রেডিও নিয়ে দুচার কথা

দেবব্রত ঘোষ মলয়


 

screenshot 2026 03 28 202734

এক

 
তখন হাফপ্যান্ট। ঘুম থেকে উঠেই আমাদের প্রথম কাজ ছিল বাড়ির বিস্তীর্ণ বাগানের মধ্যে অবস্থিত পুকুরের বাঁধানো ঘাটে বসে দাঁত ব্রাশ করা (সে সময়ে আঙুল দিয়েই অথবা দাঁতন দিয়ে দাঁত মাজতাম আমরা)। বাবা আমাদের থেকেও ভোরে উঠে পড়ে পুকুরের পাড়ে গাছ গাছালি পরিচর্যা করতেন অফিসের জন্য প্রস্তুত হওয়ার আগে পর্যন্ত। বাবার একটা ছোট্ট ট্রানজিস্টার ছিল ওই পুকুর পাড়েই বসানো থাকতে এবং তাতে সুন্দর সুন্দর গান হতো সকাল বেলা। তিন ভাইয়ের মধ্যে ছোট ছিল কাজল। ও হঠাৎ দাঁত মাজা বন্ধ করে চোখ গোল করে আমাকে জিজ্ঞেস করল – হ্যাঁরে মনাই, রেডিওর ভিতরে কি করে গান হয় বলতো? দাদা অগ্নিপাস থেকে বলে উঠলো – কি বোকা রে তুই এটাও জানিস না, রেডিওর ভিতরে লোকে বসে গান গায়। এরপর আমরা তিন ভাই গভীরভাবে ভাবতে বসলাম এত বড় মানুষগুলোকে কি উপায়ে এই ছোট্ট রেডিওর মধ্যে বসিয়ে দেওয়া হয়।
 
দুই
 
সন্ধ্যেবেলা বাড়ির সামনে জাফরী দেওয়া বারান্দায় পাতা তক্তবোসে পড়তে বসেছি তিন ভাই। দাদা ক্লাস এইট আমি ফোর আর কাজল থ্রি। আমি একটা কাগজে রুটিন বানাতে শুরু করলাম। কাজল তাতে মনোনিবেশ সহকারে সাহায্য করতে লাগলো। আমরা সন্ধে ছটা থেকে রাত্রি নটা অব্দি আধ ঘন্টা ছাড়া ছাড়া এক একটি বিষয় পড়ার জন্য নির্বাচন করলাম। সব থেকে মজার ব্যাপার ওই প্রতিটি আধঘণ্টার একটা একটা আলাদা নাম দেওয়া হল। যেমন সন্ধ্যে ছটায় বর্ণালী, বাংলা পড়া। সাড়ে ছটায় মঞ্জুসা, ইংরেজি পড়া। এরপর সন্ধ্যা সাতটায় বোরোলিনের আসর, অংক করা। এই যে নামগুলো, এগুলো সবই সে সময়ে রেডিওতে কলকাতা ক বা ক্ষয়ের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের নাম, যে অনুষ্ঠানগুলি আমরা সবাই মন দিয়ে শুনতাম।
 
তিন
 
মহালয়ার সকাল। আগের দিন রাত্রি থেকেই বাড়িতে একটা তোড়জোড় শুরু হয়ে যেত। ঘরবাড়ি পরিষ্কার করা ঝুল-ঝাড়া বিছানায় চাদর পাল্টানো ইত্যাদি। বাবা কিন্তু সেদিন সন্ধ্যে থেকে রেডিও নিয়ে পড়তেন। রেডিওটাকে ভালো করে কাপড় দিয়ে পরিষ্কার করে তার ব্যাটারিগুলো বদলে নতুন ব্যাটারি লাগানো হতো। তারপর এমন একটা জায়গায় রাখা হত যেখানে আমরা সবাই গোল করে বসতে পারি ভোর চারটের সময় উঠে। বাবা এবং মা স্নান করে নিতেন ঘুম থেকে উঠে। আমরা সবাই স্নান না করলেও কাচা জামা প্যান্ট পড়ে রেডিওর সামনে বাবু হয়ে বসে পড়তাম। তারপর অন্ধকার ভোর আর হিমেল হাওয়ার শিরশিরানির মধ্যে ভেসে আসতো বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রের অমৃত কন্ঠে স্তোত্র পাঠ। এর সঙ্গেই আমাদের স্বপ্ন মাখা কিশোর চোখ আগামী দশ দিনের আনন্দের পরিকল্পনা করতে শুরু করত। নতুন কেনা ববিছাপ জামা, বাটার জুতো সবই আমরা হাতের কাছে নিয়ে বসতাম। আমাদের পুজো সেদিনই শুরু হয়ে যেত রেডিওর হাত ধরে।
 
