মৃত্যু সংবাদ

অয়ন মুখোপাধ্যায়


 

whatsapp image 2026 09 30 at 8.59.41 pm
অঙ্কন - হিরণ মিত্র।

নিজের মৃত্যুসংবাদ পড়ার সময় আমি ডিমসেদ্ধ খাচ্ছিলাম।

ডিমে তখনও নুন দিইনি। কাগজের তৃতীয় পাতার নীচে আমার ছবি—চোখে মোটা ফ্রেমের চশমা, গলায় মফস্‌সলের এক সাহিত্যসভা থেকে পাওয়া উত্তরীয়। ছবির নীচে বড় অক্ষরে লিখেছে—

“বিশিষ্ট কবি, নাট্যকর্মী ও সমাজসেবী অনিরুদ্ধ পাল আর নেই।”

ছবিটা আমার। নামটাও। শুধু ‘বিশিষ্ট’ শব্দটি জীবনে প্রথম আমার নামের আগে বসল, আর ‘আর নেই’ কথাটা একটু তাড়াহুড়ো করল।

কাগজটা মায়ের সামনে মেলে ধরলাম।

মা খবরটি পড়ে প্রথমে আমার মুখ, তারপর হাতের ডিমটার দিকে তাকাল।

বলল, ‘মরা মানুষ সকালে ডিম খায়?’

‘কাগজ যখন মেরে ফেলেছে, নিশ্চয়ই খায়।’

মা আবার খবরটি পড়ল। তারপর বলল, ‘বয়সটা ভুল লিখেছে।’

আমার মৃত্যু নয়, বয়সের ভুলটাই তাকে বেশি বিচলিত করল।

কাগজ আমার বয়স লিখেছে বাষট্টি। আমার আটচল্লিশ। অবশ্য ছবিতে আমাকে দেখে বাষট্টি ভাবলে কাগজকে পুরো দোষ দিতে পারি না। গত পঁচিশ বছর অন্যের লেখা ঠিক করতে করতে আমার চুল নিজের রং ভুলে গেছে।

আমি ‘জনপদের কথা’ নামে একটি সাপ্তাহিক কাগজে প্রুফ দেখি। আমার পদের কোনো স্থির নাম নেই। সম্পাদক বিশ্বম্ভরবাবু আমাকে কখনও সহকারী সম্পাদক, কখনও অফিসের লোক, কখনও ‘ওই যে অনিরুদ্ধ’ বলে পরিচয় করিয়ে দেন। পুজোর বিজ্ঞাপন তুলতে গেলে আমি তাঁর সহযোদ্ধা; পাওনা চাইলে খণ্ডকালীন কর্মী।

সপ্তাহে তিন দিন বিকেলে অফিসে যাই। খবরের বানান দেখি, মৃত মানুষের নামের পাশে ফুলের চিহ্ন বসাই, নেতাদের বিবৃতি থেকে বাড়তি বিস্ময়চিহ্ন কাটি। কোনো নেতা লিখলে, ‘এ মৃত্যু সমাজের অপূরণীয় ক্ষতি!!!’—আমি তিনটির মধ্যে দুটি বিস্ময়চিহ্ন বাদ দিই। মানুষ মরার পরেও তার জন্য একটি বিস্ময়চিহ্ন যথেষ্ট বলে আমার বিশ্বাস।

আজ সেই কাগজ আমার জীবনটাই ভুল ছেপেছে।

খবরের বাকি অংশ পড়লাম—

“প্রয়াত অনিরুদ্ধ পাল আজীবন মানুষের অধিকার রক্ষার সংগ্রামে যুক্ত ছিলেন। জরুরি অবস্থার সময় তিনি কারাবরণ করেন। সিঙ্গুর-নন্দীগ্রাম আন্দোলনেও তাঁর ভূমিকা স্মরণীয়। একাধিক কাব্যগ্রন্থের রচয়িতা অনিরুদ্ধবাবু ছিলেন আপসহীন সাংস্কৃতিক যোদ্ধা। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী, এক পুত্র ও অসংখ্য গুণমুগ্ধ রেখে গেলেন।”

