কাশ্মীরের শারদাপীঠ ও বিশ্ববিদ্যালয়

প্রবীর আচার্য্য

March 08, 2026


picture কাশ্মীরের শারদাপীঠ ও বিশ্ববিদ্যালয়

সম্প্রতি আমেরিকা ভারত রাষ্ট্রের একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে। তাতে দেখানো হয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীর ভারতের অংশ। সে প্রসঙ্গেই এই প্রবন্ধের অবতারণা।
হিমালয় পর্বতমালার বহু উঁচুতে কাশ্মীর দেশে রয়েছে হরমুখ পর্বত। বর্তমানে জায়গাটা পাক অধিকৃত কাশ্মীর নামে পরিচিত। দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে সেই হরমুখ পর্বতের নীচেই রয়েছে নীলম উপত্যকা। তার চারদিক ঘিরে বরফে ঢাকা দুধ সাদা গগনচুম্বী গিরিশৃঙ্গের মালা। উপত্যকাটি কিন্তু নয়নাভিরাম সবুজ বৃক্ষরাজিতে ঢাকা। কারণ হরমুখ পর্বত থেকে নেমে এসে উপত্যকাটিকে ঘিরে বয়ে চলেছে কিষাণগঙ্গা নদী। কাশ্মীরের মানুষ তাকে বলে নীলম নদী। হাজার হাজার বছর আগে এই নদী মধুমতী নদী নামে পরিচিত ছিল। নৈসর্গিক সৌন্দর্যে সাজানো সেই নীলম উপত্যকায় রয়েছে শারদা নামে একটি অতি প্রাচীন জনবসতি। সাড়ে ছয় হাজার ফুট উচ্চতায় এই শারদা জনপদটিতে ছিল সুপ্রাচীন এক হিন্দুমন্দির। যার নাম ছিল শারদাপীঠ।
আজ শুধু পড়ে আছে সে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষটুকু। লাল বেলেপাথরে তৈরি শারদাপীঠ মন্দিরটির উচ্চতা একসময় ছিল আনুমানিক ১৪০ ফুট, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ছিল ৯৫ ফুট করে। মূল মন্দিরের সামান্য কিছু অংশ এখনও টিকে আছে। মন্দিরের ভিতর কোনও বিগ্রহ নেই। মন্দিরের তিনটি দেওয়াল ভালো অবস্থায় থাকলেও, মন্দিরের ছাদ ও দরজার কোনও অস্তিত্ব নেই। নীলম জেলা প্রশাসনের মতে মন্দিরটির ধ্বংসের জন্য দায়ী আবহাওয়া ও ভূমিকম্প। কিন্তু সেটা যে আসল কারণ নয়, তা জানে প্রশাসনও। তাই একসময় সারা ভারতবর্ষের হিন্দুদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থান শারদাপীঠ, আজ অবলুপ্ত হতে বসেছে কালসমুদ্রে।
ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দীতে রচিত ‘নীলমাতা’ পুরাণে এই শারদাপীঠের উল্লেখ আছে। ঐতিহাসিক আল বিরুনি শারদাপীঠকে এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মন্দির হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। শারদাপীঠের উল্লেখ পাওয়া যায় কলহনের রাজতরঙ্গিণী গ্রন্থেও। রাজতরঙ্গিণী থেকে জানা যায়, শারদাপীঠ ছিল সে যুগের শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান। কারণ মন্দিরের পাশেই ছিল সুবিশাল শারদা বিশ্ববিদ্যালয়। আজও যেটির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
