ইউক্যালিপটাস ও আরেকটি অধ্যায়
শান্তা কর রায়
অর্থনৈতিক জীবন শুনতে শুনতে বড় হয়েছে রিক্তা। ওর দুহাতই শূন্য। বাবার কাছেই বড় হওয়া। মা কোনো এক অবাঙালীর সঙ্গে কেটে পড়েছিল। ভালোবেসে ওদের ঘর শূন্য করে দিয়ে চলে যায়। সেখানে হয়তো ভালো আছে। শূন্য দুহাতে তাই রিক্তা সবার ভালোর কথা ভাবে। সকলের জন্য করে। সবাই ওকে ভালোবাসে।
রিক্তা বড়ো হচ্ছে। আঠারো বছরের পর থেকে জীবনের ডিপ্লোম্যাসি ওর সেরিব্রাল হেমিস্কোয়ারে আঁচড় কাটতে শুরু করে। ও বুঝতে পারে পার্সোন্যাল লাইফ থোর-বড়ি-খাড়া নিয়মে চললে তার ফলাফল মিড লাইফ ক্রাইসিস। জীবন থেকে রূপ, রস, গন্ধ স্পর্শ নিয়ে ওর বেড়ে ওঠা।
গাছ ভালোবাসে, বাগান করতো ওর দাদামশাই, সেই থেকেই শেখা। গাছের পরিচর্যা করতে করতে বেড়ে ওঠা। ওদের বাগান ভর্তি গাছ। গাছে গাছে পাখি। ওর মনে হয় পাখিরা কী সুন্দর ভালো ভালো জায়গায় প্রতিদিন ঘোরে। ওর পাখা থাকলে ও বেরিয়ে একবার মাকে দেখে আসতো। সাজানো সংসার আর মা কেমন করে ওকে ফেলে দূরে আছে।
এতোদিন শুধু অভিমান ছিল। আঠারো বছরের পর ও বুঝতে শিখেছে দুবেলা পেটে ভাত পড়লেই জীবন চলে না। ব্যক্তিগত জীবন খুব জরুরী। বায়োলজির শিক্ষক ওকে বড়ো হতে সাহায্য করেছে। ব্যক্তিজীবনের জটগুলো খুলে গ্যাছে। বুঝতে শিখেছে বাঁচার জন্য সব থেকে জরুরী নির্জনতা। তাই বাগান ওকে শান্তি দেয়। নির্জনে বসে গ্রন্থিমোচনের নেশা ধরায়।
আম, জাম, কাঁঠাল নানা রকমের গোলাপের পাশাপাশি বাগানে একটা ইউক্যালিপ্টাস গাছ আছে। রিক্তার জ্যেঠুমণির লাগানো। মসৃণ শরীরের গাঢ় সবুজ পাতায় ওর শরীরে সব সময় যৌবন। রিক্তা ওর গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়াতে ভালোবাসে। মালিকাকাকে দিয়ে বছরে একবার ডাল পরিষ্কার করে। অন্য গাছগুলো থেকে একটু বেশীই যত্ন নেয়।
বাগানে কমন গাছগুলোর সঙ্গে বেমানান ছিল একটা ইউক্যালিপটাস গাছ। রিক্তার বাবা এখন পঞ্চাশে হিপোক্রিট বুড়ো (মানসিকভাবে)। সুন্দরী মেয়ের একটা হিল্লে করে দিতে চায় কোনওভাবে। ইউনির্ভাসিটি গন্ডী পেরোলে ভাগিয়ে দেবে ওকে।
মেয়ে বড়ো হচ্ছে। পড়াশোনায় ভালো।
ভিতরে বেড়ে ওঠে শিকড়। পাত্র ঠিক হয় গোপনে। রিক্তা কিছুই আঁচ পায় না। পড়া বন্ধু আর বাগা। বিজেশ দেশে ফিরলেই ওদের বিয়ে। ওর দশদিন আগে আসার কথা ছিল। ফ্লাইট ক্যানসেল হওয়ায় বিয়ের দিনই আসবে স্থির হয়। ফোনে কথা হয় রিক্তার সঙ্গে।
বাবার বন্ধুর ছেলে। ছোটবেলার খেলার সাথী। বিয়ে করতে রিক্তা চায় না। বাবা একা হয়ে যাবে। তাছাড়া জন্মের পর থেকেই মা-বাবার মধ্যে তিক্ত সম্পর্ক ওর বিয়ে না করতে চাওয়ার প্রধান কারণ। তবু বাবার কষ্ট হবে তাই রাজী হয়।
বসন্ত এসে গেছে। রিক্তার বাগানে ফুলের মেলা বসেছে। রিক্তা সেজেগুজে অপেক্ষা করছে, হঠাৎ খবর আসে বিজেশের প্লেন ক্র্যাশ করেছে।