জরুরি অবস্থার সময় আমি মায়ের কোলে। কারাবরণ দূরের কথা, স্কুলে একবার হেডমাস্টার ঘরে ডাকায় আমার জ্বর এসেছিল। আমার কোনো কাব্যগ্রন্থও নেই। ষোলো বছর আগে একটা কবিতার বই ছাপানোর জন্য এক প্রকাশককে পাঁচ হাজার টাকা দিয়েছিলাম। লোকটি প্রথমে টাকা নিয়ে কলকাতা ছাড়ল, পরে বাংলা সাহিত্য থেকেই উধাও হয়ে গেল।

আমার স্ত্রী নেই, পুত্রও নেই। আর গুণমুগ্ধের সংখ্যা মানুষ সাধারণত নিজের মৃত্যুর পরেই জানতে পারে।

মা বলল, ‘কাগজের অফিসে ফোন কর।’

বিশ্বম্ভরবাবু ফোন ধরলেন না। দু-মিনিট পরে মেসেজ পাঠালেন—

“জরুরি মিটিংয়ে আছি। পরে করছি।”

আমি লিখলাম—

“আমি মারা গেছি।”

সঙ্গে সঙ্গে তিনি ফোন করলেন।

‘কে বলছেন?’

‘মৃত অনিরুদ্ধ পাল।’

ও-পাশে কিছুক্ষণ নীরবতা।

তারপর তিনি বললেন, ‘অনিরুদ্ধ, তুমি কোথা থেকে কথা বলছ?’

‘রান্নাঘর থেকে।’

‘মানে তুমি বেঁচে আছ?’

‘এখনও পর্যন্ত।’

তিনি এমনভাবে দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, যেন আমার বেঁচে থাকা তাঁর দিনের সবচেয়ে বড় বিপদ।

বললেন, ‘সর্বনাশ হয়ে গেছে।’

‘আমার, না আপনার?’

‘কাগজের! এরপর লোকে আমাদের বিশ্বাস করবে?’

‘আমার জীবনটারও তো একটা দাম ছিল, বিশ্বম্ভরবাবু।’

তিনি জানালেন, পাশের ব্লকের অনিরুদ্ধ পাল নামে এক প্রবীণ রাজনৈতিক কর্মী মারা গেছেন। একই নাম দেখে কম্পিউটার চালানো ছেলেটি ফেসবুক থেকে আমার ছবি তুলে দিয়েছে। পুরনো কয়েকটি স্মরণসংখ্যা কেটে-ছেঁটে সে লেখাটাও বানিয়েছে।

বললাম, ‘পরের সংখ্যায় ভুলটা শুধরে দেবেন।’

‘দেব। নিশ্চয়ই দেব। তবে আজ বিকেলে অফিসে এসো। সামনাসামনি কথা বলব।’

ফোন রাখতেই উঠোনে কান্নার শব্দ শুনলাম। প্রতিবেশী রেবা কাকিমা ছুটে আসছেন। তাঁর পিছনে আরও দুজন মহিলা।

দরজায় আমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি চিৎকার করে উঠলেন—

‘ও মা গো!’

বললাম, ‘ভয় পাবেন না। কাগজ ভুল লিখেছে।’

তিনি বুকের উপর হাত রেখে কিছুক্ষণ হাঁপালেন। তারপর মাকে বললেন, ‘আমি জানতাম, মানুষটা এত ভালো—এভাবে চলে যেতে পারে না।’

জীবিত অবস্থায় রেবা কাকিমা আমাকে ‘অপয়া’ বলতেন। একদিন তাঁর বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় কালো বিড়াল রাস্তা কেটেছিল। বিড়ালটিকে ধরতে না পেরে তিনি আমার ঘাড়ে দোষ চাপিয়েছিলেন।

পনেরো মিনিটের মধ্যে উঠোনে ভিড় জমল। কেউ আমার হাত ছুঁয়ে দেখল, কেউ বুকে হাত রেখে ধুকপুকুনি খুঁজল। নিতাইদা বলল, ‘জীবিত অবস্থায় মৃত্যুসংবাদ বেরোনো ভালো লক্ষণ নয়।’

‘মরে যাওয়ার পরে বেরোলে ভালো হত?’

