খিদে
সুদীপ ঘোষাল
এক
দুই বন্ধু, অসীম ও বিপুল কথা বলে জীবনের বিপরীত মেরুতে দাঁড়িয়ে।
– উদরহীন মানুষ, যার খাওয়ার প্রয়োজন নেই,যদি এমন হত?
– এরকম হয় নাকি?
– হয় হয়, ফুটপাতে,রেলস্টেশনে শত শত উদরহীন মানুষ, কেমন ঘর সাজিয়ে, খিদে লুকিয়ে,দীর্ঘশ্বাস গিলে খায় ,দেখিস না।
– তুই মানসিক চিকিৎসা করা, সাইকো কোথাকার।
বিপুল তার বিপুল খিদের পেট নিয়ে খেতে খেতে এগিয়ে চলে।প্রথমে খায় মাল্টিস্টোরেড বিল্ডিং, সেতু, সরকারি আবাস মায় লোহার টিউবওয়েল,পায়খানা ঘর পর্যন্ত।
অসীম বলে,তোর মত খাদক হতে গেলে লোকবল চাই,রাজনৈতিক এলেম চাই।তোর বড় হাত,বড় খিদে,বড় নাম,বড় ক্ষমতা।
পানের পিক গিলে ফেলে বিপুল হাসিমুখে। কিছুই ফেলে না সে।এমনকি মায়ের গহণা পর্যন্ত গিলে খায় দ্বিধাহীন ভাবে।
অসীমের পেট শুকিয়ে মরা পুকুরের মত মজে যায়। বিপুল অসীমকে দুটো সাঁড়াশি দিয়ে মুখ টেনে খুলে একটা সেতুর নক্সা গেলাতে চেষ্টা করে,কিন্তু পারে না। অসীমের বমি হয়ে যায়।
বিপুল বলে,আমার সঙ্গে ঘুরিস, একটু খিদে রাখিস, দেখবি ফুলে ফেঁপে উঠবি।
অসীম তাকায় আকাশের দিকে, সমগ্র প্রকৃতি তার বড্ড আপন। সে বিপুলের কথা শুনতে পায় না, তার কানে বাজে শত মৌটুসির ডাক,নদীর কলতান আর অরণ্যের মর্মরধ্বনিতে শোনে খিদের ভাষা।
বিপুল ক্রমশ খেতে খেতে সমগ্র পৃথিবী গিলতে চায়।খিদে চারবেলা পায়,জলখাবার,মধ্যাহ্নভোজ, সান্ধ্য আহার, নৈশ ভোজ।আবার খিদে পায় পরের দিন, এর কোনো শেষ নেই। এ খিদে চলে জীবনজুড়ে, আমৃত্যু।
খেতে খেতে প্রচন্ড খিদে রেখে বিপুল এগিয়ে চলে।
দুই
অসীম তার এক বন্ধুর বিয়েতে নিমন্ত্রিত হয়ে তার বাড়ি যায়।বন্ধুর নাম মাধব।বাউড়ি পাড়ার উপোষী ছারপোকা, মাতাল মাধবের বিয়ে।সামিয়ানা নয়,তোড়জোড় নয় , বাঁশ,প্যান্ডেল জুড়ে এলাহি ব্যবস্থা না হোক,ছেঁড়া তিরপল জুড়ে মচ্ছপের আয়োজন হয়েছে বিয়েতে। শিক্ষিত মাধব মাতালের নুন আনতে পান্তা ফুরোয়।
সে বলে বন্ধুকে, তবু বিয়ে বলে কথা।অনেকের কাছে চেয়েচিন্তে,চালডাল,কুমড়ো সংগ্রহ করেছি আমি।
তারপর বিয়ের দিন খিচুড়ি খেয়ে, পাড়ার না খাওয়া শিশু আর কিশোরদল মহাখুশি। মাধবও খুশি।তার আজ সারাদিন কান্ট্রি চলবে, উল্টো পিঠে গড়াগড়ি হবে।
মাতাল মাধব বলে,পুরোহিত দেলা বাঙ,চলে গেছে, তল্পিতল্পা গুটিয়ে ভারি ব্যাগ নিয়ে, হাল্কা হাওয়ার মত মিলিয়ে গেছে।
মাধব বলে,বিয়েতে পেধান সাহেব এয়েচেন,মাধব বকবক করে আর বলে,একটা ভোটার, দশটা টানে।শর্তমাফিক চলাফেরা মিছিল,মিটিঙ আর পচুই মদ।রাতে বাসর হবে ।
