিকরা পূজা চালান। এঁদের দূর্গা মন্দিরে কালী পূজারও প্রচলন আছে। পরিবারের সবচেয়ে বরিষ্ঠ সদস্য অর্ধেন্দু ঘোষের বয়স ৬০ বছর।
বেশিরভাগ মানুষ বারোয়ারি পুজোর জৌলুস দেখেই মুগ্ধ হয়ে যান। তাঁদেরকে অনুরোধ করব এই প্রাচীন পুজো বাড়িগুলো একবার করে ঘুরে আসুন। আমার মনে হয় আপনাদের ও ভালো লাগবে।

prabir babu
প্রবীর আচার্য্য

কাটোয়া নিবাসী এই ইতিহাসবিদ গবেষক ইতিমধ্যেই ১৫ টি গ্রন্থ লিখে ফেলেছেন ৷ বিপ্রকলম পত্রিকার সম্পাদক প্রবীর বাবু একজন অবসর প্রাপ্ত সরকারী আধিকারীক ৷ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে একসময় ঘুরে বেড়িয়েছেন ৷ বর্তমানেও সময় সুযোগমত চারিদিকে ভ্রমণের জন্য চলে যান ৷ অবশ্য আঞ্চলিক ইতিহাসের খোঁজে তিনি এ রাজ্যের বিভিন্ন পুরাকীর্তি কে লিপিবদ্ধ করার আপ্রান চেষ্টা করেন ৷ প্রবীর বাবু ইদানিং কিছু অন্য ধারার সাহিত্যও রচনা করছেন ৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top