দুগ্ধফেননিভ শুভ্র তুষারের মুকুট পরে সারি সারি গিরিশৃঙ্গ চতুর্দিকে দণ্ডায়মান। নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে তাদের মাথায় পত পত করে উড়ছে শুভ্র চীনাংশুকের মতো মেঘ খণ্ডের বিজয় কেতন। তার নিচে চোখ জুড়ানো সবুজ বনানীতে ঢাকা উপত্যকা। প্রস্ফুটিত তরুলতাগুলি থেকে ভেসে আসছে স্বর্গীয় সুগন্ধ। উচ্ছ্বল ফেনরাশি ছড়িয়ে গিরিকন্দরের খাঁজে খাঁজে উপলখণ্ডে আছড়ে পড়ছে জলরাশি। জল তরঙ্গের ছন্দে ছন্দে ঝর্ণাগুলি উদ্দাম নৃত্যে রত। তারা যেন অপ্সরীদের মতো ধ্যানগম্ভীর পর্বত শৃঙ্গগুলির ধ্যানভঙ্গ করাতে চায়। কোথাও তারা ক্ষণে ক্ষণে দৃশ্যমান, আবার কোথাও পর্বত কন্দরে অদৃশ্য। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই শারদা জনপদেই ছিল প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত শারদা বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শারদা বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল ভারতবর্ষের এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্যময় গর্বের স্থান।
রাজতরঙ্গিণী গ্রন্থের লেখক ঐতিহাসিক কলহন শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন এই শারদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। প্রায় দুই হাজার বছর আগে বৌদ্ধ মহাথের আয়ুর্বেদাচার্য কুমারজীব এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি শুধু বৌদ্ধ শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন না, ছিলেন একজন ধন্বন্তরি চিকিৎসকও। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চৈনিক দেশের রাজা তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। চৈনিক দেশে তিনিই প্রথম বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেছিলেন। বহু বৌদ্ধ গ্রন্থও তিনি চৈনিক ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর ভগিনী মহাভিক্ষু অক্ষুমতীও শারদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শিক্ষালাভ করেছিলেন। সর্বস্ব ত্যাগ করে যিনি রাজকন্যা থেকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনী হয়েছিলেন। আবার হাজার বছর আগে আদি শঙ্করাচার্য এই শারদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই অধ্যয়ন করেছিলেন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় ভারত বিখ্যাত বিদ্বানরা ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব লিপিও ছিল, লিপিটির নামও ছিল ‘শারদা’ লিপি। কলহন বিরোচিত রাজতরঙ্গিণী গ্রন্থে এই শারদা পীঠ এবং শারদা বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল বর্ণনা আছে। এ থেকেই বোঝা যায় সেকালে কত উন্নত ছিল কাশ্মীর দেশ।
