ইতিহাস, পুরাণ এবং ধর্মতত্ত্বের প্রেক্ষাপটে জগন্নাথদেব রথ এবং রথযাত্রা
সিদ্ধেশ্বর আচার্য্য
রথ একটি প্রাচীন যান। বৈদিক এবং রামায়ণ মহাভারতের যুগে এই যানটির উল্লেখ রয়েছে। প্রাচীন গ্রীস, রোম সাম্রাজ্যে এই যানটি যুদ্ধ বিগ্রহ এবং মনুষ্য স্থানান্তরের কাজে ব্যবহার করা হত। প্রাচীন মিশরেও এই যানটির ব্যবহার দেখা যায়। প্রায় সব দেশের প্রাচীন ধর্মগ্রন্থে এবং মহাকাব্যে রথ নামক যানটির নির্মাণের কৃৎ কৌশল ও গঠনের বর্ণনা দেওয়া আছে। বেনহুর চলচ্চিত্রে রথের (Chariot) প্রতিযোগিতার দৃশ্যে প্রাচীন কালে রোমান সাম্রাজ্যের রথের অবয়ব সম্বন্ধে একটা স্পষ্ট ধারণা করা যায়। আমাদের দেশে রামায়ণ মহাভারতের কাহিনী গ্রন্থে যোদ্ধাদের রথ আকাশ পথে পুষ্পক রথ আখ্যায়িত হয়ে শূণ্য মার্গে পরিভ্রমণ করতো। সাত ঘোড়ায় টানা রথে সূর্যদেব প্রতিদিন বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ড পরিভ্রমণ করে চলেছেন। আমাদের ধর্মীয় গ্রন্থে এই সব রথের যে বর্ণনা দেওয়া থাকে তার সঙ্গে বর্তমান জগন্নাথ দেবের রথ এবং ভারতের বিভিন্ন প্রদেশে দেবদেবীকে বিভিন্ন সময়ে যে রথে চাপানো হয় তার আকৃতি এবং গঠন এক নয়।

প্রাচীনকালে ভারতে বা ইউরোপে রথের চেহারার বর্ণনা সাধারণত দেখা যায় একটি দু চাকার যান, মাথার উপরে একটি ছত্র থাকে, (ইউরোপে ছত্র প্রায় থাকে না) পিছনের দিক আচ্ছাদন থাকে এবং তিনদিক উন্মুক্ত। এক বা দুজন আরোহী এবং একজন চালকের স্থান সংকুলান হয়। আদিম সভ্যতায় চাকা আবিষ্কারের পরই মানুষ গতিকে আয়ত্ব করতে সক্ষম হয়েছিল। চাকা ব্যবহারের বিবর্তনের ফল স্বরুপ দুই এবং দুয়ের অধিক চাকা যুক্ত করে নানা ধরণের যান নির্মাণ হয়েছে। এই রথ (Chariot) হল আদিম যানের রূপান্তরিত শকট। মনে হয় সর্বপ্রথম এই আদিম যানটির সঙ্গে দুই এবং ততোধিক চাকা যুক্ত করে যানটি পাটাতনের উপর মন্দির (দারু নির্মিত) স্থাপনা করে রথ (Chariot) যানটির নব রূপায়ন এই ভারতবর্ষেই আবিষ্কার (Discover) হয়েছিল। ভারতীয় এই রথকে অনেক ঐতিহাসিক Temple Car হিসাবে নামকরণ করেছেন। ভারতে দেবতারা যে রথে আরোহন করেন সেটি মন্দিরযান। শব্দকল্পদ্রুম থেকে জানা যায় সূর্যদেব যে রথটি ব্যবহার করেন সেটি হল পৃথিবীর সর্বপ্রাচীন রথ (কোনারকের সূর্য