ধর্মনিরপেক্ষতা, সহিষ্ণুতা ও ভারতীয় সংস্কৃতি: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দৃষ্টিভঙ্গী
কৌশিক দে
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মননে ও দর্শনে ভারতবর্ষ কেবল একটি ভৌগোলিক সীমারেখা বা রাজনৈতিক রাষ্ট্র ছিল না; তাঁর কাছে ভারতবর্ষ ছিল এক আধ্যাত্মিক ও সাংস্কৃতিক মহামিলনের তীর্থক্ষেত্র। বর্তমান বিশ্বে যখন ধর্মান্ধতা ও অসহিষ্ণুতা সমাজের ভিত্তিকে দুর্বল করে দিচ্ছে, তখন রবীন্দ্রনাথের ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ ও ‘সহিষ্ণুতা’র ধারণা আমাদের জন্য এক আলোকবর্তিকা স্বরূপ। ভারতবর্ষের আত্মপরিচয়ের মূল সুর যদি একটি শব্দে প্রকাশ করতে হয়, তবে সেই শব্দটি হবে “সমন্বয়”। এই সমন্বয়ের মধ্যেই নিহিত রয়েছে ধর্মনিরপেক্ষতা, সহিষ্ণুতা এবং বহুত্ববাদী সংস্কৃতির অনন্ত ঐতিহ্য।
রবীন্দ্রনাথ তাঁর বিখ্যাত প্রবন্ধ “ভারততীর্থ”-এ ভারতবর্ষকে এমন এক মিলনভূমি হিসেবে কল্পনা করেছেন, যেখানে নানা জাতি, নানা ভাষা ও নানা ধর্মের মানুষ এক মানবিক বন্ধনে আবদ্ধ হয়েছে। তিনি লিখেছেন,
“হেথায় আর্য, হেথা অনার্য, হেথায় দ্রাবিড়-চীন,
শক-হূণ-দল পাঠান-মোগল এক দেহে হল লীন।”
উৎস: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, ভারততীর্থ (কাব্যগ্রন্থ: পূরবী)
এই কয়েকটি পঙক্তির মধ্যেই ভারতীয় সংস্কৃতির মৌলিক চরিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এখানে কোনো জাতি বা ধর্ম অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী নয়; বরং সকলেই মিলিত হয়ে গড়ে তুলেছে ভারতবর্ষের সাংস্কৃতিক সত্তা। এই সমন্বয়ই প্রকৃত ধর্মনিরপেক্ষতার ভিত্তি।
রবীন্দ্রনাথের ধর্মনিরপেক্ষতা ও জাতিভেদমুক্ত ভারতের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রকাশ দেখা যায় তাঁর ‘গোরা’ উপন্যাসে। উপন্যাসের নায়ক গোরা প্রথমদিকে ছিল এক কট্টর হিন্দুত্ববাদী এবং রক্ষণশীল মানসিকতার মানুষ। কিন্তু উপন্যাসের শেষে যখন সে জানতে পারে যে সে জন্মসূত্রে হিন্দু নয়, বরং এক আইরিশ খ্রিষ্টান সন্তান, তখন তার সমস্ত অহংকার ও ভ্রান্ত ধারণার অবসান ঘটে। ধর্মান্ধতার খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে গোরা উপলব্ধি করে প্রকৃত ভারতবর্ষের রূপ। গোরার সেই অবিস্মরণীয় উক্তিটি রবীন্দ্রনাথের নিজস্ব দর্শনেরই প্রতিফলন:
“আজ আমি ভারতবর্ষীয়। আমার মধ্যে হিন্দু, মুসলমান, খৃস্টান কোনো সমাজের কোনো বিরোধ নেই। আজ এই ভারতবর্ষের সকলের অন্নই আমার অন্ন, সকলের পানীয়ই আমার পানীয়।” (গোরা উপন্যাস)
তিনি অনুভব করেছিলেন যে, ধর্মান্ধতা মানুষের চিন্তাশক্তিকে পঙ্গু করে দেয় এবং সমাজে হিংসার বীজ বপন করে। তাঁর ‘ধর্মমোহ’ কবিতায় তিনি অত্যন্ত কঠোর ভাষায় এই অন্ধত্বের সমালোচনা করেছেন:
“ধর্মের বেশে মোহ যারে এসে ধরে
অন্ধ সে জন মারে আর শুধু মরে।
