বৈষ্ণব সাহিত্যর অনুসারী মাতৃ সাধক ভবা পাগলা
সত্যেন্দ্র প্রসাদ নন্দী
যুগে যুগে বাংলা সাহিত্যের সম্ভারকে রত্নখচিত করে তুলেছেন বিভিন্ন মতের সাধক। বৈষ্ণব, বৈষ্ণবসহজিয়া, বাউল, মরমিবাদ, ফকিরি, সুফি এবং শাক্তপদাবলীর বিভিন্ন রচনা। ভবা পাগলা হলেন বিংশ শতাব্দীর এক জন অন্যন্য সাধক। ব্যক্তিত্বগত প্রতিভায় যে স্বাক্ষর রেখেছেন তা শুধু অনস্বীকার্য নয় গবেষকদের গবেষণার বস্তুগত উপাদান। একজন মানুষ থেকে তাঁর সিদ্ধ পুরুষে রূপান্তরের ক্ষেত্রে যে সকল বিশেষণে তাঁকে প্রতীয়মান করা হোক না কেন, সকল বিশেষণই তাঁর কাছে যেন ক্লিশে হয়ে পড়ে। তিনি তাঁর সাধনায় সিদ্ধ সাধক, মহাপুরুষে উত্তোরণ, উত্তর প্রজন্মের কাছে মহামানব। তিনি সমাজ তত্ত্ববিদদের কাছে একজন সমাজ সংস্কারক। সাহিত্য প্রতিভার স্বাক্ষরে কবি, গীতিকার। সঙ্গীত বোদ্ধাদের কাছে একজন সুরসাধক, সঙ্গীতশিল্পী, বেহালা বাদক, হারমোনিয়াম বাদক। এছাড়াও তিনি মৃৎশিল্পী, সূচী শিল্পী। আত্মভোলা এই মহামানব ভবেন্দ্র চৌধুরী থেকে আপামর শিষ্য, ভক্ত, শ্রোতা ও পাঠক সাধারণের কাছে হয়ে ওঠেন ভবা পাগলা।

ভবাপাগলার সাধনকালে যে সমস্ত স্বরূপের উদঘাটন করেছেন, সেই সকল ভাবাদর্শের মধ্যে দিয়ে দর্শন ও চেতনা এবং অসাম্প্রদায়িক ভাবনার ভাববাদী বিশ্লেষণ করেছেন। সেই ভাবনা ও বিশ্বাসের পথিকৃত কিন্তু থেকে গেছেন আড়ালে। তাঁর জীবনচারণে যে আলোর সন্ধান করেছেন। সেই আলোর উৎসে নিজেকে নিয়ে গেছেন অসীম থেকে অনন্ত পথে, যা আসলে আজকের এই পৃথিবীর জটিল আবর্তে ঘুরে বেড়ানো মানবের কাছে চর্চিত বিষয় হয়ে পড়েছে। ভক্তি সাধনার বা আরাধনার আঙ্গিক কে নতুন পথের মধ্যে দিয়ে নিয়ে গিয়েছেন। এই আরাধনার পথেই তাঁর সিদ্ধ পুরুষ হয়ে ওঠার সোপান। নিজেকে জানার জন্য তাঁর প্রতিনিয়ত জিজ্ঞাসা এবং কর্মকান্ডকে তিনি রচনার মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করতে চেয়েছেন। প্রকাশ করেছেন নিজের উপলব্ধি যা আজ মানুষকে ভাবিয়ে তোলে-
“যত খুঁজবি হারিয়ে যাবি
বই পুস্তক আর চন্ডীগীতা
আত্মনির্ভর এই তো ঈশ্বর
খুলে দ্যাখ তোর মনের খাতা।”
আত্মনির্ভরতা যে ঈশ্বরের নামান্তর সাধক কত সহজে তা বলে দিয়েছেন। মনের মধ্যে নানা রকম সংশয় থাকলে নির্ভরতা যেন সংশয়ের ঘূর্ণিপাকের মধ্যে পড়ে হারিয়ে যাবে। এই ভাবনা যেন আত্মাকে মুক্ত করে ঈশ্বরত্বে অনুধাবন করা।
এই রচনাকে সামনে রেখে একটি বিষয় আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভবা পাগলাকে যতই খোঁজার চেষ্টা করা হোক তিনি কিন্তু নিজের কর্মকান্ডকে আড়ালে রেখেই হয়ে উঠেছেন অন্য আর পাঁচজন মানুষের থেকে স্বতন্ত্র। এই স্বতন্ত্র হয়ে ওঠা যেন সময়ের দিন গুনে চলেছিল। বালক বয়সেই মা কালী অবলম্বন করে এগিয়ে চলা। যত বড় হয়েছেন ততই যেন মাতৃজ্ঞানের আধারে মা কালীকে নিয়ে জীবনের ধ্রুব তারা স্বরূপ দিক নির্দিষ্ট করেছেন। জীবনের প্রতিটি কাজের সাথে জড়িয়ে পড়েছে মাতৃরূপের একাত্মতা, খেলার ছলেই হোক বা আত্মনির্ভরতার নিবেদনে, মা-এর কাছেই সকল চাওয়া পাওয়ার আকুতি। বালক বয়স থেকেই মাতৃনামের উপলব্ধিতে গানের মধ্যে দিয়ে জীবনের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা, ক্রোধ-ভালোবাসা সকল অনুভুতির প্রকাশ করেছেন তাঁর রচনার মাধ্যমে। সঙ্গীতকে করে তুলেছেন মাতৃসাধনার একমাত্র উপাদান বা উপাচার হিসাবে। তিনি তাঁর গানে বলেছেন-
