মুকশিমপাড়া গ্রামের কিছু কথা
বিদ্যাধর মুখার্জী
পূর্বস্থলী ২নং ব্লকের অন্তর্গত মুকশিমপাড়া গ্রাম-পঞ্চায়েতাধীন মুকশিমপাড়া একটি প্রান্তিক গ্রাম। গ্রামটিতে যেতে গেলে পাটুলী স্টেশনে নেমে অটোতে যাওয়া যায়। গ্রামের পূর্বদিকে গাঁ বাগান, পশ্চিমে বিস্তীর্ণ মাঠের পর হাল্দিপাড়া গ্ৰাম-এর সংলগ্ন খড়ি নদী-ওপারে মন্তেশ্বর থানার অন্তর্গত সমসপুর গ্রাম, দক্ষিণ পশ্চিম ও দক্ষিণে ইসবপুর, দক্ষিণ পূর্বে বারোরপাড়া, উত্তরে মানমোষপাড়া,তারপরেই বুড়োরাজ তথা ধর্মরাজ মন্দিরখ্যাত গ্রাম জামালপুর। আজ পর্যন্ত এটি সম্পূর্ণ হিন্দু অধ্যুষিত গ্রাম, গ্রামের চার প্রান্তে-বাউরি পাড়া, বাগ পাড়া, সাঁওতাল পাড়া, হাজরা অর্থাৎ হাড়ী সম্প্রদায়। মাঝখানে আছে মুখার্জী, চ্যাটার্জী, ভট্টাচার্য, হালদার (এঁরা বাবু’ অর্থাৎ জমিদার, ব্যানার্জী-হালদার পাওয়া উপাধি ) – আছে কর্মকার, বৈরাগ্য, দাস , পাল, বিশ্বাস, ঘোষ, মন্ডল, বন্ধু ইত্যাদি। এখন বাউরি ও বাগদি সম্প্রদায়ই সমধিক। গ্রামটি থেকে বহু মানুষ ভারতবর্ষ তথা বিদেশের বিভিন্ন শহরে বাস করেন, বাইরে থাকা শুধু মুখার্জীরাই এসে জড়ো হলে তারা একটি গ্রাম তৈরী হতে পারে।
স্বাধীনতার বহু বছর আগে থেকেই গ্রামটির জাঁকজমক ছিল চোখে পড়ার মত , তুলনায় পার্শ্ববর্তী গ্ৰামগুলি ছিল দীন-হীন-মলিন-বিবর্ণ ৷ আজ কিছুটা উল্টো চেহারা। তাই গ্ৰামটিতে নেই কোন হাসপাতাল (স্বাস্থ্যব্যবস্থা ) নেই বাজার, নেই রেশন দোকান, ওষুধের দোকান, মিষ্টির দোকান ইত্যাদি একসময়ে প্রায় সবই ছিল। ছিল যাত্রাদল, ফুটবল টিম-নিজস্ব ড্রেস ইত্যাদি সহ সবকিছু। গান-বাজনা, উৎসবের সমারোহ, প্রশাসনিক স্তর থেকে নেতৃস্থানীয় মানুষের আনাগোনা, গ্রামের শিক্ষিত মানুষদের যাতায়াত।
এই ‘নেই’-এর রাজত্বে এখনও যা আছে তা হল-জমিদারবাড়ির বিশাল ভগ্নদশায় থাকা বাড়িগুলি, একটি প্রকান্ত অট্টালিকা যেটির গঠনশৈলী, চমৎকারিত্ব চোখে লাগার মতো-এখন অনেক অংশ ধূলিসাৎ তবুও যেটুকু ভগ্নভবন আছে সেখানেই ২৫০ বছর আগে শুরু হওয়া দুর্গাপুজো আজও হয়। গ্রামবাসীদের দুপুরে প্রসাদসহ অন্নভোজের নিমন্ত্রণ থাকে, এখনও অষ্টমীতে সন্ধিপুজো শুরু হয় বন্দুকের গুলির আওয়াজে। ভবনটির আশেপাশে আছে তিনটি বড় শিবমন্দির, যে গুলিতে এক-কালে পাঁজিতে নাম থাকা টোলের পন্ডিতদের বংশধর ভট্টাচার্যেরা আজও প্রতিদিন নিয়মমাফিক পুজো করে থাকেন ৷ সর্বাধিক পুরানো একটি ধূলিসাৎ হয়ে যাওয়া চণ্ডীমণ্ডপ এখন সংস্কার হয়েছে- এটিও