নাস্তিক সেও পায় বিধাতার বর,
ধার্মিকতার অহংকার যারে নাই;
রূপহীন ভক্তি করে সে আপন-পর,
ধর্মান্ধের চেয়ে সে যে ভালো তাই।”
অর্থাৎ, তাঁর মতে একজন অহংকারী ও অসহিষ্ণু ধার্মিকের চেয়ে একজন নীতিবান নাস্তিকও অনেক শ্রেয়। ধর্ম যদি মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসাই শেখাতে না পারল, তবে সেই ধর্মের কোনো উপযোগিতা নেই।
সহিষ্ণুতার প্রশ্নে রবীন্দ্রনাথ ছিলেন আপসহীন। তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতা, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং মুক্ত চিন্তার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর বিশ্বখ্যাত কাব্য “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য”-এ তিনি প্রার্থনা করেছেন,
“চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির,
জ্ঞান যেথা মুক্ত…”
উৎস: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, নৈবেদ্য (কবিতা: চিত্ত যেথা ভয়শূন্য)
এই কবিতায় তিনি এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখেছেন, যেখানে সংকীর্ণতার প্রাচীর ভেঙে মানুষ স্বাধীনভাবে চিন্তা করবে। ভয়মুক্ত সমাজই সহিষ্ণুতার ভিত্তি, কারণ ভীত মানুষই সহজে বিদ্বেষে প্ররোচিত হয়।
রবীন্দ্রনাথের শিক্ষাদর্শও ধর্মনিরপেক্ষতার এক অনন্য উদাহরণ। শান্তিনিকেতনে তিনি এমন এক শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ বা দেশের বিভেদ ছিল গৌণ। প্রকৃতির উন্মুক্ত পরিবেশে শিক্ষার্থীরা শিখত পারস্পরিক সম্মান, সহযোগিতা এবং মানবিক মূল্যবোধ। পরবর্তীকালে বিশ্বভারতী প্রতিষ্ঠার মূল মন্ত্রও ছিল,
“যত্র বিশ্বং ভবত্যেকনীড়ম্।”
উৎস: বিশ্বভারতীর মূল মন্ত্র (উপনিষদ থেকে গৃহীত; রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক প্রতিষ্ঠানের আদর্শ হিসেবে গ্রহণ)
পরিশেষে বলা যায়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি নীতি ছিল না, তা ছিল আত্মার গভীর উপলব্ধি।
আজ যখন চতুর্দিকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্প এবং অসহিষ্ণুতার আস্ফালন দেখা যায়, তখন রবীন্দ্রনাথের এই বাণীগুলো আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে—বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্যই ভারতবর্ষের শাশ্বত সত্য। ধর্ম, বর্ণ বা ভাষার ভিন্নতা কোনো বিভেদের কারণ নয়, বরং তা আমাদের সংস্কৃতির এক অমূল্য সম্পদ।
লেখক — কৌশিক দে
ঠিকানা — কৃষ্ণনগর , নদীয়া ৷
শিক্ষকতা পেশা হলেও সাহিত্যচর্চা এবং নাটকের সাথে যুক্ত আছেন বহুদিন ৷ ছোট বড় সব রকম সাহিত্য পত্রিকায় লেখালিখি করেছেন ৷কবিতা ,গদ্য এবং প্রবন্ধ রচনায় তিনি সাবলিল ৷

Cảm ơn bài viết. Với dịch vụ du học Hàn Quốc chuyên nghiệp, Letco giúp bạn tiết kiệm thời gian và chi phí chuẩn bị hồ sơ. Truy cập letco.vn để biết thêm.