পথপ্রান্তের দেবমূর্তি
তথাগত সেন
যে কোন অঞ্চলের সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নাগাল পেতে হলে সেখানকার অতীত যুগের বিবিধ উপাদানের ওপর আমাদের নির্ভর করতে হয়, এই উপাদান গুলি সেই অঞ্চলে বা তার সন্নিহিত অঞ্চলে হয়ত এক দীর্ঘ সময় ধরে সঞ্চিত রয়েছে। এই সঞ্চিত উপাদান বা আরও স্পষ্ট করে বললে বিবিধ প্রত্নতাত্ত্বিক উপাদান সেই অঞ্চলের মানুষের সাংস্কৃতিক ইতিহাস কে বোঝার জন্য একমাত্র বিবেচিত বস্তু হতে পারে। যদিও অনেক সময় প্রচলিত লোককাহিনি বা স্থানীয় মানুষের মুখে মুখে প্রচলিত কাহিনির ওপর নির্ভর করতে হয়, তবে তা কখনই মূল ইতিহাস রচনার উপাদান নয় বরং এর থেকে সহায়তা নেওয়া যেতে পারে মাত্র।
আমাদের এই বাংলায় সাংস্কৃতিক ইতিহাস রচনার মুল পরিপন্থী হল এখানকার উষ্ণ এবং আর্দ্র আবহাওয়া, যার ফলে বহু উপাদান যেমন পুথি বা প্রাচীন লেখা বা পোড়ামাটির তৈরী উপাদান দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়, সে দিক থেকে চিন্তা করলে পাথরের তৈরী প্রত্নবস্তু অনেক বেশিদিন অবিকৃত অবস্থায় থাকে, তাই পাথরের মূর্তি নিয়ে কাজ করার ক্ষেত্রে গবেষক একটু হলেও সুবিধা পান যে হাতের কাছে বেশ কিছু ভগ্ন বা অভগ্ন মূর্তি পাওয়া যায়। তবে সংগ্রহালয় গুলিতে এই বিষয়ে বিরাট সংখ্যায় উপাদান মজুত রয়েছে। কিন্তু সমস্যা হল সব সময় সকলের পক্ষে সব সংগ্রহালয় পৌছানো সম্ভব হয় না, আর সব সংগ্রহালয়তেই স্থানাভাবের কারণে সব সংগ্রহ তারা সাধারণ মানুষ কে দেখাতে পারেন না। এই একই স্থানাভাবের সমস্যা রয়েছে আমাদের কলকাতার ভারতীয় সংগ্রহালয়েও। সাধারণ গবেষকদের আরও একটি সমস্যার মুখে পড়তে হয়, সংগ্রহালয়ের সংগ্রহে থাকা মূর্তির ছবি ব্যবহার করতে হলে তা অনুমোদন সাপেক্ষ এবং তার জন্য নির্দিষ্ট পরিমান অর্থ দিতে হয়, তা সবসময় সাধারণ গবেষকদের পক্ষে ব্যয় করা সম্ভব হয় না, ফলে তাদের কাজের প্রধান অবলম্বন হয়ে ওঠে পথে প্রান্তরে বা মাঠে ঘাটে পড়ে থাকা প্রধানত পাথরের বিভিন্ন মূর্তি ভাস্কর্য।
এইবার আসি সে আলোচনায় যেখানে দেখি কি অনুপম এবং বিচিত্রধর্মী পাথরের মূর্তি আমরা পথে ঘাটে দেখতে পাই, যা আমাদের কাছে হয়ে ওঠে খোলা মাঠের সংগ্রহালয়।
আসুন আমরা চলে যাই বাঁকুড়া জেলার জয়পুরের কাছে গোকুলনগরে ৷ এখানকার গোকুলচাঁদের পঞ্চরত্ন মন্দির ছাড়াও আরও একটি প্রত্ন নিদর্শন হল কাছেই খোলা জমিতে অর্ধেক প্রথিত অবস্থায় থাকা একটি পাথরের বরাহ মূর্তি। এই ধরনের মূর্তির মধ্যে এই শিল্প নিদর্শনটি এক কথায় অনবদ্য, বিশেষ করে পরিধেয় অলংকার গুলি বা মাথায় থাকা কোঁকড়ান চুলের কথা আলাদা করে বলতেই হয়। এবার চলে আসি উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার শ্যামনগরের মূলাজোড় কালীবাড়িতে, এখানে ৩ টি বিষ্ণু মূর্তি দেখতে পাওয়া যায়। এই ৩ টির মধ্যে একটি বিশেষ মূর্তি সকলেরই আলাদা করে চোখে পড়ে, মূর্তিটি মূল মন্দির থেকে নাট মন্দিরে যাওয়ার সময় বাম দিকে পড়ে। এই প্রায় অভগ্ন সমপদস্থানক ভঙ্গিমায় থাকা মূর্তিটির হাতের আয়ুধের সজ্জা অনুসারে দেখলে আশ্চর্য হয়ে যাবেন ৷ পদ্মপুরাণ ও অগ্নিপুরাণ মতে বিষ্ণুর এই