মন্দির রথ দ্রষ্টব্য)। ভবিষ্য পুরাণ মতে ভাদ্রমাসের শুক্ল পঞ্চমী তিথিতে সূর্যদেবের রথযাত্রার বিধি পালনের নির্দেশ রয়েছে। ঐ পুরাণেই উল্লেখ আছে ভক্ত প্রহ্লাদ বিষ্ণুর রথ প্রথম টেনেছিলেন, পরে গন্ধর্বরা টেনেছিলেন। বামদেবেশ্বর তন্ত্রে দেবী ভগবতীর প্রতি মাসেই রথ যাত্রার কথা বলা আছে। এই জাতীয় ষোল প্রকার রথযাত্রার উল্লেখ এই পুরাণ গ্রন্থে রয়েছে। এই সব ধর্মগ্রন্থে বলা আছে মানুষ রথযাত্রায় অংশ গ্রহণ করলে সংসার চক্র থেকে চিরকালের জন্য মুক্তি প্রাপ্ত হয়। “রথস্থং বামনং দৃষ্টবা/পুনঃ জন্ম ন বিদ্যতে।” যাত্রাতত্ত্ব গ্রন্থে বিষ্ণুর বারো রকম রথ যাত্রার উল্লেখ আছে। হরিভক্তি বিলাস গ্রন্থে কার্ত্তিক মাসে বিষ্ণুর রথ উৎসবের বর্ণনা দেওয়া আছে। শিবের রথযাত্রার কথা গদাধর পদ্ধতিতে রয়েছে। তাঁর রথের বিশেষত্ব হল রথটির রং সাদা এবং চার তোরণের চারটি স্বর্ণকলস ও স্বর্ণদীপ দ্বারা সজ্জিত থাকে।

প্রতিবেশী হিন্দু রাজ্য (বর্তমানে প্রজাতন্ত্র) নেপালে দেবী যাত্রা, কুমারী যাত্রা, ভৈরব যাত্রা, মৎসেন্দ্রনাথ যাত্রা এই রকম বিভিন্ন প্রকার রথযাত্রা বিভিন্ন সময়ে অনুষ্ঠিত হয়। হিন্দু ধর্ম ছাড়া বৌদ্ধ ধর্মেও রথযাত্রার উল্লেখ আছে। বুদ্ধদেবের মূর্তি রথে বসিয়ে হর্ষবর্দ্ধনের রাজত্বকালে (৬০৬-৬৪৭ খ্রীঃ) রথযাত্রা অনুষ্ঠিত হয়েছিল। বৈশাখী পূর্ণিমায় রথযাত্রার কথা ভারত ভ্রমণকারী ফা হিয়েনের বিবরণে পাওয়া যায়। অনেক ঐতিহাসিক মনে করেন জগন্নাথ দেবের অন্যস্থানে (মাসির বাড়ি) কিছু দিনের অবস্থান বৌদ্ধ ধর্মের আচরণের অঙ্গীভূত অনুষ্ঠান। কিছু ঐতিহাসিকের মতে বৌদ্ধ ত্রিরত্নের মধ্যে সংঘ নারী রূপে বুদ্ধদেব এবং ধর্মের মধ্যস্থলে অবস্থান করায় জগন্নাথদেবের মূর্ত্তি ত্রিরত্নের রূপান্তরিত এক দেবতা। তিব্বতে লামারা ছোট তুলসী মঞ্চের মতন কালো, হলুদ এবং সাদা রং-এর স্তুপ ত্রিরত্ন বা পরমেশ্বরা (পরমেশ্বর) বুদ্ধ, ধর্ম এবং সংঘের প্রতীক হিসাবে পূজা করেন। এই স্তুপগুলির প্রত্যেকটিতে চোখ এবং ঠোট এঁকেছিলেন ওনারা জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা কল্পনায়। অনেক ঐতিহাসিক জগন্নাথ দেবকে বুদ্ধের অবতার বলে মনে করেন (কাশ্মীর ও তিব্বতে স্বামী অভেদানন্দ) অর্থাৎ জগন্নাথ বিগ্রহ বুদ্ধদেবেরই রূপান্তর। Chember’s Encyclopedia (Vol-II) বলা হয়েছে ‘There is much in rites at Puri to countenance the idea that though professedly Hindu if is realy a Bud-dhist shrine.’