ভয়, হাতি ও মানুষের অন্তর্লোক
‘হাওয়াভূত আর হাতির গল্প’-এর পাঠ
অয়ন মুখোপাধ্যায়
গত শুক্রবার, ১০ তারিখে গিরিশ মঞ্চের আলো-আঁধারি থেকে বেরিয়ে আসার পরেও আমার মাথার ভেতর অনেকক্ষণ একটা অবশ হাওয়া অদ্ভুতভাবে ঘুরপাক খাচ্ছিল। কারণ গিরিশ মঞ্চে ‘হাওয়াভূত আর হাতির গল্প’ নাটকটি দেখার পর আমাদের নিজেদের সময়েরই এক অলীর রূপকথা যেন নির্মম আয়নার সামনে এসে থমকে দাঁড়িয়েছে। আমি স্বীকার করি, আনন্দপুর ‘গুজব’ প্রযোজিত এই নামটি আমাকে কবিতার মতো এক স্বপ্নময় বিষণ্নতার দিকে নিয়ে যায়। আর নাটকের ভেতরের কাব্যময়তা, বাস্তব ও অবাস্তব, লোককথা ও রাজনৈতিক রূপক, শিশুমন ও প্রাপ্তবয়স্কের নির্মম অভিজ্ঞতাকে এক অদ্ভুত মিশ্রণে শেষ পর্যন্ত মিলেমিশে যায়।
প্রথম দেখার পর অনেকের কাছেই মনে হতে পারে নাটকটি আসলে নিছক কল্পলোকের রূপকথা। কিন্তু কাহিনির স্তরগুলো একে একে উন্মোচিত হতে দেখলে বুঝতে পারবেন, এর শিকড় অনেক গভীরে প্রোথিত—যেখানে নাটকের মূল সুর আজকের সমাজ, এমনকি মানুষের আবহমান সমষ্টিগত অবচেতন কে টান মারে। বাংলা লোক কথায় আমাদের কাছে ভূত শুধুমাত্র অতিপ্রাকৃত কোনো সত্তা নয়; বহু সময়ই তা অদৃশ্য ভয়, সামাজিক নিষেধ এবং ক্ষমতার রূপক। বিশ্ববসু বিশ্বাস সেই দীর্ঘ লোক ঐতিহ্যকে আধুনিক রাজনৈতিক ও মনস্তাত্ত্বিক ভাষায় এক নতুন অর্থ দিয়েছেন। ফলে নাটকটি শিশুদের রূপকথার মধ্যে আর সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং আমাদের সময়ের এক তীক্ষ্ণ আত্মজিজ্ঞাসায় পরিণত হয়েছে।’

কায়াহীন শরীর ও পরিমিতির ব্যাকরণ
বিরতিহীন, নাতিদীর্ঘ এই নাটকের ব্যাপ্তি প্রায় এক ঘণ্টা দশ মিনিট, কিন্তু এখানে কোথাও কোনো দর্শকের মনোযোগে ভাটা পড়ে নেই বা মনোযোগে ভাটা পড়েনি। তার প্রধান কারণ পুরো নাটকের সংলাপ থেকে শুরু করে আলো কিংবা আবহসংগীতের মধ্যে থাকা এক অসাধারণ পরিমিতিবোধ। নেপথ্য সংগীত, আলোর ব্যবহার, মঞ্চ-নির্মাণ কিংবা নৈশব্দ্য—সবকিছুর মধ্যেই রয়েছে এক সচেতন সংযম। কোথাও অযথা আবেগের বিস্ফোরণ নেই, নেই মেলোড্রামার বাড়াবাড়ি কিংবা অতি-নাটকীয়তা। বরং প্রতিটি উপাদান যেন পরস্পরকে সংযত করে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে।
এই প্রযোজনার সবচাইতে বড় শক্তি অভিনেতা বিশ্ববসু বিশ্বাসের শরীরনির্ভর অভিনয়। যিনি একাধারে নাটকটির লেখক ও নির্দেশক, তিনি তাঁর শরীরকেই নাটকের প্রধান ভাষায় রূপান্তরিত করতে পেরেছেন। কখনো একজন পুরুষ, কখনো একজন নারী এবং সবশেষে হাতির ভূমিকায় অনবদ্য একক অভিনয়ে তিনি মুগ্ধ করেন। সীমিত মঞ্চসজ্জা, অল্প উপকরণ এবং নিখুঁত শরীরী অভিব্যক্তির সাহায্যে তিনি একাই নির্মাণ করেন বহুচরিত্রের এক বিস্তৃত জগৎ। আধুনিক নাট্যচর্চায় অভিনেতার শরীর যে কেবল চরিত্রের বাহন নয়, বরং ভাবনা, প্রতিবাদ ও অস্তিত্বেরও ভাষা হয়ে উঠতে পারে, সেই ধারণারই এক শক্তিশালী শিল্পরূপ দেখতে পেলাম তাঁর অভিনয়ের ভেতর।

সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিশ্ববসুর অভিনয় কখনোই স্রেফ দক্ষতার প্রদর্শনী হয়ে ওঠেনি। বরং চরিত্র, কাহিনি এবং নাট্যভাবনার সঙ্গে তিনি এমনভাবে মিশে গেছেন যে, দর্শক অভিনেতাকে নয়, দেখতে শুরু করেন তাঁর নির্মিত জগৎকে। এই সংযমই প্রযোজনাটিকে দীর্ঘদিন মনে রাখার মতো করে তুলেছে।
ক্ষমতার জুজু ও নিষিদ্ধ আনন্দ
এই নাটকের কেন্দ্রে রয়েছে ভয়। কিন্তু এই ভয় কোনো অতিপ্রাকৃত অশুভ শক্তির নয়; মানুষের তৈরি এক সামাজিক ও রাজনৈতিক নির্মাণ। মানুষ জন্মগতভাবেই হাসে, কাঁদে, ভালোবাসে, প্রশ্ন করে। অথচ ক্ষমতা যখন মানুষের এই স্বাভাবিক প্রবৃত্তিগুলোকেই নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, তখন ভয় হয়ে ওঠে তার সবচাইতে কার্যকর অস্ত্র। অনেকেই স্বৈরাচারকে বিশ্লেষণ করতে গিয়ে মনে করেন, মানুষের স্বতঃস্ফূর্ততা ও ব্যক্তিসত্তাকে ভয়ের আবহে আবদ্ধ করাই ক্ষমতার অন্যতম কৌশল। অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে বসে বারবার আমার মনে হয়েছে, যে সমাজ মানুষকে হাসতে ভয় দেখায়, প্রশ্ন করতে ভয় দেখায়, ভালোবাসতে ভয় দেখায়, সে সমাজ আসলে নিজের অস্তিত্বকেই ভয়ের ওপর দাঁড় করিয়ে রাখে।

এই প্রেক্ষিতে ‘হাওয়াভূত’ কেবল একটি কাল্পনিক চরিত্র নয়; সে ক্ষমতার নির্মিত এক অদৃশ্য জুজু। শম্ভু সেই ভয়ের গল্প শুনিয়ে এমন এক মানসিক কাঠামো তৈরি করে রেখেছিল, যেখানে মানুষ ধীরে ধীরে নিজের স্বাধীনতাকেও একদিন সন্দেহ করতে শেখে। স্বৈরাচারের সবচাইতে বড় সাফল্য হলো, সে মানুষের শৃঙ্খলকে বাইরে থেকে নয়, বরং তার ভেতর থেকে তৈরি করে দেয়। ফলে হাওয়াভূতকে আর চোখে দেখা যায় না, কিন্তু তার ভয় সর্বত্র ছড়িয়ে থাকে।
এই ভয়কে অস্বীকার করার সাহস দেখায় মা এবং ঝুম্পা। তাদের প্রতিরোধ কোনো স্লোগানের ভাষায় আসেনি, এসেছে স্বতঃস্ফূর্ত জীবনের কান্নাহাসি আর দোল-দোলানো ফাগুনের পালায়। তারা বেঁচে থাকার অধিকার, ভালোবাসার অধিকার এবং প্রশ্ন করার অধিকারকে রক্ষা করতে চেয়েছে। এই কারণেই এই নাটকের এই দুই নারীচরিত্র নিছক ব্যক্তি হয়ে থাকে না; তারা হয়ে উঠেছে সেই সমস্ত প্রান্তিক মানুষের প্রতিনিধি, যাদের স্বাধীনতা রক্ষণশীলতা, কুসংস্কার এবং ক্ষমতার যাঁতাকলে প্রতিনিয়ত ক্ষতবিক্ষত হচ্ছে।
গণেশ ও আমাদের ভেতরকার হাওয়াভূত
এই জায়গাতেই নাটকটি তার সবচেয়ে গভীর দার্শনিক স্তরে পৌঁছে যায়। প্রশ্ন তোলে, ভয় কি সত্যিই বাইরে থাকে, নাকি মানুষের নিজের মধ্যেই তার বাস? এখানেই এসে উপস্থিত হয় গণেশ। সে কেবল নাটকের একটি চরিত্র নয়; সে যেন প্রকৃতির এক প্রাচীন, ধীর এবং প্রাজ্ঞ উপস্থিতি।

