রাশিচক্র
অয়ন মুখোপাধ্যায়
১
নদী মানুষের গল্প মনে রাখে না, সে শুধু স্রোতকেই মনে রাখে। মানুষের গল্প ফুরিয়ে যায়, স্রোত ফুরোয় না।
১৯৩০ সালের এক থমথমে রাত। গঙ্গার জল ধীরে ধীরে বয়ে যাচ্ছে। হাওড়া ব্রিজের লোহার রেলিংয়ে হাত রেখে এক তরুণ কালো জলের দিকে তাকিয়ে ছিল। দূরে কলকাতার গ্যাসবাতির আলো বিন্দু বিন্দু হয়ে ছড়িয়ে আছে। বাতাসে ভেসে আসছে জাহাজের সাইরেন। কিন্তু ওই আলো তার মনের অন্ধকারে পৌঁছচ্ছিল না।
পেছনে ট্রামের ঘণ্টা বাজছে। ঘোড়ার গাড়ির চাকা পাথুরে রাস্তায় শব্দ তুলে ছুটে যাচ্ছে। মানুষের ভিড় আরও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। অথচ এই বিরাট শহরে তার জন্য এক চিলতে জায়গাও নেই।
সন্তোষ নিজেকেই বলেছিল, “আজ রাত এগারোটার মধ্যে যদি চাকরির হিল্লে না হয়, তা হলে এই গঙ্গার কালো জলই হবে আমার শেষ ঠিকানা।”
এতে কোনো নাটক ছিল না। ছিল শুধু হিসেব। যেন জীবনের একটা অঙ্ক মেলাতে গিয়ে সে ভুল করেছে, আর এখন খাতা বন্ধ করার সময় হয়েছে।
২
গুপ্তিপাড়ার সেই পুরনো দিনগুলো এখন ঝাপসা। বাড়িটা খুব বড় ছিল না, কিন্তু মান-সম্মান ছিল। বারান্দায় বসে থাকতেন তার বাবা, সামনে খোলা হিসেবের খাতা।
বাবা ঠিকাদারি করতেন। কিন্তু মানুষের হিসেবের বাইরেও আর-একটা হিসেব থাকে। সেখানে লাভের অঙ্কে হঠাৎ লোকসান এসে বসে। দু-একটা ভুল চুক্তি, তার সঙ্গে চেনা মানুষের বেইমানি—সব মিলিয়ে তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়ল সব। দেনা বাড়ল। জমি গেল।
সেই চরম অভাবের মধ্যেও সন্তোষকে দেখা যেত এক কোণে বসে পুরনো পঞ্জিকা আর জ্যোতিষের বই নিয়ে থাকতে।
একদিন বাবা বিরক্ত হয়ে বললেন, “সন্তোষ, সংসারটা কি ওই গোল গোল গ্রহ-নক্ষত্রের ছকেই চলবে? একবার এই কঠিন বাস্তবটাও দেখবি না?”
সন্তোষ কোনো উত্তর দেয়নি। শুধু মনে মনে ভেবেছিল, এই দুনিয়ার সব জগাখিচুড়ির আড়ালেও বুঝি একটা নিয়ম আছে। সবাই সেটা দেখতে পায় না।

৩
পরদিন ভোরে বাবার কাছ থেকে সামান্য কিছু টাকা নিয়ে সন্তোষ বেরিয়ে পড়ল। হাতে একটা পুরনো ঘড়ি, কাঁধে গামছা, আর সঙ্গে একখানা বাড়তি ধুতি।
কুয়াশাভরা গুপ্তিপাড়ার রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে সে জানত না, ফিরে আসার পথগুলো তার জন্য একে একে বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।
কলকাতা শহর তাকে ভয় পাইয়ে দিয়েছিল। সে দরজায় দরজায় ঘুরল। সরকারি অফিস, বড়বাজারের গদি, সাহেবি দোকান—সব জায়গায় একই কথা, “লোক লাগবে না।”
পকেটের শেষ পয়সাটাও যখন ফুরিয়ে গেল, তখনই সে হাওড়া ব্রিজে দাঁড়িয়ে মরার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।
সেই সন্ধ্যায় সে ক্লান্ত হয়ে ফুটপাথে বসেছিল। এমন সময় এক ভদ্রলোক সামনে এসে দাঁড়ালেন। তিনি গুপ্তিপাড়ারই লোক। কলকাতায় ডাক বিভাগে কাজ করেন।
সন্তোষকে চিনে তিনি বললেন, “তুই এভাবে পথে বসে আছিস কেন? তোর বাবা আমার বন্ধু ছিলেন। কী হয়েছে, বল তো?”
সব শুনে তিনি বললেন, “চল, আমার সঙ্গে চল। আমাদের আপিসে একটা পিয়নের কাজ খালি আছে।”
সে রাতে নদী তাকে ছাড়াই বয়ে গিয়েছিল। সন্তোষ মুখার্জির আর মরা হয়নি।
৪
চাকরি পাওয়ার পর জীবনটা একটু ছন্দে ফিরল। দিনে সে চিঠির বস্তা বাছাই করে, খামের ওপরের ঠিকানা পড়ে, এক শহরের খবর আর-এক শহরে পাঠিয়ে দেয়। আর রাতে তার আঙুল চলে নক্ষত্রের ছকে।
অফিসের বন্ধুরা হাসত। বলত, “চিঠি বিলি করবি, না কপাল গুণবি?”
সন্তোষ হেসে বলত, “সময় হলে দেখবে।”
ধীরে ধীরে লোকের মুখে মুখে তার গণনার কথা ছড়িয়ে পড়ল। দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ তার কাছে আসতে লাগল। কিন্তু সে কোনো দিন একটি পয়সাও নিল না।
সে বলত, “ভাগ্যকে বাজারে বেচলে তার জোর কমে যায়।”

