নববর্ষ, হালখাতা ও প্রাচীন বাংলার বাণিজ্য
অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায় (ইতিহাস পাঠক ও গবেষক)
১৪৩৩ বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন ১ লা বৈশাখ যতটা না মাঙ্গলিক সংস্কৃতির পরিচায়ক তার চাইতেও বেশি গুরুত্বপূর্নদিন বাংলার ব্যবসায়িক ক্ষেত্রে ৷ বাংলা সন বা বর্ষের ইতিহাস অনেকদিনের ৷বহু প্রাচীনকাল থেকেই আমাদের বঙ্গে সৌরকেন্দ্রিক বর্ষগননা হত ৷

মুঘল সম্রাট আকবর তার রাজত্বকালে দেখলেন এ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে বিভিন্ন বর্ষপঞ্জী , তখন ভারতে হিজরী সন গননা পদ্ধতিও চলছে ৷ কিন্তু কর আদায়ের ক্ষেত্রে এইসব বর্ষপঞ্জী ঠিকঠাক সুবিধাজনক হচ্ছে না ফলে তিনি তার রাজ জ্যোতিষি আমির ফতেউল্লাহ সিরাজীকে এমন এক ক্যালেন্ডার তৈরি করতে বলেন যা ফসল উৎপাদনের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হবে এবং সৌরকেন্দ্রীক এই পঞ্জিকায় হিজরী সনেরও গুরুত্ব থাকবে ৷এর আগে হিজরী সন অনুযায়ী কর আদায় অসুবিধাজনক ছিল ৷ ফসল উৎপাদনের পর কর নেওয়াই সঠিক নিয়ম কিন্তু এ ব্যবস্থা করা যাচ্ছিল না ৷ সিরাজী সাহেব মুসলিম চন্দ্রগননা পদ্ধতি সৌরকেন্দ্রিক গননা পদ্ধতিতে সংযুক্ত করলেন ৷ ফসলি বর্ষ ক্যালেন্ডার তৈরি হয়ে গেল ১৫৮৪ সাল থেকে ৷ পরবর্তীকালে বছর শেষে পাওনা গণ্ডা মিটিয়ে দেবার রেওয়াজ তৈরি হয় ৷ সারাটা বছর চাষের পর কৃষক যেমন রাজস্ব দেবে তেমনি বণিকদলও তাদের হিসাব নিকাশ বুঝে নেবে বচ্ছরের শেষদিনটিতে ৷ কার কাছে কত পাওনা তার হিসাব লেখা আছে যে খেরোর খাতায় তা দেখে পরদিন সেইসব ক্রেতাদের ডেকে মিষ্টি মুখ করিয়ে টাকাটা বুঝে নেওয়ার বিষয়টি বছর শুরুর প্রথমদিনেই করা হতে লাগলো ৷ ১ লা বৈশাখ তাই বণিকদের কাছেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ দিন হয়ে গেল ৷

এ দিন বাঙালি ব্যবসায়ীদের মধ্যে মন্দিরে পুজো দেওয়ার হিড়িক পড়ে। একটা লাল সালুতে বাঁধানো দড়ি বাঁধা খাতা কিংবা হাল আমলের কার্ডবোর্ড বাঁধানো গণেশের ছবি দেওয়া একখান খাতা নিয়ে তারা ঢুকে যান মন্দিরে। পুরুতমশাই আবার সেই খাতা খুলে লক্ষ্মী গণেশের কাছে পুজো দিয়ে তার সামনের পাতায় তেল-সিঁদুর দিয়ে এঁকে দেন একখানা স্বস্তিক চিহ্ন আর তারপর একটা পুরানো দু’টাকার কয়েন সিঁদুরে মাখিয়ে তার ছাপ দিয়ে দেন পাতার সামনেই। তারপর প্রসাদ আর খাতা হাতে দোকান খোলেন ব্যবসায়ীরা। দোকান সাজানো হয় শোলার কদমফুল আর আমপাতা দিয়ে। নতুন বছরের প্রথম দিনে অনেকে আবার ক্রেতাদের মিষ্টিমুখও করান। পুরোনো বছরের ধার-বাকি হিসাবের জের টেনে শুরু হয় নতুন খাতা লেখা। কেউ আগের বাকি মিটিয়ে দেন, কেউ নতুন জিনিসপত্র কেনাকাটা করেন – সবই তোলা হয় সেই খাতায়। এরই নাম হালখাতা (Halkhata) ।

