সবাই ভালো
শ্রী রায়
গ্রামের ধানক্ষেতের মাঝখানে, পাকারাস্তা থেকে একটু ভিতরে একটা তালগাছ ছিল। বেঁটে খাটো গাছ। তাল হতো না। কেবল জট বের হতো। ওগুলো আসলে তালগাছের ফুলের মঞ্জরী। শুকিয়ে গেলে জটার মতো দেখতে হতো। জোরে বাতাস বইলে ঝরে পড়ত মাটিতে।
সেই গাছটায় বছর দুয়েক ধরে একটা একপেয়ে একানড়ে এসে বসবাস করতে শুরু করেছে। মাঠে চাষ করার সময় চাষীরা বুঝতে পারত ঐ গাছটায় কিছু একটা আছে। অনেকে আবার রাতের অন্ধকারে ফাঁকা মাঠে তালগাছটা থেকে ঝুরঝুর করে আগুনের ফুলকি ঝরে পড়তেও দেখেছে।
ভূতটা অশরীরী হয়েই ছিল, কাউকে দেখা দেয়নি কোনো অনিষ্টও করেনি বরং ও আসার ফলে চাষবাসের উন্নতি দেখা দিল। ফলে গ্রামের মানুষেরা আদর করে একানড়েটাকে তালভূত বলে ডাকতে লাগল।
একদিন এক চাষীবউ নয়নতারা নাম, সে তার চাষী বরকে দুপুরের খাবার দিতে এসেছিল। তারসঙ্গে ছিল ভাত, ডাল আর আলুভাজা।
চাষী সেগুলো সপ সপ্ করে খেয়ে নিল। ভাত খাওয়ার পর চাষী বউ তার শাড়ির কোঁচড় থেকে ছোট্ট একটা কৌটো বের করল। তার মধ্যে ছিল নটা তালের বড়া। চারটে চাষী খেল চারটে খেল চাষীর বউ। বাকি রইল একটা। চাষী বউ বলর-এটা কে খাবে? চাষী বসেছিল ঐ তালগাছটার নীচে। একবার উপর দিকে তাকাল। তারপর চোখ নামিয়ে একটু ভেবে বলল। -বউ, দিয়ে দে ওটা তালভূতকে। খাক্ বেচারা।
বউয়ের মন খুব দরদী, সে একটা বড়া তালগাছের গোড়ায় রেখে ‘ভূতদাদা খাও’ বলে চলে গেল। চাষীও
কাজে মন দিল।
একটু পরে মাঠ ফাঁকা হলে তালভূত গাছ থেকে নামল। দেহ ধারণ করে বড়াটা খেয়ে দেখল। সে ভূত হবার পর কোনোদিন তালের বড়া খায় নি। খেয়ে এতো ভালো লাগল যে, আরো কটা খাবার লোভ হল। দিনেরবেলা গ্রামের ভিতরে যাবার সাহস হল না। সন্ধ্যে হলে পর গায়ে একটা সাদা ময়লা কাপড় জড়িয়ে লাঠিতে ভর দিয়ে ঘুরে ঘুরে খুঁজতে লাগল চাষির বাড়ি। গ্রামে অল্প কটাই বাড়ি ছিল। এক বাড়িতে শুনতে পেল শাশুড়ি তার ছেলের বউকে খুব বকছে।
-তুমি এই কাজটা একদম ঠিক করোনি বউমা। তালের বড়া কেন তালভূতকে খাওয়াতে গেলে?
-মা, আপনার ছেলেই তো বলল।
-আমার ছেলে বলল আর তুমি করলে?
একটা কথাও তো কারো শোনো না। ও কিছু জানে নাকি? তুমি তো জানো যাকে তাকে তালের বড়া খাওয়াতে নেই আকর্ষণ হয়। মানুষ হলেও না হয় হোতো, ভূতকে গেলে খাওয়াতে? সাহস তো মন্দ নয়!
-আমি এটা জানতাম না।
-কিছুই শেখোনি দেখছি বাপমায়ের কাছ থেকে। এবার দেখো কী হয়। আমাকেও তো একবার জিজ্ঞাসা
করতে পারতে ?