নিতাইদা রসিকতা বুঝল না। বলল, ‘একজন জ্যোতিষীকে দেখাও।’

পাড়ার ক্লাবের সম্পাদক বাবাই সবার শেষে এল। আমার দিকে না তাকিয়ে মাকে বলল, ‘কাকিমা, চিন্তা করবেন না। আমরা পাশে আছি।’

বললাম, ‘আমি এ-পাশেই দাঁড়িয়ে আছি।’

বাবাই এবার আমার দিকে তাকাল। তার মুখে স্বস্তির চেয়ে হতাশা বেশি। সকালেই সে ক্লাবের ফেসবুক পেজে আমার ছবির উপর রজনীগন্ধার মালা বসিয়ে পোস্ট করেছে—“তোমার মৃত্যুতে আমরা শোকাহত।” চল্লিশ মিনিটে একশো সাতাশটি প্রতিক্রিয়া এসেছে। ক্লাবের পেজে এত সাড়া আগে শুধু বিরিয়ানি বিতরণের সময় উঠেছিল।

বাবাই বলল, ‘পোস্টটা মুছে দিচ্ছি।’

‘থাক।’

‘কেন?’

‘জীবনে প্রথম মালা পেয়েছি। ঘণ্টাখানেক থাক।’

দুপুরের মধ্যে আমার মৃত্যুসংবাদ সাতটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপ ঘুরে ফেলল। যারা আমাকে কোনোদিন ফোন করেনি, তারা মাকে ফোন করে জানতে চাইল—শেষ মুহূর্তে আমি কিছু বলে গেছি কি না। মা বিরক্ত হয়ে একজনকে বলল, ‘বলে গেছে, দুপুরে মাছের ঝোলে নুন কম দিতে।’

বিকেল তিনটেয় বাবাই আবার এল।

‘অনিরুদ্ধদা, একটা সমস্যা হয়েছে।’

‘আবার মরেছি?’

‘আজ সন্ধ্যায় ক্লাব তোমার স্মরণসভা ডেকেছে।’

‘আমি তো বেঁচে আছি।’

‘জানি। কিন্তু আমরা হল নিয়েছি, মাইকওয়ালাকে টাকা দিয়েছি, পোস্টারও ছাপিয়েছি। প্রধান অতিথিও রাজি।’

‘তা হলে?’

‘তুমি সন্ধ্যাটা বাড়িতে থাকো। কাল আমরা ভুলটা জানিয়ে দেব।’

‘আমার স্মরণসভায় আমিই যেতে পারব না?’

‘তুমি গেলে লোকে হাসবে।’

‘না গেলে?’

‘অনুষ্ঠানটা সম্মানের সঙ্গে শেষ হবে।’

‘আমার সম্মান বাঁচাতে আমাকে লুকিয়ে থাকতে হবে?’

বাবাই দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

‘তুমি শুধু নিজের দিকটা ভাবছ, অনিরুদ্ধদা।’

নিজের মৃত্যুসংবাদ আর কার দিক থেকে ভাবতে হয়, বুঝলাম না।

সন্ধ্যা ছ’টায় মাথায় হনুমানটুপি আর গায়ে বাবার পুরনো চাদর জড়িয়ে নিজের স্মরণসভায় গেলাম।

হলটির নাম ‘জনকল্যাণ ভবন’। যে দাতব্য চিকিৎসালয়ের জন্য পঞ্চায়েত ভবনটি বানিয়েছিল, সেটি বারো বছর আগে দরজা বন্ধ করেছে। এখন সেখানে বিয়ে, অন্নপ্রাশন, রাজনৈতিক সভা, যোগব্যায়াম এবং মৃত মানুষের স্মরণসভা বসে।

মঞ্চের মাঝখানে আমার বড় ছবি। ফ্রেমে রজনীগন্ধার মালা। নীচে ধূপ জ্বলছে। ধোঁয়া মাঝে মাঝে ছবির চোখদুটো ঢেকে দিচ্ছে।

জীবনে কেউ আমার মুখের দিকে ভালো করে তাকায়নি। মরার খবর শুনেই সবাই সেই মুখ বড় করে মঞ্চে তুলে দিয়েছে।

পিছনের সারিতে বসলাম।

সভাপতি আমার সম্পর্কে বলতে উঠে প্রথমেই নাম ভুল করলেন।

‘প্রয়াত অনির্বাণবাবু—’

বাবাই পাশ থেকে শুধরে দিল, ‘অনিরুদ্ধ।’

সভাপতি বললেন, ‘হ্যাঁ, প্রয়াত অনিরুদ্ধবাবুর সঙ্গে আমার দীর্ঘ চল্লিশ বছরের পরিচয়।’

তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম কথা হয়েছিল গত বছর। পঞ্চায়েতের স্মরণিকায় তাঁর লেখা ‘উন্নয়ণ’ শব্দটি কেটে আমি ‘উন্নয়ন’ লিখেছিলাম। তিনি ফোন করে জানতে চেয়েছিলেন, তাঁর লেখায় হাত দেওয়ার অধিকার আমাকে কে দিয়েছে।

আজ তিনি বললেন, ‘মানুষটি ছিলেন আমার অন্তরঙ্গ বন্ধু।’

তারপর কবি নীলোৎপল মাইতি ঘোষণা করলেন, বাংলা কবিতা আমার মৃত্যুতে একটি শক্তিশালী কণ্ঠ হারাল। তিনি আমার অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি উদ্ধার করে ছাপানোর দাবিও তুললেন।

পাশের লোকটি ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল, ‘ওঁর কবিতা পড়েছেন?’

বললাম, ‘একটাও না।’

‘আমিও না। নিশ্চয়ই খুব উঁচু মানের লিখতেন।’

‘কী করে বুঝলেন?’

‘কেউ বোঝেনি বলেই।’

তৃতীয় বক্তা আমাকে সমাজকর্মী বানালেন। চতুর্থ বক্তা বললেন, আমি নাকি প্রচার এড়িয়ে চলতাম। কথাটা পুরো মিথ্যেও নয়। লোকজন ডাকলেও মঞ্চে উঠিনি; কেউ না ডাকলে পিছনের চেয়ারে বসে থেকেছি।

এরপর সংগঠনের সম্পাদক ঘোষণা করলেন, আগামী বছর থেকে তাঁরা ‘অনিরুদ্ধ পাল স্মৃতি সম্মান’ চালু করবেন। বিজয়ী পাবেন উত্তরীয়, স্মারক এবং পাঁচশো টাকার বই।

জীবিত অবস্থায় যে সংগঠনের পত্রিকায় আমার লেখা তিন বছর ধরে জায়গা পায়নি, মৃত্যুর পরে সেই সংগঠন আমার নামে পুরস্কার দেবে।

তারপর ঘোষক বললেন, ‘এবার প্রয়াত কবির স্মৃতিচারণ করবেন বিশিষ্ট শিক্ষিকা মাধুরী সেন।’

বুকের মধ্যে পুরনো একটা দরজা নড়ে উঠল।

বাইশ বছর আগে আমরা একসঙ্গে নাটক করতাম। মাধুরী অভিনয় করত, আমি প্রম্পট করতাম। নাটকের বাইরেও আমাদের সম্পর্কটা অনেকটা তেমন ছিল—ও আলোয় দাঁড়াত, আমি আড়াল থেকে সংলাপ মনে করিয়ে দিতাম।

এক বর্ষার রাতে মহড়া শেষে মাধুরী জিজ্ঞেস করেছিল, ‘তুমি কোনোদিন নিজের কথা বলবে?’

বলেছিলাম, ‘বলতে গেলেই সংলাপ ভুলে যাই।’

ও বলেছিল, ‘অন্যের সংলাপ মনে করিয়ে দাও, নিজেরটা মনে থাকে না?’

তারপর মাধুরীর বিয়ে হয়ে গেল। আমি ওর নিমন্ত্রণপত্রের বানান দেখে দিয়েছিলাম।

বাইশ বছর পরে নিজের স্মরণসভায় আবার ওকে দেখলাম।

মাধুরী মাইকের সামনে কিছুক্ষণ আমার ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর বলল, ‘অনিরুদ্ধ খুব সাধারণ মানুষ ছিল।’

সভায় চাপা গুঞ্জন উঠল।

মাধুরী বলল, ‘ও ভয় পেত। মঞ্চে উঠতে ভয়, নিজের লেখা কাউকে পড়াতে ভয়, ভালোবাসার কথা বলতে ভয়। এমনকী রাগ করতেও ভয় পেত। আমরা বড় বড় কথা বলতাম, ও চুপ করে আমাদের ভুল বানান ঠিক করত।’

এতক্ষণে মৃত মানুষটির মধ্যে নিজেকে সামান্য চিনতে পারলাম।

মাধুরী বলল, ‘একটা নাটকে ওর একটিমাত্র সংলাপ ছিল—“আমি এসেছি।” মহড়ায় ঠিক বলত। অভিনয়ের দিন পর্দা উঠতেই সব ভুলে গেল। দর্শক হাসছিল। আমি আড়াল থেকে বললাম, “বল, আমি এসেছি।” অনিরুদ্ধ তখন বলেছিল, “না, আসতে পারিনি।”’