। শ্রীকৃষ্ণ বুদ্ধরূপে জগন্নাথ নামে প্রতিষ্ঠিত এই তত্ব দারুব্রহ্ম এবং শূন্য সংহিতায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উড়িষ্যায় এক সময় বৌদ্ধ প্রভাব প্রবল ছিল (সম্রাট অশোকের সিংহাসন লাভ ২৭৩ খ্রীঃ পূর্বাব্দে) এবং ২৬০ খ্রীঃ পূর্বাব্দে কলিঙ্গ জয়)। বৌদ্ধ তান্ত্রিক দেবতা তারা, হেরুক, অপরাজিতা প্রভৃতি হিন্দুদেরও পূজ্য দেবতা। ড. মায়া ধর মনে করেন রামানুজ বুদ্ধ এবং বিষ্ণুকে একত্রিত করেছেন। এটা ঐতিহাসিক ভাবে স্বীকৃত হিন্দু তন্ত্রশাস্ত্রের বহুমত যেমন বৌদ্ধধর্মে অনুপ্রবেশ করেছে তেমনি বৌদ্ধ ধর্মের বহু ধারণা হিন্দু ধর্মও ধারণ করেছে। বৌদ্ধ পূর্ব্ববর্তী ধর্ম জৈন ধর্মের মধ্যে রথযাত্রার প্রচলন ছিল। পুরাণ মতে জরা নামে এক ব্যাধের বাণে শ্রীকৃষ্ণর মৃত্যু হলে তিনি দেহটি সমুদ্রতীরে ফেলে রেখে পঞ্চভূতে বিলিন হয়ে স্বর্গে চলে যান। পৃথিবীর নিয়মানুসারে তার দেহটি ধ্বংস হলেও তাঁর হৃৎপিণ্ডটি একটি কাষ্ঠ খন্ডে রূপান্তরিত হয়ে সমুদ্রতীরে পরে থাকার পর স্কন্ধ পুরাণের উৎকল এবং পুরুষোত্তম খন্ডে বর্ণিত মতানুসারে শবরপতি বিশ্বাবসু স্বপ্নাদেশ প্রাপ্ত হয়ে ঐ কাষ্ঠ খন্ডটি নীলগিরি পর্ব্বতের এক গুহায় স্থাপনা করে দীর্ঘদিন নীল মাধব জ্ঞানে পূজা করেছিলেন। বিশ্বাবসু জাতিতে অনার্য ছিলেন। তাঁর তিরোধানের পর নীলমাধবও গুহা থেকে অন্তর্হিত হন। পরে পুরীধামে জগন্নাথ মূর্ত্তিরূপে আবির্ভূত হয়েছিলেন (Evolution of Sakti Cult & Tara)।

এই সূত্রানুসারে জগন্নাথদেব হলেন মূলত অনার্য দেবতা তাই জগন্নাথদেবের ভোগের উপাচারে এবং শ্রীক্ষেত্রে আচার বিচারে কিছু অনার্য রীতিনীতি বিদ্যমান রয়েছে। পুরীতে স্পর্শদোষ নেই এবং মধ্যযুগীয় হিন্দু সংস্কার এঁটো এবং একাদশীর নিয়মকানুন এখানে অচল। যদিও মন্দিরে অহিন্দুর প্রবেশাধিকার কঠোরভাবে নিষিদ্ধ, কিন্তু রথযাত্রা উপলক্ষ্যে পুরীধামে উচ্চনীচ সর্ব্ব ধর্মের সকল মানুষ রথের কাছি স্পর্শ করতে পারেন। হিন্দু দর্শনে মনুষ্য দেহকে রথের সঙ্গে তুলনা করেছে। কথোপনিষদে বলা হয়েছে..
