বেতারের নেপথ্যে কিছু কথা

নরেশ মণ্ডল

 

313

মিডিয়ার যেমন নেপথ্য কাহিনি থাকে তেমন নাটক, চলচ্চিত্র থেকে আরও অনেক ক্ষেত্রেই আছে। আমাদের আলোচনার বিষয় যেহেতু নির্দিষ্ট একটি ক্ষেত্রে। সেদিকেই নজর দেওয়া যায়। বেতারের ব‌্যাপারটাই অন্যরকম। দৃশ্যমান কোনও কিছু নেই। শব্দই প্রধান। নিটোল গল্প শ্রুতিনাটক হিসাবে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছে দিতে নাট্যকারকে যথেষ্ট সতর্ক থাকতে হয়। শব্দের মাধ্যমে ঘটনাকে শেষ পর্যন্ত টান টান অবস্থায় নিয়ে যাওয়া। নাট্য পরিচালককে সবসময় সময়কে মেনে চলতে হয়। তা সে মূল লেখা যত বড় হোক। দু’পাতার গল্পকে দু’মিনিটে শেষ করার ক্ষেত্রে বাধা আছে। সেই কাহিনিকেও নির্ধারিত সময় পর্যন্ত টেনে নিতে হয়। এক্ষেত্রে বেতার নাট্যকারকে মূল রচনার কিছু অংশ ছাঁটকাট করতে বা সংযোজন করতে হয়।

 এখানে সেটিং, মেক-আপ, কস্টিউম আলো ছাড়া শুধু সংলাপ। অন্যদিকে একটা ছোট বাক্স। যার থেকে শব্দ বের হয়। আর তাকে ঘিরে শ্রোতা। দৃশ্যের কোনও ব‌্যাপার নেই। শুধুমাত্র সংলাপ কণ্ঠ মড্যুলেশনের নৈপুণ্যে আর আবহ সঙ্গীতের মুর্ছনায় লক্ষ লক্ষ শ্রোতার মনে আনন্দ বয়ে যেত।

 নাট্যকার স্ক্রিপ্ট জমা দেন প্রযোজককে। খুব পরিষ্কার করে পৃষ্ঠার এক দিকে লেখা বা টাইপ করা থাকে। দু’পৃষ্ঠায় হলে পাতা ওলটাতে গেলে যে খসখস আওয়াজ হয় তাও মাইক্রোফোনে ধরা পড়ে। লেখার দু’লাইনের মধ্যে ফাঁক থাকা দরকার যাতে অভিনেতারা নোট লিখতে পারেন কোন জায়গায় কণ্ঠস্বরের পর্দা পরিবর্তন করবেন। সাউন্ড এফেক্ট এবং মিউজিক এসব কিছুর নির্দেশও থাকতে পারে।

নারায়ণ সান্যালের ‘তিমিতিমিঙ্গিল’ কাহিনি অবলম্বনে বেতার নাটক এক সময় যথেষ্ট জনপ্রিয় হয়েছিল। পরীক্ষামূলক এই নাটকে যথেষ্ট পরিশ্রম করতে হয়েছিল সমর চৌধুরীকে। তিমির ডাক সংগ্রহ করতে প্রযোজককে মিউজিয়ামে গিয়ে পুরানো ডিস্কে তিমির ডাক সংগ্রহ করেন। সেটা সঙ্গীত নির্দেশক অলোকনাথ দে-কে শোনানো হয়। এই ডাকের অনুসরণে ইলেকট্রনিক বাজনায় তিমির ডাক তৈরি হয়ে যায়। এই ব্যাপারগুলো নেপথ্যের কারিগরদের কাজকর্ম জানতে আরও আগ্রহী করে তোলে।