সামনের সারিতে কয়েকজন হেসে উঠল। মাধুরী হাসল না।

‘সেদিন ও ভুল বলেনি। আমাদের অনেকেই সারাজীবন হাঁটি, অথচ যেখানে পৌঁছতে চাই, সেখানে পৌঁছই না।’

চাদরের নীচে আমার হাত কাঁপছিল।

মাধুরী ছবির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘অনিরুদ্ধ, জীবিত থাকতে নিজের কথা বললে আজ আমাদের তোমার হয়ে এত কথা বানাতে হত না।’

আমি উঠে দাঁড়ালাম।

বাবাই আমাকে চিনে ছুটে এল।

‘এখন নয়, অনিরুদ্ধদা! অনুষ্ঠানটা শেষ হতে দাও।’

‘শেষ তো হয়েই গেছে।’

‘লোকে কী বলবে?’

‘এতক্ষণ তো বলল।’

তার হাত ছাড়িয়ে মঞ্চে উঠলাম। হনুমানটুপি খুলতেই একজন মহিলা চিৎকার করলেন, ‘ভূত!’ সভাপতি পিছনের দরজার দিকে সরে গেলেন। অনেকে মোবাইল তুলে ভিডিও করতে শুরু করল।

শুধু মাধুরী দাঁড়িয়ে রইল।

মাইকের সামনে গিয়ে বললাম, ‘ভয় পাবেন না। কাগজ ভুল করেছে। আমি এখনও মরিনি।’

পিছন থেকে কেউ বলল, ‘তা হলে মালাটা খুলুন!’

আরেকজন বলল, ‘আগে প্রমাণ দিন।’

হেসে ফেললাম।

‘বেঁচে থাকারও প্রমাণ লাগে?’

নীলোৎপলবাবু মাইক কেড়ে নিতে এসে বললেন, ‘মানুষ এতক্ষণ আপনার জন্য কাঁদল, আর আপনি এসে সবটা হাসির খোরাক করে দিলেন!’

‘আমার মৃত্যুর অনুষ্ঠানে আমি এসে পড়েছি—এটাই সমস্যা?’

তিনি উত্তর দিলেন না।

সভায় বসা মানুষগুলোর দিকে তাকালাম। এঁরা যে মৃত মানুষটির প্রশংসা করছিলেন, সে আমি নই। আবার সামনে দাঁড়ানো জীবিত লোকটিকেও তাঁরা বিশেষ পছন্দ করছেন না। মৃত মানুষটি তাঁদের কাজে লাগছিল; জীবিত মানুষটি অনুষ্ঠান নষ্ট করছে।

বললাম, ‘আমি জেলে যাইনি। আন্দোলনের নেতা ছিলাম না। আমার কোনো কাব্যগ্রন্থও নেই। স্ত্রী-পুত্র নেই। আমি একটা ছোট কাগজে অন্যের ভুল ঠিক করি। আজ সেই কাগজ আমার জীবনটাই ভুল ছেপেছে।’

সবাই চুপ করল।

‘আমি নিজের কথা বলিনি বলেই আজ আপনারা আমার হয়ে গল্প বানাতে পারছেন। সব দোষ আপনাদের নয়। খালি কাগজটা আমিই সামনে রেখেছিলাম।’

মাধুরীর দিকে তাকালাম।

ও আমার সামনে এসে বলল, ‘বাইশ বছর পরে আজ তোমার গলাটা শুনলাম।’

‘আবার ভুল বললাম না তো?’

‘না। আজ প্রথম নিজের সংলাপ বললে।’

বিশ্বম্ভরবাবু কখন হলে ঢুকেছেন, খেয়াল করিনি। তিনি মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ভুল হয়েছে, অনিরুদ্ধ। পরের সংখ্যায় আমরা শুধরে দেব।’

‘কী লিখবেন?’

‘অনিচ্ছাকৃত ত্রুটির জন্য আমরা দুঃখিত।’

‘তারপর?’