“গানই আমার দেবী মূর্তি,
গানই আমার স্ফূর্তি।”
একজন সাধক তাঁর ঈশ্বর আরাধনায় বিভিন্ন উপাচার ব্যবহারের মধ্যে দিয়ে সাধনক্রিয়া পরিচালনা করে থাকেন। কিন্তু ভবাপাগলা এখানেই এক নতুন ধারার দিক নির্দেশ করছেন। তিনি উপাচার হিসাবে গানকেই ভেবে নিয়েছেন। সমাজতাত্বিক ভাবনায় অন্য আরও একটি দিক নির্দেশ করে, গানকে মাধ্যম করে সমাজের অভ্যন্তরে মানুষের মধ্যে চেতনার উন্মেষ ঘটানোর প্রবল ইচ্ছা সাধকের মনোজগতে প্রতীয়মান ছিল। সেই সময়কালীন ভারত তথা বাংলা দেশের অবস্থানগত বিষয়গুলি লক্ষ্য করলে দেখা যায় জাত-পাত ধর্মীয় কুসংস্কার, সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা, দারিদ্রতা এবং অভাবের তাড়নায় মানুষের জীবন যন্ত্রনা সাধক জীবনের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার মধ্যে দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। ফলে সাধকের কাজ শুধু মাত্র তাঁর সাধনার পথে মানুষের কাছে চেতনার বার্তা তুলে ধরা। এক্ষেত্রে গানই হলো একমাত্র মাধ্যম যা এই মানুষগুলির কাছে বার্তাকে পৌঁছে দেওয়ার কাজে সহজতা তৈরি করে। গ্রাম বাংলার মানুষ লোকায়ত সাধনার নির্যাস লোক আঙ্গিকের গানের মধ্যে দিয়ে নিজেদের জীবনের অভিজ্ঞতার বিনিময় করে চলেছে। ভবাপাগলার মাতৃসাধনার ভাবাদর্শে জারিত হওয়া চেতনার উপলব্ধি গানের সুরে প্রকাশ করতে থাকেন। গ্রাম বাংলা তাঁর গানের কথা ও সুরে ভেসে যেতে থাকলো বিভিন্ন আসরে। তাঁর সেই সুরের নিমগ্নতায় যেন প্রকৃতি যেন ক্রমশ তাঁর কাছে এসে ধরা দিতে চাইছে।

ভবাপাগলার জীবন পরিচয় সম্পর্কে যা জানা যায়, তা হল- পিতা গজেন্দ্র মোহন রায় চৌধুরী, মাতা গয়াসুন্দরী দেবী। ‘রায় চৌধুরী’ উপাধী হিসাবে পাওয়া। এই উপাধী হিসাবে রায়চৌধুরী নামের সাথে যুক্ত হওয়া মানেই জমিদারী ব্যবস্থার সাথে ভবাপাগলার পরিবার যে যুক্ত ছিল তা প্রমান হয়। মূল পদবী হলো সাহা। এই ধারণা থেকে বলা যায় ভবাপাগলা জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। জন্ম কোজাগরী লক্ষী পূর্ণিমা তিথিতে শুক্রবার, তারিখ ১৩০৯ সালের ৩১শে আশ্বিন (ইংরাজী ১৯০২ সালের ১৭ই অক্টোবর)। ঢাকা জেলার ধামরাই থানার আমতা গ্রামে। আসল নাম ভবেন্দ্র মোহন সাহা (রায়চৌধুরী)। গজেন্দ্র মোহন রায় চৌধুরীর তিন পুত্র, গিরীন্দ্র, দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্র এবং এক কন্যা সন্তান সতী আগমনী। দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্র যমজ দুই ভাই। শৈশব জীবনেই ভবেন্দ্রকে দেখে পরিবারের মনে এক শঙ্কা উপস্থিত হয়। তার কারণ ভবেন্দ্র চলা ফেরা এবং পারিবারিক কালীমায়ের