মন্তেশ্বরের পিপলন গ্রামে পুরাকীর্তির খোঁজে: একটি সমীক্ষা
নির্ম্মলেন্দু পাল
কোন জনপদের পুরাকীর্তি বলতে সেই জনপদে অবস্থিত প্রাচীনকালে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য বা শিল্পকর্মকে বোঝায়,যা অতীতের নানান ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক তাৎপর্য বহন করে কালজয়ী হয়ে জনপদে থিতু রয়েছে আজও। ক্ষেত্র সমীক্ষায় অগণিত প্রত্নসম্পদ যেমন মুগ্ধ করে তেমনি পুরাতাত্ত্বিক স্থান বিলুপ্ত হতে দেখলে হতাশ হতে হয়। তবু প্রাচীন লোকায়েত গ্রামের নাম, প্রাচীন দেব দেবীর লৌকিক বিশ্বাসে জারিত হয়ে উপস্থিতি তৎসংক্রান্ত বৈচিত্র্যধর্মী লোকাচার নতুন ভাবনার খোরাক যোগায়।
পুরাকীর্তি হল অতীতের গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহ্যবাহী নিদর্শন। এগুলি সবই অতীতে নির্মীয়মাণ স্থাপত্য, ভাস্কর্য। যা অতীতের স্মৃতি হয়ে কালের স্বাক্ষ্য বহন করছে আজও বিভিন্ন জনপদে। গ্রামের প্রাচীন ঐতিহ্যপূর্ণ নিদর্শনগুলো সেই সময়ের সমাজ, সংস্কৃতি, ধর্ম এবং জীবনযাত্রা সম্পর্কে মূল্যবান তথ্য বহন করে চলেছে। তথ্য বিস্ফোরণের যুগে সোস্যাল মিডিয়ার দৌলতে মানুষ সমস্ত বিষয়ে যথেষ্ট অবগত অথচ জানার মাঝেই রয়ে গেছে অনেক অজানা।কালনা মহকুমার সব থেকে বড় ব্লক হল মন্তেশ্বর।এই ব্লকে রয়েছে ১৪৪ টি মৌজা।গ্রামের সংখ্যা রয়েছে আরও বেশি।তার মধ্যে জনশূন্য মৌজা রয়েছে ৮ টি। এই সমস্ত মৌজা গুলির মধ্য অনেক মৌজায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে হাজারো পুরাকীর্তি। তার মধ্য থেকে পিপলন গ্রামকে সামনে রেখে সমীক্ষা করা হয়েছে।
পিপলন(জে.এল.নং-১০৫)
পিপলন গ্রাম পঞ্চায়েত অধীনস্থ একটি প্রাচীন এবং বর্ধিষ্ণু গ্রাম হল পিপলন। এই মৌজাতে পিপলন গ্রাম ছাড়া আরও একটি গ্রাম রয়েছে গ্রামটির নাম হল ইচু। পিপলন গ্রামের পূর্বদিকে ,পশ্চিম দিকে,উত্তর দিকে এবং দক্ষিণ দিকে গ্রামের অবস্থান।
পিপলনে চর্চিকা দেবী:
গ্রামের অন্যতম পুরাকীর্তি কালো পাথরের উপর খোদাই করা চর্চিকা দেবীর বিগ্রহ। সেবাইত পরিবারের কথানুযায়ী ১৫০ বৎসর পূর্বে এই পরিবারের পূর্বপুরুষ স্বপ্নাদেশে গ্রামের ‘দে কুড়ি’ পুকুর সংস্কারের সময় দেবীর বিগ্রহ উদ্ধার হয়। স্বপ্নাদেশ অনুযায়ী এই চামুন্ডা মূর্তিকে জয়দুর্গার ধ্যানে পূজা করা করেন ব্রাহ্মণ ঠাকুর। দেবীর নিত্যসেবা হয়। বিগ্রহ প্রাপ্তির পর প্রথমে একটি মাটির ঘরে এই মূর্তিটি প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। বর্তমানে চর্চিকা মাতা দালান ঘরের মন্দিরে অধিষ্ঠিতা।