বাংলা কথায় দক্ষিণী সুর বসালেন রবীন্দ্রনাথ

রাহুল হালদার


 

tagore’s musical bengal at sunset

­­১৯২৮ সাল,রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বিদেশে যাওয়ার পথে মাদ্রাজের কাছে আডিয়ারে আ্যনি বেসান্ট প্রতিষ্ঠিত এবং তাঁরই আমন্ত্রণে থিয়জফিকেল সোসাইটিতে কয়েকদিনের জন্য বিশ্রাম নিচ্ছিলেন।সেই বিশ্রামকালের কোন এক অবসর মুহুর্তে একদিন থিয়জফিকেল সোসাইটির ‘গিন্ডি হাই স্কুলের’ একজন ছাত্রীর কন্ঠে গান শোনেন।ছোট মেয়েটির কন্ঠে গাওয়া গান কবিগুরুকে প্রসন্ন করায় ছাত্রীটিকে সামনে থেকে দেখবার আর আরো গান  শোনবার জন্য ডাক আসে গুরুদেবের থেকে।

 রবীন্দ্রনাথ  যার কন্ঠে গান শুনেছিলেন তার কাকা ছিলেন সেই সোসাইটির সদস্য। কাকার ইচ্ছায় ছাত্রীটিকে গান শোনানোর জন্য নিয়ে যাওয়া হলে প্রথমে ছাত্রীটি বলেছিলো কোন বুড়ো মানুষের সঙ্গে সে দেখা করবে না। ছাত্রীটিকে কাকা নানা উপায়ে বোঝানোর পর সে গান গাইতে রাজি হল।তারপর যখন ছাত্রীটি গান শোনানোর জন্য রবীন্দ্রনাথকে সামনে থেকে দেখেন তখন সে রবীন্দ্রনাথের ব্যক্তিত্বে এতটাই অভিভূত হয়ে গিয়েছিলো যে বুড়ো মানুষকে দেখবেন না এই জেদ,  শ্রদ্ধায় পরিণত হয় এবং রবীন্দ্রনাথের পা ছুঁয়ে প্রণাম করেন।

মুখোমুখি সাক্ষ্যাৎ পর্ব শেষ হওয়ার পর গুরুদেব যখন গান শোনানোর কথা বলেন তখন মেয়েটি কর্ণাটিক সুরে মীনাক্ষী দেবীর উদ্দেশ্যে দীক্ষিতের রচিত ‘মীনাক্ষী মে মুদম্ দেহি’  ভজনটি শোনান।

ছোট বয়স থেকেই মেয়েটি গান শেখার কোন প্রথাগত  শিক্ষা কারোর কাছে না পেলেও সে নিজের খেয়ালেই গাইতো ত্যাগরাজ,মীরা,মারাঠি সাধু সন্ত প্রভৃতি ভজন কীর্তন। রবীন্দ্রনাথ মেয়েটির গান শোনার পর বুঝলেন যদি একে সঙ্গীতে উপযুক্ত শিক্ষার বন্দোবস্ত করা হয় তাহলে সে অনেকদূর যেতে পারবে তাই গুরুদেব নিজেই মেয়েটির সমস্ত শিক্ষার ভার গ্রহণ করবেন এই সিদ্ধান্ত জানিয়ে মেয়েটিকে শান্তিনিকেতনে আসতে আহ্বান করলেন।

অনিচ্ছা সত্বেও সে গুরুদেবের ইচ্ছাকে সম্মতি দিয়ে শান্তিনিকেতন এসে দিনেন্দ্রনাথের কাছে সঙ্গীতচর্চা শুরু করে। পরে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে তাঁর দক্ষিণী সুরে বাংলা কথা বসিয়ে গান রচনা করেছিলেন।,তিনি হলেন সাবিত্রীদেবী কৃষ্ণান।

“মহিলাদের স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ” গ্রন্থে অমিয়া বন্দ্যোপাধ্যায়কে পিতৃহারা আত্মীয়-স্বজন ছেড়ে আসা চোদ্দ পনেরো বছর বয়েসি অবাঙালি একটি মেয়ে তার নিজস্ব পরিবেশ থেকে ভিন্ন ধারার আরেকটি পরিবেশে এসে প্রথমে কেমন অভিজ্ঞতা হয়েছিলো সে বিষয়ে জানিয়েছিলেন –“দিনুবাবুকে প্রথমে দেখে তিনি অত্যন্ত ভীত হয়ে পড়েন।দিনেন্দ্রনাথ লম্বা চওড়া বিরাট পুরুষ–আর তাঁর চোখ দুটি এত বড়ো ও অসাধারণ যে,সেদিকে তাকাবা মাত্র বালিকা সাবিত্রীর বুকে যেন হাতুড়ির ঘা পড়ত।কিন্তু আস্তে আস্তে তাঁর সদয় ব্যবহারে ভয় দূর হয়ে গেল।”