‘আমরা ভুল করে অন্য ব্যক্তির ছবি ছেপেছি।’

‘ছবিটা ভুল নয়, বিশ্বম্ভরবাবু। মানুষটা ভুল।’

তিনি চুপ করে গেলেন।

সভা আর এগোল না। কেউ আমার সঙ্গে ছবি তুলতে চাইল, কেউ বলল ঘটনাটা ভাইরাল হবে। যে ক্লাব কিছুক্ষণ আগে আমার স্মৃতি রক্ষার শপথ নিয়েছিল, তারা এখন লাইভ ভিডিওর ভিউ গুনতে ব্যস্ত।

সবাই চলে গেলে নিজের ছবির সামনে দাঁড়ালাম। রজনীগন্ধার মালা তখনও ঝুলছে।

মাধুরী বলল, ‘মালাটা খুলবে না?’

‘থাক। জীবনে প্রথম কেউ মালা দিয়েছে।’

ও হেসে ফেলল। আমিও হাসলাম।

‘চা খাবে?’ মাধুরী জিজ্ঞেস করল।

‘মৃত্যুর পরে?’

‘মৃত্যুর পরে মানুষ অমর হয়ে যায় শুনেছি। চা খেতে পারবে না কেন?’

বাইরে হালকা বৃষ্টি শুরু হয়েছে। আমরা পাশাপাশি হল থেকে বেরোলাম। বাইশ বছর আগে মহড়া শেষে যেমন বেরোতাম। তখন আমার অনেক কথা ছিল, সাহস ছিল না। আজ সাহস সামান্য এসেছে; কথাগুলো বুড়িয়ে গেছে।

রাস্তার মোড়ে মাধুরী বলল, ‘কাল ফোন করব।’

‘তোমার নম্বর তো নেই।’

ও আমার মৃত্যুসংবাদের কাগজটি নিয়ে ছবির পাশে নম্বর লিখে দিল।

‘এবার হারিয়ো না।’

‘কাগজটা?’

‘নিজেকে।’

মাধুরী বৃষ্টির ভিতর চলে গেল।

জল পড়ে কাগজের ছবিটা ঝাপসা হয়ে এল। আমার মুখ মুছে গেল, নীচে নামটি স্পষ্ট রইল—অনিরুদ্ধ পাল।

পরদিন অফিসে গিয়ে সংশোধনের প্রুফ আমি নিজেই দেখলাম—

“গত সংখ্যায় প্রয়াত সমাজকর্মী অনিরুদ্ধ পালের স্থানে আমরা ভুল করে অন্য ব্যক্তির ছবি ছেপেছি। এই ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত।”

জিজ্ঞেস করলাম, ‘যিনি সত্যিই মারা গেছেন, তাঁর ছবি কোথায়?’

বিশ্বম্ভরবাবু কম্পিউটারের ফাইল ঘাঁটতে ঘাঁটতে বললেন, ‘পাইনি।’

‘তাঁর বাড়ির লোক?’

‘কেউ যোগাযোগ করেনি।’

‘আপনারা খুঁজেছেন?’

বিশ্বম্ভরবাবু বিরক্ত হলেন।

‘সময় কোথায়? ছবি নেই, কী ছাপব?’

লাল কলম দিয়ে শেষ লাইনের নীচে লিখলাম—

“যে মানুষটি মারা গেছেন, আমরা এখনও তাঁর মুখ ও জীবনের খোঁজ পাইনি।”

বিশ্বম্ভরবাবু বললেন, ‘লাইনটা বড় হয়ে যাচ্ছে।’

আমি প্রুফের মার্জিন বাড়িয়ে দিলাম।

বললাম, ‘লোকটা মরেছে বলে তার নামটাও কেড়ে নেবেন?’

সেই শুক্রবার কাগজ সংশোধন ছাপল। পাঠকেরা জানল, আমি বেঁচে আছি। কিন্তু কাগজের কেউ সত্যিকারের মৃত মানুষটিকে খুঁজতে বেরোল না।

মাধুরীর নম্বরটা তখনও আমার মৃত্যুসংবাদের পাশে লেখা। দুবার ফোন হাতে নিয়েছি। প্রথমবার অফিসের কাজ এসে পড়ল। দ্বিতীয়বার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে দেখলাম, রাত অনেক। ফোনটা রেখে দিলাম। ভাবলাম, রবিবার সকালে কথা বলব। বাইশ বছর যখন কেটে গেছে, দুটো দিনে আর কী হবে!

রবিবার সকালে মা চায়ের পাশে কাগজটা রেখে বলল, ‘তোর সেই মাধুরী সেন না?’

