আড়াইশো বছরের প্রাচীন কালনার মহিষমর্দিনী পুজো

পুলক মণ্ডল


 

758765011 1515185203182974 4378813212506235355 n

দেবী দুর্গার আর এক নাম মহিষাসুরমর্দিনী। সেটাই কালক্রমে রুপ নিল মহিষমর্দিনী। দেবীর এই ভিন্ন রূপের আরাধনা হয় পশ্চিমবঙ্গের পূর্ববর্ধমান জেলার কালনা শহরে।  কয়েক বছর আগেই আড়াইশো বছর পার করেছে গোটা বাংলার ঐতিহ্যপূর্ণ মহিষমর্দিনী পুজো। হাওড়া-কাটোয়া রেলপথে কালনার দূরত্ব আশি কিমি। ভাগীরথীর পাড়ে ছোট শহর কালনা। কিন্তু স্থাপত্যে ও ঐতিহ্যে রাজ্যের অন্যতম সাংস্কৃতিক পীঠস্থান। একদা বর্ধমান রাজ পরিবারের উদ্যোগে এখানে গড়ে উঠেছিল একের পর এক স্থাপত্য ও পুরাকীর্তি। তৈরি হয়েছিল শহরের শেষ প্রান্তে ভাগীরথীর পাড়ে নয়াগঞ্জ। তখনকার এই নয়াগঞ্জে ছিল ব্যাবসায়ীদের রমরমা। সারাদিন রাত তখন ভাগীরথীর ঘাটগুলিতে ভিড়ত একের পর এক পণ্য বোঝাই নৌকা আর জাহাজ। কালনা তখন দেশের মধ্যে এক নামকরা বাণিজ্যকেন্দ্র। নদীপথে চাল, ডাল, তেল, নুন সহ নানা সামগ্রী তখন কালনা থেকে যেত দেশের নানা প্রান্তে।

759410098 2189303572008665 7010852224752841185 n

জনশ্রুতি প্রায় আড়াইশো বছর আগে ১৭৬৪-৬৮ সাল নাগাদ এই নয়াগঞ্জেই ছিলেন ঈশ্বরী প্রসাদ পালচৌধুরী নামে এক আড়তদার। তিনি এসেছিলেন নদীয়ার রানাঘাট থেকে। সৎ ও মিশুকে মানুষ হিসেবে ব্যাবসায়ীদের মধ্যে তাঁর যথেষ্ট সুনাম ছিল। তিনি নাকি মহিষমর্দিনী দেবীর স্বপ্নাদেশের মাধ্যমে জানতে পারেন ভাগীরথীর ঘাটে ভেসে আসবে একটি কাঠের পাটাতন। ঘুম ভাঙার সাথেসাথে ঈশ্বরী প্রসাদ ছোটেন ঘাটে। দেখেন সত্যি সত্যিই একটি পাটাতন হাজির হয়েছে নদীর ঘাটে। জল থেকে তোলা হয় পাটাতন।

সেকালে শহরে সংস্কৃত চর্চার জন্য ছিল অনেক টোল। খবর পাঠানো হয় টোলের পণ্ডিতদের কাছে। তাঁরা পুজোর সম্বন্ধে নানান নিদান দেন। শুধু ঈশ্বরী প্রসাদই নন, দেবীকে পুজো করতে এগিয়ে আসেন অন্যান্য ব্যাবসায়ীরাও। তাঁরা মিলিত ভাবে ঠিক করেন পুজোর জন্য ব্যাবসার লাভের একটা অংশ জমিয়ে রাখবেন। পুজোর বন্দোবস্ত হলেও ব্যাবসায়ীদের চিন্তার বিষয় হয়ে ওঠে দেবীর মূর্তি কেমন হবে? এইসময় আচমকাই ভবতারন পাল নামে এক যুবক এসে হাজির হন রানাঘাট থেকে নয়াগঞ্জে। তিনি জানালেন, দেবীর স্বপ্নাদেশ পেয়েই তিনি এসেছেন দেবীমূর্তি গড়তে। কয়েক দিনের চেষ্টায় তিনি গড়ে তোলেন দশভুজা মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তি। প্রতিমার চালচিত্রে আঁকা হয় নানান দেবদেবীর মূর্তি। দু’পাশে রাখা হয় চামর ব্যজনরত জয়া ও বিজয়ার মূর্তি।

