হারানো চিঠি

স্নেহাশ্রী মল্লিক


 

landsc

বাড়িটা বিক্রি হয়ে যাবে—খবরটা শুনে অদ্ভুত কিছু অনুভব হয়নি অদিতির। বরং মনে হয়েছিল, কিছু বাড়ি আসলে অনেক আগেই আমাদের ছেড়ে চলে যায়; শুধু তাদের দেওয়ালগুলো কিছুদিন অপেক্ষা করে।

বারো বছর পর সে ফিরেছিল।

শীতের শেষ বিকেল। উঠোনে শুকনো পাতার শব্দ, জানালার কাঁচে ধুলোর আস্তরণ, আর পুরোনো কাঠের আলমারিতে আটকে থাকা এক ধরনের গন্ধ—যেন সময়কে কোনো ঘরে বন্ধ করে রাখা যায়।

ঘর গোছাতে গিয়ে অদিতি তার বাবার পুরোনো লেখার টেবিলটা সরাচ্ছিল। টেবিলের নিচে একটা উপন্যাস পড়ে ছিল। বইটা তুলতেই মেঝেতে পড়ে গেল একটি হলদে খাম।

খামের ওপর তার নাম নেই।

শুধু লেখা—

“তোমার কাছে, যাকে কোনোদিন ‘তুমি’ বলতে পারিনি।”

অদিতির হাত থেমে গেল।

হাতের লেখাটা সে চিনতে পেরেছিল।

অর্ক।

একটা নাম, যেটা সে বহু বছর উচ্চারণ করেনি; অথচ মনে হয়েছিল, নামটা কোথাও তার ভিতরে এখনও নীরবে বাস করে।

অর্ক থাকত রাস্তার ওপারের বাড়িটায়। ছোটবেলায় তারা একসঙ্গে স্কুলে যেত। অর্ক সবসময় তার জন্য জানালার পাশের সিটটা রেখে দিত। অদিতি কখনও জিজ্ঞেস করেনি কেন।

শরৎকালে অদিতির জানালার কার্নিশে শিউলি ফুল পাওয়া যেত।

সে জানত ফুলগুলো কোথা থেকে আসে।

তবু কোনোদিন বলেনি।

বৃষ্টির দিনে একই বারান্দায় দাঁড়িয়ে তারা ঘণ্টার পর ঘণ্টা কথা বলত—পরীক্ষা, বই, পাড়ার বিড়াল, আকাশের রং। এতসব তুচ্ছ কথার ভিড়ে সবচেয়ে জরুরি কথাটাই বলা হয়ে ওঠেনি।

একদিন অদিতির বাবা বদলি হয়ে গেলেন।

তারা চলে গেল।

অর্ক সেদিন স্টেশনে এসেছিল কি না, অদিতি জানত না।

কারণ সে পিছন ফিরে তাকায়নি।

চিঠিটা খুলতে তার অনেকক্ষণ লেগেছিল।

ভেতরে মাত্র দুটো পৃষ্ঠা।

“অদিতি,

তোমাকে এই চিঠি দেওয়ার সাহস আমার কোনোদিন হয়নি। তাই এটাকে চিঠি বলা যায় কি না, জানি না।

তুমি চলে যাওয়ার আগের দিন তুমি জিজ্ঞেস করেছিলে—‘কিছু বলবে?’

আমি বলিনি।

অদ্ভুত, তাই না? মানুষ কখনও কখনও সারাজীবন যে কথাটা বলার অপেক্ষায় থাকে, সেই কথাটাই বলার মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি ভয় পায়।

তোমার জন্য শিউলি রেখে যেতাম। তুমি জানতে। আমিও জানতাম তুমি জানতে। তবু আমরা কেউ কিছু বলিনি।

হয়তো আমাদের ভালোবাসার সবচেয়ে বড় প্রমাণ ছিল এই না-বলা।

আমি জানি না তুমি আমাকে মনে রাখবে কি না। কিন্তু যদি কোনোদিন এই শহরে ফিরে আসো, উত্তর দিও না।

শুধু একবার আমাদের পুরোনো জানালাটার পাশে দাঁড়িয়ো।

তাহলেই বুঝব, কিছু কিছু গল্প শেষ হয় না। শুধু তাদের বাকিটা সময়ের হাতে রেখে দিতে হয়।

—অর্ক”

চিঠির নিচে কোনো তারিখ ছিল না।

অদিতি অনেকক্ষণ জানালার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

বাইরে সন্ধ্যা নেমেছে। রাস্তার ওপারের বাড়িটা আগের মতোই দাঁড়িয়ে আছে, যদিও তার রং মুছে গেছে, জানালার কপাটে মরচে ধরেছে।

সে জানত, অর্ক সেখানে থাকে না।

হয়তো বহু বছর ধরেই থাকে না।

হয়তো চিঠিটা লেখার পরের দিনই সে শহর ছেড়ে চলে গিয়েছিল।

হয়তো অদিতি কখনওই জানবে না।

সে চিঠিটা ভাঁজ করে বুকের কাছে রাখল।

তারপর হঠাৎ চোখ গেল জানালার কার্নিশে।

সেখানে একটা শিউলি ফুল পড়ে আছে।

অদিতি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল।

হাওয়া ছিল না।

ফুলটা পুরোনোও নয়।

সে জানত না কে রেখেছে।

জানতেও চাইল না।

শুধু খুব আস্তে জানালার পাশে দাঁড়াল।

বারো বছর পর।

কোনো উত্তর দেওয়ার জন্য নয়।

শুধু একটা অসমাপ্ত চিঠির শেষ বাক্যটুকু পূর্ণ করার জন্য।

শহর ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে যাচ্ছিল।

আর জানালার কার্নিশে পড়ে থাকা ছোট্ট শিউলি ফুলটির দিকে তাকিয়ে অদিতির মনে হলো—

কিছু ভালোবাসা মানুষের কাছে পৌঁছয় না;

তবু তারা পথ হারায় না।

তারা কোনো এক পুরোনো জানালার ধারে,

একটি শিউলি ফুল হয়ে অপেক্ষা করে।

whatsapp image 2026 09 22 at 3.56.37 pm

স্নেহাশ্রী মল্লিক 

পরিচিতিঃ  স্নেহাশ্রী ১৪ বছর বয়সী একজন স্কুলছাত্রী, যার স্বপ্ন একদিন একজন লেখিকা হওয়া। স্নেহাশ্রী শুধু বাংলা গল্প নয় পাশাপাশি ইংরাজী কবিতাও লিখে চলেছে ৷ স্কুলের শিক্ষিকাদের খুবই প্রিয় স্নেহাশ্রী পড়াশুনাতেও এগিয়ে ৷

14 thoughts on “হারানো চিঠি”

  1. Gourav kumar Biswas

    এটি খুবই একটি সুন্দর লেখা একটি 14 বছরের মেয়ের জন্য। এবং এটি আমারও পছন্দ হইছে💗

  2. May the Almighty God shower his all blessings on you….Keep it up and flourish your future with your own words….❤️❤️

  3. মৈত্রেয়ী ব্যানার্জী

    অসাধারণ লেখা ,এতটুকু মেয়ের যদি এই লেখা হয় না জানি পরবর্তীকালে কত বড় লেখিকা হয়ে উঠবে !

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top