“আত্মানং রথিনং বিদ্ধি শরীরং রথমেবতু।
বুদ্ধিং তু সারথিং বিদ্ধি মনঃ প্রগ্রহমেব চ।।”
আত্মাকে রথস্বামী এবং নিজ দেহকে রথ বলে উপলব্ধি করতে হবে। দেহরূপ রথে অবস্থান করছেন আত্মা যিনি পরমাত্মার অংশ দেবতা স্বরূপ। সৎবুদ্ধি দ্বারা মনকে সঠিক পথে পরিচালনা করলে মনুষ্যশরীর রূপ রথে অবস্থান আত্মা সঠিক পথ গমন করে পরমাত্মার সঙ্গে মিলিত হতে পারে। আবার শাস্ত্রে একথাও বলা হয়েছে…
“ইন্দ্রযানি হয়ানাপুর্বিষয়াং স্তেষু গোচরান।
আত্মেন্দ্রিয় মনোযুক্তং ভোক্তেত্যাহুর্মনী যিনঃ।।”
বিবেকবান ব্যক্তিরা শরীরের ইন্দ্রিয় সমূহকে দেহ রথের অশ্বরূপ কল্পনা করেন আর আমাদের চারিদিকে ভোগ্য বিষয়বস্তু হল সেই পথ যার মধ্য দিয়ে আমাদের দেহ রথ গমন করে। শরীর ইন্দ্রিয় এবং মন, এই ত্রয়ীর সমন্বয়ে আত্মা সুখ ও দুঃখ অনুভব করে থাকে। মন সংযত না হলে দেহের ইন্দ্রিয় সকল সংযত হয় না। সকল ধর্মের নির্দেশিকায় বলা রয়েছে নিজেকে সংযত কর। এবং সংযমী হও। রথযাত্রা নিছক অন্ধভাবে ধর্ম পালন নয়, গভীর তত্বজ্ঞানের বিষয়। আরো একটু গভীরে প্রবেশ করলে দেখা যাবে জগন্নাথ সপরিবারে নিজ মন্দিরালয় থেকে বাহির হয়ে মাসির বাড়ীর উদ্দেশ্যে (পুরীধামে গুন্ডিচা বাড়ি) গমন এবং সেখানে ৭দিন অবস্থান করে অষ্টমদিনে নিজ আলয়ে প্রত্যাবর্তন, পৃথিবীতে কোন দেবতার এই ধরণের ভ্রমণের নজির নেই যেখানে পুজিত দেবতারা নিজ আলয় (মন্দির) থেকে বাৎসরিক ভ্রমণে বাহির হন।

এই পৌরাণিক ঘটনার পশ্চাতে রয়েছে একটা ভাবনার গভীরতা তা হল সীমার গন্ডী ছাড়িয়ে অনন্তের মধ্যে ভগবানের অসীম বিচরণ। এটি হল দেবতাদের অসীমে প্রতীকী যাত্রা পৌরাণিক চিন্তার আধারে। তাই রথযাত্রার মধ্যে একটা গভীর তাৎপর্য রয়েছে এবং সেই অনুভূতিকে স্পর্শ করার জন্য লক্ষ লক্ষ মানুষ শ্রীক্ষেত্রসহ পৃথিবীর সর্বত্র রথযাত্রায় অংশগ্রহণ করেন। দেবতা গতিহীন থেকে গতিময় অবস্থায় উপনীত হয়ে গতিশীল হন। হিন্দুভক্তদের বিশ্বাস ভগবান শ্রীবিষ্ণুর (শ্রীকৃষ্ণের) দেহধারী হলেন শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব। ঋগ্বেদে মিত্র দেবতা হলেন সূর্য এবং এই বৈদিক মিত্র দেবতা পৌরাণিক যুগে বিষ্ণু নামে খ্যাত হলেন এবং এই বিষ্ণুই বিশ্ব চরাচরের নাথ জগন্নাথদেব। মিত্রদেবের তিনরূপ যথা বলরাম, জগন্নাথ এবং সুভদ্রা। বলরাম (বলভদ্র) শ্রীকৃষ্ণের অগ্রজ এবং অভয়মুদ্রাধারিণী বিষ্ণুজায়া হলেন শ্রীলক্ষ্মীরূপে সুভদ্রা। বিষ্ণু হলেন এই জগৎ ব্রহ্মান্ডের সৃষ্টি কর্তা এবং সংরক্ষক। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন….