আজ অবশ্য শুধু ব্যবসার সঙ্গেই এই হালখাতার সংস্কৃতি জড়িয়ে রয়েছে, অতীতে কিন্তু তা ছিল না। কৃষিভিত্তিক সমাজে হালখাতা ছিল সম্পূর্ণ কৃষিকাজের সঙ্গে জড়িত একটি প্রথা। হালের খাতাই ছিল হালখাতা – এই ‘হাল’ কথার মানে লাঙলের ফলা। আদিম মানুষ ঠিক যে সময় থেকে চাষাবাদ শিখলো, সেই সময় চাষ করা ফসলের বিনিময় প্রথা শুরু করল তারা আর তার জন্যেই হিসাব রাখা হতো একটি খাতায়। সংস্কৃত শব্দ ‘হাল’ মানে লাঙল আর ফারসি ভাষায় ‘হাল’ কথার মানে নতুন। ভাষাবিদরা মনে করেন ‘হাল’ কথাটি সম্ভবত দুটি ভাষা থেকেই বাংলায় এসেছে। এই রীতি বহাল রেখে ছিলেন মোগল সম্রাট আকবর। জমিদারি প্রথা তখনও বহাল রয়েছে বাংলায়। নিয়ম ছিল বছরের নির্দিষ্ট একটি দিনে জমিদারেরা তাদের সমস্ত বকেয়া খাজনা বা রাজস্ব জমা করবেন সম্রাটের ঘরে। সেই বিশেষ দিনে খাজনার হিসাব হালনাগাদ করা হতো। নবাব জমিদার সকলের মধ্যে আকবর এই দিনের জন্য চালু করেছিলেন ‘পুণ্যাহ’ প্রথা। মৌসুমী ফসল বিক্রির টাকা পেতেন এই দিন কৃষকেরা আর তা দিয়ে তারা পুরো বছরের বকেয়া শোধ করতো বিভিন্ন দোকানদারের কাছে। ফলে দোকানদারদের খাতায় সেই হিসেব তুলে রাখতেই হতো। সেটাই ছিল হালখাতার রীতি।

তবে কি আমরা বাংলার মানুষ শুধুই কৃষিকাজ করতাম ? শিল্প ও বাণিজ্য কি শুরু হয়েছিল বেনিয়া জাতি ইংরেজদের হাত ধরে ? কারণ কলকাতায় যে বাবু কালচার গড়ে উঠেছিল তার বাবুরা প্রায় সকলেই ছিলেন ইংরেজ অনুগ্রীহিত ব্যবসাদার ৷ তাই মনে করাই স্বাভাবিক ৷ কিন্তু বছরের প্রথমদিন এটা লিখতে বেশ অহংকার বোধ হচ্ছে সেটা হল বাঙালি আসলে ছিল কৃষি ও শিল্প উৎপাদনমূখী ব্যবসায়ী জাতি ৷ বহু বহু প্রাচীন কাল থেকেই তার ব্যবসাবৃত্তির প্রমাণ পাওয়া যায় ৷

একদিকে তাম্রলিপ্ত বন্দর ,অন্যদিকে সপ্তগ্রাম , উত্তরে গৌরের নিচের অংশ এবং প্রাচীন গঙ্গার দক্ষিণ পশ্চিম পাড় এই নিয়ে ছিল রাঢ়ের বাণিজ্য অঞ্চল ৷ যে অঞ্চলের বাণিজ্যের জন্য একসময় (মুঘল শাসনের প্রারম্ভে ) বাংলা সারা পৃথিবীর লক্ষ্য ছিল ৷
মঙ্গলকোট , মানকড় , উজানিনগর (কোগ্রাম ) , দাঁইহাট , কাটোয়া , মুর্শীদাবাদ , কালনা এই সমস্ত বাণিজ্য কেন্দ্রগুলি একসময় বাংলার অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা গ্রহণ করেছিল ৷