মাধব বাসর বোঝে না মদের আসর বোঝে ,নিয়ম নীতি জানে না।তার সঙ্গীরা বলে,পেথম রাতে বেড়াল মার মাধব ।মাধব টলে,বকবক করে, ধীরে ধীরে শব্দহীন হয়। সে বেড়াল মারতে পারে নি। অতিরিক্ত মদ খাওয়ার জন্য বাসরঘরে শোধ ঘুম মেরেছে।
বিয়ের আগে বিজুলি একবার মাধবের খিদে দেখে বলেছিলো, গতর লিকলিকে ভেতরে আছোলা বাঁশ।বিজুলি আখ, ডান হাতে ধরে, ছ্যাঁকা খেয়ে চিবোয়।মাধবের হাচুলিপাচুলি ভাব দেখে মাপ নিয়েছিলো গোপনে।সেই বিজুলি আজ দোর দিয়ে বসে আকাশের তারা গুণছে,আর ঘুমন্ত মাধবকে দেখছে।ফিস ফিস করে কাঁপা গলায় বিজুলিকে বলে,অধীরের আলকাপের বুলি, লে গুড়জল, চিরিক চিরিক।লে ভজা লে, আর কতদিন থাকবে পিরীত।বিজুলি বলে,যা, নেঙা বাসুলে, অপদার্থ মাতাল,বাসর বোঝে না।
বিজুলির গায়ের মত ফর্সা সকাল।মোদো মাতাল, মাধব বেরিয়ে পড়ে ভাঁটিখানার দিকে।সে দেখে,সরু ঢ্যামনার মত রাস্তা।পাশে খাল,বাঁশবাগান,ভুতুড়ে বাড়ি পেরিয়ে মদের ভাঁটিখানা।
সে মাটির বারেন্দায় বসে,রাসপুতিনের মত একটা লোক দাড়ি নাড়িয়ে বাত মারে,পাছা চুলকোয়।
সে বলে,কখন পাবো ভায়া।আর যে তর সয় না।মদ দাও, কুলকুচি করি।
মাধব তাকায়, লোকটাকে দেখতে পায়।একগাল দাড়ি।
ভাঁটিখানার মালিক হল সুখদেব।
সুখদেব ভাঁটিখানায় ভাত থেকে মদ তৈরি করে।বাউড়িপাড়ার পাশ দিয়ে গেলে এই পচাভাতের গন্ধ ভুরভুর করে।
মাধব বলে কি করে হয় গো মদ?
সুখদেব বলে,তোর কি দরকার।তবে জানতে যখন চাইছিস,তবে শোন। ভাত পচে গেলে একটি বড় হাঁড়িতে বসিয়ে তা ফের ফোটানো হয় উনুনে। ওই হাঁড়ির উপরে বসানো হয় আরও একটি হাঁড়ি। পচা ভাতের বাষ্প পাইপের মাধ্যমে ফোঁটা ফোঁটা করে জমা হয় জারিকেনে বা বোতলে।
মাধব বলে, এটাই হচ্ছে চোলাই মদ বা ইথাইল অ্যালকোহল।
সুখদেব বলে,তু তো একটু নেকাপড়া জানিস। তুই বলতি পারবি কি এটা।আমি বুঝি না।ভালো লাগে খাই,মরে যাওয়া বউটার মায়া গুলে খাই আর মদ তৈরি করি, ব্যাস।
তবে কে যেন বলছে,আসছে আসছে,নেড়ে নে, কুলকুচি করে নে।তারপর খাবি।মাধবেরও দাড়ি গজিয়ে লম্বা হয়েছে।তার খোয়ারি মেটে মদে কুলকুচি করে।শু়ঁড়ি আসে বলে,দেরি আছে,আবার হবে, থেমে খাও দই আসছে।
রাসপুতিনের মত দেখতে লোকটা , বাতেলা দেয়,মাধবকে খোলা ছিপি দেখায়।মাধব গলায় জড়ায়।মাধব তাকিয়ে দেখে কিছুই নাই।নিজের সাদা পাঞ্জাবি আর পাজামার গিঁটের ভেতরে রাতের বোতলখান পেটফুলে আছে।শুঁড়ি আশা দিলেন দেরি করে। মাধব বোতল খুলে কুলকুচি করে,শোয়।আবার আষাঢ়ে স্বপ্ন দেখে, ভিড়ের মাঝে সে হাঁটছে।এত যে ভিড় মানুষ কই।সে বলে,শালা মাঝেমাঝে নিজেকেই গালি দিতে মন হয়।