ভারতীয় সাংস্কৃতিক কল্পনায় হাতি শুধু শক্তির প্রতীক নয়; সে স্মৃতি, স্থৈর্য, প্রজ্ঞা এবং সহাবস্থানেরও প্রতীক। তাই নাটকের গণেশ মানুষের নির্মিত কৃত্রিম ভয়ের বিপরীতে দাঁড় করিয়ে দেয় প্রকৃতির সহজ সত্যকে। তার নীরব উপস্থিতিই যেন মানুষের হিংসা, লোভ এবং ক্ষমতার দম্ভকে আরও নগ্ন করে তোলে।
জঁ-পল সার্ত্র লিখেছিলেন, মানুষ স্বাধীন হতে বাধ্য; কারণ পৃথিবীতে নিক্ষিপ্ত হওয়ার পর তার প্রতিটি নির্বাচনের দায় শেষ পর্যন্ত তাকেই বহন করতে হয়। ‘হাওয়াভূত আর হাতির গল্প’ এই দর্শনকে সরাসরি উচ্চারণ না করেও তার নাট্যরূপ নির্মাণ করে। নাটকটি যেন আমাদের সামনে আয়না ধরে প্রশ্ন করে—আমরা কি সত্যিই হাওয়াভূতকে ভয় পাই, নাকি নিজেদের মধ্যেই তাকে লালন করি?
শেষ পর্যন্ত বোঝা যায়, হাওয়াভূত কোনো অলৌকিক সত্তা নয়। সে মানুষের মনের গভীরে জমে থাকা অজ্ঞতা, কুসংস্কার, ক্ষমতালিপ্সা এবং পরস্পরের প্রতি অবিশ্বাসেরই আরেক নাম। আর গণেশ সেই বিস্মৃত বিবেক, যে নীরবে মনে করিয়ে দেয়, ভয় নয়, সহমর্মিতাই মানুষের সবচেয়ে বড় শক্তি।
শূন্য আসন ও বিপণনের থিয়েটার
নির্দিষ্ট সময়ে নাটক শেষ হয়, কিন্তু একটি মনখারাপ থেকেই যায়। প্রেক্ষাগৃহের শূন্য আসনগুলো বারবার চোখে পড়ছিল। এই মানের একটি প্রযোজনা তার শিল্পগুণের তুলনায় অনেক কম দর্শক পেয়েছে, যা নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। দিনটি শুক্রবার ছিল, বৃষ্টি হয়েছিল, প্রচারেরও হয়তো ঘাটতি থাকতে পারে। কিন্তু কারণ যাই হোক, এই দৃশ্য আমাকে বাংলা থিয়েটারের বৃহত্তর সংকটের কথাই মনে করাচ্ছে।

আজকাল দেখতে পাই নাটকের শিল্পমূল্যের চেয়ে অনেক সময় প্রচারের ভাষাই বেশি শক্তিশালী হয়ে উঠছে। ফলে সামাজিক মাধ্যমের দৃশ্যমানতা, বিপণনের কৌশল কিংবা জনসংযোগের দক্ষতা অনেক ক্ষেত্রেই প্রযোজনার প্রকৃত শিল্পগুণকে ছাপিয়ে যাচ্ছে। ফলে আলোচনায় থাকে পোস্টার, প্রচারাভিযান কিংবা মুখচেনা নাম; নাটকটি নিজে নয়। এই বাস্তবতার মধ্যেই ‘হাওয়াভূত আর হাতির গল্প’-এর মতো সংযমী, মননশীল এবং শিল্পসচেতন প্রযোজনাগুলিকে নিজেদের জায়গা তৈরি করতে হবে আরও কঠিন লড়াইয়ের মাধ্যমে।
অথচ বাংলা থিয়েটারের ইতিহাস বারবার প্রমাণ করেছে, সত্যিকারের শিল্প শেষ পর্যন্ত বিজ্ঞাপনের নয়, দর্শকের স্মৃতির ওপর ভর করেই দীর্ঘজীবী হয়। তাই এই প্রযোজনার সবচেয়ে বড় প্রচার হতে পারে সেই দর্শকের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়া অভিজ্ঞতা, যা নাটকটি দেখে তাঁকে সত্যিই আলোড়িত করেছে। আমাদের মনে রাখতে হবে, সামাজিক মাধ্যমের ক্ষণস্থায়ী আলো নয়, দর্শকের দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিই একটি ভালো নাটকের প্রকৃত আশ্রয়।
শেষ দৃশ্য: এক দার্শনিক উত্তরণ
পরিশেষে বলব, এই নাটক অর্থাৎ ‘হাওয়াভূত আর হাতির গল্প’ শেষ পর্যন্ত কেবল স্বৈরাচার, কুসংস্কার কিংবা সমাজ-বাস্তবতার নাটক হয়ে থাকে না। ফলে এর অন্তর্গত সুর ধীরে ধীরে মানুষের অস্তিত্ব, ভয় এবং ভালোবাসার আরও গভীর প্রশ্নের দিকে আমাদের এগিয়ে নিয়ে যায়।