অজয় ও কুনুরের সঙ্গমস্থলের উজানি থেকেই ধনপতি ও তার পুত্র শ্রীমন্ত সিংহল যাত্রা করেছিলেন ৷এই ধনপতি ছিলেন গন্ধবনিক জাতির অন্যতম শ্রেষ্ঠ বণিক ৷
দাঁইহাট , কাটোয়া ,কালনার অবস্থান গঙ্গা তীরবর্তী হওয়ায় বাণিজ্য কেন্দ্র রূপে পরিচিত হয়েছিল ৷

বাণিজ্য সম্মৃদ্ধি সাধরণ মানুষের জীবনযাত্রার মানকে বৃদ্ধি করেছিল বলেই একসময়ের অনুর্ব্বর জঙ্গলাকীর্ণ (রাঢ়ের বেশ কিছু অংশ ) রাঢ় মারাঠা দস্যুদেরও লক্ষ্যবস্তু ছিল ৷ এ অঞ্চলেই বার বার সামন্ত রাজা ও জমিদাররা ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকেই তৈরি হয়েছে ইতিহাস তার সাক্ষী ৷ স্বাধীনতার আগে পর্যন্ত যে বর্ধমান রাজারা বাংলায় প্রভাব বিস্তার করে এসেছে তারাও মূলত ব্যবসায়ী ছিলেন ৷পশ্চিমপ্রদেশ থেকে ব্যবসা সূত্রে এসে বর্ধমানে স্থায়ী বসবাস করতে লাগেন ৷ গঙ্গা তীরবর্তী হওয়ায় প্রথমে দাঁইহাটকে বর্ধমান রাজারা তাদের পবিত্র স্থান হিসাবে বেছে নিলেও যখন বর্গী আক্রমন হয় তখন তারা দাঁইহাট থেকে তাদের তীর্থ অঞ্চল গুটিয়ে নিয়ে কালনায় চলে আসেন ৷কালনার সাথে এমনিতেই বর্ধমান রাজাদের পুরানো সম্পর্ক ৷

পুরানো বাণিজ্য অঞ্চল তাই কালনাতে গড়ে ওঠে একের পর এক মন্দির , প্রশাসনিক ভবন , স্মৃতি সৌধ ৷ এ গেল একটা দিকের কথা কিন্তু চন্ডীমঙ্গল বা মনসামঙ্গলে যেসব চরিত্রকে মূখ্য রাখা হয়েছিল তারা সকলেই ছিলেন ব্যবসায়িক ৷ উজানি ও চম্পকনগর এদুটি স্থানের কথা মঙ্গলকাব্যে উঠে এসেছে ৷ আর যাই হোক লোক মুখে মুখে তৈরি হওয়া কাহিনি মুকুন্দরামের সুন্দর রচনাতে পরিশীলিত হয়েছে ৷ বনিকদের যে এ বঙ্গে রমরমা ছিল তা বর্ননাগুলো পড়লেই বোঝা যায় ৷ নাম ও বাসস্থান উল্লেখ হয়েছে কাব্যমধ্যে ৷ খুল্লনার পাত্র নির্বাচনে জনার্দন পণ্ডিত বাংলার ব্যবসায়ী সমাজের বিবাহযোগ্য ছেলেদের একটা তালিকাই করে দিলেন ৷ প্রধানত রাঢ় দেশের বর্ধমান ও হুগলী অঞ্চলের বণিকদেরই নাম করেছেন কবিকঙ্কণ ৷সবচাইতে বেশি নাম পাওয়া যায় ধনপতি সওদাগরের পিতৃ শ্রাদ্ধ উপলক্ষ্যে উজানিতে বিভিন্ন স্থান থেকে যে বণিকদের সমাগম হয়েছিল তার তালিকায় ৷
একে একে বণিকের কত কব নাম ৷
সাত শত বেনে আইসে ধনপতি ধাম ৷
বোঝা যাচ্ছে যে ধনপতি সদাগরের নিমন্ত্রণে সেদিন সাতশো বণিক হাজির হয়েছিলেন ৷ কবিকঙ্কণের তালিকা থেকে কিছুটা তুলে ধরছি — বর্ধমানের ধুস দত্ত , চম্পাইনগরের চাঁদসদাগর , লক্ষ্মী সদাগর , কর্জনার নীলাম্বর ও তাঁর সাতভাই ,গনেশপুরের সনাতন চন্দ ও তাঁর ভাই গোপাল , গোবিন্দ , দশঘরার বাসুলা , সপ্তগ্রামের শ্রীধর হাজরা , সাঁকোর শঙ্খ দত্ত ,বিষ্ণু দত্ত ও তাঁর সাত ভাই ,কাইতির যাদবেন্দ্র দাস , জাড়গ্রামের রঘূ দত্ত , তেঘরার গোপাল দত্ত , ত্রিবেণীর রাম রায় ও তাঁর দশ ভাই , লাউগাঁর রাম দত্ত , পাঁচরার চণ্ডীদাস খাঁ , সাতগাঁর রাম দাঁ ,বিষ্ণুপুরের ভাগ্যবন্ত খাঁ , খণ্ডঘোষের বাসু দত্ত , গোতানের মধু দত্ত ও তাঁর ভাই এমন বহু নাম পাওয়া যায় ৷ প্রধানত বাংলার সুবর্ণবনিক গন্ধবণিক ও তাম্বুলিবণিকেরা জলপথে রাপ্তানী বাণিজ্য চালাতেন দূর দূর দেশগুলোতে ৷ এভাবে বণিকজাতির প্রায় দেড় হাজার বছরের একটা ইতিহাস ও ঐতিহ্যের হদিশ পাওয়া যায় শুধুমাত্র রাঢ়দেশেই ৷ বাংলার অন্য অঞ্চল গুলোরও বাণিজ্য ইতিহাস বেশ ঈর্ষনিয় ৷৷ আজ নববর্ষের প্রথমদিনটিতে তাই আমাদের পূর্বের বাণিজ্য ঐতিহ্য স্মরণ করা খুবই প্রয়োজন ৷৷
অভিজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়
ভাষাপথের সম্পাদক এবং সব রকম লেখার সাথে যুক্ত ৷ বর্তমানের ভাষাপথ বিষয় ভিত্তিক সংখ্যা করছে ৷ বাসভূমি কালনা ৷ পেশা শিক্ষকতা ৷

বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে লেখক কে জানাই আন্তরিক শুভেচ্ছা । লেখাটি পড়ে ঋদ্ধ হলাম । সারা বছর সকলকে নিয়ে সুস্থ ও সুন্দর থাকবেন এই কামনা করি ।
অনেক অনেক কৃতজ্ঞতা জানাই ৷
অত্যন্ত সুন্দর, ঝরঝরে লেখা। অনেক তথ্যসমৃদ্ধ হলেও তথ্যের ভারে অবনত নয়,বরং লেখার গুণে আদ্যন্ত সুখপাঠ্য।
এইরকম লেখা যত বেশী হয় ততই মঙ্গল।
লেখার মধ্যে ইতিহাস আছে, আছে বিশ্লেষণ, নিজস্ব ভঙ্গিতে লেখক অনায়াসে আমাদের মুগ্ধ করেছেন।
অনেক কৃতজ্ঞতা রইলো ৷
খুবই সুন্দর ও তথ্যবহুল লেখা। লেখকের উপস্থাপনা সত্যিই প্রশংসনীয়। ভবিষ্যতেও এমন লেখা আরও পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
অনেক অনেক ধন্যবাদ ৷
অনেক বড লেখা তবে বেশ তথ্য রয়েছে। পড়তে অসুবিধা হয় নি।
অনেক অনেক ধন্যবাদ ৷
তথ্যবহুল অপূর্ব সুন্দর লেখাটি পড়তে পড়তে কখন যে প্রাচীন বাংলার বিশেষ করে কালনা, কাটোয়া , ও দাঁইহাটের গঙ্গার ধার ও ব্যবসায়িক জনপদ গুলিতে হারিয়ে গিয়েছিলাম বুঝতে পারিনি, হঠাৎ দেখি শেষ লাইন।
খুব ভালো লাগলো। আরও বিস্তারিত চাই, তৃষ্ণা বেড়ে গেল।
খুব ভালো লাগলো যে আপনি মন দিয়ে লেখাটা পড়েছেন ৷ আগামীদিনে আমাদের পাশে থাকুন ৷