 থিয়েটারে সেট, স্টেজ, প্রপার্টিজ বদলে যেমন দৃশ্যের পরিবর্তন করা হয়। বেতারের ক্ষেত্রে আবহসুর ব্যবহার করে দৃশ্যের পট পরিবর্তন করা হয়। পরীক্ষানিরীক্ষার কথায় আসা যাক। অজিতেশ বন্দ্যোপাধ‌্যায়ের ‘সওদাগরের নৌকা’ বেতারনাটকে প্রযোজক ছিলেন অজিত মুখোপাধ‌্যায়। সুরারোপ করেন প্রবীর মজুমদার। নাটকের প্রধান চরিত্র একজন ঐতিহ্যবাহী প্রাচীন যাত্রাশিল্পী। যিনি বর্তমানে অবসন্ন এবং অবসরপ্রাপ্ত। যাত্রায় পুনরায় যোগদান নিয়ে দীর্ঘদিন টালবাহানা চলছিল। যে মুহূর্তে তিনি যাত্রায় আবার যোগ দিলেন অমনি পরিবেশ রচনায় ক্লারিয়োনেট বেজে ওঠে। তারপর কনসার্টের সঙ্গে এক এক করে উঠে এল বাস, ট্রেন, স্টিমার, গোরুর গাড়ি ইত‌্যাদির ছন্দোময় ধ্বনি। আর এই শব্দ ব্যবহার থেকে শ্রোতা গ্রাম শহরে অবস্থান বুঝতে পারেন।

সেই সময় সাউন্ডকিউ-তে গোলমাল হলে অদ্ভুত ঘটনা ঘটতো। গাড়িতে করে নায়িকা বা নায়ক বাড়ি ফিরে ঘরে ঢোকে। এখান থেকেই গল্পের শুরু। এদিকে মোটরের গোঁ গোঁ শব্দ থামে না। তখনও হয়ে চলেছে। লাইভ ব্রডকাস্টে অনেক বেশি রিহার্সাল দিতে হতো। কারণ এখানে ভুল শোধরানোর কোনও সুযোগ থাকে না।

এখানে নেপথ্যের একটি স্মরণীয় ঘটনার উল্লেখ পাঠকদের আমার মতই ভালো লাগবে। শিল্পী ও কলাকুশলীদের উপর শ্রদ্ধা অনেকটাই বেড়ে যায়। ছবি বিশ্বাস সিনেমার কাজের চাপ থাকায় রিহার্সালে আসতে পারেননি। এসেছেন অনুষ্ঠানের দিন ঘণ্টা দুয়েক আগে। এসে স্ক্রিপ্ট থেকে চোখ তুলছেন না। এক মনে পড়ছেন আর দাগ দিয়ে যাচ্ছেন কোথায় স্ক্যান করবেন কোথায় এমফ্যাসিস করবেন, কোথায় যতি ব্যবহার করবেন। এমন সময় প্রোগ্রাম এক্সিকিউটিভ এসে বললেন, ‘‘সারাদিন শুটিংয়ে ছিলেন একটু চা জলখাবার আনিয়ে দি। ছবি বিশ্বাস কোনও দিকে না তাকিয়ে অভিনেতা ভানু চট্টোপাধ্যায়কে বললেন, ভানু অন্য পার্টগুলো প্রক্সি দাও— এখন খাওয়া দাওয়ার সময় নয়, কাজটা ঠিক করে করতে হবে।’’                                                            ১

সিনেমায় যেমন উত্তম-সুচিত্রার মতো কয়েকটি জুটিও যথেষ্ট বিখ্যাত হয়েছিলেন শ্রোতাদের কাছে। যেমন জয়ন্ত চৌধুরী-নীলিমা সান্যাল, বিকাশ রায়-নীলিমা সান্যাল। এখানে উল্লেখ করা ভালো দিল্লি থেকে খবর পড়ছি নীলিমা সান্যাল খ্যাত ইনিই সেই ব্যক্তি। এছাড়া নির্মলকুমার-নীলিমা দাস, সত্য বন্দ্যোপাধ্যায়-বাসবী নন্দী, ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়-কণিকা মজুমদার এবং শম্ভু মিত্র-তৃপ্তি মিত্র।  