প্রতি আত্মমগ্নতা দেখে। আমতা গ্রামের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেবেন্দ্র ও ভবেন্দ্রকে ভর্তি করা হলেও তাঁর পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ ছিল না। এই নিয়ে শিক্ষকদের অভিযোগ শোনা যায়। ভবেন্দ্র পড়াশোনা বাদ দিয়ে প্রকৃতির বিভিন্ন উপাদানের মধ্যে কোন কিছু একটা খুঁজে চলেছেন। ভাকুটিয়া শ্মশানে যাতায়াত করতে থাকেন। আত্মভোলা ভবেন্দ্র মা কালীর প্রতি ভাবাবেশে নিমগ্ন হয়ে পড়া। এই বিষয়গুলি পরিবারের সকলকে আশঙ্কার মধ্যে রাখতো। এমতবস্থায় তাঁর দাদা গীরিন্দ্রমোহন দুই ভাইকে কলকাতায় নিয়ে এলেন। গিরিন্দ্র মোহন চৌধুরী সে সময় কলকাতায় পাটের একটি গুদামে চাকরী করতেন এবং কীর্তন গায়ক হিসাবে সুনাম অর্জন করেছেন। দুই ভাইকে কলকাতার নাম স্কুলে অর্থাৎ এরিয়ান্স স্কুলে ভর্তি করে দিলেন। কিন্তু কলকাতায় এসেও ভবেন্দ্রমোহন একই ধারায় পরিচালিত হতে থাকলো পড়াশোনা বাদ দিয়ে বিভিন্ন মন্দিরে ঘুরে বেড়াতে থাকলো। আর তার সঙ্গে উপরি পাওনা হিসাবে দাদার সাথে বিভিন্ন কীর্তন আসরে উপস্থিত থাকা এবং গান গাওয়া। বালক ভবেন্দ্রর গান শুনে সকলেই খুব মুগ্ধ হয়ে পড়তো। কৃষ্ণ নাম ছাড়া বিশেষ করে শ্যামা সংগীতের সময়ে তাঁর ভাবের আবেশে সকলেই যেন মন্ত্রমুগ্ধের মত স্থির হয়ে বসে থাকতো। মাঝে মাঝে ভবেন্দ্র মধ্যে ভাবে বিভোর হয়ে ধ্যানস্থ হয়ে পড়ার পরিস্থিতি তৈরি হতো।
ভবাপাগলা শাক্ত সাধক হলেও তিনি বৈষ্ণবসাধনা ও শাক্ত সাধনার মধ্যে কোন প্রভেদ রাখেননি। বরং তিনি অভেদতত্ত্ব ও সমন্বয়িক সুরের জাগরণ ঘটিয়েছেন। যা আধুনিক যুগের শুরু সময়কালের এক সংস্কারমুক্ত জাগ্রত চেতনার বহিঃপ্রকাশ। এই বিষয়ে একটি ধারণা আমরা দেখতে পাই কবি ভারতচন্দ্রের ‘অন্নদামঙ্গল’ কাব্যে। হরিহোড়ের আখ্যানে কবি ভারতচন্দ্র দেখিয়েছেন হরি এবং হর বা বিষ্ণু ও শিবের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ফলে এই সময়কালে শাক্ত কবিদের মধ্যে এই অভেদ তত্ত্বের প্রচলন ঘটেছিল। ফলত ভক্ত ও ভগবানের মধ্যে কোনো তফাত নেই। এই ভাবনার মধ্যে দিয়ে জারিত হয়েছে ভবাপাগলার জীবনাচারণ। সাধকের সাধকোচিত ভাবনার রসে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে এক অকল্পনীয় ছবি তৈরি করে গেছেন। তিনি লীলাকারী শক্তির দ্বারা নিজেকে গড়ে তুলেছিলেন সমন্বয়ের বাহক। শাক্ত ও বৈষ্ণব বা অন্য কোন মত তাঁর কাছে ধরা মানব জীবনের বাস্তবতার নিরিখে পালনীয় কর্তব্যের ধারামতে। মিলনের বার্তা এগিয়ে চলে তাঁর রচনার প্রবাহিত কল্লোলে। প্লাবিত হয় হৃদয়ের দুকূল। যেখানে মাঝি তিনি আর যাত্রী হয়ে বসে থাকেন তাঁর ইষ্ট। এখানে ইষ্ট অর্থে জীবাত্মা এবং রচিত হয়ে চলে কালজয়ী ভাবনার মিশ্রিত এক অনন্য সাহিত্য। তিনি উদাসীনতার মধ্যে অসীমতার আলোড়নে নেচে ওঠেন জগতের সব দেব-দেবীকে এক সারিতে নিয়ে এসে উপস্থিত করেন মানবীয় আধ্যাত্মিকতায়। তাঁর একটি গানের মধ্যে সেই মিলনাশ্রিত ভাবনার প্রকাশ আমরা দেখতে পাই-
