স্মৃতির লকার

কমলিকা ভট্টাচার্য


 

nostalgic memories in a rusty locker copy

সাল ২১০১
অনিকেত নিজের সামনে শূন্যে আঙুল ঘুরিয়ে দ্রুত কিছু টাইপ করছিল। তার আঙুলের ডগা থেকে বেরিয়ে আসা অতি সূক্ষ্ম আলোকরশ্মিগুলো অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছিল বাতাসে, আর তার চোখের সামনে ভেসে উঠছিল একের পর এক তথ্যের স্তর। বাইরে থেকে দেখলে মনে হতো, ছেলেটি শূন্যে হাত নেড়ে কোনও অদৃশ্য মানুষের সঙ্গে কথা বলছে।
আজ থেকে কয়েক দশক আগে কেউ যদি এমনটা করত, তবে তাকে মানসিক চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়ার পরামর্শ দিত প্রতিবেশীরা। তখন মানুষ লিখত কাগজে, দেখত কম্পিউটারের পর্দায়, আর তথ্য খুঁজতে হলে কিবোর্ডে আঙুল চালাতে হতো। অথচ এখন লেখার জন্য কাগজ নেই, দেখার জন্য স্ক্রিন নেই, এমনকি কম্পিউটার নামের যন্ত্রটিও ইতিহাসের জাদুঘরে সংরক্ষিত।
এখন মানুষের চিন্তাই তার ইন্টারফেস।
পৃথিবীর সমস্ত মানুষের ব্যক্তিগত স্মৃতি, জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংরক্ষিত থাকে কেন্দ্রীয় ডেটা সেন্টারের সুরক্ষিত লকারে। মস্তিষ্কে সব তথ্য জমিয়ে রাখার পুরোনো অভ্যাস মানুষ ছেড়ে দিয়েছে। কারণ, তথ্য যত বেশি নিজের মাথায়, বিপদের আশঙ্কাও তত বেশি। সত্তর বছর আগের মানুষ যেমন জরুরি প্রয়োজনে পকেটে সামান্য নগদ টাকা রাখত, অথচ অধিকাংশ লেনদেন করত অনলাইনে, এখনকার মানুষও তেমনই মস্তিষ্কে রাখে শুধু দৈনন্দিন কাজ চালানোর মতো প্রয়োজনীয় তথ্য। বাকি সবই নিরাপদে সংরক্ষিত থাকে নির্দিষ্ট সার্ভারে।
নিরাপত্তার জন্য প্রতিটি মানুষের মস্তিষ্কে বসানো হয়েছে একটি বিশেষ সুইচ। কানের পিছনে আঙুলের স্পর্শে সেটি সক্রিয় হয়। তারপর মানুষ মনে মনে যা জানতে চায়, যা দেখতে চায়, কিংবা অতীতের যে অনুভূতিটুকু ফিরে পেতে চায়, সেই অনুযায়ী ডেটা সেন্টারের সঙ্গে সংযোগ স্থাপিত হয়। এই ব্যবস্থার নাম মাইন্ড রিডার।
অনিকেত আজ কাজ করতে করতে হঠাৎ থেমে গেল।
তার কোনও শারীরিক অসুবিধা নেই, কাজের চাপও খুব বেশি নয়। বিশাল এক ব্যবসায়িক সাম্রাজ্যের উত্তরসূরি সে। তার বাবা জন্ম থেকেই তাকে তৈরি করেছেন নিজের সাম্রাজ্যের দায়িত্ব নেওয়ার জন্য। অনিকেতের জীবন সাজানো, নিয়ন্ত্রিত, আরামদায়ক। তার প্রয়োজনের প্রায় সবকিছুই হাতের নাগালে। তবু মাঝে মাঝে কাজের ফাঁকে তার মনের ভিতরটা কেমন ফাঁকা হয়ে যায়। চারপাশে সবকিছু এত সহজ, এত দ্রুত, এত নিখুঁত যে কোনও কিছু পাওয়ার জন্য বিশেষ অপেক্ষা করতে হয় না। আনন্দ, বিনোদন, জ্ঞান, এমনকি অন্যের অভিজ্ঞতা—সবই কয়েক মুহূর্তের দূরত্বে। অথচ এই অফুরন্ত প্রাপ্তির পৃথিবীতেও এমন কিছু মুহূর্ত আসে, যখন অনিকেতের মনে হয়, তার যেন কী একটা নেই। কী নেই, সে নিজেও জানে না। শুধু অনুভব করে, জীবনের কোথাও যেন একটা অদৃশ্য শূন্যতা রয়ে গেছে, যা কোনওভাবেই পূরণ হচ্ছে না।