অতি মনোরম সেই প্রাকৃতিক নৈসর্গিক পরিবেশে ঋষি শাণ্ডিল্য প্রথম স্থাপন করেন নীলসরস্বতী দেবীর আদি মন্দির। যেখানে শিক্ষা, জ্ঞান ও বাকশক্তির দেবী মা সরস্বতীর সঙ্গে একই দেহে লীন হয়ে আছেন স্বয়ং দেবী দুর্গাও। ১৮টি মহাশক্তিপীঠের অন্যতম পীঠ, শারদাপীঠ। কথিত আছে এখানে সতীর ডান হাত পড়েছিল। মা নীল সরস্বতীর নামেই উপত্যকা, নদী ও জেলার নাম আজ হয়েছে নীলম। ঋষি শাণ্ডিল্যের মন্দির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে একটি পৌরাণিক কাহিনিও আছে।
পুরাকালে এই নীলম উপত্যকাতেই মধুমতী নদীর তীরে জ্ঞানলাভের জন্য নীল সরস্বতী দেবীর আরাধনা ও এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন ঋষি শাণ্ডিল্য। নিয়োগ করেছিলেন কয়েকশো স্থানীয় পুরোহিতদের। উপস্থিত ছিলেন দেশ বিদেশ থেকে নিমন্ত্রিত সাধুসন্তেরা। আর সঙ্গে ছিলেন উপত্যকার গ্রামগুলির বাসিন্দারাও। যজ্ঞ চলাকালীন যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হন এক অসামান্যা সুন্দরী নারী। তিনি নিজেকে ব্রাহ্মণী বলে পরিচয় দিয়ে বললেন, যজ্ঞের আমন্ত্রণ পেয়ে অনেক দূর থেকে আমি এসেছি। আমি ও আমার সঙ্গীরা এখন পথশ্রমে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। শীঘ্র আমাদের ক্ষুণ্ণিবৃত্তির ব্যবস্থা কর। করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে ঋষি শাণ্ডিল্য বললেন, যজ্ঞ শেষ হবার আগে খাদ্যবস্তু বিতরণ করার নিয়ম নেই। যজ্ঞ শেষ হলেই ব্রাহ্মণী ও তাঁর সঙ্গীদের যথারীতি আপ্যায়ন করা হবে। ক্রুদ্ধ হয়ে ব্রাহ্মণী চিৎকার করে বললেন, যাঁকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে এই যজ্ঞ করছো, আমিই সেই দেবী নীল সরস্বতী। ঋষি শাণ্ডিল্য ব্রাহ্মণীর কথা বিশ্বাস করতে পারলেন না। ফলে যজ্ঞের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
ঋষি শাণ্ডিল্যের অবজ্ঞায় ক্রুদ্ধ ব্রাহ্মণী ছুঁড়ে ফেললেন তাঁর হাতের পঞ্চাশটি পদ্মবীজের অক্ষমালা। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক ঢেকে গেল ঘন কুয়াশায়। শুরু হল প্রবল ঝটিকাবৃষ্টি, নিভে গেল যজ্ঞাগ্নি। অদৃশ্য হয়ে গেলেন ব্রাহ্মণী। ক্ষণপরেই কুয়াশা ভেদ করে ঋষি শাণ্ডিল্যের সম্মুখে অবতীর্ণ হলেন রুদ্রমূর্তি মা নীল সরস্বতী। সালঙ্কারা দেবীর একহাতে অস্ত্র ও অপর হাতে নীল পদ্মের আকারে পুঞ্জীভূত মেঘ। ক্রোধে কম্পমানা দেবী অভিশাপ দিলেন, যজ্ঞাগ্নিতে পুরোহিত, সাধুসন্ত, গ্রামবাসী, গাছপালা, পশুপাখি সব ধ্বংস হয়ে যাবে।
প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই পুণরায় জ্বলে উঠল যজ্ঞের আগুন। ঋষি শাণ্ডিল্যর চোখের সামনে যজ্ঞের আগুনে একে একে ভস্মীভূত হয়ে গেল সবকিছু। চূড়ান্তভাবে মুষড়ে পড়লেন ঋষি শাণ্ডিল্য। তাঁর জন্যেই এত মানুষ, পশু, পাখি, গাছপালার মৃত্যু হল। তাঁর জন্যই শুকিয়ে গেল প্রবহমানা মধুমতী নদী। তাঁর জন্যেই বিগলিত হয়ে গেল পর্বতশৃঙ্গের তুষার। তাঁর জন্যেই নীল আকাশ ছেয়ে গেল বিষাক্ত মেঘে। তাঁর জন্যেই সবুজ উপত্যকা পরিণত হল ধু ধু মরুভূমিতে। প্রবল অনুশোচনায় দেবীর পদতলেই প্রাণত্যাগ করলেন ঋষি শাণ্ডিল্য।