-ভুল হয়ে গেছে। এবার থেকে আর কাউকে দেবো না। এসব কথা বলে ওরা দুজনে রান্নঘরের আলো নিভিয়ে শিকল তুলে দিল।
তালভূত আড়ালে একপায়ে দাঁড়িয়ে সব শুনছিল। বুঝতে পারল এই সেই বউ যে তাকে বড়া খাইয়েছিল। সে রান্নাঘরের শিকল খুলে ভিতরে ঢুকে বাসনপত্র নেড়ে চেড়ে দেখতে লাগল আর বড়া আছে কিনা। একটা বাটিতে তিন চারটে ছিল। পা ছড়িয়ে মজা করে সেগুলি খেল তারপর যেই উঠতে যাবে অন্ধকার ঘরে কিছু দেখতে না পেয়ে মাথাটা তাকে রাখা একটা মাটির হাঁড়ির সাথে ঠুকে গেল। হাঁড়িটা ঠাস্ করে পড়ল আর ভাঙল।
শাশুড়ি আর বউমা হ্যারিকেন হাতে ছুটে এসে দেখে সাদা কাপড় পরে কে একটা রান্নাঘরে দাঁগিয়ে আছে, সরু একখানিমাত্র পা। পা টা বড়ো দেহটা তুলনায় ছোটো, লম্বা লম্বা হাত। গায়ের রং কালচে চোখগুলো রসগোল্লার মতো।
ও বাবাগো মাগো বলে দুজনে বিকট চিৎকার আরম্ভ করল।
তালভূতটা বলল-ভয় পেয়ো না গো, ভয় পেয়ো না। আমি তালের বড়া খেতে এসেছিলাম।
-তুই কে? না বলে ঘরে ঢুকেছিস?
-আমি গো গিন্নিমা আমি। তোমাদের গাঁয়ের অতিথি। তোমাদের বাড়ি নেমন্তন্ন খেতে আবার আসব। আমার ভাগটা যেন রাখতে ভুলোনা। না বলে ঘরে ঢুকেছি বলে কিছু মনে কোরোনা, চাইতে সাহস পাইনি। বউদিমণি ভালো মেয়ে তাকে বোকো না। দাদাকেও না। বলতে বলতে ভূতটা হাওয়ার মতো শাশুড়ির গা ঘেঁসে হুস করে
বেরিয়ে গেল। মিলিয়ে গেল কোথায়।
এদিকে শাশুড়িমা হাত পা ছড়িয়ে কাঁদতে বসল-কী সব্বোনাশ হল গো কী সব্বোনাশ হল। শেষে মাঠের ভূত ঘরে ঢুকল? যেমনি আমার ছেলেটা আস্ত গাধা, তেমনি জুটেছে তার বউটা! এখন আমাকেই একটা কিছু করতে হবে। পরদিন সকালেই ছেলের সাথে কথা বলে বউকে দিল বাপের বাড়ি পাঠিয়ে।
তিনদিন পর ছেলেকে বলল-চঞ্চল বাবা যাতো, মাঠে গিয়ে তোর নতুন দাদাকে নেমন্তন্ন করে আয়। সন্ধ্যার সময় একটু ভোজ দেব। চঞ্চলকুমার মায়ের বাধ্য ছেলে, ঠিকঠাক নেমন্তন্ন করে এল। ফিরে এসে মায়ের
কথামতো মামারবাড়ি গেল দাদুকে দেখতে।
সেদিন বিকাল থেকেই তোড়জোড় শুরু হল। বড়ো তে আঠিয়া তাল ছুলে তাতে নারকেল কোড়া, চালের গুঁড়ো, আরো সব ভালো ভালো জিনিস দিয়ে তালের বড়া ভাজতে বসল চঞ্চলের মা পরীবালা দাসী। সুন্দর খাবারের গন্ধে বাতাস ম ম করছে ছেলে বুড়ো ছুটে এল খাবে বলে। পরীবালা সক্কলকে ফিরিয়ে দিল ‘কালকে এসো’ বলে, আজ আমার ঘরে অতিথি আসবে। তাকে না দিয়ে কাউকে দিতে পারব না।
এদিকে একানড়েটা গন্ধে গন্ধে ঠিক এসে হাজির হল। জিভ দিয়ে টস্ টস্ করে জল ঝরছে কৈ হল তোমাদের? ও গিন্নিমা, দাও শিগগির। আর তো পারি না ক্ষিদে চাপতে। কী জিনিস খাওয়ালেগো, আমিও পাগল বেনে গেছি।
-এই তো বাছা, হয়ে এসেছে। তা তোর কটা ফুলুরি লাগবে বলতো?