আজও তেমনই একটা মুহূর্তে সে কাজ থামিয়ে দিল।
কানের পিছনের সুইচে আঙুল ছোঁয়াতেই সামনে ভেসে উঠল কয়েকটি বিকল্প—পুরোনো পৃথিবীর ছবি, মহাকাশ অভিযানের অনুভূতি, পূর্বপুরুষদের স্মৃতি—আরও কত কী!
অনিকেতের হঠাৎ মনে পড়ল, তার নিজের পরিবারের স্মৃতির লকারে একটি বিশেষ সংগ্রহ রয়েছে। পাঁচ প্রজন্মের জিনোম সিকোয়েন্স, বংশপরিচয়, আর কিছু সংরক্ষিত স্মৃতি। তার নিজের জন্মও এই আধুনিক প্রযুক্তিরই ফসল। স্পার্ম ব্যাংক ও এগ ব্যাংকে সংরক্ষিত জৈব উপাদান থেকে তার ভ্রূণ তৈরি হয়েছিল, আর এক সারোগেট মায়ের গর্ভে তার জন্ম। জন্মদাতা বাবা-মাকে সে কখনও দেখেনি। সারোগেট মা মাঝেমধ্যে আসে, তবে সেই আসার পিছনে অর্থের সম্পর্কটাই স্পষ্ট। তাকে মানুষ করেছেন তার বাবা, যাঁর কাছে অনিকেতের ভবিষ্যৎ মানে তাঁর সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ।
পাঁচ প্রজন্মের জিনোম সিকোয়েন্স তার কাছে আছে, কিন্তু এই মানুষগুলোর জীবনের কতটুকুই বা সে জানে? তাদের মুখ, তাদের অভ্যাস, তাদের হাসি, অভিমান, ভালোবাসা—সবই যেন তথ্যের আড়ালে হারিয়ে গেছে। মানুষগুলোর অস্তিত্বের প্রমাণ রয়েছে, অথচ তাদের সঙ্গে বেঁচে থাকার কোনও স্মৃতি নেই তার।
হঠাৎ তার মনে একটা প্রশ্ন জাগল।
একজন মা দেখতে কেমন হন?
প্রশ্নটা খুব সাধারণ। অথচ অনিকেতের কাছে এর উত্তর নেই।
সে কখনও নিজের মাকে দেখেনি। তার জন্মের নথিতে রয়েছে কয়েকটি জৈবিক তথ্য, কিছু সংখ্যার সারি, কিছু চিকিৎসাবিষয়ক বিবরণ। কিন্তু কোনও মুখ নেই, কোনও ছবি নেই। বাবার কাছেও এ নিয়ে প্রশ্ন করার সাহস তার হয়নি। তাদের সম্পর্কের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা আছে, দায়িত্ব আছে, সাফল্যের হিসাব আছে—কিন্তু এই ধরনের প্রশ্নের জন্য কোনও জায়গা নেই। বাবা তাকে জীবনের সমস্ত প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়েছেন, শুধু সেই প্রশ্নটির উত্তর দেননি, যা আজ হঠাৎ তার সমস্ত মন জুড়ে বসেছে।
অনিকেত আবার মাইন্ড রিডার সক্রিয় করল।
“মা—একটি নারীর মুখ তৈরি করো।”
কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
তারপর সিস্টেম জানাল, “অনুগ্রহ করে মুখের বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট করুন।”
অনিকেত থমকে গেল। কী বলবে সে? চোখের রং? চুলের দৈর্ঘ্য? মুখের গড়ন? যে মানুষটিকে সে কখনও দেখেনি, তাঁর চেহারা কেমন হবে, তা সে কী করে জানবে?
সে চোখ বন্ধ করল। আঙুল নাড়িয়ে সমস্ত নির্দিষ্ট নির্দেশ মুছে দিল। তারপর শুধু মনে মনে বলল, “একজন মা।”
শূন্যে ধীরে ধীরে আলো জমতে লাগল। প্রথমে একটি অস্পষ্ট অবয়ব, তারপর মুখের রেখা, চোখ, ঠোঁট, কপালের কাছে নেমে আসা কয়েকটি চুল। ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে উঠল এক নারীর প্রতিবিম্ব।
অনিকেত চোখ খুলল।
তার সামনে এক শান্ত মুখের নারী দাঁড়িয়ে আছেন। চোখে অদ্ভুত কোমলতা, ঠোঁটে মৃদু হাসি। তিনি যেন কিছু বলতে চাইছেন, অথচ কোনও শব্দ নেই।