শান্তিনিকেতনে যখন সাবিত্রী কৃষ্ণান প্রথম আসলেন তখন রবীন্দ্রনাথ শান্তিনিকেতনে ছিলেন না তাই এখানে এসে সে প্রথম গানের শিক্ষা নেওয়া শুরু করেন দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে। এরপর রবীন্দ্রনাথ যখন সাবিত্রীর কন্ঠে বাংলা গানের রেওয়াজ শ্রবণ করেন তখন তিনি দিনেন্দ্রনাথকে বলেছিলেন “সাবিত্রীকে প্রথমে পূরবীরাগের গান শেখা— ওর গলায় তা ফুটবে ভালো।রবীন্দ্রনাথের কথা মত সাবিত্রীকে দিনুবাবু প্রথম যে বাংলা গান শেখান সেটি হলো”অশ্রুনদীর সুদূর পারে ঘাট দেখা যায় তোমার দ্বারে….।”

সাবিত্রীদেবীর শান্তিনিকেতনে থাকবার দিন যত বাড়তে থাকে,নতুন আবাসিক থেকে যখন পুরোনো হতে থাকে তত রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে ধীরে ধীরে আলাপ জমতে থাকে।সেই আলাপ পরবর্তীতে পিতৃস্নেহ স্বরূপে রূপান্তরিত হয়।

পড়া,গান শেখা এই সব কিছু স্বাভাবিক নিয়মে চলতে চলতে একদিন দুপুরে ক্লাস ছুটির পরে সাবিত্রী  কলাভবনের ছাত্রী আবাসে এসে পৌঁছিয়েছে। একটু বিশ্রাম নিয়ে খাওয়া দাওয়া করে আবার ক্লাসে যাবে সেই মুহুর্তে তাঁর ডাক পড়ে উত্তরায়নে।সেখানে গুরুদেবের সামনে উপস্থিত হওয়া মাত্রই তিনি বললেন সাবিত্রী বললেন, তুমি আ্যডেয়ারে যে গানটি শুনিয়েছিলে সেই গানটি গাও আর আমার হাতে একটা কাগজের টুকরো দাও।ক্লান্ত, ক্ষুধার্ত,তৃষ্ণার্ত সাবিত্রী অনিচ্ছা সত্বেও গুরুদেবের আদেশকে অমান্য করতে পারলেন না।রবীন্দ্রনাথের নির্দেশ মত ধীরে ধীরে গাইতে লাগলেন মীনাক্ষীদেবীর ভজন আর রবীন্দ্রনাথ  কাগজে ভজনের সুর অক্ষুন্ন রেখে বাংলা কথা বসালেন——–

                             বাসন্তী, হে ভুবনমোহিনী

                       দিকপ্রান্তে, বন-বনান্তে,

                        শ্যাম প্রান্তরে, আম্রছায়ে,

                         সরোবরতীরে, নদীনীরে

                        নীল আকাশে, মলয় বাতাসে,

                         ব্যাপিল অনন্ত তব মাধুরী।

এরপর গুরুদেব লিখিত কথা সাবিত্রীর গাওয়া মীনাক্ষী ভজনের সুরে বসিয়ে দিনেন্দ্রনাথকে ডেকে নিয়ে এসে নিজে এবং সেখানে উপস্থিত সকলকে শোনালেন। গান গাওয়া শেষে তিনি ঘোষণা করলেন এবারে কলকাতার নিউ এম্পায়ারে বসন্তের নবীব উৎসবে প্রথম গান এটি হবে আর সেই গানটি গাইবে সাবিত্রী।

শুধুমাত্র মীনাক্ষী ভজনে নয় রবীন্দ্রনাথ সাবিত্রীর গাওয়া মারাঠি ভজন, মীরার ভজনের সুরেও (সামান্য পরিবর্তন করে) বাংলা কথা বসিয়ে প্রায় সাত আটটি গান রচনা করেছিলেন।এরকম দু-একটি গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো “প্রেমভাবে জীব জোগিয়া নটলা” মারাঠি ভজনে “শুভ্র প্রভাতে পূর্ব গগনে”,”কোই কছু কহোর” মীরার ভজনে “তুমি কিছু দিয়ে যাও”,”ধ্যান মে বড় মঁয়ী না” ত্যাগরাজের রচিত গানে “বেদনা কী ভাষায় রে” প্রভৃতি উল্লেখ যোগ্য।