“জগতের একমাত্র আমি হই গতি।
ভর্তা ও নিয়ন্তী আমি, আমি বিশ্বপতি।।
স্রষ্টা রক্ষা কর্তা আমি সংহার আবার।
লয় স্থানে আমি নিত্য হেতু ও আধার।।”
এই সংরক্ষণকালে ধ্বংস এবং সৃষ্টি কিছুই হয়না অর্থাৎ আত্মার সৃষ্টি এবং ধ্বংস নেই। বৃদ্ধি এবং ক্ষয় নেই অতএব অনন্যকাল ধরে এই বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের সুষ্ঠু রূপান্তর ঘটবে এবং সংরক্ষিত থাকবে। জগতে জীবকূল সৃষ্টি হচ্ছে, ধ্বংস হচ্ছে আবার সৃষ্টি ও ধ্বংস হচ্ছে। এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়েই জগতের অক্ষয়তা রক্ষা হচ্ছে। এই চিরন্তর বিশ্বস্থিতি এবং ক্ষণিক জীবন স্থায়িত্বের অস্তিত্বের মধ্য দিয়েই জীবন জীবনকে অর্থবহ করে তোলে। এই জীবন মৃত্যুর প্রতীকী হিসাবে পুরীর জগন্নাথদেবের প্রতি ১২ বছর অন্তর পুরাতন দেহ পরিত্যাগ করে আবার নতুন দেহ ধারণ করার রীতি রয়েছে। গীতায় বলা হয়েছে…
জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করিয়া যেমন
নব বস্ত্র পরিধান করে নরগণ।।
আত্মাও সেরূপ ত্যাজি জীর্ণ কলেবরে,
নব কলেবর এক পুনরায় ধরে।।
এখানে দেবতাও জাগতিক নিয়মের অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন। তাই রথযাত্রার এক পক্ষকাল পূর্ব্বে পূর্ণিমায় জগন্নাথদেবের স্নান যাত্রায় অসুস্থ হওয়া মনুষ্য শরীরের ইঙ্গিত বহন করে। দেবতাকেও মানুষের অনুভূতি দিয়ে সাজানো হয়েছে। এতৎ সত্বেও শ্রীশ্রী জগন্নাথদেব হলেন ব্রহ্মরূপী পরম সত্য (Absolute) এই ব্রহ্মাণ্ডের সকল জীব সত্তা এবং সকল বস্তুর মধ্যে তাঁর অস্তিত্ব রয়েছে। তিনি স্থবির, তিনি গতিশীল, তিনি সুক্ষ্মাতিসুক্ষ্ম এবং স্থূলাতিত স্থুল। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন
আমিই জীবন-মৃত্যু হই ধনঞ্জয়,
আমি স্থূল, আমি সূক্ষ্ম, আমি সমুদয়।।
রথযাত্রায় প্রথম যাত্রী হবার অধিকারী হলেন বলভদ্র যিনি শ্রীকৃষ্ণের জ্যেষ্ঠ ভ্রাতা। তাঁরই রথ সর্বাগ্রে চলে। জ্যেষ্ঠকে মান্যতা দেওয়া এটাই ভারতীয় সংস্কৃতি। তারপর হল সুভদ্রা দেবীর রথ এবং সর্বশেষ হল জগন্নাথদেবের রথ। সম্মুখে বড়, পিছনে ছোট এবং দুই ভাই-এর সুরক্ষিত বলয়ের মধ্যে থাকেন বোন সুভদ্রা। এই ধর্মীয় পদ্ধতির মধ্য দিয়ে নারীর সম্মান এবং সম্ভ্রম রক্ষার ভারতীয় ঐতিহ্যেকে তুলে ধরা হয়েছে। এই তিন দেবদেবী বিশ্ব মানব জাতির প্রতীক। বলভদ্রের রং সাদা, জগন্নাথ কালো এবং সুভদ্রা হলেন পীতবর্ণ। সমগ্র মানব জাতি মূল তিনটি বর্ণে বিভক্ত। আবার এই তিন দেবমূর্তি অসম্পূর্ণ। এর তাৎপর্য হল দেবতার সঠিক এবং সম্পূর্ণ অবয়ব মনুষ্য উপলব্ধির অতীত। অনন্তকে দেহ ধারণার মধ্য দিয়ে প্রকাশ করা সীমাবদ্ধ চিন্তাধারা মানুষের পক্ষে সম্ভব নয়, অসম্ভব যার অবস্থান মানুষের কল্পনাতীত সময় ও সীমার (Time and Space) মধ্যে রয়েছে।

