অভয়া কে একটি খোলা চিঠি
স্বপ্নেশ গুপ্ত
অভয়া,
কোথায় আছেন জানি না। কেমন আছেন তাও জানি না। জানার উপায়ও নেই। এখনো কি আশা করেন? স্বপ্ন দেখেন? নাকি এত দিন ধরে সুবিচার থেকে বঞ্চিত হবার তীব্র বেদনায়, অবসাদে, হতাশায় আপনার আশার মৃত্যু হয়েছে। স্বপ্ন দেখার ইচ্ছা আপনি হারিয়ে ফেলেছেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন রাতের পর রাত জেগেও আমাদের চোখে ঘুম নেই। লাঞ্ছনা, অত্যাচার, অপমান, নিগ্রহ, হুমকি, ধমক, চমকানির পরেও আপনার বোনেরা, দিদিরা, মা -কাকিমা রা, দাদা রা ভাইরা, কাকারা, জ্যাঠারা জেগে আছি। প্রতি মুহূর্তে আমরা তীব্র যন্ত্রণায় বিবশ হয়ে গেছি কারণ আমরা দেখেছি আমাদের চোখের সামনে রাজপথে বীর দর্পে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে সেই শ্বাপদ রা যারা আপনার হত্যার জন্য পরোক্ষ বা প্রত্যক্ষ ভাবে দায়ী। অবসাদ, হতাশার অন্ধকারে আমরা প্রতি মুহূর্তে ডুবে গেছি যখন দেখেছি যারা সুপরিকল্পিত ভাবে আপনাকে হত্যা করেছিল, আপনাকে ধর্ষণ করেছিল প্রশাসনের কর্তা রা তাদের কে বাঁচাতে ময়দানে নেমে গিয়েছিল। রাষ্ট্রিক ষড়যন্ত্রর মাধ্যমে আপনার সাথে ঘটা নারকীয় ঘটনার সত্য উদঘাটনে প্রতি পদে প্রতিবন্ধকতা তৈরী করেছে। আমরা অবসন্ন হয়েও লড়াই ছাড়িনি, অত্যাচার, অপমান, নিপীড়ন আমাদের দমাতে পারে নি। আমরা হাল ছাড়ি নি। প্রশাসন তার সমস্ত নখ, দাঁত বার করে রাজপথের আন্দোলন কে থামিয়ে দিতে পেরেছে কিন্তু আমাদের বুকের ভেতরের আগুন কে নেভাতে পারে নি। সে আগুন কে নেভানোর ক্ষমতাও প্রশাসনের ছিল না। সেই আগুন আমাদের বুকের ভেতর এত দিন ধরে জ্বলে চলেছে। হ্যাঁ এখনো জ্বলছে। কারণ এখনো সুবিচার অধরা। সেই জ্বলন্ত আগুন আমাদের সংকল্প কে দৃঢ় করেছে। কোন এক অদৃশ্য বিনি সুতোর বন্ধনে বাঁধা পড়ে আমরা তৈরী হয়েছি, ঘরে ঘরে নীরবে জোট বেঁধেছি। আমরা অপেক্ষা করেছি উপযুক্ত সময়ে উপযুক্ত জবাব দেবার জন্য। পূর্বতন শাসক ভেবেছিল দুর্বল দের দমিয়ে দিতে পেরেছে। হ্যাঁ, আমরা নিতান্ত সাধারণ, আমরা দুর্বল। আমাদের প্রশাসনিক ক্ষমতা নেই। কিন্তু “শাসনে যতই ঘেরো আছে বল দুর্বলেরও।”

এই সহজ সত্যি টা চিরকালের মতন এবারো শাসক বুঝতে পারে নি। স্বাধীনোত্তর গণতান্ত্রিক, প্রজাতান্ত্রিক ভারতে এই বল আমাদের দিয়েছে আমাদের সংবিধান। একটি ভোটের বল। আপাত ভাবে নিরীহ কিন্তু সেই একটা একটা ভোট যখন গ্রামে, শহরে, জেলায়, রাজ্যে একজোট জয় তখন শাসকের আসন টলিয়ে দেয়। তখন রাজছত্র ভেঙে পরে। ক্ষমতা তখন ভুলুন্ঠিত হয়ে অস্তিত্বহীনতায় ভোগে। আমাদের ভেতরের সেই আগুন এবার ভোটের রূপ ধারণ করে সুনামি হয়ে আছড়ে পড়েছে ই ভি ইম এ।পূর্বতন শাসকদের করেছে ক্ষমতাচ্যুত।আর বর্তমান শাসক কে দিয়েছে সুবিচার করার দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা।