ঠাকুরের নিত্যসেবা হয়। অগ্রহায়ণ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে দেবী চর্চিকার বিশেষ পুজো হয়। ঐ দিন রাত্রে দেবী সেবাইতদের (১০ ঘর সেবাইত আছে) বাড়িতে বাড়িতে বেড়াতে যান। বাজনা বাদ্যসহকারে সিংহাসনে করে বেড়াতে যাওয়াকে ‘র’ বেড়ানো বলে। প্রত্যেক সেবাইতের বাড়িতে বাড়িতে ভোগ গ্রহণ করেন। ঐ দিন প্রায় ৮-১০টি মানসিকের ছাগ বলিদান হয়। বিনয় ঘোষের লেখা ‘পশ্চিমবঙ্গের সংস্কৃতি’ পুস্তক থেকে জানা যায় চর্চিকা দেবী চামুন্ডারই এক রূপ। তিনি এ সম্বন্ধে লিখেছেন ‘চামুন্ডা হিন্দুদেবী হলেও একেবারে বৌদ্ধ প্রভাব মুক্ত নন’। বৌদ্ধ সাধন মালায় বলা হয়েছে মহাকাল সপ্তদেবী পরিবৃতা হয়ে থাকবেন। পূর্বে মহামায়া, দক্ষিণ যমদূতী, পশ্চিমে কালদূতী, উত্তরে মহাকাল নিজে। প্রত্যেকেরই মূর্তি ভয়াবহ। এছাড়া দক্ষিণ-পূর্ব কোনে কালিকা, দক্ষিণ- পশ্চিম কোনে চর্চিকা, উত্তর-পশ্চিম কোনে চন্ডেশ্বরী এবং উত্তর-পূর্ব কোনে কুলিশেশ্বরী থাকবেন। এদেরও প্রত্যেকের মূর্তি ভয়াল। সপ্ত মাতৃকার রূপ বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে বর্ণিত হয়েছে। পল্লব এবং চোল আমলের ভাষ্কর্যে, গোড়ার দিকে, দক্ষিণ ভারতে এই সপ্ত মাতৃকার মূর্তির মধ্যে চামুন্ডা তরুণীরূপে রূপায়িত হয়েছেন, নাগ কুচবদ্ধ ও কপাল যজ্ঞোপবীত সহ। পরবর্তী চালুক্য ভাষ্কর্যে এবং উড়িষ্যায় ও বাংলাদেশে চামুন্ডা অস্থি চর্মসার কোটরাক্ষী রূপে উপস্থিত হয়েছেন। মনে হয় পরে বৌদ্ধ তান্ত্রিকরা পূর্ব ভারতে সপ্তমাতৃকাকে মহাকাল পরিবৃত সপ্তদেবীতে পরিণত করেন। তার মধ্যে চর্চিকা রূপে চামুন্ডারও স্থান ছিল। বাংলা বজ্রযানী বৌদ্ধদের এই চর্চিকা রূপী চামুন্ডাই তিব্বত হয়ে চীন পর্যন্ত যাত্রা করেন। সেই জন্য চীনের নিষিদ্ধ শহর পিপিঙে যে সব দেবদেবীর মূর্তি পাওয়া গেছে তার মধ্যে চামুন্ডার মূর্তিও আছে। প্রধানত পাল যুগে বৌদ্ধ ও হিন্দু তান্ত্রিক দেবদেবীর মধ্যে এই পারস্পরিক মিলন মিশ্রণ একাত্মীকরণ ঘটতে থাকে।
শিব: বহু পুরাকাল থেকে গ্রামের মন্দিরে রয়েছে শয়ম্ভু শিব । এই শিব গৌরীপট্ট বিহীন। সেবাইতদের কথায় জানা যায় শিবের স্বপ্নাদেশেই চর্চিকা মাতাকে একই মন্দিরে
স্থাপন করা হয়েছে। এই শিব লিঙ্গটি মাটির নীচ থেকে আপনা আপনিই উঠেছিল বলে গ্রামবাসীদের বিশ্বাস। সেবাইত পরিবারের এবং মন্দিরের সন্নিকটস্থ পরিবারের মহিলারা প্রতিদিন দুবেলা শিবের পুজো করে থাকেন। পুরোহিত ঠাকুরও পুজো করে থাকেন।
বিষ্ণু মূর্তি: চর্চিকা দেবীর মন্দিরে রয়েছে একটি বিষ্ণু মূর্তি। এই মূর্তিটি প্রায় ২০-২৫ বছর আগে গ্রামের ‘গেঁগা’ পুকুর সংস্কারের সময় পুকুর থেকে উদ্ধার হয়। কালো ব্যাসল্ট পাথরের উপর খোদাই করা অপূর্ব মূর্তিটির উচ্চতা প্রায় সাড়ে তিন ফুট ।