এই ধরো পঁচিশটা মতো হলেই হবে তার বেশি না। খেয়ে মনের আশ মেটেনি কিনা তাই
-বা,বা,বা, তাই হবে। তুই কিন্তু ঘরে ঢুকবি না।
জানলা দিয়ে হাত পাতবি। আমি একটা একটা করে
দেবো, তুই খাবি।
ভূতটা রান্নাঘরের পিছনে জঙ্গলের মধ্যে গিয়ে দাঁড়াল। হাতটাকে লম্বা করে জানালার শিকের মাঝখান দিয়ে গলিয়ে দিল। গিন্নিমা একটা একটা করে ভাজছে আর তেল থেকে তুলেই গরম গরম ওর হাতে দিচ্ছে। উঃ আঃ করে উঠল ভূতটা। বড্ড গরম বড্ড গরম! বেশ খেতে বেশ খেতে! জিভটা পুড়ে গেল, বড্ড গরম।
এই করে পাঁচ নম্বর বড়া খাওয়ার জন্য যেই আবার হাত পেতেছে গিন্নিমা বলল- চোখটা বন্ধ কর তাহলে আর গরম লাগবে না। ভূতটা বিশ্বাস করে চোখ বন্ধ করেছে ওমনি চঞ্চলের মা বড়ো লোহার ডাবু হাতাটা, যেটা দিয়ে ভাজছিল, তাতে করে অনেকটা গরম তেল কড়াই থেকে তুলে ভূতের হাতে বেশ করে ঢেলে দিল।
ভূতটার প্রায় গোটা হাতটাই ঝলসে গেল। বড়ো বড়ো ফোস্কা গজিয়ে উঠল দেখতে দেখতে। আর সে কী ছটফটানি! সে কী দাপাদাপি! সে কী কাতরানি। কী করলে গো গিন্নিমা কী করলে? এমন কাজ কেউ করে? নেমন্তন্ করে এনে এমনি সাজা দিলে? দুটো তো খেতেই এসেছিলাম, ক্ষতি করতে তো আসিনি! এখন আমার কী হবে? খুঁতো হয়ে গেলাম যে, কে আমাকে মানবে? সবাই টিটকারি দেবে এখন।

পরীবালা হাসি আর চেপে রাখতে পারে না। ফিক্ ফিক্ করে হাসি দমকে দমকে বেরিয়ে আসছে। দেখ কেমন মজা! আর আসবি আমাদের বাড়ি? আবার যদি এবাড়ির ত্রিসীমানায় পা দিয়েছিস; কী আমার ছেলে, ছেলেবউয়ের দিকে নজর দিয়েছিস; এর থেকেও ভয়ানক কিছু হবে বলে দিলাম। আমার নাম পরীবালা! আমাকে সবাই যমের মতো ভয় খায়। তুই তো কোন ছাড়! তোর বাপঠাকুরদাও তোকে বাঁচাতে পারবে না।
ভূতটা এবার বেজায় রেগে গেল। একে পোড়ার জ্বালা তার উপর পরীবালার কথার জ্বালা। দাঁড়া দজ্জাল বুড়ি, তোর মজা এবার দেখাচ্ছি। কী ভেবেছিস? তুই সব পারিস আমি কিচ্ছু পারি না? ষড়যন্ত করে আমাকে পোড়ানো? বলার সঙ্গে সঙ্গে লাফাতে লাফাতে রান্নাঘরে ঢুকে পরীবালার কাঁধে চেপে বসল। পরীবালার চুলগুলো গেল খাঁড়া হয়ে, চোখদুটো ট্যারা হয়ে গেল, হাত পা গুলো বেঁকে মুখ দিয়ে গোঙানি বার হতে লাগল।
শোরগোলশুনে প্রতিবেশীরা চঞ্চল আর তার বউকে খবর দিয়ে আনল। মাতৃভক্ত চঞ্চল মায়ের অবস্থা দেখে আকুল হয়ে পড়ল। বারে বারে ডাকতে লাগল-ওমা কী হয়েছে? আমাকে খুলে বলো। কীসের কষ্ট হচ্ছে? কেন এমন করছ? ক্যাঁই ক্যাঁই করে চঞ্চলের মা কী বলল, কিছুই বোঝা গেল না।
প্রতিবেশীরা পরামর্শ দিল,-বাবা চঞ্চল তোমার মাকে বোধহয় ভূতে ধরেছে। ওঝার কাছে নিয়ে যাও। একথা চঞ্চল মোটেই মানতে চাইল না।