আপনার মা আজ জয়ী। আজ তিনি যারা এ রাজ্যের নতুন শাসক হলেন তাদের একজন। মানুষ অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিভেদ ভুলে আপনার মা কে জয়ী করেছেন।
বিচার তাঁকে ছিনিয়ে আনতেই হবে। কারণ আপনি এখন আর শুধু রত্না দেবনাথের মেয়ে নন, আমরা সবাই আপনার আপন জন।
সুবিচার যত দিন না পাওয়া যাবে ততদিন আমরা সেই দাবী থেকে সরবো না। সেই ষড়যন্ত্রী দের মধ্যে তিনজনের আজ ১৫/০৫/২০২৬ তারিখে মাঝারি মাপের শাস্তি হয়েছে। কিন্তু এরা তো সেই শাসনতন্ত্রের হাত, পা, চোখ, কান। তাই এদের শাস্তি সুবিচার নয়, তবে সুবিচারের পথে দৃঢ় পদক্ষেপ। কিন্তু মাথা অবধি পৌঁছাতে হবে। দিগন্তে লাল আলোর ছটা। কিন্তু এখানেই পথের শেষ নয়, আশার সমাপ্তিও নয়। বরং আরম্ভ। অনেক দূর অবধি যেতে হবে। আমরা আশায় বুক বাঁধছি।”ঢেউ উঠছে, কারা টুটছে।”কিন্তু সেই আশার যদি সমাধি হয় তাহলে তার পরিণাম কিন্তু বর্তমান শাসকের পক্ষে ভালো হবে না। Justice can be delayed but can not be denied. দেরী অনেক হয়েছে, এবার যেন যত দ্রুত সম্ভব সুবিচার হয়।আর বর্তমান শাসকও যদি পূর্বতন শাসকের ছেড়ে যাওয়া পোষাক গায়ে চাপায় তাহলে তারা অবশ্যই যেন মনে রাখে –
“আমাদের শক্তি মেরে তোরাও বাঁচবি নে রে
বোঝা তোর ভারী হলে ডুববে তরী খান। “
নিবেদনান্তে,
আমরা যারা আপনার জন্য লড়ে চলেছি।

স্বপ্নেশ গুপ্ত
নদীয়া জেলার নৃসিংহপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ইংরাজী শিক্ষক ৷ লেখার থেকে পড়াতেই বেশি আগ্রহ ৷ নাট্যকর্মী ৷ শ্রুতি নাটক লিখতে ভালোবাসেন ৷প্রবন্ধও লিখেছেন বেশ কিছু নামি পত্রিকায় ৷বিশেষ পচ্ছন্দ আড্ডা এবং গান শোনা সিনেমা দেখা ৷
ঠিকানা — সেন পাড়া ,কালনা ,পূর্ব বর্ধমান ৷

ভালো লাগলো লেখাটা পড়ে। আর আরো ভালো লাগলো শেষের কথাটা। আশা নিয়েই মানুষ বাঁচে। আর দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়া জনগণ সরকার বদলেছে যে আশায় সেই আশা পূরণ না হওয়াটা আরো যন্ত্রণার। সত্যিই তাই। তবুও আশায় বুক বেঁধে এগিয়ে যাওয়া। 👍👍👍
লেখনী ভালো। এবার অপেক্ষা : সুবিচারের
স্বপ্নেশ বাবু , আপনার এ লেখা সারা বিশ্বের শুভ বুদ্ধি সম্পন্ন প্রতিটি মানুষের একান্ত মনের কথা । পৃথিবীতে কোনো অত্যাচারী কখনও ছাড় পায়নি … ….. আমরা সর্বান্তকরণে আশাবাদী …. একদিন প্রতিটি শয়তান শাস্তি পাবেই ।