চার
 
এরপর একটু বড় হয়ে যখন ফুলপ্যান্ট ধরবো ধরবো করছি, সে সময় দাদা সন্ধান দিল রাত্রি ন’টায় রেডিওতে কাউন্ট ড্রাকুলার ধারাবাহিক হয়। ভূতকে আমরা ভীষণ ভয় পেতাম। সন্ধ্যেবেলা হ্যারিকেন নিয়ে শেওড়াতলা দিয়ে আসার সময় বুক দূর দূর করত। সে যাই হোক তাড়াতাড়ি পড়াশোনা করে রেডিওর সামনে বসে পড়লাম সবাই। শুরু হলো ধারাবাহিক কাউন্ট ড্রাকুলা। কখন যে ওই হারহিম করা গল্পের মধ্যে ঢুকে গেছি, ড্রাকুলার হিসহিসে কন্ঠে লুসি লুসি ডাক। সে অভিনয় এতটাই জীবন তো আমরা যেন চোখের সামনে পুরোটাই দেখতে পাচ্ছি। সেই মোবাইলহীন, ওয়েব সিরিজ হীন, টিভিহীন এবং সর্বোপরি বিদ্যুৎহীন রাত্রে যে ভয়টা আমরা পেলাম সেটা আজকের ছোটরা কল্পনাও করতে পারবে না। আর সেই দিনই মাঝ রাত্রে দেড়টা দুটো নাগাদ ঘুম ভাঙলো টয়লেট যাবার প্রয়োজনে। মাকে ঘুম ভাঙ্গিয়ে তুলে নিয়ে বারান্দার শেষ প্রান্তে আমাদের প্রকাণ্ড বাথরুমের মধ্যে যাবার সময়ও কেবলই মনে হচ্ছে চারপাশে অশরীরী ড্রাকুলারা ঘুরে বেড়াচ্ছে।
 
পাঁচ
 
রেডিও শোনা শুরু হয়েছিল শিশু মহল দিয়ে। ইন্দিরাদির কন্ঠে “ছোট্ট সোনা বন্ধুরা” শুনলেই মনটা ভালো হয়ে যেত। এরপর একটু বড় হয়ে গল্প দাদুর আসর। পার্থদের কন্ঠে “ছোট্ট বন্ধুরা” শোনার পরই আমাদের এক ঘন্টা কথা দিয়ে কেটে যেত। এরপর আস্তে আস্তে “অনুরোধের আসর”, “বোরোলিনের সংসার”, “মঞ্জুষা”, “বর্ণালী”,  বুধবারের যাত্রা, “কৃষিকথার আসর” সবই শুনতাম আমরা। স্কুলের বাইরে আমাদের প্রধান বিনোদন ছিল খেলার মাঠ আর বাড়িতে নানা রকম গল্পের বই আর রেডিও। একবার দুবার অনুরোধ এর আসরে গানের অনুরোধ করে নিজের নাম শুনতে পাওয়ার সেই রোমাঞ্চ ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। আর ছিল বেতার জগত। শুধু রেডিওকে কেন্দ্র করে এইরকম একটি পত্রিকা আজও আমার মনের মনিকোঠায় জ্বলজ্বল করছে। যুগের সঙ্গে পরিবর্তনকে গ্রহণ করার নামই জীবন। আজ রেডিও অনেকটাই অন্তরালে চলে গেছে আর সামনে প্রতিদিন আসছে নতুন নতুন বিনোদন মাধ্যম। কিন্তু রেডিও তো শুধু বিনোদন ছিল না সে সময়, লোকশিক্ষার একটা বড় মাধ্যম ছিল রেডিও। আজকের হাজারো মাধ্যমে বিতরিত বিনোদনে বেশিরভাগ সময় থাকে শুধুই বাণিজ্য, লোক শিক্ষার ব্যাপারটা চলে যায় অন্তরালে। আমরা যারা দুটি সময়কেই চোখের সামনে দেখেছি, তাদের কাছে রেডিওর এ হেন গুরুত্ব অনস্বীকার্য।
screenshot 2026 04 03 22 08 49 04 99c04817c0de5652397fc8b56c3b3817

দেবব্রত  ঘোষ মলয়

ইলশেগুঁড়ি পত্রিকা ও প্রকাশনের প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক দেবব্রত ঘোষ মলয় নিজে একজন সাহিত্যকর্মী। সম্পাদনার অবকাশে তাঁর কবিতাযাপন এবং গল্পলিখন। তাঁর রচিত উল্লেখযোগ্য বইগুলি হল কাব্যগ্রন্থ ‘‘মেঘলা গঙ্গার কাদামাটি’’ ও ‘‘মেঘ চিনেছি ঈশানকোণে।” এছাড়াও প্রকাশিত হয়েছে উপন্যাসিকা ‘‘হজমিগুলি হাফপ্যান্ট ও কুলের আচার’’, ‘‘সোনালী দিনের উপাখ্যান’’ এবং গল্পগ্রন্থ ‘‘ভোরের সূর্যোদয়।’’ প্রকাশিত হতে চলেছে উপন্যাস ‘‘নদী, নারী ও ভালবাসা’’, গল্পগ্রন্থ ‘‘বৃষ্টিধারা’’ এবং কিশোর গ্রন্থ ‘‘ডাংগুলির দুপুরগুলি’’।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Scroll to Top