বিগ্রহের বর্ননা: এই বিগ্রহ ভোগ বিষ্ণু মূর্তি নামে পরিচিত। এই বিষ্ণু মূর্তির বৈশিষ্ট্য হল দণ্ডায়মান বিষ্ণু এবং দুই পাশে দুই স্ত্রীও দন্ডায়মান। বিষ্ণুর ডান পাশে দণ্ডায়মান লক্ষ্মী এবং বাম পাশে দণ্ডায়মান সরস্বতী। বিষ্ণুর চারটি হাতের উপরের ডানদিকের হাতে রয়েছে গদা, উপরের বাম দিকের হাতে চক্র, নীচের বাম দিকের হাতে শঙ্খ এবং ডান দিকের হাতে পদ্ম। এই বিগ্রহকে ত্রিবিক্রম বলা হয়। পাল সেন যুগে এই বিগ্রহ অসংখ্য নির্মিত হয়েছিল। মুসলিম শাসকদের অত্যাচারে ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে বিভিন্ন মন্দির থেকে এই বিগ্রহ গুলি বিভিন্ন জলাশয়ে ফেলে দিয়েছিলেন। এখন ঐ সমস্ত জলাশয় সংস্কার করতে গিয়ে এই ধরনের বিগ্রহের সন্ধান মিলছে।
শিব মন্দির :
গ্রামের বাইরে কুসুমগ্রামের দিক থেকে মেমারীর দিকে যাওয়ার সময় বাস রাস্তার ডান পাশে পুরাতন ভগ্নপ্রায় দেউল রীতির শিব মন্দিরটি রয়েছে। মন্দিরটি এক সময় টেরাকোটার কাজের দ্বারা সুসজ্জিত ছিল।
সরু সরু ইঁটে নির্মিত এই মন্দির। গঠনশৈলী অসাধারণ। সংস্কারের অভাবে বর্তমানে মন্দিরটি ধ্বংস প্রায়। এই ধরনের দেউল রীতির শিব মন্দির খুব কমই দেখা যায়। মন্দিরে শিব লিঙ্গ রয়েছে। এই শিবের নিত্যসেবা হয় সেবাইতদের দ্বারা।
যাতায়াত: মেমারী-মালডাঙা বাস রাস্তার উপর সাতগাছিয়ার দিক থেকে ৪.৪ কিমি উত্তর দিকে কুসুমগ্রামের দিকে অগ্রসর হলে একেবারে রাস্তার পাশে পিপলন গ্রামের অবস্থান। গ্রামের মোড়েই বাসস্ট্যান্ড রয়েছে।এখান থেকেই লোকজন বাসপথে যাতায়াত করে থাকেন। নিকটতম রেলস্টেশন হল মেমারী।
নির্ম্মলেন্দু পাল
পরিচিতি : জন্ম ৩রা জানুয়ারি ১৯৭৭, নিবাস পূর্ব বর্ধমান জেলার পূর্বস্থলী থানার অন্তর্গত বড়কায়বাতী গ্রাম। বর্তমানে পূর্বস্থলীতে বসবাস। শিক্ষা: স্নাতকোত্তর ইতিহাস এবং গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞানে। পেশায় স্কুল গ্রন্থাগারিক। বর্তমানে পূর্বস্থলী নীলমণি ব্রহ্মচারী ইনস্টিটিউশনে কর্মরত। আঞ্চলিক ইতিহাস ও লোক সংস্কৃতি বিষয়ে মৌলিক প্রবন্ধ বিভিন্ন পত্র পত্রিকার নিয়মিত প্রকাশিত হয়। গ্রন্থাগার ও তথ্য বিজ্ঞানের উপর অনেক লেখা জাতীয় স্তরের নানান সেমিনার ও জার্নালে প্রকাশিত। লেখালিখি শুরু পিতার অনুপ্রেরনায়। পিতা সুকুমার চন্দ্র পাল হাইস্কুলের অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক। কালনা মহকুমার পাঁচটি ব্লককে নিয়ে ক্ষেত্র সমীক্ষার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। লেখকের প্রকাশিত বই সমূহ :
“ক্ষেত্র সমীক্ষা গ্রন্থমালা (১): পূর্বস্থলী উত্তর”, “ক্ষেত্র সমীক্ষা গ্রন্থমালা (২): পূর্বস্থলী দক্ষিণ”,
“ক্ষেত্র সমীক্ষা গ্রন্থমালা (৩/ক): মন্তেশ্বর”।

খুব ভালো লাগলো। আদিতে আমাদের পূর্বপুরুষরা এই গ্রামে বসত করতেন। গ্রামের নাম অনুসারে আমাদের পদবী ছিল পিপিলাই। আমাদের পূর্বপূরুষ ছিলেন কমলাকর পিপিলাই যিনি মাহেশের জগন্নাথের সেবার অধিকারী হয়েছিলেন। তোমাকে ও অভিজিতবাবুকে আমার শুভেচ্ছা শ্রদ্ধা জানাই।
আপনার এই মূল্যবান মতামত সত্যিই আমাদের অনুপ্রাণিত করবে ৷ আপনি আমাদের শ্রদ্ধা ও শুভেচ্ছা নিন ৷