কোনো কোনো দার্শনিক বলেন, “কাউকে ভালোবাসা মানে তাকে বলা, তুমি অন্তত মরবে না।” এই উচ্চারণের ভেতর কোনো শারীরিক অমরত্বের কথা নেই; আছে মানুষের অস্তিত্বকে অন্য মানুষের ভালোবাসার মধ্য দিয়ে অর্থপূর্ণ করে তোলার বিশ্বাস। নাটকটির শেষ দৃশ্য যেন সেই বিশ্বাসকেই নতুন ভাষা দেয়।
ঘৃণার সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, যে ঘৃণা করে এবং যাকে ঘৃণা করা হয়, দুজনেই সেই একই ঘৃণার সাম্রাজ্যে বন্দি হয়ে পড়ে। অন্যদিকে ভালোবাসার পরিসরে যে ভালোবাসে এবং যে ভালোবাসা পায়, তারা উভয়েই এক ধরনের মুক্তির অংশীদার হয়ে ওঠে। নাটকটি এই সহজ অথচ গভীর সত্যকে কোনো নীতিকথার মধ্য দিয়ে নয়, বরং দর্শককে তার পরম নাট্য-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে উপলব্ধি করায়।
রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, “চিত্ত যেথা ভয়শূন্য, উচ্চ যেথা শির।” সেই ভয়মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই যেন এই প্রযোজনার অন্তর্লীন সুর। শেষ পর্যন্ত জানা যায়, হাওয়াভূত আসলে কোথাও নেই; বরং সে আছে মানুষের মনের অন্ধকারে। আর সেই অন্ধকার ভাঙার শক্তি ক্ষমতার দম্ভ থেকে আসে না, আসে সহমর্মিতা, বিশ্বাস এবং ভালোবাসার মধ্য দিয়ে।

এই কারণেই ‘হাওয়াভূত আর হাতির গল্প’ কেবল একটি সফল নাট্যপ্রযোজনা নয়; এটি আমাদের সময়কে বোঝার এক সংবেদনশীল শিল্পভাষা। প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে আসার পরও যার হাওয়া দীর্ঘক্ষণ দর্শকের ভেতরে বয়ে চলে এবং নীরবে মনে করিয়ে দেয়, মানুষের সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ কোনো হাওয়াভূত নয়, তার নিজের নির্মিত ভয়। আবার সেই মানুষই, ভালোবাসার মধ্য দিয়ে, সেই ভয়কে অতিক্রম করতে পারে। সবশেষে এই নাটক সেই সম্ভাবনাকেই উসকে দিয়ে আমাদের নিয়ে যায় চিরন্তন আশাবাদের দিকে; তখনই এই নাটক হয়ে ওঠে চিরকালের এক অনন্য আখ্যান।
অয়ন মুখোপাধ্যায়
লেখক পরিচিতি – কবি ও লেখক অয়ন মুখোপাধ্যায়। ঠিকানা – বলাগড়, হুগলী। যে সমম্ত পত্রিকাতে লিখে চলেছেন — পরম্পরা ,বাংলা স্ট্রিট অনলাইন , গুরুচণ্ডালী , বাংলা স্পিয়ার ,কেতাব ,ভারতের কণ্ঠ বাঙালা নেটওয়ার্ক ,আবর্ত , আপনপাঠ , বিকল্প ,গণশক্তি ,জলদর্চি ৷