গীতায় শ্রীকৃষ্ণ বলেছেন-‘এই বিশ্ব ব্রহ্মাণ্ডের পূর্ণ স্বরূপ জানা কোনও জীবের পক্ষে অসম্ভব।’ তাই আমাদের চেতনায় এবং চিন্তাধারায় অসম্পূর্ণতা রয়ে যায় এবং তারই প্রতিফলন এই মূর্ত্তিগুলির অসম্পূর্ণতায় প্রকাশিত। সেই জন্য শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন ‘সর্বধর্মান্ পরিতাজ্য মামেকং শরণং ব্রজ’, ব্রহ্মের স্বাদ পাবে। এই রথযাত্রাতেই সকল ধর্ম-বর্ণ-জাতি নির্বিশেষে সকল মানুষ ভক্তের কাছে দেবতা নেমে আসেন। পৃথিবীর মানুষ স্বর্গের দেবতার স্পর্শ লাভ করে। মানুষে দেবতার মিলন হয়। ব্রহ্ম এক আর বিশ্বের সকল বস্তু এবং জীবন তারই সূক্ষ্মাতিসূক্ষ্ম অংশ। দেবতা মানুষে এক হৃদয়ে লীন হয়ে যায়।৷
সিদ্ধেশ্বর আচার্য্য প্রাক্তন সরকারি কর্মচারী, এবং পাশাপাশি তিনি ছিলেন একজন ইতিহাস গবেষক। মৃত্যুর আগে পর্যন্ত তিনি সিনে সোসাইটি কালনা এবং কালনা মহকুমা ইতিহাস ও পুরাতত্ত্ব চর্চা কেন্দ্রের সক্রিয় একজন নেতৃত্বে ছিলেন। একদিকে সিনে আন্দোলন, অন্যদিকে ইতিহাস গবেষণা।
এই দুটো বিষয়েই তিনি ছিলেন অত্যন্ত পারদর্শী। একসময় তিনি সাক্ষরতা প্রকল্পও সামলেছেন।
তারপর তিনি ছিলেন কালনা পৌরসভার উপ-পৌরপতি। ভাষাপথ পত্রিকার সঙ্গে তিনি জন্মলগ্ন থেকেই যুক্ত ছিলেন উপদেষ্টা পদে। এ যাবৎকাল পর্যন্ত তার দশটি বই প্রকাশিত হয়েছে। এছাড়াও, পশ্চিমবঙ্গের বহু পত্রিকা এবং সংবাদপত্রে তিনি একসময় বহু প্রবন্ধ এবং নিবন্ধ লিখেছেন। মানুষের ইচ্ছা এবং জেদের কাছে বয়স হার মানে, এটা তার কাছে কাছ থেকে শেখার আছে । তার প্রয়াত হওয়ার দু’মাস, আগেও বই প্রকাশ হয়েছে তাঁর ৷ শুধু লেখা নয়, তিনি ছিলেন একজন ভালো বইপ্রেমিক, গবেষক এবং ছাত্র।
ঠিকানাা— কালনা , পূর্ব বর্ধমান ৷

রথ সম্পর্কে অল্প কিছু জানতাম, কিন্তু ইতিহাস গবেষক, লেখক সম্মানিয় সিদ্ধেশ্বর মহাশয়ের লেখাটি পড়ে রথের ইতিহাস পূরাতন, ধর্ম তত্বে র কথা আরও জেনে নিজেকে সমৃদ্ধি করলাম।লেখাটি আমার খুবই ভালো লেগেছে। “আমাদের দেহকে রথের সঙ্গে তুলনা”কিন্তু আমরা সাধারণ মানুষ,মন রুপ দেহ রথের সারথি কে সবসময় ঠিক পথে পরিচালিত করতে পারি না।যাই হোক ভাষা পথের সারথি স্যার ভাষা পথকে আরো এগিয়ে নিয়ে যান এবং আরো ভালো ভালো লেখা আমাদের উপহার দেন এই আশা রাখি।