মিনি বিড়ালের মত গুটিয়ে পড়ে থাকা মাধব আশার স্বপ্ন দেখে।ভোরের স্বপ্ন,সব শিশুদের একমুঠো খাবারের স্বপ্ন।
তিন
অসীম জীবনের হিসেব মেলাতে গিয়ে দেখে বিস্তর না খেতে পাওয়া মানুষগুলো বাবুদের পেটমোটা নৌকার দাঁড় টানে।হাড় জিরজিরে হাত নিয়ে দাঁড়ের হাতলে হাত রেখে গান গায়।বাবুরা ডুবে যাওয়ার ভয়ে ওদের শাসন করে আর দুচার দানা দেয় ছিটিয়ে,ছড়িয়ে।পায়রার মত খুঁটে খুঁটে খায় কুড়োনো দানা।ওরা প্রতিবাদ করবে বলে একত্রিত হয়,ভিখারীর রক্তচক্ষুকে উপেক্ষা করে এগিয়ে যায় বিপুলের বিশাল বাহিনী। মিথ্যাবাদীর পিছনে লাইনে দাঁড়ায় নরবড়ে মেরুদন্ডবিহীন মানুষ।
বিপুল মানবিকতা গুলে খায় মদের সঙ্গে, থালায় ‘মদের চাট,’আছে, রক্তমাংসের নৃশংসতা।
আজ মাধবের বিয়ে করা বউটা আসে বিপুলের ঘরে।মুরগীর মত ছাল ছাড়িয়ে টেবিলে তোলে মাংসপিন্ড। খাবলা জালে ধরে লজ্জাজলের মাছ।তারপর ধীরে ধীরে গিলে নেয় সমগ্র মায়াময় পৃথিবীর বিশ্বাস। মানুষের সংজ্ঞা ভুলে যায় নীরব রাত্রির ভেজানো দরজা।
আবার সকাল হয়।খিদে পায়। বিপুল গিলতে থাকে,ভাঙা হৃদয়,মরচেপড়া মন।আর অভুক্তরা গেলে অবিশ্বাস,দীর্ঘশ্বাস আর মায়াভস্মের ছাই ৷
সুদীপ ঘোষাল
লেখক পরিচিতি – অতি সাধারণ জীবন যাপন লেখকের। সুদীপ ঘোষাল পূর্ববর্ধমান জেলার বড় পুরুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। পিতা প্রভাতকুমার মাতা গীতারাণী। ছোট থেকেই লেখালেখি করেন। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা প্রথম পছন্দ। তারপর জীবনানন্দ ও বিভূতিভূষণ প্রিয় কবি ও লেখক। পশ্চিমবাংলার ও বাংলাদেশের বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখকের লেখা প্রকাশিত হয়।১৯৮৫ সালে প্রথম উপন্যাস লেখেন মিলনের পথে। তারপর চারটি কাব্যপুস্তিকা ও দুটি গল্পসংকলের পুস্তিকা প্রকাশিত হয়।কলকাতা সৃষ্টিসুখ ও এবং ছাপাছাপি দুটি উপন্যাসিকা- সংকলনের গ্রন্থ প্রকাশিত করেন কলকাতা বইমেলায়। বার্লিন অংশুমালী পত্রিকায়, সিডনী প্রভাতফেরী পত্রিকায় ও পশ্চিমবাংলা ও ঢাকার বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় লেখা নিয়মিত প্রকাশিত হয়।গল্প, উপন্যাস লিখতে ভালবাসেন।

গল্পটি পড়ুন ও মতামত দিন বন্ধু ।