হাল্দারপাড়া তথা বাবুদের পাড়াতেই আছে, যদিও মূল বাবুরা গ্রামে থাকেন না, দুর্গাপুজোর কয়েকদিন আগে আসেন। গ্ৰামে আছে মনসা মন্দির, রাস্তার মোড়ে গড়ে ওঠা শনি-মন্দির। গ্ৰামের অন্যদিকে প্রাচীনকাল থেকে পুজো হয়ে আসা মনসাতলায় আর একটি মনসামন্দির হচ্ছে। গ্ৰাম্যপুজো থেকে উৎসবে পরিণত হয়েছে অম্বুবাচী পুজো ৷ গ্রামের পশ্চিমপ্রান্তে একটি কালীতলায় সুবিশাল বটগাছের নীচে, একটিই পুজো ছিল, পার্শ্ববর্তী গ্ৰামের পুজোও আসতো মাথায় মইয়ে সাজিয়ে, এখনও জাঁকজমক ভালই আছে তবে পাড়ায় পাড়ায় কয়েকটি অম্বুবাচী পুজো হচ্ছে । আছে গ্রামের মাঝে বহু প্রাচীনছোট শিবমন্দির যেটি মুখার্জীরা সংস্কার করে রেখেছে। রামকৃষ্ণ-মিশনের মহারাজদের মাঝে মাঝে গ্ৰামে এনে রামকৃষ্ণ জন্মোৎসবের সঙ্গে সেবাকাজ শুরু হয়েছে-এজন্য রামকৃষ্ণ সেবাশ্রম তৈরী হচ্ছে। এটি পূর্বস্থলী ২নং ব্লকের মধ্যে প্রথম উদ্যোগ।
গ্ৰামে আছে অনেককাল আগে শ্রদ্ধেয় নারায়ন মুখার্জীর প্রচেষ্টায় তৈরি হওয়া পোস্ট অফিস, আছে মুখার্জীদের জায়গায় প্রাচীন প্রাথমিক বিদ্যালয় ও জুনিয়র হাই স্কুল (১৬ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত)। সব মিলিয়ে ক্ষয়িষ্ণু গ্রামটির উন্নয়নের চেষ্টা হচ্ছে। শুধু প্রশাসনের আর একটু নজরদারি দরকার।
বিদ্যাধর মুখোপাধ্যায়
পরিচিতি — বিদ্যাধর মুখোপাধ্যায় পেশায় ছিলেন বিদ্যালয় পরিদর্শক ৷ কর্মসূত্রে অনেক বছর কাটিয়েছিলেন উত্তরবঙ্গে ৷ বর্তমানে অবসর গ্রহণের পর ইতিহাস গবেষক হিসাবে বেশ মনোযোগ সহকারে কাজ করছেন ৷ মুকশিমপাড়া তাঁর নিজের গ্রাম ৷ বিভিন্ন পত্রিকাতে তিনি মুকশিমপাড়ার কথা লিখেছেন এবং সর্বতভাবে এই গ্রামের উন্নতির জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন ৷ ৷
বর্তমানে তিনি পরিবার সহ পূর্ববর্ধমান জেলার কালনাতে থাকছেন ৷

খুব সুন্দর লিখেছো। আমাদের সময়ে গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থা এত ভালো ছিল। মনে পড়ে লোহার ফ্রেমে কাঠের সেই চেয়ার মাস্টার মশাই দের বসার জন্য। বিরাট আকারের কাঠের টেবিল যার পিছনে আমার দাদু স্বর্গীয় শ্রী নিরাপদ ভট্টাচার্য ( কাব্য ব্যকরণ স্মৃতি তীর্থ ) হেডমাস্টারের দায়িত্বে বিরাজমান হতেন । তবে বিশেষ ভাবে একজন মাস্টার মশাই এর নাম না বললেই নয়, স্বর্গীয় হরেন্দ্র নাথ হালদার। কঠোর অনুশাসন ছিল। উনি যে ঘরে বসতেন সেই ঘরের পাশ দিয়ে যেতে আমরা ভয় পেতাম। আরো অনেক ঐতিহ্য এই গ্রামটি ঘিরে আছে।