759642533 28666189202968915 521510270765750278 n

মূর্তি গড়ার পর শুরু হয় দেবীর বাসস্থান নির্মাণ নিয়ে তোড়জোড়। কাছাকাছি এলাকা থেকে হোগলা পাতা নিয়ে এসে তৈরি হয় দেবীর মন্দির। প্রথমে চৈত্র মাসে দেবীর পুজো শুরু হয়েছিল। পরে ব্যাবসায়ীদের হালখাতা, প্রাকৃতিক দুর্যোগ-সহ নানা কারনে পুজোর সময় পরিবর্তন করা হয়। বর্তমানে এই পুজো শ্রাবণী শুক্লা সপ্তমী বা শ্রাবণী পূর্ণিমায় অনুষ্ঠিত হয়।

760379322 1638920967665876 415616487668793299 n

দেবীর হোগলা পাতার মন্দির বেশিদিন স্থায়ী হয়নি। তৈরি হয় পাকা ও স্থায়ী মন্দির। এরপর একে একে মন্দিরকে ঘিরে তৈরি হয় বিশাল আটচালা, যাত্রামঞ্চ, নহবৎখানা, অতিথিশালা, রন্ধনশালা সহ অনেক কিছু। সময়ের সাথে বাড়তে থাকে উৎসবের জৌলুস। ব্যাবসায়ীদের পুজো একসময় সার্বজনীনে পরিনত হয়। এককালে পুজোর সময় হোরমিনার কোম্পানির স্টিমারে করে আসতো বেলোয়ারি ঝাড়। সে আলোর রোশনাইয়ে ঝলমল করত মন্দিরের ভেতর-বাহির। এখন অবশ্য সে রেওয়াজ নেই।

759664126 28666176839636818 5177202911945576763 n

১৯২২ সালে রামবিহারি চাল নামে এক ব্যবসায়ির সহযোগিতায় তৈরি হয় পাকা ও স্থায়ী নহবৎখানা। মন্দিরে প্রবেশের মুখে প্রায় ৩০ ফুট উঁচু নহবৎখানা তৈরি করেন স্থানীয় শিল্পী প্রিয়লাল মিস্ত্রী। সুউচ্চ এই নহবৎখানাটির ওপরের অংশটি দেখতে অনেকটা হাতলহীন পাল্কির মতো। পুজো চারদিনের- সপ্তমী থেকে দশমী। কিন্তু নহবৎখানায় ষষ্ঠীর সকাল থেকেই সানাইয়ের সুর বাজতে থাকে, শুরু হয় উৎসবের আমেজ। মন্দির লাগোয়া ভাগীরথীতে স্নান করে ভক্তরা পুজো দেন, দেবীর কাছে মানত করেন। পুজো উপলক্ষে মন্দির চাতালে জড়ো হন হাজার খানেক দুঃস্থ মানুষ, তাদের জন্য খুলে দেওয়া হয় অতিথিশালার দরজা। নিয়ম অনুযায়ী পুজোর তিনদিন মন্দির চত্বরে বসে অন্নসত্র। সপ্তমীর দিন অন্নসত্রের পর শুরু হয় চাল ও বস্ত্র বিতরন। বিশালাকৃতি আটচালার ভেতর পুজোর উপাচার নিয়ে বসেন পুরোহিত। পুজো হয় তান্ত্রিক মতে। পাশে সাজানো থাকে ভক্তদের দেবীর উদ্দেশ্যে মানত করা নানা মুল্যবান সামগ্রী। প্রতিমাকে সাজানো হয় বহু মুল্যবান সোনার অলঙ্কার দিয়ে। কথিত আছে, বহু আগে পণ্ডিতদের হাতে পুজোর সময় তুলে দেওয়া হতো ধর্মগ্রন্থ, নগদ অর্থ ও পিতলের সামগ্রী। পণ্ডিত বিদায়ের রেওয়াজ ভাঙলেও দেবীর পাশে আজও পিতলের সামগ্রী রাখার রেওয়াজ আছে।
পুজোর চারদিন যে অসংখ্য মানুষ আসেন তাদের মনোরঞ্জনের জন্য রাতে হয় যাত্রাপালা, চলে দ্বাদশী পর্যন্ত।

