ঈশানী নদীর আত্মকথা

রাজীব কুণ্ডু


whatsapp image 2026 09 09 at 8.58.04 am

পূর্ব বর্ধমান জেলার মধ্য দিয়ে প্রবাহিত রাঢ় বঙ্গের একটি অন্যতম নদী হল ঈশানী। বীরভূম জেলার চিতগ্রাম-উড়ুন্দির মধ্যে এক  সারগাদা বা ক্যানেল বা জলের নালা থেকে উৎপন্ন হয়ে কেতুগ্রামের উপর দিয়ে পূর্ব বর্ধমান ও মুর্শিদাবাদের সীমান্ত ঘেঁষে গোমাই , অম্বল, বেলুন, খাঁরুলিয়ার পাশ দিয়ে গঙ্গাটিকুরি গ্রামের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শিবলুনের কাছে দু ভাগে বিভক্ত হয়েও মাসিসেঁকোর কাছে  পুনরায় ঈশানী মিলিত হয়ে এর মিলিত প্রবাহটি শাঁখাইয়ের কাছে অজয় নদীতে পড়েছে। ঈশানী নদীর প্রবাহ পথের দুই পাড়ের সৌন্দর্য আমাদের মনকে মোহিত করে। শরৎকালের কাশ ফুলের বন নদীর তীরবর্তী প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে অপরূপ মোহময় করে তোলে। নদীর জল প্রবাহের কুলকুল – কলতান মনের গভীরে এক অনুভূতির সঞ্চার করে। বিশেষ করে পূর্ণিমার চাঁদের আলোয় নদীর মনমোহিনী রূপকে যেন এক স্বর্গীয় সৌন্দর্য প্রদান করে।

whatsapp image 2026 09 09 at 8.58.04 am (1)

 

জনশ্রুতি আছে যে, নদীটির উৎপত্তি হয়েই ঈশান কোণে অর্থাৎ দেবতার অবস্থান যে দিকে অর্থাৎ উত্তর-পূর্ব দিকে প্রবাহিত হওয়ায় এর নাম হয় ‘ঈশানী নদী’ (কাঁদর)। এই নদীটি প্রাচীন কালে ‘সিঙ্গাটিয়া’ নামেও পরিচিত ছিল বলে শোনা যায় –তবে এই ধরনের নাম কেন হয়েছিল সে বিষয়ে কোন সঠিক তথ্য জানা নেই।

