ডলারের দম্ভ বনাম ফ্লেমিঙ্গোর ডানা: ট্রাম্পের জামাইয়ের বিলাসবহুল রিসর্ট ও এক অবরুদ্ধ রাজধানীর রূপকথা
অয়ন মুখোপাধ্যায়
দূর আলবেনিয়ার সমুদ্র উপকূল। নোনা বাতাস আজ ভারী। সেখানে হঠাৎ ডানা ঝাপটাচ্ছে একঝাঁক ফ্লেমিঙ্গো। এই গোলাপি ডানা আজ শুধু ওড়ার জন্য ছটফট করছে না। তারা যেন এক কর্পোরেট কফিনের ওপর মৃত্যুর পরোয়ানা লিখছে।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষমতার অলিন্দে জ্যারেড কুশনারের বাস। সম্পর্কে তিনি ডোনাল্ড ট্রাম্পের জামাই। এই কুশনারের লোভী চোখ পড়েছে আলবেনিয়ার শান্ত প্রকৃতির বুকে। কুশনার সাহেবদের ডলারের পাহাড় আছে। তাঁদের কাছে আলবেনিয়ার এই নোনা জল আর পরিযায়ী পাখির কলকাকলি নেহাতই এক ফালতু বিলাসিতা। তাই সেখানে মাথা তুলবে দশ হাজার ঘরের এক দানবীয় বিলাসবহুল রিসর্ট। প্রকৃতির ফুসফুসটা খুবলে নিতে চাইছে কুসনার সাহেব। সেখানে বসানো হবে কংক্রিটের এক কৃত্রিম হৃৎপিণ্ড।
কিন্তু হিসাবের খাতায় একটা মস্ত বড় ভুল করে ফেলেছেন এই মার্কিন ধনকুবের। তিনি ভুলে গেছেন এক আশ্চর্য আদিম প্রতিরোধের কথা। পুঁজির দম্ভ যেখানেই প্রকৃতিকে রক্তগঙ্গায় ভাসাতে চাইছে, ঠিক সেখানেই গড়ে উঠছে প্রতিরোধ ।
বলকান অঞ্চলের এই ছোট দেশটার সাধারণ মানুষ আজ ঘর ছেড়ে রাজপথে নেমেছেন। রাজধানী তিরানা আজ অবরুদ্ধ। কোনো সেনাবাহিনীর বুটের তলায় এই অবরোধ হয়নি। রাজপথ থমকে গেছে খেটে খাওয়া আমজনতার এক অভূতপূর্ব মিছিলে। তাদের হাতে কোনো মারণাস্ত্র নেই। বুকে ধরা রয়েছে স্রেফ এক-একটা ফ্লেমিঙ্গো পাখির ছবি। এ লড়াই শুধু জল আর জমির নয়। এ লড়াই আসলে এক করপোরেট মস্তানির বিরুদ্ধে মানবতার শেষ জেহাদ।
এই কর্পোরেট বাবুদের মানসিকতা দুনিয়ার সব প্রান্তেই এক রকম। ওয়াশিংটনের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘরে বসে আলবেনিয়ার ম্যাপের ওপর পেনসিল দিয়ে দাগ কাটা হচ্ছিল। তখন কুশনার বা তাঁর পারিষদদের মাথায় ছিল স্রেফ খাঁটি মুনাফার অঙ্ক। কতগুলো ঘর হলে কত ডলার আসবে, কোন কোন অ্যাঙ্গেল থেকে সমুদ্রের ভিউ সবচেয়ে ভালো পাওয়া যাবে— এই ছিল তাঁদের গবেষণার বিষয়। অথচ ভাবুন ওই জলাভূমির তলায় কত হাজার বছর ধরে একটা আস্ত বাস্তুতন্ত্র বেঁচে রয়েছে, তা নিয়ে তাঁদের কোনও মাথাব্যথা নেই। কত বিপন্ন প্রাণীর ওটাই শেষ আশ্রয়, সেই খতিয়ান দেখার সময় ও তাঁদের নেই। পুঁজিবাদ কখনো প্রকৃতির ভাষা বোঝে না। সে বোঝে শুধু লভ্যাংশের ভাষা।
তারা ভেবেছিল একটা অনুন্নত দেশের সরকারকে পকেটে পুরে নিলেই কেল্লাফতে। আইন বদলে যাবে। পরিবেশের ছাড়পত্র চলে আসবে। আর চটজলদি তৈরি হয়ে যাবে ধনীদের ফুর্তি করার স্বর্গরাজ্য।