মায়ের প্রতি অগাধ বিশ্বাস। তার মা এমন কোনো কাজ করতেই পারে না যে ভূতে ধরবে। তাই পরীবালা দাসীকে নিয়ে ছুটল বড়ো শহরে বড়ো ডাক্তার দেখাতে। ডাক্তারবাবু ওষুধ দিলেন, রোগী ভালো হল না।
বাধ্য হয়ে ওঝার কাছেই যেতে হল। পাশের গাঁয়ের একটা ছোকরা ওঝাগিরিতে খুব নামডাক করেছে।
তাকে ধরে আনা হল।

ওঝা অনেক লোক জড়ো করে জিনিসপত্র গুছিয়ে বসল। পরীবালাকে দেখে ছোকরা আনন্দে লাফিয়ে উঠল, অনেকদিন ধরে এইরকম একটা রোগীরই দরকার ছিল আমার। এখুনি শায়েস্তা করে দিচ্ছি। বলল সে। শুকনোলঙ্কা, হলুদ, সরষে মালসার মধ্যে পুরিয়ে নাকের সামনে ধরল। গন্ধে প্রাণ যায় যায়। হেঁচে কেশে একসা হল চঞ্চলের মা। ওঝা বিড় বিড় করে মন্ত্র পড়ে ফুঁ দিয়ে শুধাল-তালভূত গেছিস তুই?
পরীবালা কোনো উত্তর দিল না রাগে কটমট করে একবার ওঝার দিকে তাকায় একবার বাকিদের দিকে তাকায়-
-বুঝেছি তুই এত সহজে ছাড়বি না। দাঁড়া ব্যবস্থা করছি।
বলেই কালো রঙের একটা থলি থেকে একটা ঝাঁটা বার করে মারতে লাগল পরীবালাকে।
-যা যা ভূতবালাই দূর হয়ে যা।
তালভূত এতক্ষণ চুপচাপ সহ্য করছিল কিন্তু সেও যে সে ভূত নয়। পরীবালা বড় ঝাঁটার বাড়ি খেয়ে নড়ে চড়ে বসল। ওঝার হাত থেকে ঝাঁটাটা কেড়ে নিয়ে এমন মারতে আরম্ভ করল যে, ওঝা পালাবার পথ পেল তো অনেক কষ্টে পেল।
আমি পরীবালা দাসী। আমার গায়ে ঝাঁটার বাড়ি? মর্ মুখপোড়া, হতচ্ছাড়া, আবার যদি তোর ছায়াও দেখি, ঠ্যাং খোঁড়া করে দেব, হাত গুঁড়িয়ে দেব। কয়েক মুহূর্তের জন্য চঞ্চলের মা স্পষ্ট কথা বলে উঠল। আবার একটু পর যে কে সেই, ক্যাঁই ক্যাঁই করতে লাগল। তাকে বোঝে কার সাধ্য?
বুড়ির নাওয়া গেল, খাওয়া গেল, দিনের রাতের ঘুম গেল। এই যায় সেই যায় অবস্থা। ছেলে আর ছেলের বউ কত সেবাযত্ন করল ভালোর কোনো লক্ষ্মণ দেখা দিল না।
চাষীর বউ তার বরকে বললে, তুমি নিজে একটু ভূতদাদার সাথে কথা বল। তোমার কথা যদি শোনে।
চঞ্চল হাতজোড় করে মায়ের সামনে বসল।
যেদিন সন্ধ্যায় তোমার নেমন্তন্ন ছিল সেদিনই মায়ের এমন অবস্থা হল। কী হয়েছে বল? অনেকতো হল, এবার আমাদের মাকে মুক্তি দাও। ছেড়ে দাও।
বুড়ির গলায় তালভূত বলে উঠল। গলাটা খড়খড়ে, নাকি নাকিসুর।
-তোর মা আমায় খাওয়ার লোভ দেখিয়ে হাতে গরম তেল ঢেলে পুড়িয়ে দিয়েছে। আবার দাঁত বের করে কত হেসেছে। আবার আমার বাপ ঠাকুরদার কথাও তুলেছে। তারা যদি বেঁচে থাকত তাহলে আমার খাওয়ার কষ্ট হত? দুটো তালের বড়া খাওয়ার জন্য হাত পুড়িয়ে দিত? যত্ন করে সেধে সেধে খাওয়াত। হাঁপুস নয়নে কাঁদতে লাগল ভূতটা। ভূতের হয়ে পরীবালাই আসলে কাঁদছিল। ভূততো তার ভেতরেই আছে।
সেই কান্না শুনে দুজনের খুব মায়া হল। চঞ্চল জিজ্ঞাসা করল, কী করলে তুমি মাকে ছেড়ে দেবে?