অনিকেত একটু এগিয়ে গেল। নারীটিও যেন তার দিকে তাকিয়ে রইলেন। সে ধীরে ধীরে মুখের কাছে হাত তুলল। প্রতিবিম্বের চোখের দিকে তাকিয়ে নিজের মুখের সঙ্গে মিল খুঁজতে লাগল—চোখের কোণে, ঠোঁটের বাঁকে, কপালের রেখায়। কোথাও কি তার নিজের ছায়া আছে? কোনও অজানা জিনগত স্মৃতি কি এই মুখের মধ্যে লুকিয়ে রয়েছে?
সে জানে, এই মুখটি হয়তো সম্পূর্ণ কৃত্রিম। হয়তো ডেটা সেন্টারের অসংখ্য মুখের বৈশিষ্ট্য মিশিয়ে তৈরি হয়েছে। তবু তার দৃষ্টি সরল না। এতক্ষণে সে বুঝতে পারল, সে কোনও নিখুঁত মুখ খুঁজছে না। সে খুঁজছে এমন কিছু, যার অস্তিত্ব সম্পর্কে তার কোনও প্রত্যক্ষ ধারণা নেই, অথচ যার অভাব সে এত দিন অনুভব করেছে।
অনিকেত তাকিয়ে রইল সেই চোখের ভিতর। সে শুধু দেখতে চাইছিল, একজন মায়ের চোখে তার নিজের কোনও ছায়া খুঁজে পাওয়া যায় কি না।
কিছুক্ষণ পর প্রতিবিম্বটি ধীরে ধীরে ঝাপসা হয়ে এল। আলোর রেখাগুলো একে একে মিলিয়ে গেল বাতাসে। ঘর আবার আগের মতো নিঃশব্দ।
অনিকেত ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তার কাজ এখনও অসমাপ্ত, অথচ হাত আর চলছিল না। সে কিছুক্ষণ শূন্যের দিকে তাকিয়ে রইল। সেই মুখটি কৃত্রিম, সে জানে। তবু কেন যেন মনে হচ্ছিল, তার সামনে থেকে কেউ চলে গেছেন, যাঁকে সে কোনও দিন সত্যিই পায়নি।
ঠিক সেই সময় তার বন্ধুর ছবি ভেসে উঠল সামনে।
“আবার মুখ কালো করে বসে আছিস! নিশ্চয়ই সেই প্যানপ্যান ব্ল্যাক অ্যান্ড হোয়াইট স্মৃতির রিল দেখেছিস। তোকে না কতবার বলেছি, পুরোনো পৃথিবীর এসব আবেগঘন স্মৃতি দেখা ছাড়। ইভেন মোস্ট অফ আস ডোন্ট নো আওয়ার পেরেন্টস। সো হোয়াট? তাতে কী এসে যায়? জানিস তো, আজ আমাদের পার্টি আছে আমার মুন বাংলোয়। সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। সি ইউ ইন দ্য রকেট!”
অনিকেত কিছুক্ষণ বন্ধুর মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর শান্ত গলায় বলল, “আজ আমি আসব না।”
বন্ধুটি অবাক হয়ে গেল। “কী বললি? তুই আসবি না? তোর শরীর খারাপ নাকি?”
“না।”
“তাহলে?”
অনিকেত উত্তর দিল না। কী বলবে সে? যে প্রশ্নের উত্তর সে নিজেও জানে না, সেই প্রশ্নের কথা বন্ধুকে বোঝাবে কী করে?
সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল।
ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল। কিন্তু এবার সেই নীরবতা আগের মতো ছিল না। অনিকেতের মনে হলো, এত দিন সে যা জানত না, আজ তার সামনে সেই অজানা জগতের একটাই দরজা খুলেছে। তবু প্রথমবার তার মনে হলো, সেখানে পৌঁছনো দরকার।
সে আবার মাইন্ড রিডার সক্রিয় করল। পরিবারের স্মৃতির লকারে ফিরে গিয়ে একটি পুরোনো স্মৃতির রিল বেছে নিল। তারিখ ও বিবরণে লেখা ছিল—দুর্গাপুজো, পারিবারিক সমাবেশ।
মুহূর্তের মধ্যে চারপাশের দৃশ্য বদলে গেল।