সাবিত্রী কৃষ্ণান শান্তিনিকেতনে শুধুমাত্র রবীন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথের কাছে গান শেখার নয়, গানের সঙ্গে সঙ্গে তিনি আঁকা শিখেছিলেন নন্দলাল বসুর কাছে, বাংলা  শিখেছিলেন ক্ষিতিমোহন সেনের স্ত্রী কিরণবালা সেনের কাছে।

১৯২৮ সালে  শান্তিনিকেতন আসবার পর ওই শতকের ত্রিশের দশকের মাঝামাঝি সময় পর্যন্ত একটানা সাবিত্রী কৃষ্ণান শান্তিনিকেতনে থাকেন।এরপর কর্ণাটকে ফিরে গিয়ে বিবাহিত জীবন শুরু করেন কিন্তু দুর্ভাগ্যের বিষয় হলো বিবাহিত জীবনে দুটি পুত্র ও দুটি কন্য সন্তানের মা হয়েও সুখে শান্তিতে সংসার জীবন যাপন করতে না পেরে  নিরাপদ আশ্রয়, শান্তিতে নিভৃতে জীবনযাপন আর সুর সাধনার জন্য  আবারও  তিনি ফিরে আসেন শান্তিনিকেতনে এবং সেখানে মালঞ্চ ভবনের কাছে একটি পর্ণকুটিরে থাকতে শুরু করেন।

সাবিত্রী কৃষ্ণনের মাতৃভাষা তেলেগু হলেও তিনি শান্তিনিকেতনে থাকবার সুবাদে ইংরেজি,বাংলা,হিন্দি,তামিলে কথা বলাতে স্বচ্ছন্দ ছিলেন।শান্তিনিকেতনে তাঁকে কেউ বহিরাগত মনে করেননি, তিনি ছিলেন ভারতবর্ষের মেয়ে।রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন সাবিত্রীকে স্নেহ করতেন,ভালোবেসে তাঁকে উত্তরায়নে ডেকে গান শুনতেন তেমনিই সাবিত্রী কৃষ্ণানের গান শুনে মুগ্ধ হয়েছিলেন পন্ডিত জওহরলাল নেহেরু,ড. জাকির হোসেন, নন্দলাল বসু,আবু সয়ীদ আইয়ুব প্রমুখেরা।

সারাজীবন সুরের তপস্য করলেও তিনি যতটা যোগ্য ছিলেন তার অনেকাংশের কম সম্মান পেয়েছেন।তাঁর মৃত্যুর কিছু আগে যদিও বিশ্বভারতী থেকে ‘দেশিকোত্তম’ উপাধি পেয়েছিলেন কিন্তু সেই সময়টা ছিলো অনেক পরে।রবীন্দ্রনাথ জীবিত থাকবার কালে সাবিত্রীদেবী দুটি গান গ্রামাফোনে রেকর্ড করা হলেও তাঁর অসাধারণ কণ্ঠ আর গায়কী সত্ত্বা থাকা সত্বেও রেকর্ড কোম্পানি তাঁর গানকে পরবর্তীকালে আর রেকর্ড করবার কথা ভাবেননি যিনি কিনা স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ, দিনেন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ সংস্পর্শে থেকে গান শিখেছিলেন।একজন কর্ণাটকদুহিতা হয়েও যে রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে শান্তিনিকেতনে এসে জীবনের বেশীরভাগ সময় কাটিয়ে দিয়েছিলেন,রবীন্দ্র সঙ্গীতকে জীবনে আঁকড়ে থেকেছিলেন সারা জীবন অথচ আমরা বাঙালি তাঁকে মনে রাখতে পারিনি এটা কম আক্ষেপের নয়।

whatsapp image 2026 10 01 at 3.20.25 pm

রাহুল হালদার, বাড়ি নদিয়ার কৃষ্টি সংস্কৃতির পীঠস্থান শান্তিপুরে।তিনি বাংলা সাহিত্য নিয়ে উচ্চতর শিক্ষা নিয়েছেন এবং বর্তমানে শিক্ষাকতাতে যুক্ত রয়েছেন।বিগত এক দশক ধরে তিনি মূলত বিভিন্ন প্রথম শ্রেণির বাণিজ্যিক পত্র- পত্রিকা, গ্রন্থ, লিটল ম্যাগাজিন, ওয়েব ম্যাগাজিনে প্রবন্ধ, নিবন্ধ,ফিচার লেখক হিসাবে সুনাম করেছেন।ওর প্রিয় বিষয়গুলো হল রবীন্দ্র সাহিত্য, উনিশ শতক ও লোকসংস্কৃতি সহ সাহিত্যের নানা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top