“মা, তুমি ধর বাঁশি, (আর) কৃষ্ণ ধরুক অসি,
দেখবো আমি, কেমন লাগে, থেকে পাশাপাশি।
এই যে মধুর তত্ত্ব, ভাবের তত্ত্ব, তাই তো পরাণ ভরে হাসি।
যে, যা বলুক, ভালো মন্দ, দ্বন্দু সমান,
অভিন্ন এভাবের মূর্তি, ভক্ত যেমন সাজান।
কালীর অসি, কৃষ্ণের বাঁশি,
ব্রজবাসী (আর) শ্মশানবাসী।”
ভবা পাগলা মা কালীর সাধনা ও ভজনা করে শাক্তধর্মীয় ভাবনা মিশ্রিত সাহিত্য তথা গানের ডালি উজার করে দিয়েছেন তাঁর ইষ্ট ভক্তি অর্চনায়। তা সত্ত্বেও বাংলার চিরাচরিত আবহে বৈষ্ণবীয় অনুসঙ্গ সেই সময়কালে বর্তমান ছিল। তাঁর কারণ চৈতন্য পূর্বযুগে বৈষ্ণবীয় ভাবনা বাংলার হিন্দু তান্ত্রিকতার সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রভাবে ক্ষুদ্র অংশে চর্চিত ছিল। সেনযুগে বৈষ্ণবীয় ভাবনার প্রকাশ রামানুজ দ্বারা প্রকাশিত হলেও তার বিস্তার ও প্রভাব সমাজে প্রসার ঘটেনি। চৈতন্যযুগ অর্থাৎ চৈতন্য জন্মের বা আবির্ভাবের পর তাঁর সন্ন্যাস গ্রহণের পর থেকেই বৈষ্ণব ধর্মের এক ব্যপকতা দেখা দেয়। চৈতন্যদেবের মূলধর্ম শ্রীমদ্ভাগবতের উপর প্রতিষ্ঠিত। চৈতন্য গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মের সর্বজনীন আদর্শ হলো ঈশ্বর ভক্তি এবং প্রেম। ভগবানের প্রতি ভক্তি ও প্রেম সকল ধর্মের মূল সারস্বত্ত। ঈশ্বরের কাছে কোনো জাতিভেদ নাই, হিন্দু ও মুসলমানে কোনো ভেদ নাই, উচ্চ ও নীচ শ্রেণীগত কোনো প্রভেদ নাই। চৈতন্য ভক্তি সম্পন্ন সমাজ প্রতিষ্ঠিত নীচ জাতিকে ভক্তিহীন ব্রাহ্মণ অপেক্ষা শ্রেষ্ঠ বলে মনে করতেন।
‘চন্ডালোহপি দ্বিজশ্রেষ্ঠঃ হরিভক্তিপরায়ণঃ।’
ভগবানকে স্মরণ বা হরিনাম কীর্তনই ধর্মের মূল কাজ। ভবাপাগলা চৈতন্য ভাবধারার অনুসারী হিসাবে তাঁর সাহিত্য তথা গান রচনায় সিদ্ধ হয়ে ওঠেন। এর প্রধান কারণ বৈষ্ণবীয় চর্চায় চৈতন্য প্রবর্তিত জাতপাতহীন এক বিশ্বভাবনা প্রকাশ তাঁকে প্রভাবিত করে।

আরও একটি বিষয় এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন আছে। ভবাপাগলা শাক্তসাধক। শাক্ত সাধনায় শক্তির আধার রূপে মা কালীকে তিনি ইষ্ট হিসাবে আরাধনা করেন। চৈতন্য প্রবর্তিত বৈষ্ণবীয় আচারে কৃষ্ণের শক্তি রূপে রাধারাণীকে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে এবং রাধাকে সবার প্রথমে স্থান করে দেওয়া হয়েছে। ‘রাধাকৃষ্ণ’ শব্দের মিলিত প্রয়াসে যে ঈশ্বরীয় কল্পনা আমাদের সামনে উপস্থিত হয় তাতেও সেই নামসর্বস্ব আকুতি প্রদানে রাধারাণীর উপস্থিতি সবার আগে ব্যবহৃত হয়েছে। কৃষ্ণ হলো মূল পরমতত্ত্ব, রাধা হলেন অন্তরঙ্গ শক্তি, শক্তি ও শাক্তিমান রূপে, অগ্নি ও দাহন গুণ রূপে তাঁরা অচ্ছেদ্য-
“রাধা পূর্ণশক্তি, কৃষ্ণ পূর্ণ শক্তিমান।
দুই বস্তু ভেদ নাহি শাস্ত্র-পরমাণ।।
মৃগমদ তার গন্ধ যৈছে অবিচ্ছেদ।
অগ্নি জ্বালাতে যৈছে কভু নহে ভেদ।।
রাধাকৃষ্ণ ঐছে সদা একই স্বরূপ।
লীলারস আস্বাদিতে ধরে দুই রূপ।।
========================
পূর্ণানন্দময় আমি চিন্ময় পূর্ণতত্ত্ব।
রাধিকার প্রেমে আমায় করায় উন্মত্ত।।
না জানি রাধার প্রেমে আছে কত বল।