অনিকেত নিজেকে আবিষ্কার করল এক বিশাল বাড়ির মধ্যে। বাড়ির উঠোনে মানুষের ভিড়। মাঝখানে সাজানো পূজামণ্ডপে দেবী দুর্গার প্রতিমা। ধূপের ধোঁয়া পাক খেয়ে উঠছে, বাতাসে ছড়িয়ে আছে ফুল আর ধুনোর গন্ধ। কোথাও শাঁখ বাজছে, কোথাও উলুধ্বনি। মানুষের গলার স্বর, পায়ের শব্দ, শাড়ির খসখস—সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত জীবন্ত পরিবেশ।
অনিকেত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এমন দৃশ্য সে ছবিতে দেখেছে, তথ্যভান্ডারে পড়েছে, কিন্তু এইভাবে কখনও অনুভব করেনি। তার মনে হচ্ছিল, চারপাশের মানুষগুলো যেন কেবল কোনও সংরক্ষিত তথ্যের অংশ নয়; তারা প্রত্যেকে নিজের নিজের আনন্দ, ব্যস্ততা আর অনুভূতি নিয়ে বেঁচে আছে।
হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল এক নারীর দিকে।
লালপাড় সাদা শাড়ি, কপালে বড় লাল টিপ, মাথার কাছে আলগা হয়ে আসা চুল। নারীটি একটু দূরে বসে আছেন। তাঁর মুখের দিকে তাকাতেই অনিকেতের বুকের ভিতর কেমন একটা অচেনা অনুভূতি জেগে উঠল। এই মুখ সে আগে দেখেছে। কোথায় দেখেছে, মনে করতে পারল না। তবু মুখের কোমল রেখা, চোখের চাহনি—সবকিছু যেন তাকে কোনও অজানা টানে কাছে ডাকছে।
তার মনে পড়ল সেই আলোকপ্রতিবিম্বের কথা, যে মুখটি সে কিছুক্ষণ আগে নিজের জন্য তৈরি করেছিল। এই নারীটির সঙ্গে সেই মুখের আশ্চর্য মিল আছে কি? নাকি তার মনই দুটো মুখের মধ্যে মিল খুঁজে নিচ্ছে?
অনিকেত ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।
নারীটির পাশে গিয়ে বসতেই তিনি তার দিকে তাকালেন। তারপর এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বললেন, যেন বহুদিনের চেনা কোনও মানুষকে দেখছেন—
“সারাদিন কোথায় ছিলি? অঞ্জলির সময় তোকে দেখলাম না!”
অনিকেত চুপ করে রইল।
কথাটা খুব সাধারণ। কিন্তু কেউ একজন তার অনুপস্থিতি লক্ষ করেছেন, তাকে খুঁজেছেন—এই অনুভূতিটুকুই যেন তার কাছে অবিশ্বাস্য। এত মানুষের ভিড়ে কেউ তার জন্য অপেক্ষা করেছেন, তার না-থাকাটা কারও চোখে পড়েছে।
নারীটি আবার বললেন, “কী হলো? কথা বলছিস না কেন?”
তারপর পূজামণ্ডপের দিকে তাকিয়ে একটু সরে বসলেন। চারপাশে তখন শান্তির জল দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে। নারীটি নিজের শাড়ির আঁচল টেনে অনিকেতের পা দুটো আলতো করে ঢেকে দিলেন।
“এইবার শান্তির জল হবে। দেখিস, পায়ে যেন না পড়ে।”
অনিকেত চুপ করে বসে রইল। কথাটা খুব সাধারণ, অথচ তার কানে কেমন অদ্ভুত শোনাল। কারণ এই প্রথম কেউ তার জন্য আলাদা করে কিছু করার কথা তাঁর মনে হয়েছে। কোনও নির্দেশ নেই, কোনও হিসাব নেই, কোনও প্রত্যাশা নেই—শুধু সামান্য একটু যত্ন।
নারীটি আবার পূজার দিকে মন দিলেন। চারপাশে শাঁখ বাজছে, উলুধ্বনি উঠছে, মানুষের কণ্ঠে মিশে যাচ্ছে মন্ত্রোচ্চারণ। অনিকেত স্থির হয়ে বসে রইল। তার পায়ের উপর তখনও মায়ের শাড়ির আঁচল। সে মুখ তুলে নারীটির দিকে তাকাল। তাঁর মুখে কোনও বিশেষ অভিব্যক্তি নেই, যেন এই যত্নটুকু খুব স্বাভাবিক, যেন ছেলেটির পা দুটো ঢেকে দেওয়া তাঁর কাছে এমনই এক সহজ কাজ, যা নিয়ে আলাদা করে ভাবারও কিছু নেই।