লগ্নভ্রষ্টা হয়ে যাবে রিক্তা। বিজন মাথায় হাত দিয়ে বসে পড়ে। সেই মুহূর্তে উপযুক্ত পাত্র পাওয়া গেল না।
রিক্তা উঠে দাঁড়াল। মন্ত্রের মতো এসে দাঁড়ালো ওর বাগানে। ফুল গাছ সবই ওর সঙ্গে কথা বলে। মুহূর্ত দাঁড়িয়ে ছুটে গেল ব্রাহ্মণের কাছে। বলল সে প্রস্তুত।
বিয়ের মন্ত্র পাঠ শুরু হয়। ইউক্যালিপটাস গাছটাকেই বিয়ে করে রিক্তা। ওর প্রিয় গাছ। সবাই অবাক হয়ে দেখে এই বিয়ে। সবাই বাকরুদ্ধ।
রিক্তার ঠোঁটে লেগে থাকে এক অপার্থিব হাসি। ও যেন এটাই চেয়েছিল। সব সমস্যার সমাধানের একমাত্র পথ। মুশকিল আসান গাছটা যেন হঠাৎ আরো সুন্দর আরো সবুজ হয়ে হাওয়ায় দুলে ওঠে। রিক্তা ওকে স্পর্শ করে। শরীরে শিহরণ অনুভব করে।
এরপর ওর সময় আরো বেশী সুন্দর হয়ে ওঠে। বাগানেই ওর সংসার। মনে মনে কথা বলে সব গাছের সঙ্গে। ইউক্যালিপটাসের সঙ্গে চলে দীর্ঘ সংলাপ। সবাই রিক্তাকে পাগল মনে করে।
বিজেশের মৃত্যু হয়নি। দীর্ঘ অসুস্থতার পর সে ফিরে আসে রিক্তার কাছে। অনেক বোঝায়।
‘তুমি নিশ্চয় আমার কথা ভেবেই এই সিদ্ধান্ত নিয়েছ।’
‘না এটা আমার কথা ভেবে নেওয়া হয়েছিল।
‘এখন আমি ফিরে এসেছি, এবার বিয়েটা হতেই পারে।’
‘আমি বিবাহিতা’।
রিক্তার বজ্রকঠিন কথার সামনে থমকে যায় বিজেশ। খালি হাতে ফিরে যেতে হয় তাকে।
জ্যেঠুমণি বাবা সবাইকে হারিয়ে রিক্তা একা হয়ে যায়। বিজন গাছের সঙ্গে মেয়ের বিয়েটা মেনে নিতে পারেনি।
পাড়ার বখাটে ছেলের দল রিক্তাকে বিরক্ত করতে শুরু করে।
ইউক্যালিপটাস গাছের নিচে বসেছিল রিক্তা। কয়েকটা ছেলে হঠাৎ সামনে এসে দাঁড়ায়। ওদের কথায় বিব্রত বোধ করে রিক্তা। গাছটাকে শক্ত করে ধরে দাঁড়িয়ে থাকে।
একটা ছেলে রিক্তার হাত স্পর্শ করতে যায়। তখনই ঘটে বিপত্তি। হঠাৎই শান্ত বাতাসে গাছের ডাল ভেঙে পড়ে ছেলেটার মাথায়। অজ্ঞান হয়ে যায় তৎক্ষণাৎ। বাকিরা ভয়ে পালায়।
এরপর গাছটাকে সবাই ভুতুড়ে মনে করতে শুরু করে। রিক্তা কৃতজ্ঞতায় কেঁদে ফেলে। ও জানে সব পরিস্থিতিতে রক্ষা পাবে। গাছটা ওর দায়িত্ব নিয়েছে।
রাতে সবাই ঘুমিয়ে পড়লে গাছতলায় এসে বসে থাকে। চাকরবাকরদের কোনো কথাই সে শোনে না। ইউক্যালিপটাসকে স্পর্শ করে ও ভালো থাকে, আনন্দে থাকে। ওর খসে যাওয়া পাতা ছুঁয়ে প্রতিজ্ঞা করে কোনো পরিস্থিতিতেই ওকে ছেড়ে যাবে না।
রাতে স্বপ্নে গাছের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসে এক যুবক। যার সঙ্গে সারারাত রিক্তার সহবাস চলে। হারিয়ে যায় মেঘের রাজ্যে। কখনো ঘন জঙ্গলের ভিতর শরীরে এসে বসে অসংখ্য জোনাকি।
রিক্তার দু’হাত ভর্তি আলো। সমস্ত সত্তায় ইউক্যালিপটাস।
আকাশে অসংখ্য তারার ভিতর বাবার মুখ। নিশ্চিন্ত।
শান্তা কর রায়, লেখক হুগলি জেলার উত্তর পাড়ায় থাকেন, জন্ম নদীয়ায়।