ঋষি শাণ্ডিল্যের আত্মদানে তুষ্ট হলেন দেবী নীল সরস্বতী। তিনি পুনরায় প্রাণদান করলেন তাঁকে। জেগে উঠেই দেবী নীল সরস্বতীর ধ্যানে বসলেন ঋষি শাণ্ডিল্য। মাসের পর মাস বছরের পর বছর চলল সেই কঠোর তপস্যা। তপস্যায় তুষ্ট হলেন দেবী। যজ্ঞের আগুনে ভস্মীভূত পুরোহিত, সাধুসন্ত, গ্রামবাসী, গাছপালা, পশু-পাখির জীবন ফিরিয়ে দিলেন তিনি। ঋষি প্রার্থনা করলেন নীলম উপত্যকা এবং মধুমতী নদীটিও যেন আগের রূপ ফিরে পায়। ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করলেন মা নীল সরস্বতী। অনুতপ্ত ঋষি শাণ্ডিল্যকে দেবী নীল সরস্বতী আদেশ দিলেন, মধুমতী নদীর তীরে একটি সুদৃশ্য মন্দির তৈরি করতে। সেই মন্দিরেই বিরাজ করবেন দেবী নীল সরস্বতী। সেইদিন থেকে নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে সবুজ উপত্যকাটি হয়ে গেল মা নীল সরস্বতীর আবাস।
পাক অধিকৃত কাশ্মীরের হরমুখ পর্বতের নীচে আজও আছে সেই নয়নাভিরাম নীলম উপত্যকা। সেই উপত্যকার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পুরাণের সেই মধুমতী নদী। যাকে কাশ্মীরের মানুষ চেনেন নীলম নদী বা কিষেণগঙ্গা নামে। মা নীল সরস্বতীর নামেই উপত্যকা, নদী ও জেলার নাম হয়েছে নীলম।
ঐতিহাসিক কলহনের রাজতরঙ্গিণী থেকে জানা যায়, শারদাপীঠ ছিল সে যুগের শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান। অন্যান্য ইতিহাসবিদদের মধ্যেও এই বিষয়ে রয়েছে বিস্তর মতানৈক। কেউ বলেন, সম্রাট অশোক তৈরি করেছিলেন এই শারদাপীঠ। কেউ বলেন, কুষাণ রাজারা তৈরি করেছিলেন মন্দিরটি। আবার কোনও কোনও ইতিহাসবিদ বলেন, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ইন্দো-ইরানীয়রা বানিয়েছিল এই শারদাপীঠ। পাকিস্তানের গবেষক ফয়জুর রহমানের দাবি কাশ্মীরে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব রুখতে এই শারদাপীঠ বানিয়েছিলেন কাশ্মীর রাজ ললিতাদিত্য।
স্থানীয় গ্রামগুলির প্রবীণ অধিবাসীরা বংশ পরম্পরায় বহন করেছেন শারদাপীঠ সম্পর্কে নানান লোকগাথা। বর্তমান গ্রামবাসীরা সবাই ইসলাম ধর্মের অনুসারী। তাদের কাছ থেকে এরকম একটি কাহিনিতে জানা যায়, উপত্যকাটিতে একবার শুভ ও অশুভের মধ্যে লড়াই হয়েছিল। লড়াইয়ে দেবী শারদা তথা নীল সরস্বতী অশুভের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন জ্ঞানের পাত্র। পাত্রটিকে মাটির তলায় একটি কুঠরিতে রেখে সেই জ্ঞানপাত্রটির ওপরেই নির্মাণ করলেন একটি সুরম্য মন্দির। সেই মন্দিরটিই আজ শারদাপীঠ নামে বিখ্যাত।

picture of কাশ্মীরের