অথচ অনিকেতের কাছে এই মুহূর্তটি আর পাঁচটা মুহূর্তের মতো নয়।
তার জীবনে কোনও কিছুর অভাব ছিল না। যা চেয়েছে, পেয়েছে; যা জানতে চেয়েছে, জেনেছে; যা দেখতে চেয়েছে, প্রযুক্তি তার সামনে হাজির করেছে। অথচ এই প্রথম তার মনে হলো, এমন কিছু আছে, যা চাওয়ার ভাষা সে জানত না। এমন কিছু আছে, যার জন্য কোনও নির্দেশ দিতে হয় না, কোনও বৈশিষ্ট্য নির্দিষ্ট করতে হয় না। কেউ একজন নিজের থেকেই বুঝে নেন, তার কী প্রয়োজন।
ধীরে ধীরে চারপাশের দৃশ্য ঝাপসা হয়ে আসতে লাগল। মাইন্ড রিডারের নির্ধারিত সময় শেষ হয়ে আসছে। মানুষের মুখগুলো আলো-ছায়ায় মিশে যাচ্ছে, পূজামণ্ডপের রং ফিকে হয়ে আসছে। নারীটি তখনও তাঁর পাশে বসে আছেন। অনিকেত একবার আরও তাঁর মুখের দিকে তাকাতে চাইল, যেন এই মুখটুকু সে মনে রাখতে পারে। কিন্তু মনে রাখবে কী করে? তার নিজের কোনও স্মৃতি তো তৈরি হচ্ছে না, সে তো কেবল অন্যের স্মৃতির মধ্যে প্রবেশ করেছে।
পরমুহূর্তেই পর্দার সমস্ত আলো নিভে গেল।
অনিকেত ধীরে ধীরে চোখ খুলল। সে আবার ফিরে এসেছে ২১০১ সালের নিজের পরিচিত ঘরে। চারদিকে নিস্তব্ধতা। সামনে কোনও পূজামণ্ডপ নেই, শাঁখের শব্দ নেই, সেই নারীও নেই। কানের পিছনের মাইন্ড রিডারের সুইচটি নিষ্ক্রিয় হয়ে গেছে।
হঠাৎ তার পায়ের পাতায় কয়েক ফোঁটা জলের স্পর্শ অনুভব করল সে।
প্রথমে অবাক হয়ে নিচের দিকে তাকাল। ঘরের মেঝে শুকনো। কোথাও কোনও জল নেই। তবে তার পায়ে জল এল কোথা থেকে? একি শান্তির জল?
সে পায়ের দিকে আরও ভালো করে তাকাল। তারপর ধীরে ধীরে হাত দিয়ে নিজের চোখ ছুঁল।
তার আঙুলের ডগা ভিজে উঠল।
অনিকেত কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল। তারপর বুঝতে পারল, তার পায়ে যে জলের ফোঁটাগুলো পড়েছে, সেগুলো অন্য কোনও জলের ফোঁটা নয়। তার নিজের চোখ থেকে ঝরে পড়া অশ্রু।
সে কাঁদছে।
কিন্তু কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে সে মাইন্ড রিডারের দিকে হাত বাড়াল না। কোনও তথ্যভান্ডার খুলল না, কোনও বিশ্লেষণ চালাল না। শুধু নিজের ভেজা আঙুলের দিকে তাকিয়ে রইল। তার মস্তিষ্ক হয়তো এখনও এই অনুভূতির কোনও ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি। কোনও সংরক্ষিত তথ্যের সঙ্গে এর মিল খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। কোনও নির্দিষ্ট স্মৃতিও নেই, যার সঙ্গে এই মুহূর্তটিকে মিলিয়ে দেখা যায়।
অথচ তার চোখের জল সত্যি।
এর আগে সে আনন্দের তথ্য পেয়েছে, দুঃখের অভিজ্ঞতা দেখেছে, ভালোবাসার সংজ্ঞা পড়েছে। মানুষের হাসি, কান্না, বিচ্ছেদ, মিলন—সবকিছুরই ডিজিটাল রেকর্ড তার নাগালে। কিন্তু অনুভূতির জন্য তার নিজের চোখ থেকে কখনও জল ঝরেনি।
আজ প্রথমবার তার চোখের জল তার নিজের।