কাপ নামিয়ে কাগজের দিকে তাকালাম।

তৃতীয় পাতার নীচে ছোট একটি মৃত্যুসংবাদ—

“বিশিষ্ট শিক্ষিকা ও নাট্যকর্মী মাধুরী সেন আর নেই।”

এবার কাগজ ঠিক ছবি ছেপেছে। নামটাও ঠিক।

শনিবার গভীর রাতে হৃদ্‌রোগ মাধুরীকে কেড়ে নিয়েছে।

ফোন বার করে নম্বরটা টিপলাম। বহুক্ষণ রিং বাজল। শেষে একটি কিশোর ফোন ধরল।

‘কাকে চাইছেন?’

মাধুরীর নাম বলতে গিয়েও পারলাম না।

ছেলেটি আবার বলল, ‘হ্যালো, কাকে চাইছেন?’

বললাম, ‘ভুল নম্বর।’

ফোন কেটে দিলাম।

মা জিজ্ঞেস করল, ‘ভুল নম্বর বললি কেন?’

‘যাকে চেয়েছিলাম, সে আর এই নম্বরে থাকে না।’

মৃত্যুসংবাদ দুটো পাশাপাশি রাখলাম। একটায় আমার নাম ও বৃষ্টিতে মুছে যাওয়া মুখ। অন্যটায় মাধুরীর স্পষ্ট মুখ, নীচে নির্ভুল নাম।

কাগজ ভুল করে আমাকে মেরেছিল, তাই নিজের স্মরণসভায় পৌঁছতে পেরেছিলাম। মাধুরীর সংবাদে কাগজ কোনো ভুল করেনি। এবার আমি যত তাড়াতাড়িই ছুটি, ওর কাছে আর পৌঁছতে পারব না।

দুপুরে অফিসে গিয়ে মাধুরীর মৃত্যুসংবাদের প্রুফ খুললাম। বিশ্বম্ভরবাবু লিখেছেন—

“তাঁর মৃত্যুতে এলাকার সাংস্কৃতিক জগতে এক অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি হয়েছে।”

‘অপূরণীয় শূন্যতার সৃষ্টি’ কথাগুলো লাল কলমে কেটে দিলাম।

বিশ্বম্ভরবাবু বললেন, ‘কী হল?’

নতুন করে লিখলাম—

“মাধুরী সেন চলে গেলেন। আমি কয়েকটি কথা সময়মতো তাঁকে বলিনি।”

বিশ্বম্ভরবাবু পড়ে আমার দিকে তাকালেন।

‘মৃত্যুসংবাদে নিজের কথা ঢোকাচ্ছ?’

‘আমারই তো ভুল।’

‘পাঠক তোমার কথা জানবে কেন?’

কোনো উত্তর দিতে পারলাম না।

‘আমি’ শব্দটির নীচে লাল দাগ টানলাম। তারপর বাক্যটা আবার লিখলাম—

“মাধুরী সেন চলে গেলেন। কয়েকটি কথা তাঁর কাছে আর পৌঁছল না।”

বাক্যটার দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, আবার কথার আড়ালে নিজেকে লুকিয়েছি। কথাগুলো নিজের পায়ে হেঁটে মাধুরীর কাছে যেত না। আমাকেই বলতে হত। আমি বলিনি।

দ্বিতীয় বাক্যটিও কেটে দিলাম।

শেষবার লিখলাম—

“মাধুরী সেন চলে গেলেন। অনিরুদ্ধ পাল তাঁকে কয়েকটি কথা বলতে চেয়েও বলেননি।”

বিশ্বম্ভরবাবু বললেন, ‘এ আবার কেমন মৃত্যুসংবাদ?’

বললাম, ‘ঠিক খবর।’

তিনি কিছুক্ষণ আমার মুখের দিকে তাকালেন। তারপর প্রুফটা প্রেসে পাঠিয়ে দিলেন।

অন্যের লেখার মধ্যে সেই প্রথম নিজের একটি সত্যি বাক্য লিখলাম। কিন্তু যার জন্য লিখলাম, সে আর পড়বে না।

মানুষ সময় থাকতে যে কথা বলে না, পরে সেই কথাই তার জীবনের সবচেয়ে নির্ভুল বাক্য হয়ে ওঠে। সমস্যা শুধু একটাই—তখন আর কোনো শ্রোতা থাকে না।