আমরা জানি যে অন‌্যান্য মাধ্যমের থেকে বেতারে অনেক তফাত। এখানে কোনও দৃশ্যের বা সময়কে জানান দেওয়া হয় নানা শব্দের ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। শব্দই একটা ঘটনা থেকে আর একটা ঘটনায় প্রবেশ ঘটায়। এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বেতারের ক্ষেত্রে। আমরা এবার সেদিকে নজর দেব। নাটকের রেকর্ডিং চলাকালীন অভিনেতারাই কিছু কিছু ধ্বনি নিজরাই তৈরি করে নিতেন। যেমন— দরজা খোলা, বন্ধ, খিল দেওয়া, মচমচ করে হেঁটে আসা, দ্রুত সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসা, সিগারেট ধরানো, কাপ ডিসের ঠোকাঠুকি চিঠির খাম ছিঁড়ে ফেলা ইত্যাদি। আবার যে চরিত্র এগুলো করছেন বোঝানো হবে তিনি যে এগুলো করবে তা কিন্তু নয়। একজনের হয়ে অন্যজন কফিতে চুমুক দিলেন আবার একজন দেশলাই জ্বাললেন। অন্যজন হয়তো ঠোঁট চেপে এমন ভাবে কথা বলতে শুরু করলেন যেন তিনিই সিগারেট ধরালেন। কতগুলো বিষয় কিভাবে ব্যবহার করা হয় সেই দিকে একটু তাকানো যাক। সময় বা কোনও অপেক্ষা বোঝাতে— ঘড়ির টিক টিক, নিশুতি রাত বোঝাতে— পেঁচার ডাক, দূরে কুকুরের ঘেউ ঘেউ আবার গ্রামের ক্ষেত্রে শেয়ালের ডাক। ভোরবেলা কাকের কা কা। বর্ষার রাত বোঝাতে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক, ব্যাঙের ডাক। বনজঙ্গলের মধ্যে দিয়ে হেঁটে গেলে বোঝাতে মাইকের সামনে হাতের মধ্যে কয়েকটি টেপ নিয়ে নাড়াচাড়া। বাড়িতে আগুন লেগে যাওয়া বোঝাতে মাইক্রো ফোনের সামনে সিগারেট প্যাকেটের রাংতা দুহাতে নিয়ে খচখচ করা,এরই মাঝে দু’একটা পাটকাঠি  ভাঙা। আবার ঘোড়ার ক্ষুরের আওয়াজ শোনানোর জন্য ব্যবহার করা হতো নারকেলের দুটো মালা হাতে নিয়ে তালে তালে কাঠের কোনও জিনিসের ওপর খটখট করে। এই রকম নানা কায়দায় এই সব কৃত্রিম শব্দ সৃষ্টি কার হতো। দেখা যাচ্ছে প্রযোজকরাও এই ধরনের কাজ করতে করতে নিজেরাও কৃত্রিম উপায়ে নানা ধরনের এফেক্টস তৈরি করতেন। এতে সময়ের অনেক সাশ্রয় হয়।

স্বরক্ষেপে দূরত্বের আভাস আনার জন্য প্রয়োজন হয় উচ্চ স্বরক্ষেপণ আর মাইক্রোফোনের ঠিকমতো ব্যবহার। সেক্ষেত্রে channel-fader নিচু পর্দায় রাখার চেষ্টা কর হয় বলে জানা যায়। নদীর মধ্যে নৌকা ঢুবে যাবার কথা পাড়ে জনতাকে জানাতে গেলে দূরত্বের ধারণা শ্রোতাদের কাছে পৌঁছাতে হলে প্রযোজককে কিছু কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়।