ঘরের নিস্তব্ধতার মধ্যে অনিকেত চোখ বন্ধ করল।
অনিকেতের মনে হঠাৎ একটা প্রশ্ন জেগে উঠল। এত সুন্দর অনুভূতি, এত নিবিড় সম্পর্কের বন্ধন—মানুষের জীবন থেকে সেগুলো হারিয়ে গেল কীভাবে? যে অনুভূতি এক মুহূর্তে তার চোখ ভিজিয়ে দিতে পারে, সেই অনুভূতির অস্তিত্বই বা মানুষ ভুলে গেল কেন?
উত্তর খুঁজতে সে আবার মাইন্ড রিডার অন করল। কিছুক্ষণ বাফারিংয়ের পর তার সামনে ভেসে উঠল—
INVALID ENQUIRY.
অনিকেত স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল। পৃথিবীর সমস্ত তথ্য, জ্ঞান আর স্মৃতি ধরে রাখার ব্যবস্থা যে প্রযুক্তি তৈরি করেছে, মানুষের হারিয়ে যাওয়া অনুভূতির প্রশ্নে সেই প্রযুক্তিই আজ নীরব।
ততক্ষণে তার চোখের জল গড়িয়ে পড়ছিল পায়ের ওপর। অনিকেত ধীরে ধীরে পা দুটো ঢেকে দিল। ফিরে পাওয়া অনুভূতিটুকু সে আর হারাতে চায় না।