আমার মৃত্যুসংবাদটা এখন আর খুলে দেখি না। শুধু মাধুরীর লেখা নম্বরসহ কাগজটি মানিব্যাগে রাখি। বৃষ্টির জল আমার মুখ মুছে দিয়েছে। নামটা রয়ে গেছে। সংখ্যাগুলোও এখনও স্পষ্ট।

মাঝে মাঝে গভীর রাতে নম্বরটিতে ফোন করতে ইচ্ছে করে। জানি, একটি অচেনা ছেলে ফোন ধরবে। বিরক্ত হয়ে হয়তো বলবে, ‘ভুল নম্বর।’

সে ভুল বলবে না।

মাধুরী চলে গেছে। ফোন নম্বরটা যায়নি। আমি ফোন করলে এখনও ঘণ্টা বাজে। শুধু ও আর বলে না—

‘এবার হারিয়ো না।’

ayan mukhopadhyay

 অয়ন মুখোপাধ্যায়

লেখক পরিচিতি – কবি ও লেখক অয়ন মুখোপাধ্যায়। ঠিকানা – বলাগড়, হুগলী। যে সমম্ত পত্রিকাতে লিখে চলেছেন —  পরম্পরা ,বাংলা স্ট্রিট অনলাইন , গুরুচণ্ডালী  , বাংলা স্পিয়ার ,কেতাব ,ভারতের কণ্ঠ  বাঙালা নেটওয়ার্ক ,আবর্ত , আপনপাঠ , বিকল্প ,গণশক্তি ,জলদর্চি ৷

14 thoughts on “মৃত্যুসংবাদ”

    1. Bhasapath Patrika

      ভাষাপথের পক্ষ থেকে আপনাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আগামী দিনেও আপনি পাশে থাকবেন—এই কামনা করি।

  1. Chiraprasanta Bagchi

    এ তো ভিন্ন স্বাদের একটি চমৎকার গল্প! তোর আরও সমৃদ্ধি কামনা করি।

    কোথাও কোনও আড়ষ্টতা নেই। একদম ঝরঝরে লেখা। পাঠক কৌতূহলে কৌতূহলে সানন্দে পড়বেন।

    1. Bhasapath Patrika

      খুব ভালো লাগল। অনেক অনেক ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা। আপনি যেভাবে পুরো গল্পটিকে ব্যাখ্যা করেছেন এবং মন্তব্য করেছেন, তাতে আমরা সত্যিই আপ্লুত।

  2. Kalyan Gangopadhyay

    অয়ন মুখোপাধ্যায়ের ‘মৃত্যু সংবাদ’গল্পটি এককথায় অসাধারণ। এই গল্প নিয়ে আলোচনা করতে গেলে সেটাও একটি গল্প হয়ে যাবে। এমন গল্প আরও পাঠ করার সুযোগের অপেক্ষায় রইলাম। লেখককে অনেক ধন্যবাদ ও শুভেচ্ছা।

  3. নতুন ভাবনা! সত্যিই তো বেঁচে থাকতে কাকে আর আমরা মর্যাদা দিই!

  4. এই গল্পটা একটা সোশাল স্যাটায়ার তো বটেই, কিন্তু অনেকটা ব্যথারও গল্প। ভালো লাগল।

  5. Sarmila Chatterjee

    Golpo ti bhalo laglo……Fake society r chitro….tar modhye o manushjoner kando karmo dekhe hasii pachhilo….lekhak ke dhanyobad….🙏

  6. সৌম্যজিৎ বসু

    অনেকদিন পরে একটা গল্প মনকে নাড়া দিয়ে গেল। প্রথমের দিকে মজার গল্প মনে হলেও শেষে যেভাবে সবটা উল্টে গিয়ে এক নির্মম সত্যকে তুলে ধরল, তা এককথায় অসাধারণ।
    লেখকের এরকম আরও ভিন্ন স্বাদের গল্পের আশায় রইলাম।

  7. Dr. J. K. Mitra

    বেশ অভিনব গল্প — তারাপদ রায়ের সঙ্গে যেন কাফকার আড্ডা! খুব উপভোগ্য। অনেক সূক্ষ্ম ছুঁচের খোঁচা আছে — নির্বিবাদে ঢুকে যায়, টের পাওয়া যায় না। তবে শেষের দিকে গল্প যেন একটু ঢিলে পড়ে গেছে। দ্বিতীয় সংস্করণের আগে একটু ভেবে দেখতে পারেন।
    জয় মিত্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top