কালনার রথের ইতিহাস
অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
আজকে উল্টো রথ সাড়ম্বরে পালিত হচ্ছে। কালনার জন্য এটি একটি শুভ দিন, কারণ এ বছর এই রথযাত্রা সরকারি সাহায্য পেয়েছে। রথের দিন কালনাবাসী খুব আনন্দ করেছে ৷ আসুন একবার দেখে নিই কবে থেকে কালনাতে রথযাত্রার সূচনা হয়েছিল।কালনা ছিল বর্ধমান রাজ পরিবারের কাছে বারানসী সমতূল্য পবিত্র স্থান ৷ পূর্ববর্ধমান জেলার ইতিহাস প্রসিদ্ধ স্থান কালনা ৷
কালনার প্রথম রথযাত্রা জগন্নাথ বাড়ি থেকে। কালনার পশ্চিম প্রান্তে ভাগীরথীর ধারে এই জগন্নাথ বাড়ি বা মন্দির অবস্থিত। ১৭৩০ খ্রিস্টাব্দে রাজমাতা ব্রজকিশোরী দেবী দ্বিতীয়বার যখন পুরীধামে জগন্নাথ দর্শন করতে গমন করেছিলেন, সে সময় তার নিজের মনের মধ্যে কালনাতে গঙ্গার তীরে একটি জগন্নাথ দেবের মন্দির প্রতিষ্ঠার ইচ্ছা তৈরি হয়। তার এই ইচ্ছাকে মর্যাদা দিতে রাজা কীর্তিচন্দ্র আনুমানিক ১৭৩২—৩৩ খ্রিস্টাব্দে অম্বিকা কালনার গঙ্গার খাত থেকে উচ্চ স্থানে জগন্নাথ দেবের দালান কোঠা মন্দির নির্মাণ করিয়েছিলেন। পরের বছরেই দুটি বিশাল রথও নির্মাণ করা হয়েছিল। গঙ্গার ধারে বিশাল এই দুটি রথের অবস্থান দেখে গঙ্গাবক্ষে ভ্রমণরত রেভারেন্ড জেমস লং লিখেছিলেন যে,ভাগীরথীর তীরে তিনি যে দুটি বিশাল, বিশাল রথ দেখেছিলেন, তা এত বড় ছিল যে, এর নিচে ডাকাতেরা মানুষ খুন করে লুকিয়ে থাকতে পারে। জগন্নাথ দেবের মন্দির প্রতিষ্ঠার আগে জানা যায়, ওই স্থানে একটি ছোট আকারের জগন্নাথ মন্দির ছিল। শোনা যায়, রাজা কীর্তিচাঁদ হুগলি জেলায় অবস্থিত ভান্ডারহাটির জমিদারি লুট করে ধনসম্পদের সঙ্গে জমিদারের গৃহদেবতা জগন্নাথ দেবের মূর্তিটি কালনায় নিয়ে এসে গঙ্গার এই স্থানে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। লুট করে আনা জগন্নাথ দেবের মূর্তিটিকে সেই সময়ে “লুঠের জগন্নাথ” বলা হতো। রাজা তেজচন্দ্র বাহাদুরের উদ্যোগে যে একটি ছোট রথ তৈরি হয়েছিল, সেই রথে রাধাকৃষ্ণের সাথে জগন্নাথ, বলরাম এবং সুভদ্রা এনাদেরকেও আরোহণ করিয়ে প্রদক্ষিণ করানো হতো। তা প্রায় উনিশশো সাল পর্যন্ত অস্তিত্ব যুক্ত ছিল। তা যখন বড় দুটো রথ এসে গেল, তখন ছোট রথের জনপ্রিয়তা কমে গেল। এই বড় বড় রথ দুটি বদর সাহেবের ঘাট থেকে জগন্নাথ বাড়ি পর্যন্ত পুরাতন কালনা বর্ধমানের যে রাস্তা, সেই রাস্তা ধরে যাত্রা করত। অর্থাৎ, সেই রাস্তা ধরে রথযাত্রা হত। সেই সড়ক আর বর্তমানে নেই। ভাগীরথী নদীর গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। তো, ওই সময়ে রথ টানার জন্য বর্ধমান থেকে এই পথ ধরে রাজার হাতি আসত। কালনাতে তখন রথযাত্রাকে কেন্দ্র করে বিশাল উন্মাদনা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ত। প্রথমে রাজবাড়ির রথের টান সম্পূর্ণ করে, হাতি জগন্নাথ দেবের রথ টানার জন্য চলে আসত। জগন্নাথ দেবের এই রথ ছিল পাঁচ তলা বিশিষ্ট। বিশাল তাদের চেহারা দেখলে সম্ভ্রম জাগতো। একটি