কিন্তু ক্ষমতার দম্ভে অন্ধ হয়ে যাওয়া এই আন্তর্জাতিক ফাটকাবাজরা মানুষের ভেতরের বারুদটাকে চিনতে ভুল করেন। তাঁরা ভাবেননি যে একটা পাখির জন্য মানুষ নিজের জীবন বাজি রাখতে পারে। এক চিলতে জলাভূমির জন্য মানুষ রাজপথে নেমে আসতে পারে। তিরানার রাজপথ আজ কুশনার সাহেবদের সেই অহংকারকে এক মস্ত বড় থাপ্পড় মেরেছে।
তিরানার রাস্তা দিয়ে যদি আজ কেউ হেঁটে যান, তবে তিনি এক অদ্ভুত দৃশ্যের সাক্ষী থাকবেন। কোনো উগ্র স্লোগান নেই। নেই কোনো ভাঙচুরের তাণ্ডব। অথচ এক অমোঘ, নিরেট স্তব্ধতায় অবরুদ্ধ হয়ে পড়েছে গোটা রাজধানী। স্তব্ধতাও যে কত বড় প্রতিবাদের ভাষা হতে পারে, আলবেনিয়ার জনতা আজ তা বিশ্বকে শেখাচ্ছে। বুড়ো থেকে শিশু, স্কুল শিক্ষক থেকে দিনমজুর— সবার হাতে শুধু ফ্লেমিঙ্গোর ছবি। এই ছবিটা আজ আর শুধু একটা সুন্দর পাখির অবয়ব নয়। এই গোলাপি ডানা আজ হয়ে উঠেছে শোষণের বিরুদ্ধে শোষিতের এক আন্তর্জাতিক প্রতীক।
যখন রাষ্ট্র পুঁজির কাছে মাথা নোয়ায়, তখন সাধারণ মানুষই হয়ে ওঠে প্রকৃতির শেষ রক্ষাকবচ। শাসকেরা যখন বহুজাতিক সংস্থার দালালি করতে ব্যস্ত থাকে, তখন জনতা ঢাল হয়ে সামনে দাঁড়ায়। তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, তিরানার রাজপথ মার্কিন ডলারের কাছে বিক্রি হওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। যে জনতা এতকাল নিজেদের দৈনন্দিন রুটি-রুজির লড়াইয়ে ব্যস্ত থাকত, তারা আজ এক মহত্তর উদ্দেশ্যে একজোট হয়েছে। আর এই একক লক্ষ্য যখন হাজার হাজার মানুষকে এক সুতোয় বাঁধে, তখন সেখানে এমন এক আশ্চর্য শক্তির জন্ম হয়, যার সামনে পৃথিবীর বড় বড় সাম্রাজ্যও তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়তে বাধ্য।
ইতিহাস সাক্ষী, এই লড়াই নতুন কিছু নয়। সুন্দরবনের ম্যানগ্রোভ বাঁচানোর লড়াই থেকে শুরু করে আমাজনের জঙ্গল রক্ষার আন্দোলন— সর্বত্রই খলনায়কের চেহারাটা এক। শুধু তার নাম আর পোশাকটা বদলে যায়। আজ আলবেনিয়ায় সেই খলনায়কের নাম জ্যারেড কুশনার। তিনি ভাবছেন ট্রাম্পের নাম ভাঙিয়ে আর করপোরেট ক্ষমতার দাপটে এই গণবিক্ষোভকে বুটের তলায় পিষে দেবেন। কিন্তু জনতা যখন একবার বুঝতে পারে যে তাদের অস্তিত্বের ওপর আঘাত আসছে, তখন তারা সমস্ত ভয়ডর ঝেড়ে ফেলে। এক অলৌকিক প্রাচীর তৈরি করে। আলবেনিয়ার মানুষ আজ সেই প্রাচীরটাই তুলে ধরেছে তিরানার বুকে।
একটা দেশের রাজধানী স্তব্ধ হয়ে যাওয়া মানে শুধু ট্রাফিকের চাকা থমকে যাওয়া নয়। ওটা আসলে শোষক শ্রেণীর হৃৎকম্পনের শব্দ কে থামিয়ে দেওয়া। মার্কিন ক্যাপিটালিজমের থাবা কতদূর বিস্তৃত, তা আমরা জানি। কিন্তু আমরা এটাও জানি যে সাধারণ মানুষের একতার চেয়ে বড় কোনো শক্তি আজ পর্যন্ত কোনো ল্যাবরেটরিতে তৈরি হয়নি। কুশনার সাহেবরা ডলার ছড়াতে পারেন। কিন্তু মানুষের এই আদিম, অকৃত্রিম আবেগকে কিনে নেওয়ার মতো রেস্ত তাঁদের ব্যাঙ্কে নেই।