760671494 2067256678000420 2998164831952202835 n

একসময় হতো ঢপ ও তরজার আসর। সময়ের সঙ্গে তা বন্ধ হয়ে গেলেও পুজোর জৌলুষ আগের তুলনায় বেড়েছে অনেক। উৎসবের একটি পুরনো রেওয়াজ পুতুল নাচ। আগে পুতুল নাচ আসত ঘাটাল থেকে। প্রায় চল্লিশ বছর যাবত তা আসে দক্ষিন ২৪ পরগণার খাগড়াকোনা থেকে। ভাগীরথীর বাঁধানো পাড়ে সুদৃশ্য পার্কে সকাল থেকে রাত অবধি চলে পুতুল নাচের আসর। উৎসব উপলক্ষে মন্দির চত্বরে প্রায় আধ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে বসে মেলা। একমাস ধরে চলে তার প্রস্তুতি। মহকুমা প্রশাসন, পুরসভা ও পুজো কমিটির মধ্যে হয় বৈঠক। মেলা চত্বর মুড়ে ফেলা হয় সিসিটিভি ক্যামেরায়। মেলায় প্রবেশের মুখে থাকে পুলিশ ও নানা স্বেছাসেবী সংস্থার ক্যাম্প। লাগোয়া ভাগীরথীতে পারাপারের জন্য লাইফ সেভিং বোট থেকে নানা সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়া হয়।

762944615 2067256931333728 994649107969023149 n

দশমীতে প্রতিমাকে নিয়ে শহর পরিক্রমার রেওয়াজ এখনও অব্যাহত। প্রতিমা নিরঞ্জনের জন্য আসে বিশেষ ধরনের চাকাওয়ালা লোহার একটি গাড়ি। নিচু এই গাড়িটিতে দেবীকে চাপিয়েই শহর পরিক্রমা হয়। তা শেষ হয় মন্দির লাগোয়া ভাগীরথীর ঘাটে। সেখানেই বিসর্জন।

760555019 2067256728000415 1346257874022978340 n

চেনা শহরটা দিন চারেকের জন্য উৎসবের আলোয় কেমন যেন অচেনা হয়ে ওঠে। মাটির প্রতিমা জাতপাতের ব্যবধান ঘুচিয়ে দেয়।
বাতাসে কাশের দোলার এখনও ঢের দেরী। দেরী আছে শরত মেঘের আনাগোনারও। তবুও ফি বছর এইসময় শ্রাবণের পূর্ণিমা তিথিতে কালনার আকাশ-বাতাস জুড়ে থাকে শারদীয়ার আমেজ। প্রতীক্ষার প্রহর গোনে শহরবাসী থেকে অতিথিরাও।
কাশফুল ফোটার আগেই যেন অকালবোধন শুরু হয়ে যায় কালনায়। ছোট এই শহরটিতে লক্ষাধিক মানুষের সমাগমে যেন শারদোৎসবের আগমনী সুর বেজে ওঠে।

whatsapp image 2026 07 31 at 10.28.12 pm

পুলক মণ্ডল 

ঠিকানা কালনা ৷ পেশায় শিক্ষক পুলক মণ্ডল সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ৷গল্প কবিতা ও প্রবন্ধ সবরকম লেখায় সাবলিল ৷ দেশ , আনন্দবাজার সহ সবরকম লিটল ম্যাগাজিনে লেখালিখি করছেন নিয়মিত ৷ নিজে নাগরিক সমাচার নামক একটি পাক্ষিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন দীর্ঘদিন ধরে ৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top