whatsapp image 2026 10 24 at 7.55.04 pm

কমলিকা ভট্টাচার্য

পরিচিতি : কলকাতার শহরতলিতে জন্ম ও বেড়ে ওঠা। বিবাহের পর জীবনের নানা প্রয়োজনে ভারতের বিভিন্ন প্রান্তে এবং বিশ্বের বেশ কিছু জায়গায় বসবাস ও ভ্রমণের সুযোগ হয়েছে তাঁর। সেইসব যাত্রাপথ, পরিচিত মানুষ এবং সঞ্চিত অভিজ্ঞতা নীরবে সমৃদ্ধ করেছে তাঁর জীবনবোধ ও লেখার দৃষ্টিভঙ্গিকে।
পেশায় শিক্ষিকা, বর্তমানে তামিলনাড়ুর চেন্নাইয়ে বসবাস করেন। ব্যস্ত দৈনন্দিন জীবনের ফাঁকে যখনই একটু নিরিবিলি সময় পান, তখনই লিখতে বসেন। তাঁর কাছে লেখা জীবনের থেকে আলাদা কিছু নয়, বরং জীবনেরই এক স্বাভাবিক প্রকাশ। চারপাশের ছোট ছোট ঘটনা, মানুষের সঙ্গে পরিচয়, অনুভূতির সূক্ষ্ম ওঠাপড়া এবং হৃদয় ছুঁয়ে যাওয়া মুহূর্তগুলোই তাঁর কবিতা ও গল্পে সহজ, আন্তরিক ভাষায় প্রকাশ পায়। বাংলা ভাষার পাশাপাশি ইংরেজি ও হিন্দিতেও তিনি মূলত কবিতা লেখেন।
এ পর্যন্ত তাঁর তিনটি বাংলা কাব্যগ্রন্থ এবং একটি হাস্যরসাত্মক পারিবারিক গল্পসংকলন প্রকাশিত হয়েছে। গল্পসংকলনটির দ্বিতীয় সংস্করণ শীঘ্রই প্রকাশিত হতে চলেছে। তাঁর লেখা বিভিন্ন পত্রিকা, সাহিত্যপত্র ও অনলাইন সাহিত্যপত্রে প্রকাশিত হয়েছে। সহজ ভাষা, আন্তরিক অনুভব এবং জীবনের সঙ্গে গভীর সংযোগ তাঁর লেখার প্রধান বৈশিষ্ট্য।
শীঘ্রই প্রকাশিত হতে চলেছে তাঁর প্রথম কল্পবিজ্ঞানভিত্তিক মানবিক উপন্যাস, আরও একটি বাংলা কাব্যগ্রন্থ এবং তাঁর প্রথম ইংরেজি কবিতাসংকলন।
কবিতা, গল্প কিংবা উপন্যাস—সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমে তাঁর লেখালেখির মূল প্রেরণা একটিই—মানুষ, তার অনুভূতি এবং জীবনের নানা রং। আর সেই সৃষ্টির অন্তরালে রয়েছে তাঁর গভীর বিশ্বাস—জীবনের মূলমন্ত্র ভালোবাসা।

4 thoughts on “স্মৃতির লকার”

  1. কল্পবিজ্ঞান – মানবিকতা, আধুনিকতা – চিরন্তন মূল্যবোধের অসামান্য মেলবন্ধন।

  2. আহা কি সুন্দর লেখা। রোবট সব পারে। কিন্তু তার চোখের জল নেই। অশ্রুতেই মানুষের পরিচয়। আজকের প্রযুক্তি সারাক্ষণ হাতে হাতে জুগিয়ে দিচ্ছে সব। বলছে বি হ‍্যাপী। মাপা হচ্ছে হ‍্যাপিনেস ইনডেক্স।
    হারিয়ে যাচ্ছে মানুষের মনুষ‍্যত্ব। তার এক ফোঁটা টপ টু করে গড়িয়ে পড়া চোখের জল।
    লেখিকার লেখায় সেই অশ্রুর অশ্রুত শব্দ। অভিনন্দন।

  3. আমিতাভ

    গল্পটা টাইম মেশিনে ঘোরাফেরা করছে আবেগমিশ্রিত অনুভূতির সাথে। যেখানে কানের পাশে সুইচ টিপে জাগরণ হয় ভাবনার সেখানে সেসময় কি আজকের আবেগ থাকবে? এটা বড় প্রশ্ন কারণ বর্তমান প্রযুক্তির উন্নতিতেই মানুষের আবেগ অনেকটা ম্লান। এই সময়ে দাঁড়িয়ে ভাবা যায়না রোবটের চোখে জল কিন্তু প্রযুক্তি যদি সেটা করে ফেলে তাহলে তখন হয়তো চোখে জল আসতেও পারে। একসময় সিনেমায় গ্লিসারিন ব্যবহার হত ভুললে চলবেনা। কল্পগল্পে আজকের ভাবনাকেও ত্যাগ করে সেই সময়ে কল্পনাকে নিয়ে যেতে হবে শুধু সালের হিসেবে নয়, কল্পনাকেও এগোতে হবে সেটাই বিখ্যাত কল্পবিজ্ঞান লেখকেরা শিখিয়েছেন। তবে লেখায় গতি আছে

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top