৫
১৯৩৫ সালের শেষ দিক। একদিন খবর এল, ব্রিটিশ সম্রাট পঞ্চম জর্জ খুব অসুস্থ। কাগজে কাগজে লেখা হচ্ছে, সম্রাটের প্রাণ যায় যায়।
লন্ডনের বড় বড় ডাক্তাররা যখন কূলকিনারা পাচ্ছেন না, তখন সন্তোষ নিজের অফিসের ডেস্কে বসে হিসেব কষল। খাতার পাতায় গ্রহদের অবস্থান যেন অন্যরকম ইশারা দিচ্ছিল।
সে একটি ইংরেজি কাগজের দপ্তরে চিঠি লিখল— “সম্রাট এখনই মারা যাবেন না। অমুক দিনের পর তিনি সুস্থ হয়ে উঠবেন।”
আশ্চর্যের কথা, সন্তোষ যে সময়ের কথা লিখেছিল, ঠিক তার পর থেকেই সম্রাট সেরে উঠতে শুরু করলেন।
এই খবর গিয়ে পৌঁছল বড়লাটের কানে। ভারত সচিবের প্রতিনিধি সন্তোষকে ডেকে পাঠালেন বেলভেডিয়ার প্রাসাদে।
বিশাল হলঘরের ঝাড়লণ্ঠনের আলোয় সন্তোষ গিয়ে দাঁড়াল। পরনে সাধারণ ধুতি আর সাদামাটা চাদর। সাহেবি জাঁকজমকের মধ্যে তাকে বেমানান লাগছিল। কিন্তু তার চোখে ছিল শান্ত তেজ।
সাহেব জিজ্ঞেস করলেন, “সম্রাট আপনার বিদ্যায় খুব খুশি। আপনি কী পুরস্কার চান? টাকা, জমি, না বড় কোনো খেতাব?”
সন্তোষ শান্ত গলায় বলল, “আমি কিছুই চাই না।”
সচিব অবাক হয়ে বললেন, “কিছুই না? এমন সুযোগ কেউ হাতছাড়া করে?”
সন্তোষ হেসে বলল, “যিনি প্রাণ দিয়েছেন, তিনিই সব দেবেন। মানুষের কাছে আর কী চাইব?”
কয়েক বছর আগের সেই অন্ধকার রাতটা তার মনে পড়ে গিয়েছিল। একমুঠো ভাতের অভাবে যখন সে মরতে বসেছিল, তখনও তো কেউ ছিল না।
সচিব তাকে রাতের খাবারের নিমন্ত্রণ করতে চাইলে সন্তোষ সবিনয়ে বলল, “আমি নিজের নিয়ম মেনে চলি। বাইরে খাই না।”
সাহেব মুগ্ধ হয়ে বলে উঠলেন, “A true Brahmin indeed সেদিন রাতে অফিস থেকে ফেরার পথে সন্তোষ আবার হাওড়া ব্রিজের ওপর দাঁড়াল। গঙ্গা তখনও আগের মতোই বয়ে যাচ্ছে।

সে ভাবল, সেদিন যদি সত্যিই ঝাঁপ দিত, পৃথিবীর কিছুই থামত না। ট্রাম চলত, তারা ঘুরত, শহর তার নিজের মতোই বেঁচে থাকত। শুধু একটি মানুষের গল্প আর লেখা হতো না।
তখন সে বুঝল, জ্যোতিষের ছকে গ্রহের অবস্থান যতই নিখুঁত হোক, মানুষের জীবনে সবচেয়ে রহস্যময় আর শক্তিশালী গ্রহের নাম—আশা।
এই আশার কথা কোনো কোষ্ঠীতে লেখা থাকে না। এটা শুধু মানুষের ভেতরেই জ্বলে।
সন্তোষের মনে হলো নদী সব দেখেছে। সে জানে, মানুষ ভাবে সে ভাগ্য পড়তে শিখেছে। আসলে সে সময়ের অনন্ত বইয়ের একটি মাত্র লাইন পড়তে পেরেছে।
বাকি পাতা গুলো এখনও উল্টোনো হয়নি। আর সেগুলো কেউ জানে না।
স্কেচ ছবি — হিরণ মিত্র
অয়ন মুখোপাধ্যায়
লেখক পরিচিতি – কবি ও লেখক অয়ন মুখোপাধ্যায়। ঠিকানা – বলাগড়, হুগলী। যে সমম্ত পত্রিকাতে লিখে চলেছেন — পরম্পরা ,বাংলা স্ট্রিট অনলাইন , গুরুচণ্ডালী , বাংলা স্পিয়ার ,কেতাব ,ভারতের কণ্ঠ বাঙালা নেটওয়ার্ক ,আবর্ত , আপনপাঠ , বিকল্প ,গণশক্তি ,জলদর্চি ৷