অপর লোকগাথাটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। তা থেকে জানা যায়, অনেককাল আগে পৃথিবী শাসন করতেন দুই বোন, শারদা ও নারদা। নীলম উপত্যকার পাশে থাকা শার্দি ও নার্দি নামে দুটি তুষারশৃঙ্গে ছিল তাঁদের বাস। একদিন পাহাড়ের ওপর থেকে নারদা দেখতে পেলেন, তাঁর দিদি শারদা দেহত্যাগ করেছেন। দুটি দৈত্য শারদার দেহ নিয়ে আকাশপথে পালিয়ে যাচ্ছে। উগ্রমূর্তি নারদা উড়ে গিয়ে দুই দৈত্যকে থামিয়ে দিলেন। দুই দৈত্যকে নির্দেশ দিলেন, এক দিনের মধ্যে তাঁর দিদির স্মৃতির উদ্দেশ্যে নীলম উপত্যকাতে সুদৃশ্য শারদা মন্দির তৈরি করতে। প্রাণের ভয়ে দুই দৈত্য একদিনেই তৈরি করে দিল এই শারদা মন্দির।
তৃতীয় আর একটি লোকগাথাও এক দৈত্যকে নিয়ে। কোনও এককালে নীলম উপত্যকায় বাস করত এক দৈত্য। সে স্থানীয় রাজকন্যাকে ভালোবাসত। রাজকন্যা একদিন দৈত্যকে বললেন, তাঁর জন্য পৃথিবীর সেরা প্রাসাদ বানিয়ে দিতে। রাজকন্যার জন্য নিজেই প্রাসাদ বানাতে শুরু করল দৈত্য। কাজ যখন প্রায় শেষের পথে, তখন ভোরের আজান শুরু হয়ে গেল । দৈত্য আর প্রাসাদ তৈরির কাজটি সমাপ্ত করতে পারল না। তাই দৈত্যের তৈরি সেই প্রাসাদ অসমাপ্ত হয়ে রয়ে গিয়েছে। সেকারণেই শারদামন্দিরের কোনও ছাদ নেই। এখানে লক্ষ্যণীয় ‘আজান’ শব্দটি ব্যবহার করে কাহিনিটির ইসলামীকরণ করা হয়েছে।
লোকগাথার পর নীল সরস্বতী সম্পর্কে পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় আসা যাক। শ্রীশ্রীমার্কণ্ডেয় চণ্ডী মতে নীল সরস্বতী হলেন মহাসরস্বতী। স্বত্বগুণ সম্পন্না মহাসরস্বতী, রজগুণ সম্পন্না মহালক্ষ্মী এবং তমোগুণ সম্পন্না মহাকালী এই তিন দেবী হলেন মা-চণ্ডীর এক একটি রূপভেদ। তাই শাক্ত তান্ত্রিক মতে দেবীর পূজা হয়। ঋগ্বেদে প্রথম সরস্বতী নদীর কথা বলা হয়েছে। সেই নদী থেকেই দেবীর উৎপত্তি। জ্ঞান, বাক্ ও সুরের দেবী সরস্বতীর সাথে এক দেহে লীন হয়ে আছেন মহাচণ্ডী ও মহালক্ষ্মী। বেদে সরস্বতী নদীকে জ্যোতিরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সরস্বতী নদীর তীরে বসেই বৈদিক মন্ত্র উচ্চারিত হত। পদ্মপুরাণ এবং স্কন্দপুরাণেও সরস্বতী একজন নদীর দেবী ছিলেন। বেদেও সরস্বতীর ত্রয়ী মূর্তির কথা বলা হয়েছে। তাঁরা হলেন ভূঃ বা ভূলোকে ইলা, ভুবঃ বা অন্তরীক্ষে লোকসরস্বতী, এবং স্বঃ বা স্বর্গলোকে ভারতী। ভূঃ ভুবঃ স্বঃ – এই তিনে মিলে সামগ্রিক জগত । ভূলোকে অগ্নি, অন্তরীক্ষ লোকে হিরণ্য দ্যুতি ইন্দ্র এবং স্বঃ লোকে সূর্য এই তিনের যে সম্মিলিত জ্যোতিরাশি তাই সরস্বতীর জ্যোতি। জ্ঞানময়ী বা চিন্ময়ী রূপে তিনি সর্বব্যাপিনী। তাঁর জ্যোতি সর্বত্র পরিব্যাপ্ত । শুধু এই ত্রিলোক নয় ঊর্ধ্ব সপ্তলোক নিম্ন সপ্তলোক পর্যন্ত চতুর্দশ ভুবনে স্তরে স্তরে সেই জ্যোতি বিরাজিতা। সেই জ্যোতি অজ্ঞান রূপী তমসা কে নিবারণ করে। যোগী হৃদয়ে যখন সেই আলো জ্বলে তখন সকল প্রকার অন্ধকার নাশ হয়।
মার্কণ্ডেয় পুরাণের শ্রীশ্রীচণ্ডীতে রয়েছে দেবীর আদি ধ্যান মন্ত্র। এই মন্ত্রটি কিছুটা বিশ্লেষণাত্মক।