যে বলে আমারে সদা করায় বিহ্বল।।
রাধিকার প্রেম গুরু আমি শিষ্য নট্।
সদা আমা নানা নৃত্যে নাচায় উদ্ভট্।।”
(আদির ৪পৃঃ)
অর্থাৎ বৈষ্ণবীয় আধারে শক্তিরূপীনি রাধা এবং শাক্তমতে শক্তিরূপিনী মা কালী। আবার বৈষ্ণব সহজিয়ার ক্ষেত্রে প্রজ্ঞা ও উপায়ের স্থলে রাধা-কৃষ্ণের যুগল ভাবনা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। তাই ভবাপাগলার বৈষ্ণবীয় সাধনা বা বৈষ্ণব পদকর্তা হিসাবে নিজেকে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সকল উপাদানই বর্তমান ছিল। শাক্তকবি ভবাপাগলা নিজেকে বৈষ্ণব বা বৈষ্ণব সহজিয়া কবি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার প্রমান বিভিন্ন পদের উপহার সাজিয়ে বৈষ্ণব সাহিত্যকে উজ্জ্বল করেছেন।
গৌড়ীয় বৈষ্ণব সাহিত্যকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, পঞ্চরসের আধারে সাহিত্যের পথ চলা নির্দিষ্ট হয়েছে। মূলত এই পঞ্চরসের মধ্যে ভক্তি রস তথা মধুর রসসিক্ত বৈষ্ণবসাহিত্য ভক্ত সাধারণের হৃদয়কে উদ্বেলিত করেছে। ভবাপাগলা এই ভক্তিরসের আধারেই তার সাধনাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছেন তা উপরিউক্ত আলোচনা থেকেই বোঝা যায়। এর থেকে বোঝা যায় সাধকের কাছে তাঁর সাধনার গতি প্রকৃতি কোন দিকে এগিয়ে যাবে, তা কখনও পন্থা ঠিক করে দেয় না। মূলত ভক্তি আরাধনায় সাধককে সিদ্ধতা পূর্ণ করার দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়। রাধাকৃষ্ণের উপর ভক্তের নির্ভরতা তৈরি হয় ভক্তিসাধনার পথকে অবলম্বন করেই। ভক্তের এই নির্ভরতা গড়ে ওঠে রাধাকৃষ্ণের সেবা ও ভজনায় একান্তভাবে মগ্নতার বা নীরব আস্থার উপরে। ভবাপাগলাও তাঁর ভক্তি মিশ্রিত নির্ভরতা এবং ঈশ্বরের প্রতি নিজের নিবেদন মগ্নতায় ব্যপিত থেকেই রচনা করেছেন-
“তুমি বিনে আর কেউ নাই আমার,
দগ্ধ হৃদয়ে দিতে শান্ত্বনা।”
এই রচনায় ভবাপাগলার মনে দৈন্যতার আকুতি ফুটে ওঠে। সাধকের এই দৈন্যতাই সাধককে নিয়ে যায় অপ্রাকৃত প্রেমের স্মৃতি সরোবরে। যেখানে প্রেমের মধ্যে দিয়ে বৈষ্ণবের পরমপুরুষের সন্ধান করে চলে পার্থিব আত্মা। সে শান্ত্বনা খুঁজে ফেরে ঈশ্বর প্রেমে।
সাধকোচিত দর্শন অনুসন্ধান করলে দেখা যায় সত্য-শিব- সুন্দরের মাহাত্ম্য রূপ মুগ্ধতা। এই দর্শন প্রতিষ্ঠিত হয় প্রাকৃত ভাবনার সাথে প্রেমের উদ্যাপনের তত্ত্ব। ভবাপাগলা প্রকৃতির সাথে প্রেমের রূপকে একত্রিত করে তাঁর প্রকাশভঙ্গীকে গান রচনার মাধ্যমে জনসমক্ষে এনেছেন। তাঁর গানে তাই বৈষ্ণবীয় অনুসঙ্গের প্রধান চর্চা প্রেমের উপাদান সমন্বিত ভক্তি। ভক্তিরসের পূর্ণতা হলো প্রেমের উদ্যাপন –
“ভক্তবাঞ্ছা কল্পতরু
কৃষ্ণ ভবার মায়ের গুরু।
মাটি হয় রে শুস্ক মরু
প্রেম বারি প্রবেশিলে।”