আমার জন্য আর কিছু করতে হবে না অনেক করেছ তোমরা। তোমাদের জন্যেই তো আমার এই দুর্ভোগ।
চঞ্চল এমন বিশ্বাসঘাতকতা করলে আমার সাথে?
চঞ্চল অস্থির হল, না দাদা, তুমি ভুল বুঝো না। আমি জানতাম না মা অমন কাজটি করবে। নয়নতারারও একই কথা, আমিও জানতামনা। বাড়িতে থাকলে কি হতে দিতাম এসব?
বেশ বেশ। তোমরা জানলেই বা কী করতে? মায়ের কথার অমান্যি করতে পারতে?
তুমিইবা যেচে মায়ের কাছে ভাগ চাইতে কেন গিয়েছিলে? এইটুকু দোষ তোমার আছে। তবে দোষের চেয়ে শাস্তি বড়ো হয়েছে। আমি মায়ের হয়ে ক্ষমা চাইছি। মা তো ছোটোবেলা থেকে জেনে এসেছে ভূতকে তাড়াতে হয়, জব্দ করতে হয়। ভালোবাসতে তো শেখেনি।
চঞ্চল তুমি খুব বোকা দেখছি। আরো আগে যদি এভাবে আমাকে বলতে তাহলে শুধু তোমার মুখ চেয়েই আমি চলে যেতাম। আমাকে সাতটা দিন সময় দাও। নতুন গাছ পেলে এই গাঁ ছেড়ে চলে যাব চিরদিনের জন্য। কোনমুখে থাকব এখানে?
পরদিন থেকে পরীবালা একটু একটু করে সুস্থ হয়ে উঠতে লাগল। নয়নতারা সব খুলে বলল তাকে, এতদিন যা যা ঘটেছে।
শুনে শাশুড়িমা তার বউকে বলল-সত্যি আমি বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। আসলে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম।
এরমধ্যে ভূতের ব্যাপারটা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা গ্রামে। এসব কি আর চাপা থাকে? থাকবেই বা কেন? পরীবালার অবস্থাতো নিজের চোখে দেখেছে সবাই।
তাই গ্রামের চণ্ডীমণ্ডপে সভা বসল। গ্রামের সর্দার বলল-আজ যে ঘটনা চঞ্চলকুমারের পরিবারের সাথে ঘটেছে, সেই রকম ঘটনা অন্য কারও সাথে ঘটতে পারে। আহত বাঘ আর আহত ভূত কাউকে বিশ্বাস করা যায় না। ছোটো ছোটো বাচ্চারা ভয় পাচ্ছে। এখন গাঁয়ের মাথারা সব বলুক কী করা উচিত?

জনতার মধ্যে থেকে নানা ধরণের পরামর্শ পাওয়া গেল। মাথারাও অনেক বুদ্ধি দিল। শেষে স্থির হল যে, সমস্যার মূল গাছটাকেই কেটে নদীর জলে ভাসিয়ে দেওয়া হবে। গাঁয়ের ভিতর আরও যে দুচারটে ঐ রকম গাছ আছে সেগুলিও কেটে ফেলা হবে। সেই সঙ্গে আত্মার সঙ্গতির জন্য যা যা করণীয় তাও করা হবে।
ভীড়ের মধ্যে চঞ্চলের মাও ছিল। মোটা সোটা চেহারার চঞ্চলের মায়ের বুদ্ধিও ছিল বেশি, তেজও ছিল তাই সকলে তার কথা মানত। এবারও ফেলতে পারল না কেউ। তার আবদার ছিল-ভূতের আত্মার শান্তির জন্য আমরা যা করার তাই করব কিন্তু দয়া করে গাছ কাটতে বলবেন না সর্দার।
এও তো একরকমের প্রাণহত্যা তাই নয় কি? আমার দোষে এদের কেন সাজা দেবেন ? তার চেয়ে থাকুক না যেমন ছিল। ভূতও থাকুক, গাছও থাকুক, মানুষও থাকুক। খাওয়ার সময় একটু ভাগ দিয়ে খেলেই হল। আমি তো তাই করব এখন থেকে।

