দেবদাস ও হাতিপোতা, যেখানে কল্পনা মিশেছে বাস্তবে
পুলক মন্ডল
কিছু কিছু জায়গা ইতিহাসের মানচিত্রে যতটা ছোট, মানুষের স্মৃতিতে তার চেয়ে অনেক বড়। পূর্ব বর্ধমানের কালনার হাতিপোতা তেমনই একটি নাম। ভাগীরথীর কাছাকাছি এই গ্রামটির নাম উচ্চারিত হলেই মনে পড়ে বাংলা সাহিত্যের এক অসাধারণ প্রেমকাহিনি যা শুধু বিয়োগান্তক, বিরহের বা বিচ্ছেদের নয়, যা সর্বকালীন, যা সার্বজনীন—শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের দেবদাস।
উপন্যাসে শরৎচন্দ্র লিখেছেন-
“পার্বতীর পিতা কাল রাত্রে বাটী ফিরিয়াছেন। এ কয়দিন তিনি পাত্র স্থির করিতে বাহিরে গিয়াছিলেন। এখন বিবাহের সমস্ত স্থির করিয়া ঘরে আসিয়াছেন। পাত্র প্রায় কুড়ি-পঁচিশ ক্রোশ দূরে বর্ধমান জেলায় হাতীপোতা গ্রামের জমিদার ভুবন চৌধুরী। তাঁহার অবস্থা ভাল, বয়স চল্লিশের নীচেই,—গত বৎসর স্ত্রীবিয়োগ হইয়াছে, তাই আবার বিবাহ করিবেন।”
যুগ যুগ ধরে হাতিপোতার মানুষদের বিশ্বাস, এই ভুবন চৌধুরীই ছিলেন বাস্তবের হাতিপোতার জমিদার এবং তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রী ‘পার্বতী’-র জীবনকাহিনির কোনো ছায়া শরৎচন্দ্রের উপন্যাসে এসে পড়েছিল। এমনকি স্থানীয় জনশ্রুতি বলে, শরৎচন্দ্র নিজেও এই অঞ্চলে এসেছিলেন এবং এখানকার মানুষের মুখে শোনা কাহিনি তাঁর সাহিত্যিক কল্পনাকে প্রভাবিত করেছিল। তবে এই সম্পর্কের সবটুকুর নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ নেই—এটি মূলত হাতিপোতার দীর্ঘদিনের লোকবিশ্বাস।
কিন্তু সাহিত্য কখনও কখনও প্রমাণের চেয়েও শক্তিশালী হয়ে ওঠে।

কিন্তু দেবদাসের ট্রাজেডি কেবল প্রেম হারানোর নয়। তার ভিতরে আছে সিদ্ধান্তহীনতা। পার্বতী যখন তাকে ভালোবাসার সাহস দেখায়, দেবদাস তখন সাহস করে নিজের ভালোবাসার পাশে দাঁড়াতে পারে না। সামাজিক মর্যাদা, পরিবার, অহংকার—সব মিলিয়ে ভালোবাসা পরাজিত হয়। পরে পার্বতী অন্যের ঘরে চলে যায়; আর দেবদাস নিজের ভিতরের শূন্যতাকে ডুবিয়ে দিতে মেতে ওঠে আত্মধ্বংসের সাধনায়, নিজেই নিজেকে শেষ করে দিতে চায় সে। চন্দ্রমুখীর নিঃস্বার্থ ভালোবাসাও তাকে ফিরিয়ে আনতে পারে না।
মৃত্যুকে আহ্বানকারী দেবদাসের মনের মধ্যে তখনও থেকে যায় একটি প্রতিশ্রুতি, তাঁর শেষ যাত্রার ইচ্ছা—পার্বতীর কাছে আর একবার যেতে হবে।
“গাড়ি যখন পান্ডুয়া স্টেশনে আসিয়া উপস্থিত হইল, সারারাত্রি বৃষ্টি হইয়াছিল, এখন থামিয়াছে। দেবদাস উঠিয়া দাঁড়াইলো… দ্বার খুলিয়া আস্তে আস্তে বাহির হইয়া পড়িল… কাঁপিতে কাঁপিতে দেবদাস স্টেশনের বাহিরে আসিল। একজন ঘোড়ার গাড়ির গাড়োয়ানকে ডাকিয়া বলিল, বাপু হাতিপোতায় নিয়ে যেতে পারবে?”
হাতিপোতা। পান্ডুয়া স্টেশন থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার কালনা শহর থেকে ১৫ কিলোমিটার দূরের গ্রাম।
দেবদাস ঘোড়ার গাড়ি চায়; কিন্তু গাড়োয়ান জানায়, বর্ষায় রাস্তার অবস্থা এমন যে ঘোড়ার গাড়ি যেতে পারবে না। গরুর গাড়িই ভরসা। সামনে কাদামাখা দীর্ঘ পথ। শরীর তার আর পথ চলার অবস্থায় নেই, তবু সে জানে—যেভাবেই হোক, তাকে হাতীপোতা পৌঁছতেই হবে।
তারপর শরৎচন্দ্র লিখেছেন- ” দেবদাস জিজ্ঞাসা করিল, কতক্ষণে পৌঁছবে? গাড়োয়ান বলিল, পথ ভালো নয় বাবু, বোধহয় দিন-দুই লেগে যাবে।”
দেবদাসের মনে তখন যেন একটিই প্রশ্ন—আর দু’দিন সে বাঁচবে তো? সে বাঁচতে চায়নি; সে শুধু পৌঁছতে চেয়েছিল।
এ যেন শুধু পাণ্ডুয়া থেকে হাতিপোতার পথ নয়—নিজে
—নিজের সমস্ত ভুলের ভিতর দিয়ে একজন মানুষের শেষবার ফিরে যাওয়ার পথ।
দেবদাস জানে, পার্বতীকে আর পাওয়া যাবে না। জীবনকে মদপাত্রে ভাসিয়ে দিয়ে যে নিজেই নিশ্চিত ধ্বংসের পথে এগিয়েছে, যুক্তির কাছে তাঁর কি আর কোনো দায় থাকে? থাকে শুধু শেষবার তাঁর প্রিয় মানুষটিকে একবার দেখার আকুলতা!