এই গানে ভবাপাগলা বার্তা দিতে চান ভক্ত সাধারণের প্রতি। তিনি বলছেন একমাত্র প্রেমভক্তিই মানুষকে দিতে পারে নির্ভুল জীবনাচারণের নির্দেশনা। যে ঠিকানায় মানুষ গন্তব্যে যাওয়ার পথে তার জীবনকে করে তুলবে সহজ, সরল এবং সুন্দর। তিনি চেয়েছেন এই বিশ্বসংসারে প্রতিটি মানুষ যেন প্রেমের পথ ধরে এগিয়ে যেতে পারে। তবেই এই সংসার হবে শান্তিময় সুন্দরের পূজারী। মানবতার ভাবনায় ভবাপাগলার পরমাত্মার প্রতি নির্ভরতার খোঁজ করে চলেছেন। তিনি প্রেমের জয়গানে কালী ও কৃষ্ণকে এক আসনে বসিয়ে শক্তি ও শক্তিমানের ঈশ্বরীয় যুগলতত্ত্বকে আবিস্কার করে বলেন-
“তুমি ভাবো কালী, তিনি বনমালী
কভু ধরে বাঁশী, কভু ধরে খাঁড়া।”
আরও একটি পদে তিনি বলছেন-
“কন্ঠে কণ্ঠে গাহ কালী নাম
গাহ কৃষ্ণ নাম
কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে
হরে মুরারে মধুর সুরে
ভবে দাও মন এহেন সংসারে।”
বৈষ্ণব বা সহজিয়া বৈষ্ণব চেতনায় সাধনীয় ও পালনীয় আঙ্গিকে প্রেম শুধুমাত্র দেহসাধনার মধ্যেই যুগলতত্ত্বকে সীমাবদ্ধ রাখেনি। এখানে প্রেম বাস্তবে ঈশ্বর প্রেম চেতনায় সম্পৃক্ততা পেয়েছে। ভবাপাগলা তাঁর গানে প্রেমের জাগতিক রূপকে পরিগ্রহ করেছেন। তিনি ঈশ্বরপ্রেমের সাথে সাথে নরনারীর প্রেমের দায়িত্ববোধকে জাগ্রত করে সংসারের কর্তব্যে স্থায়িত্ব আনতে শিখিয়েছেন। এই সংসার ও ঈশ্বর প্রেমকে অঙ্গীভূত করে যে সমস্ত রচনা তিনি করেছেন তা এককথায় পদাবলী সাহিত্যে এক অনন্যমাত্রা যোগ করে।
ভবাপাগলার সাহিত্য তথা গান রচনায় চৈতন্য অনুগামীতা লক্ষ্য করা যায়। বাউল গুরু বৈষ্ণবদের মধ্যে এই চৈতন্য অনুসরণ দেখা যায়। বৈষ্ণবীয় সাহিত্যে চৈতন্যকে কেন্দ্র করে অবর্তিত হয়েছে। এই ক্ষেত্রে ভবাপাগলাও এই আবর্তনের বাইরে থাকতে পারেননি। রাধাকৃষ্ণের যুগলতত্ত্বের আধারে সাহিত্যের চলনে ভবাপাগলা তাঁর উজ্জ্বল সাক্ষর বহন করে গেছেন। তাঁর রচনায় আমারা দেখতে পাই চৈতন্য তথা গৌরাঙ্গকে নিয়ে রচনা-
“আজি গৌরাঙ্গ লাল রে, আমার গৌরাঙ্গ লাল,
নিতাই প্রেম মাতাল রে, নিতাই প্রেম মাতাল,
ও আমার শ্রীঅদ্বৈত গদাধর
ভক্ত কাঙাল রে, ভক্ত কাঙাল।
শ্রীবাস অঙ্গনে কীর্তনে-কীর্তনে
ফাগুয়া অবির হ’ল
লালে ওই লাল রে, লালে ওই লাল।
নদীয়ার রাঙামাটি, নদীয়ার বসতবাটী,
কোটি-কোটি জনম,
মহাভাগ্যের ফল রে, মহাভাগ্যের ফল।
ভবা ফাগুয়া দিনে, নিবেদন শ্রীচরণে,
নদীয়ার শ্রীবৃন্দাবনে
একই খেয়াল রে একই খেয়াল।”
বৈষ্ণবীয় ভাবনায় শ্রীচৈতন্যের জন্মস্থানকে শ্রীবৃন্দাবন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভবাপাগলাও তাঁর রচনায় নদীয়ায় রাধাকৃষ্ণের যুগল লীলামাহাত্ম্যে রঙের উৎসবের মাস ফাগুন মাসে নদীয়ায় যেতে চাইছেন। চৈতন্যকে তিনি পরমপুরুষ হিসাবে উপস্থিত করে নিজের ভক্তি অর্ঘ্য নিবেদন করতে চাইছেন। এই আকুতি ঝরে পড়ে তাঁর গানের মাধ্যমে,-
“বৃন্দাবনের পথে যাবো আমায় পথ দেখাবে কে?
কেকা রবে ময়ুর ডাকে বলো এই দিকে না ওই দিকে?
কবে হবে আকাশবাণী আমায় কৃপা করবেন রাধারাণী,
শূন্য পথে বংশীর ধ্বনী বাজবে যখন আমার বুকে।
শ্যাম সোহাগী গৌরী আমার কৃষ্ণ নামে দিচ্ছে ঝংকার,
নীল যুমনার এপার-ওপার কত মধুর ছবি আঁকে।
শ্যাম সুন্দর আর মদন মোহন বাঁশির সুরে ভরলো ভূবন,
ওরে আমার বধির শ্রবণ আমার অন্ধ নয়ন খুলে দেবে?