whatsapp image 2026 09 09 at 11.47.21 am

 ইতিহাস ও পৌরাণিক কাহিনীর সঙ্গে এই ঈশানী নদীর নাম ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে। পূর্ব বর্ধমানের কেতুগ্রামের দক্ষিণদিহি গ্রামের  কাছেই এই ঈশানী নদীর তীরে রয়েছে অট্টহাস সতীপীঠ তীর্থক্ষেত্র। অট্টহাস হিন্দু ধর্মের একান্ন শক্তিপীঠের অন্যতম। পৌরাণিক কাহিনী অনুযায়ী, এখানে দেবী সতীর অধরোষ্ঠ বা নিচের ঠোঁট পড়েছিল বলে মান্যতা রয়েছে। সংস্কৃত ‘অট্টহাস’ (প্রচন্ড হাসি) শব্দ থেকেই এই পবিত্র জায়গার নামকরণ হয়েছে বলে মনে হয়। পুরাণে উল্লেখ আছে যে , দক্ষ যজ্ঞে পতি নিন্দা শুনে সতী দেহত্যাগ করার পর শিব তার সেই নশ্বর দেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বজুড়ে তান্ডব নৃত্য শুরু করলে পৃথিবী ধ্বংসের সম্মুখীন হয়। সেই সময় দেবতাদের পরামর্শে শ্রীবিষ্ণু সুদর্শন চক্র দ্বারা সতীর দেহ টুকরো টুকরো করে দিলে যেখানে যেখানে সেই দেহাংশ পরে সেখানে সেখানে তৈরি হয় একটি করে সতীপীঠ। ঈশানী নদীর তীরে অবস্থিত এই অট্টহাস সতীপীঠ হিন্দুদের পবিত্র তীর্থ ক্ষেত্রে একটি অন্যতম পীঠস্থান। এই ঈশানী নদীর তীরেই অধিষ্ঠিত ভগবান শিব, যিনি এই নদীর নামে “ঈশানেশ্বর শিব”  নামে পরিচিতি পেয়েছেন। এখানেই প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বহুলাক্ষ্মী মন্দির। জঙ্গল ঘেরা নির্জনে দেবী অধরেরশ্বরী বা দস্তুরা চামুন্ডা ঈশানী নদীর তীরে পূজিত হন । এই নদীর তীরেই রয়েছে তন্ত্রসাধনার অন্যতম ক্ষেত্র মহাশ্মশান। বিখ্যাত আধ্যাত্মিক লেখক প্রমোদ কুমার চট্টোপাধ্যায় ‘তন্ত্রবিলাসী সাধুসঙ্গ’ নামে একটি বইতে ঈশানী নদীর তীরে অবস্থিত অট্টহাস সতীপীঠ যাত্রা প্রসঙ্গে লেখেন, “নিরোল  বা পাচুন্দি  স্টেশনে নেমে প্রায় দেড় ক্রোশ হাঁটিতে হইয়াছিল, মাঠের উপর দিয়েই পথ, মধ্যে মধ্যে ঘনবৃক্ষলতা পূর্ণ জনবহুল গ্রামও আছে। এইরূপ দুইখানি গ্রাম ও একটি ছোট্ট খাল বা নদী নৌকায় করে পার হয়ে অট্টহাসে পৌঁছেছিলাম।” এখানে লেখক নৌকা করে যে ছোট নদীটি পার হয়েছিলেন সেটিই হল ঈশানী নদী। এলাকায় জনশ্রুতি আছে যে, কেতুগ্রামের কাছেই ঈশানী নদীর তীরে অবস্থিত গ্রাম ভৈরব তলার চণ্ডী মণ্ডপে বসে শ্রীশ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু বিশ্রাম করেছিলেন। এছাড়াও কথিত আছে যে, শ্রীশ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু যখন রাঢ় দেশে পরিভ্রমণে বেরিয়েছিলেন তখন তিনি এই ঈশানী নদীর পথ ধরেই গঙ্গার তীরবর্তী উদ্ধারন পুরে এসে পৌঁছেছিলেন এবং সেখান থেকেই শ্রীশ্রী চৈতন্য মহাপ্রভু শান্তিপুরের অদ্বৈতাচার্যের  আশ্রমে পৌঁছান।

whatsapp image 2026 09 09 at 11.47.22 am

ঈশানী নদীর তীরেই রয়েছে ইতিহাস প্রসিদ্ধ গ্রাম বালুটিয়া বা বাল্লহিট্টা বা বাল্লহিটা। বাংলার সেন রাজা বল্লাল সেন দ্বাদশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে এই গ্রাম দান করেছিলেন তার পুরোহিত বাসুদেব শর্মনকে, যার উল্লেখ পাওয়া যায় ঈশানীর পার্শ্ববর্তী গ্রাম  নবহট্ট বা নৈহাটিতে প্রাপ্ত নৈহাটি- সীতাহাটি তাম্র শাসনে। এই তাম্র শাসনটি ১৯১১ সালে নবহট্ট বা নৈহাটি গ্রামে পাওয়া গিয়েছিল। যেটি বর্তমানে কলকাতা মিউজিয়ামে রক্ষিত রয়েছে বলে শোনা যায়।  এই তাম্র শাসনে বালুটিয়া ছাড়াও জলসাথী, খন্ডেয়িল্লা বা খাঁরুল, মোলাদণ্ডী বা মুরুন্দি প্রভৃতি ঈশানী নদীর পার্শ্ববর্তী গ্রামের নাম পাওয়া যায়। বালুটিয়া গ্রামে বাংলার পাল যুগে  মদন পালের সময় হেমাশ্ব যজ্ঞের প্রভাবও পড়েছিল বলে শোনা যায়। এছাড়াও বালুটিয়া গ্রামে পাল ও সেন যুগের বেশ কিছু মৃৎপাত্রও পাওয়া যায়। আবার ঈশানী নদীর একটি ক্ষীণ শাখা শিবাই নদীর উপর রয়েছে বিখ্যাত মাসিসেঁকোর ধ্বংসপ্রাপ্ত ইঁটের পিলার– যা আজও অতীত ইতিহাসকে নীরবে বয়ে চলেছে।

whatsapp image 2026 09 09 at 11.47.22 am (1)