রথে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা এবং অপরটিতে রঘুনাথ ও অন্যান্য দেবতারা আরোহণ করতেন। আনুমানিক ১৯৩৯—৪০ সালে, রথ দুটিকে সমাজ বাড়ির সামনে, দিঘির পাড়ের রাস্তায় নিয়ে আসা হয়েছিল। জগন্নাথ বাড়ি থেকে দেবতাদের এখানে নিয়ে এসে রথে চড়ানো হতো। হাবু সাহার বাড়ির সামনে থেকে জাকেরিয়া বিল্ডিং পর্যন্ত রথ দুটি তখন টানা হতো। উনিশশো ছেচল্লিশ সালে বাংলাদেশে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। প্রথম দাঙ্গা জামালপুর অঞ্চল পূর্বস্থলী থানা থেকে আরম্ভ হয়ে নোয়াখালী, পূর্ব বাংলা পর্যন্ত বিস্তার লাভ করেছিল। সম্ভবত নভেম্বর কিংবা ডিসেম্বর মাস নাগাদ, জনৈক দুষ্কৃতী সন্ধ্যা রাতে কালনার এই দুটি রথের ছাউনিতে আগুন ধরিয়ে দিয়েছিল। পাশের দিঘি থাকা সত্ত্বেও একটি রথ প্রায় সম্পূর্ণ পুড়ে যায়। অপরটি অর্ধদগ্ধ হয়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে জগন্নাথ দেবের রথযাত্রা বন্ধ হয়ে যায়।
কালনায় দ্বিতীয় বৃহত্তম রথযাত্রা ছিল রাজবাড়ীর লালজির রথযাত্রা উৎসব। রাজবাড়িতে তিনটি রথ ছিল এবং তাদের পৃথক পৃথক নামও ছিল। লালজী যেটায় চাপতেন, সেই রথটির নাম ছিল গরুধধ্বজ। উচ্চতায় বাইশ হাত। কৃষ্ণচন্দ্র যেটাই চাপতেন, সেটির নাম ছিল **লাঙ্গলধ্বজ**; উচ্চতা একুশ হাত। এবং গোপালজী যেটাই চাপতেন, সেটির নাম ছিল **পদ্মধ্বজ**; উচ্চতা কুড়ি হাত। এই রথ তিনটি নির্মিত হয়েছিল রানী বিষ্ণুকুমারী দেবীর উদ্যোগে। এই তিনটি রথ টেনে নিয়ে যেতে বর্ধমান রাজাদের হাতি আসতো কালনায় । মহারাজার বন্দুকধারী সিপাহীরা পোশাক পরিহিত অবস্থায় সারিবদ্ধভাবে রথকে রাজকীয় কায়দায় পাহারা দিয়ে নিয়ে যেত। এখানে রথ টান শেষ হলে, এই হাতিগুলি চলে যেত জগন্নাথ বাড়ির রথ টানতে। উনিশশো পঞ্চাশ সাল থেকে বর্ধমানের থেকে হাতি আসা বন্ধ হয়ে গেছিল। লালজি বাড়ির অভ্যন্তরে যে রথগুলি থাকতো, সেগুলি মেরামতের অভাবে ক্রমে ক্রমে স্থবির হয়ে পড়লো। সেগুলি মেরামতির জন্য কোনো উদ্যোগ সে সময় নেওয়া হয়নি। কালক্রমে রথগুলি মাটিতে বসে যায়। সেই অবস্থাতেও কয়েক বছর লালজি, কৃষ্ণচন্দ্র এবং গোপালজিউদের রথে বসিয়ে নিয়ম রক্ষা করে রথযাত্রা উৎসব পালিত হয়েছিল। তারপর উনিশশো সত্তর একাত্তর সালে রাজবাড়িতে অবস্থানরত বন্যাপীড়িত মানুষেরা ভগ্নরথের উই ধরা কাঠ রান্নার কাজে ব্যবহার করে।এইভাবে একটা গৌরবময় ঐতিহ্যপূর্ণ ইতিহাসের পরিসমাপ্তি ঘটেছিল।

দীর্ঘ সময় পর, দুই হাজার আট সালে, রাজবাড়ি সংলগ্ন এলাকার অধিবাসীরা পুনরায় রথ কমিটি তৈরি করে রথযাত্রার পুনঃপ্রতিষ্ঠার জন্য উদ্যোগী হন। বর্তমানে কালনার রথটি জনসাধারণের সংগৃহীত টাকাতেই তৈরি। এই লোহার রথটির উচ্চতা পনেরো ফুট।
অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
ভাষাপথের সম্পাদক এবং সব রকম লেখার সাথে যুক্ত ৷ বর্তমানের ভাষাপথ বিষয় ভিত্তিক সংখ্যা করছে ৷ বাসভূমি কালনা ৷ পেশা শিক্ষকতা ৷

তথ্য সমৃদ্ধ লেখা।