ময়ুর নাচে পেখব তুলে হা কৃষ্ণ, হা কৃষ্ণ ব’লে,
ভবা বলে আয়রে চলে বলে আয় তোর শ্যামা মাকে।”
সাধক তাঁর এই আর্তি ভক্তি সাধনায় পরমপুরুষের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছেন। শক্তি তত্ত্বে মূল শক্তির আধারে রাধারানীর কাছে কৃপা চাইছেন। আবার গানের শেষ চরণে তাঁর শ্যামা মায়ের কাছে অনুমতি চাইছেন।
‘কৃষ্ণ বলে কাঁদে কয় জনা
পাগলিনী রাধা কাঁদে আর কাঁদে যমুনা।
বাঁশি যখন বাজতে থাকে নীল যমুনার আঁকে বাঁকে,
রাধে তখন কলসী কাঁখে কি করবে সে জানে না।
রাধারাণীর স্মরণ নিলে তবে কৃষ্ণের দেখা মেলে,
রাধে তুমি কোথায় গেলে কৃষ্ণ প্রেমের গিনিসোনা।
যমুনা আর রাধারাণী আমায় কৃপা করবে জানি,
দুই অঙ্গে এক অঙ্গখানি গৌর কাঁদে কৃষ্ণ কাঁদে না।
কৃষ্ণ কেবল বাজায় বাঁশী তাই তো কৃষ্ণ ভালোবাসি
ভবাও তাই কইছে হাসি কান্নাকাটির ধার ধারে না।।”
কৃষ্ণকে ভজনার পাশাপাশি রাধারাণীকে অস্বীকার করতে পারছেনা। তিনি এই গানের একটি পংক্তিতে বলছেন পরমপুরুষকে পাওয়ার জন্য রাধারাণীর কাছে স্মরণ নিতে হবে। গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্মে রাধারাণীকে মুখ্য প্রধান্য দেওয়া হয়েছে সেইরূপ ভবাপাগলাও রাধারাণীকে প্রধান করে তাঁর রচনাকে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। এর একটি কারণও আছে, সেটি হলো হিন্দুতন্ত্রে শক্তিবাদের ভাবনা। প্রাচীন কাল থেকে শিব ও শক্তির, শক্তিমান ও শক্তির মিলনাত্মক অদ্বয়ত্ব কল্পনা করা হয়েছে। ফলে শক্তির প্রাধান্য সবসময় বেশি বলেই ধারণা করা হয়েছে। শক্তিই হলো মূল তত্ত্ব শেখানে শিব বা শক্তিমান হলো তাঁহার আধার। বিশ্বব্যাপী পরাশক্তির মধ্যেই পরমপুরুষ বিরাজ করে। শক্তিই পরমপুরুষ-ব্রহ্ম ও সকল দেবতাকে ধারণ করে আছে। ভবাপাগলা শক্তির আরাধনা তথা মা কালীকে ইষ্ট বলেই সাধনা করেছেন। রাধারাণী বৈষ্ণব অনুসঙ্গে মূল শক্তি। তাই রাধারাণীর প্রতি এতটা গুরুত্ব তাঁর রচনায় দেখতে পাওয়া যায়।

ভবাপাগলার রচনাগুলির মধ্যে দেহতত্ত্ব মূলক গানের উপস্থিতি আমরা দেখতে পাই। দেহতত্ত্বমূলক গানের প্রচলন বহুলভাবে আমরা বাউলগান গুলিতে দেখতে পাই। ভবাপাগলা একজন শাক্তসাধক, তাঁর সাধনার আচরণে দেহকেন্দ্রিক সাধনার বার্তা তিনি দিয়েছেন বিভিন্ন গানের মধ্যে। বাংলার বাউল মতের গানের চলনে তাঁর গান বহু গায়ক উপস্থাপন করে থাকেন। তার মধ্যে একটি গানের উল্লেখ করা যায়-
আমার নিতাই চাঁদের দরবারে,
গৌর চাঁদের দরবারে
একমন যার সেই যেতে পারে,
আবার দুই মন হলে পরবি ফেরে, ক্ষ্যাপারে
ওরে পারবি না পারে যেতে।
চার দশে চল্লিশ সেরে মন
রতি মাশা কম হইলে, ক্ষ্যাপারে
নেয় না মহাজন,
বলি আরেক হাকিম বসে আছে,
ব্রজে রাধারাণী পার করে।
কাঠুরিয়া মানিক চিনে না, ক্ষ্যাপারে
চিনির বলদ বয় যে চিনির
ও ভাই, স্বাদতো পেলে না,
যেমন স্বর্ণকারে সোনা চেনে
আবার নেয় সেথায় পরখ করে।
যে জন চাকতা গুড়ের
ভিয়ান জানে না
ওলা রস বাঁধবি কি করে,