লড়াইটা হয়তো দীর্ঘ হবে। একদিকে থাকবে আধুনিকতম প্রযুক্তি, আইনি মারপ্যাঁচ আর রাষ্ট্রশক্তির পরোক্ষ মদত। অন্যদিকে থাকবে স্রেফ খালি হাত, কিছু প্ল্যাকার্ড আর বুকভরা জেদ। কিন্তু এই অসম লড়াইয়ের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত সৌন্দর্য। আলবেনিয়ার এই আন্দোলন আজ সীমান্ত ছাড়িয়ে পৃথিবীর সমস্ত পরিবেশপ্রেমী, সমস্ত মুক্তিকামী মানুষের বুকে এক নতুন আশার আলো জ্বালিয়েছে। এটা প্রমাণ করেছে যে দুনিয়াটা এখনো পুরোপুরি করপোরেটদের চারণभूमि হয়ে যায়নি। এখনো কিছু মানুষ আছেন, যাঁরা প্রকৃতির কান্না শুনতে পান। যাঁরা একটা পাখির ডানা মেলার अधिकार রক্ষা করতে নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য বিসর্জন দিতে পারেন। তিরানার অবরুদ্ধ রাজপথ আজ বিশ্ব পুঁজিবাদের মুখে এক জ্বলন্ত প্রশ্নচিহ্ন ছুঁড়ে দিয়েছে।
শেষ পর্যন্ত এই লড়াইয়ের শেষ কোথায়, তা হয়তো ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। কুশনারের সংস্থা হয়তো আরও অনেক আইনি চাল চালবে। হয়তো ক্ষমতার সর্বোচ্চ স্তর থেকে চাপ সৃষ্টি করবে। কিন্তু একটা কথা পরিষ্কার। আলবেনিয়ার মানুষ অলক্ষ্যে একটা মস্ত বড় জয় ইতিমধ্যেই হাসিল করে ফেলেছে। তারা প্রমাণ করে দিয়েছে যে ঐক্যবদ্ধ জনতা যখন কোনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে বুক চিতিয়ে দাঁড়ায়, তখন ক্ষমতার সিংহাসনও কাঁপতে শুরু করে।
জ্যারেড কুশনার আলবেনিয়ার বুকে তাঁর বিলাসবহুল রিসর্টের একটা ইটও গাঁথতে পারবেন কিনা তা নিয়ে মস্ত বড় সংশয় তৈরি হয়ে গেছে। কিন্তু তার অনেক আগেই, তিরানার রাজপথে রাজপথে সাধারণ মানুষেরা প্রতিরোধের যে অভেদ্য, আশ্চর্য মিনার গড়ে তুলেছে, তার গায়ে আঁচড় কাটার সাধ্য কোনো ডোনাল্ড ট্রাম্প বা তাঁর ধনকুবের জামাইয়ের নেই। ফ্লেমিঙ্গোর গোলাপি ডানার সেই প্রতিবাদের আলোয় আজ বিশ্ব দেখছে এক নতুন রূপকথা। এখানে ডলারের দম্ভ হেরে যাচ্ছে প্রকৃতির আদিম টানে। আর শোষকের বন্দুক থমকে গেছে একজোড়া পাখির ছবির সামনে।
ছবিসমৃহীত অর্ক ভাদুড়ীর দেওয়াল থেকে।
অয়ন মুখোপাধ্যায়
লেখক পরিচিতি – কবি ও লেখক অয়ন মুখোপাধ্যায়। ঠিকানা – বলাগড়, হুগলী। যে সমম্ত পত্রিকাতে লিখে চলেছেন — পরম্পরা ,বাংলা স্ট্রিট অনলাইন , গুরুচণ্ডালী , বাংলা স্পিয়ার ,কেতাব ,ভারতের কণ্ঠ বাঙালা নেটওয়ার্ক ,আবর্ত , আপনপাঠ , বিকল্প ,গণশক্তি ,জলদর্চি ৷