অবশেষে হাতিপোতা।
রাতের অন্ধকারে পার্বতীর বাড়ির সামনে এসে পৌঁছয় দেবদাস। কিন্তু যে দরজার কাছে এত পথ পেরিয়ে এসেছে, সেই দরজা তার জন্য আর খোলে না। পার্বতী ঘরের ভিতরে—দেবদাস বাইরে। দুজনের মাঝখানে তখন শুধু একটি বন্ধ দরজা নয়; আছে সমাজ, পরিবার, শ্রেণি, সময়, সামন্ততন্ত্র অজস্র বাঁধার দরজা।
কিন্তু শরৎচন্দ্র তাঁর পাঠককে দেবদাসকে ঘৃণা করে বিদায় নিতে দেননি। বরং শেষ মুহূর্তে তিনি পাঠকের হৃদয়ের দরজা খুলে দেন। লেখেন—
“তাহার জন্য একটু প্রার্থনা করিও।”
তারপর সেই অমর আবেদন—মৃত্যুর সময় যেন অন্তত একটি “স্নেহ-করস্পর্শ” তার ললাটে পৌঁছয়; যেন একটি “করুণার্দ্র স্নেহময় মুখ” দেখতে দেখতে তার জীবনের অন্ত হয়; যেন মরিবার সময় অন্তত “এক ফোঁটা চোখের জল” দেখে সে মরতে পারে।
হাতিপোতার মানুষ সেই প্রার্থনাটি ভুলে যায়নি। হাতিপোতার মানুষের কাছে আজও তার গ্রামের বউ পার্বতীর চাইতে বেশি আপন দেবদাস। এমনকি গ্রামের যারা শরৎচন্দ্রের নাম পর্যন্ত শোনেননি, তাঁরা দেবদাস কে জানেন, তাঁরা দেবদাসকে চেনেন, দেবদাস তাঁদের অন্তরে অন্তরে। এবং এটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে। আজও গ্রামে দেবদাসের স্মৃতিকে ঘিরে মেলা হয়; পুরনো জমিদারবাড়ির ধ্বংসাবশেষ ঘিরে কৌতূহল আজও রয়েছে। স্থানীয় মানুষের বিশ্বাস, শরৎচন্দ্রের দেবদাস-এর সঙ্গে এই গ্রামের সম্পর্ক নিছক কল্পনা নয়।
হয়তো শরৎচন্দ্র সত্যিই হাতিপোতায় এসেছিলেন, হয়তো আসেননি। হয়তো ভুবন চৌধুরীর জীবনে এমন কোনো পার্বতী ছিলেন, হয়তো ছিলেন না। হয়তো পার্বতী সম্পূর্ণই কল্পনার, সাহিত্যের সৃষ্টি। ইতিহাস এই প্রশ্নের সম্পূর্ণ উত্তর দেয় না। কিন্তু সাহিত্য কখনও কখনও ইতিহাসের চেয়েও দীর্ঘজীবী হয়। প্রমাণের খাতায় যা অস্পষ্ট, মানুষের স্মৃতিতে তা কখনও কখনও আশ্চর্য স্পষ্ট হয়ে থাকে।
কিন্তু একটি সত্য অস্বীকার করা যায় না—শরৎচন্দ্রের কলম হাতিপোতাকে বাংলা সাহিত্যের স্মৃতিতে অমর
করে দিয়েছে।

আজও যদি সেই গ্রামের পথে সন্ধ্যা নামে, ভাগীরথীর বাতাসে যদি দূর থেকে কোনো গরুর গাড়ির ক্ষীণ শব্দ ভেসে আসে, মনে হয়—হয়তো সেই পথেই কোনো এক শীতের রাতে মৃত্যুপথযাত্রী দেবদাস এসেছিল। পার্বতীর দরজা তাঁর জন্য খোলেনি। সে ফিরে যায়নি। তার জীবন থেমে গিয়েছিল হাতিপোতার মাটিতেই।
আর থেকে গিয়েছিল একটি গ্রামের নাম, একটি প্রেমের অসমাপ্ত ইতিহাস এবং শরৎচন্দ্রের সেই অমর উক্তি—
“তাঁহার জন্য একটু প্রার্থনা করিও।”
একটি গ্রামের নাম থেকে যায় একটি উপন্যাসের শেষ অশ্রুবিন্দু হয়ে।
হাতিপোতা বাংলা সাহিত্যের সেই ভূগোল, যেখানে ইতিহাস, লোকবিশ্বাস, প্রেম, অনুশোচনা ও কল্পনা একসঙ্গে মিশে গিয়ে সত্যের থেকেও বড় এক স্মৃতি তৈরি করেছে।
পুলক মণ্ডল
ঠিকানা কালনা ৷ পেশায় শিক্ষক পুলক মণ্ডল সাংবাদিকতার সাথে যুক্ত ৷গল্প কবিতা ও প্রবন্ধ সবরকম লেখায় সাবলিল ৷ দেশ , আনন্দবাজার সহ সবরকম লিটল ম্যাগাজিনে লেখালিখি করছেন নিয়মিত ৷ নিজে নাগরিক সমাচার নামক একটি পাক্ষিক পত্রিকা সম্পাদনা করেন দীর্ঘদিন ধরে ৷