একসময় ঈশানী নদী ছিল যাতায়াত ও ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম মাধ্যম। এই নদী পথ ধরে এক সময় নৌকা, ডিঙ্গা ,বড় বড় বাজরা চলাচল করত। এই নদী যেমন শান্ত -শীতল স্রোতে বয়ে চলেছে তেমনি বর্ষাকালে এই নদী রুদ্ররূপও ধারণ করে। ফলে নদীর তীরবর্তী বহু গ্রামের মানুষ প্রভাবিত হন। এই ঈশানী নদীর তীরবর্তী মানুষ তাদের মৎস্য শিকার ও কৃষিকাজের জন্য এই নদীর উপর ভীষণভাবে নির্ভর করে থাকেন। ঈশানী নদীর দুই পাড়ের বিস্তীর্ণ তৃণক্ষেত্রে এক সময় ছিল বাঘ- হরিণ- বন মহিষের বিচরণ করত। এই বিস্তীর্ণ চারণ ক্ষেত্রে একসময় বাংলার গৌড় ও মুর্শিদাবাদের নবাবরা হরিণ শিকার করতে আসত। এখনও এখানে  ‘হরিণডাঙ্গার মাঠ’ নামে একটি জায়গার অস্তিত্ব রয়েছে। বহু বছর আগে এই ঈশানী নদীতে গঙ্গা থেকে বড় বড় কুমিরও ঢুকে পড়ত। এই নদীর পথ ধরেই নদীর তীরবর্তী গ্রাম গুলোতে এক সময় ব্যবসা-বাণিজ্য চলত। বাংলা সাহিত্যের প্রখ্যাত ঔপন্যাসিক তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁর লেখায় এই ‘ঈশানী নদী’-র কথা উল্লেখ করেছেন। বহু কবি, বোলান পালাকার, বাউল সাধক ঈশানী নদী কে নিয়ে ঈশানীর তীরে বহু গান বেঁধেছেন। ঈশানীর তীরে বসে বাংলা সাহিত্যের অন্যতম কবি ও সাহিত্যিক ইন্দ্রনাথ বন্দোপাধ্যায়ও বহু কবিতা রচনা করেছেন। এই ঈশনী নদীর পার্শ্ববর্তী এলাকার  কাঁদরার কবি জ্ঞানদাস, ঝামটপুরের বৈষ্ণব কবি কৃষ্ণদাস কবিরাজ, বাংলার সেন রাজা লক্ষণ সেনের মাতা হেরম্ভ দেবীর ঈশানী নদীর পার্শ্ববর্তী গ্রাম নৈহাটিতে গঙ্গা মাতার পূজা, মারাঠা বর্গী আক্রমণ সহ বহু ইতিহাস ও মহাপুরুষের জীবন গাঁথার সাক্ষী আজও বহন করে চলেছে।

whatsapp image 2026 09 09 at 11.47.23 am

ঈশানী-র রূপের মাধুরী সব সময় সকলকেই মোহিত করেছে। প্রকৃতিপ্রেমী বহু মানুষ এই নদীর সৌন্দর্যের টানে ভ্রমণে আসেন। ঈশানী তার রূপের মায়ায় মানুষকে আকর্ষণ করে। যেন এক প্রকৃতির রূপমোহীনি ও অপার সৌন্দর্যের অধিকারী এই ঈশানী এক মোহময়ী নারী, যার রূপের মোহে মানুষকে তার দিকে আকর্ষণ করে। তাই এই ঈশানী সম্পর্কে বলা যায় –“নদীর স্রোত কখনও শুধু জল বহন করে না—তার সঙ্গে বহন করে অপার সৌন্দর্য, সময়, স্মৃতি ও ইতিহাস।”

 

তথ্যসূত্র:- লেখকের নিজস্ব গবেষণালব্ধ তথ্য ও স্থানীয় মানুষের সাক্ষাৎকার। গুগল- ইন্টারনেট। বিশেষ কৃতজ্ঞতা- প্রশান্ত রায়চৌধুরী, ফুলহক সেখ, স্বপন কুমার ঠাকুর ও সম্পর্ক মন্ডল।

 চিত্র:- নিজস্ব

whatsapp image 2026 09 09 at 11.47.21 am

রাজীব কুণ্ডু

ঠিকানা – ধাত্রীগ্রাম, পূর্ব বর্ধমান ৷
পেশায় শিক্ষক ৷ ইতিহাস গবেষক ৷ ধাত্রীগ্রামের ইতিহাস লেখক ৷ ইতিহাস বিষয়ক প্রবন্ধ লিখে চলেছেন বিভিন্ন পত্রিকাতে ৷

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top