আবার ভবা পাগলার রসের তত্ত্ব
ওরে জীবে জানবে কি করে।”
এখানে সম্পূর্ণ গানের পংক্তিগুলি তুলে ধরা হলো তার কারণ দেহতত্ত্বমূলক গানের প্রতিটি শব্দের একটা আলাদা গুরুত্ব আছে। বাউলরা দেহতাত্ত্বিক গানে দেহের বিভিন্ন কর্মকান্ডগুলিকে প্রতীকের মধ্যে দিয়ে প্রকাশ করে থাকে। ভবা পাগলাও সেইরকমভাবে বিভিন্ন প্রতীক এই গানে ব্যবহার করেছেন। যেমন চিনির বলদ, রতি মাশা, হাকিম, স্বর্ণকার, গুড়ের ভিয়ান, ওলা রস এবং রস প্রভৃতি শব্দগুলি দেহ কেন্দ্রিক সাধনার বিষয়বস্তু একজন সাধক তার শিষ্যদের কাছে রূপকের আড়ালে দেহসাধনার সম্যক অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে থাকেন। ভবা পাগলাও তাঁর গানে বর্ণনা করেছেন সাধু গুরু বৈষ্ণবগণ যাতে এই তত্ত্বের মধ্যে দিয়ে আগামী দিনের সাধনাকে এগিয়ে নিয়ে যান সেই বার্তা তুলে ধরেছেন। আরও একটি গানের কথা এখানে বলা যায় যেমন-
“আমি যার বাড়িতে বসত করি সে বড় সুন্দর বাড়িওয়ালা,
তার আছে প্রচুর দাসদাসী ঝাড়ে-মোছে দুইবেলা।
আটকুঠরী নয় দরজা ঘরে ঘরে অনেক প্রজা
কেউ বা ব্যাঁকা, কেউ বা ল্যাংড়া মুশকিল হয় তাদের চলা।
মশুকিল-আসান দ্বারে দ্বারী একটু শুধু দ্বন্দাচারী,
দফা সারে ক’রে চুরি যদি পায় মন কপাটখোলা।
বাড়িওয়ালার আশেপাশে বুদ্ধি দিতে কতই আসে
বাড়িওয়ালার কাছে গিয়ে বসে থাকে ভবা পাগলা।”
দেহতাত্ত্বিক গান মূলত বাউল সাধকেরা করে থাকেন। তার প্রধান কারণ হলো দেহকে কেন্দ্র করেই তাদের সাধনা আবর্তিত হয়ে থাকে। ভবা পাগলা তাঁর সাধনার স্তরে বাউল আঙ্গিক সাধনার চলন নিয়ে কোনোরকম ভেদাভেদ করতে না। তিনি সকল সাবু গুরু বৈষ্ণবের সঙ্গ করেছেন। জীবনের উপলব্ধিতে তাঁর মনের ভাব প্রকাশ করে গানের রচনা করে গেছেন। দেহতত্ত্বমূলক গানের পূর্বসুরি লালন, কুবীর, হাউড়ে সকলের প্রতি তিনি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন। তাঁরা রচনায় এদের প্রভাব যে ছিল না এটা বলা যাবে না। উপরে উল্লিখিত গানের পংক্তিগুলি লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, পূবসুরিদের মতো প্রতীকের ব্যবহারে জীবনের স্বরূপ সন্ধানে দেহের ভিতরের কর্মকান্ডকে পরিচালনা করবার জন্য বাড়িওয়ালার কঠিন পাহাড়া। সেই বাড়িওয়ালার সাথে তিনি সম্পর্ক তৈরি করার জন্য বসে আছেন। দেহতত্ত্ব মূলক গানের পসরা সাজিয়েছেন নিজের খেয়ালখুশিতে।
সত্যেন্দ্র প্রসাদ নন্দী
ঠিকানা — কালনা , পূর্ববর্ধমান ৷
ধারাবাহিকভাবে কবিতা ,গল্প ও প্রবন্ধ লিখে চলেছেন কালনা থেকে ৷ একসময় একটি পাক্ষিক সংবাদপত্র চালিয়েছেন ৷ বর্তমান সময়ের অভাব ও যন্ত্রণা তার কবিতায় বার বার এসেছে ৷ একটি কাব্য গ্রন্থ ও একটি গল্প সংকলনের পাশাপাশি উপন্যাসও প্রকাশিত হয়েছে ৷ সম্প্রতি লোক সংস্কৃতি এবং বাউলাঙ্গিক ঘরানার গবেষণা ও লেখা লিখছেন ৷ এবারের কলকাতা বইমেলাতে প্রকাশিত হয়েছে হাউরে গোঁসাই এর জীবন ও সাধনা ৷ এছাড়া সত্যেনবাবু একজন লোকো গায়ক ৷