রূপের নাম ‘দামোদর’। আমরা এইবার চলে আসি হুগলি জেলায়, সদর শহর চুঁচুড়ার পরিচিত ষন্ডেশ্বরতলায় একটি অসাধারণ সূর্য মূর্তির কথায়। এই মূর্তিটি স্থানীয় ভাবে ষষ্ঠী বলে পূজা করা হয়, কিন্তু আদপে এটি সপ্তাশ্ববাহী রথের ওপর থাকা সূর্য মূর্তি। হুগলি থেকে চলে যাব নদীয়া জেলার রানাঘাটের কাছে চূর্ণি নদীর ধারে অবস্থিত আনুলিয়া গ্রামে, এখানে একটি গাছের নিচে থাকা একটি অনন্য বিষ্ণু মূর্তি স্থানীয় ভাবে বাসুদেব বলে পুজিত হন। মুখের ভাব, অর্ধনিমিলিত চোখ, মাথার মুকুট, ইত্যাদি এই মূর্তিকে আর দশটি মূর্তির থেকে আলাদা করেছে। বিশেষকরে মূর্তির পায়ের কাছে বামে আয়ুধ পুরুষ রূপে শঙ্খ পুরুষ ও ডান দিকে আয়ুধ দেবী রূপে গদা দেবীকে দেখা যায়।
মোটামুটি ভাবে খুব সংক্ষেপে আমাদের পরিচিত কয়েকটি মূর্তির কথা লিখলাম। চিন্তা করলে এই সবগুলি মূর্তিই কিন্তু খোলা জায়গায় রয়েছে, যদিও খোলা জায়গায় মূর্তি রাখাটার মধ্যে সব সময়ই ঝুঁকি থেকে যায়। কিছুদিন আগেই নদীয়া জেলার দিকনগরের রাঘবেশ্বর মন্দির থেকে এই রকমই একটি বিষ্ণু মূর্তি চুরি হয়ে যায়, একটি অমুল্য প্রত্ন ও শিল্প নিদর্শন হারিয়ে গেল। এইরকম বহু নিদর্শন হারিয়ে যাচ্ছে, অবহেলায় আর গুরুত্ব না দেওয়ার কারণে। এইরকম উদ্ধার হওয়া অনেক মূর্তির দিনের পর দিন ঠাঁই হয় থানার মালখানায়। আসলে যারা একদম নিজের উদ্যোগে কাজ করতে চান তাদের পক্ষে সব সময় সংগ্রহালয় থেকে ছবি সংগ্রহ বা প্রকাশ করা সম্ভব হয় না, আবার পথে প্রান্তের মূর্তির ছবি ব্যবহার করতে কোন মুল্য দিতে হয় না, ফলে একটি অদ্ভুত অবস্থার সৃষ্টি হয়। প্রাচীন মূর্তির স্থান হওয়া উচিত সংগ্রহালয়ে আর মূর্তির ছবি তোলা ও ছাপানো সংক্রান্ত নিয়মের সরলীকরণ জরুরি, যাতে যারা তাদের নিজের দেশের অতীত ও সংস্কৃতি নিয়ে কাজ করতে চান তাদের কাজ সহজতর হয়, এই অনুরোধ সংস্লিষ্ট সকলের কাছেই রইল।
প্রবন্ধের সাথে সব ছবিই লেখক নিজে সংগ্রহ করেছেন ৷
তথাগত সেন
লেখক পরিচিতি – তথাগত সেন, জন্ম ১৮.০৭.১৯৭৮, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিজ্ঞানে স্নাতক, বর্তমানে একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ ও প্রযোজনা সংস্থায় কর্মরত। দীর্ঘ সময় ধরে বাংলার মন্দির নিয়ে কাজ করছেন, এই মন্দিরচর্চার অনুসঙ্গে সম্প্রতি বাংলার মূর্তি ভাস্কর্য নিয়ে চর্চা শুরু করছেন। তার লেখা প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়েছে বাংলার পুরাতত্ত্ব পত্রিকা, ভাষাপথ, রূপশালি, পুরাবৃত্ত, রাঢ় কথা, বাঁকুড়ার খেয়ালী, ইত্যাদি বিভিন্ন পত্রপত্রিকায়, পেয়েছেন নবদ্বীপ পুরাতত্ত্ব পরিষদ প্রদত্ত “দার্শনিক অরুণ প্রসাদ সেন স্মৃতি পুরস্কার” (২০২২ ও ২০২৩)। রক্তমৃত্তিকা পত্রিকার যুগ্ম সম্পাদক, এ ছাড়া যৌথ ভাবে সম্পাদনা করেছেন বাংলার টেরাকোটা সংক্রান্ত সংকলন গ্রন্থ। বাংলার মন্দিরের “যুগ্মদেহী ও মিশ্রদেহী মূর্তি” নিয়ে তার প্রথম গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে ২০২৪ এ।

প্রবন্ধ টি পড়লাম। খুবই ভালো।
ধন্যবাদ ৷ পড়তে থাকুন আমাদের ব্লগ ৷
বেশ ভালো লাগলো আপনার লেখা। এভাবেই লিখতে থাকুন ।