 এখানে একটা সংলাপ নিয়ে দৃষ্টিপাত করা যেতে পারে যাতে আরও কিছু নেপথ্য কথা জানা যেতে পারে।‘‘ স্বর: আচ্ছা, এখন তবে চলি।(কণ্ঠটি একটু দূরে)। …বেশিক্ষণ থাকব না ওখানে। কারণ এখানে তো অনেককিছু বাকি রইল। (দরজা খুলল) যত শিগ্‌গির ফিরে আসছি। ভাববেন না…নমস্কার (দরজা বন্ধ হল)।’’ এখানে বলা হয়েছে স্বরক্ষেপ প্রথম, দ্বিতীয় এবং তৃতীয় বাক্যের যে এক মাত্রায় হতে পারে না। এক্ষেত্রে অভিনেতাকে মাইক্রোফোনের থেকে কিছুটা দূরে সরে বলতে হয়। অথচ শ্রোতার মনে হবে অনেকটা দূরে দরজা খুলতে গেলেন। আর একটা উদাহরণ দিয়ে শেষ করব। অনেকের মনে আছে মতি নন্দীর ‘কোনি’ নাটকটির কথা। নাটকে একটা দুরূহ দৃশ্য আছে যা চলচ্চিত্রে সম্ভব হলেও বেতারে তাকে রূপায়িত করতে কি করতে হয়েছিল। কোনি পুকুরে সাঁতারের ট্রেনিং চলছে ট্রেনার খিদ্দা পুকুর পাড়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করছেন নানা নির্দেশ দিচ্ছেন। সত্য বন্দ্যোপাধ‌্যায় খিদ্দা আর শাঁওলি মিত্র কোনি। মাইক্রোফোন থেকে কোনাকুনি দাঁড়িয়ে একটু উঁচু গলায় অভিনয় করতে লাগলেন। আর এখানে খিদ্দার সংলাপে শব্দসংযোজক একটু রিভার্ব মিশিয়ে দেন ফলে পুকুর পাড়ের ফাঁকা যায়গার আবহাওয়া তৈরি হয়ে যায়। জলের মধ্যে মুখ রেখে সংলাপ উচ্চারণে এফেক্ট আনতে জলভর্তি কলসি এনে মুখ ঢুকিয়ে  কান্না গলার অনুভূতি শ্রোতারা পেয়ে যান। এই ভাবে নানা শব্দের দ্বারা বেতারের সংসার গড়ে ওঠে।

namresh mondal

নরেশ মণ্ডল

পরিচিতি – নরেশ মণ্ডল জন্ম কলকাতায়। ছোটবেলা থেকেই লেখার প্রতি আগ্রহ। ১৯৭৮ সালে সব্যসাচী পত্রিকা বের করেন। আজও বের হচ্ছে। কবিতা দিয়ে শুরু। তারপর গল্প, ছড়া, ছোটদের জন্য লেখা, প্রবন্ধ। একটি উপন্যাস আছে। প্রথম বের হয় বাংলাদেশ থেকে। বহু দৈনিক পত্রিকা সহ সাময়িকীতে নিয়মিত লেখেন। বর্তমানে নানা বিষয়ে গবেষণাধর্মী কাজ করছেন।দীর্ঘদিন সংবাদপত্রে কর্মরত। ক্যালকাটা জার্নালিস্টস ক্লাবের কার্যকরী কমিটির সদস্য। দুই দেশের নানা সম্মানে সম্মানিত হয়েছেন। তাঁর কয়েকটি বই।
কবিতার বই: খরা বন্যা ভালোবাসা। অরণ্য বালকও জানে না। মেঘ বৃষ্টি রোদ। দরিয়ায় ভাসাই তরী। ঈশ্বর ভালো নেই। Font (কবিতার অনুবাদ )। জ্বালানি কাঠ। বদলে যায় রং। ধর্ম কারায় ভাঙন চাই। শাহবাগের পাশে মৌলবাদের বিরুদ্ধে(সম্পাদিত কবিতা)। গল্প : ব্যালেন্স নেই। তটরেখা। সম্পাদিত গল্প : চেনা অচেনার গল্প। আবর্তিত সময়ের বৃত্তে। সময়। নিছক গল্প নয়। খরা কোকিলের গল্প (যৌথ) । উপন্যাস: বন বকুলের কথা। প্রবন্ধ: বাংলাদেশের সাহিত্য: সমকালীন পাঠ। তপন বাগচীর সাহিত্য: বিচিত্র বীক্ষণ(শোভা প্রকাশন, ঢাকা)।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top