পঞ্চাশল্লিপিভির্ব্বিভক্ত মুখদোঃপন্মধ্য বক্ষস্থলং
ভাস্বন্মৌলি নিবদ্ধ চন্দ্রশকলাং আপীনতুঙ্গস্তনীম।
মুদ্রামক্ষগুণংসুধাঢ্যকলসংবিদ্যাঞ্চহস্তাম্বুজৈর্বিভ্রাণাং
বিশদপ্রভাং ত্রিনয়নাং বাগ্দেবতামাশ্রয়ে ।।
দেবীর এক হাতে যে অক্ষমালা আছে, প্রকৃতপক্ষে তা পঞ্চাশৎটি পদ্মবীজের মালা। এই পঞ্চাশটি পদ্মবীজ দেবনাগরী বর্ণমালা বা লিপির পঞ্চাশটি বর্ণের প্রতীক। সেগুলি হল অ, আ থেকে শুরু করে ক, খ পেরিয়ে হ পর্যন্ত। পা থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত দেবীর পঞ্চাশটি অঙ্গে এক একটি বর্ণ প্রতিস্থাপিত। দেবীর মুখমণ্ডল চন্দ্রকলার ন্যায় উজ্জ্বল। দেবীর বক্ষদেশ সুউন্নত, তিনি সুধা কলস ধারণ করে আছেন। ত্রিনয়নী বিশালাক্ষী দেবী বিদ্যা, বাক্য এবং সুরের নিয়ন্ত্রণকারিণী।
প্রশ্ন উঠতে পারে সংস্কৃত বর্ণমালায় তো একান্নটি বর্ণ থাকে, এখানে পঞ্চাশটি হল কেন? সংস্কৃতে ‘ক্ষ’ যুক্তাক্ষরটিকে বর্ণমালার শেষ বর্ণ হিসেবে আলাদা মর্যাদা দিলে একান্নটি বর্ণই হয়। ওই একান্নটি বর্ণ দেবীর একান্নটি অঙ্গে সংস্থাপিত। দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের পর মহাদেব যখন তাঁর দেহটা কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করতে করতে আকাশ পথে বিচরণ করছিলেন তখন শ্রীবিষ্ণু সুদর্শন চক্রে দেবীর দেহকে একান্নটি ভাগে খণ্ডিত করেন। বর্ণমালার সেই একান্নটি আদ্য অক্ষর যুক্ত দেবীর দেহাংশ ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় পতিত হয়। সৃষ্টি হয় একান্নটি সতীপীঠের। ওই একান্নটি সতীপীঠে একান্নটি পীঠদেবী বিরাজমানা। তাঁদের নামকরণ করা হয়েছে সংস্কৃত বর্ণমালার একান্নটি বর্ণকে আদ্য অক্ষর করে।
অন্য একটি ধ্যান মন্ত্রে ভিন্নভাবে দেবীর রূপ বর্ণনা করা হয়েছে —
ধ্যায়েদ্দেবীং বিশালাক্ষীং শরদিন্দু সুবদনাং।
চতুর্ব্বাহু ধরাং বীণাং ধারয়ন্তীং ত্রিভির্ভুজৈঃ ।।
জপয়ন্তীমেক হস্তেন চাক্ষমালাং বরপ্রদাম্।
বামপদ পদ্মাসনা দক্ষিণপদ শিবোপরি ।।
অর্থাৎ শরৎকালের চন্দ্রের মতো মুখশ্রী যুক্ত বিশালাক্ষী দেবীকে ধ্যান করছি, তিনি চতুর্ভুজা। তিনটি হাতে তিনি বীণা ধারণ করে রয়েছেন, অপর হাতটিতে রয়েছে জপমালা বা অক্ষমালা। দেবীর বামপদ পদ্মের উপর এবং দক্ষিণপদ শিবের উপর স্থাপিত।”
প্রশ্ন উঠতে পারে, তা দেবী যদি সরস্বতীই হবেন, তাহলে তাঁর একটা পা শিবের উপর কেন? সেক্ষেত্রে ব্যাখ্যাটা হল, ইনি হলেন তান্ত্রিক দেবী। এঁর অপর নাম বিশালাক্ষী হলেও ইনি মহাসরস্বতী এবং চণ্ডীরূপেও বিরাজমানা। তাই তাঁর একটি পা শিবের উপর স্থাপিত। এই মন্ত্রটি কিন্তু শাস্ত্রীয়। দেবীর নাম বিশালাক্ষী হওয়ার তাৎপর্য হল দেবীর চক্ষু দুটি আয়ত এবং খুব সুন্দর, তাই বিশাল অক্ষি থেকে দেবীর নাম বিশালাক্ষী। এছাড়াও শাস্ত্র অনুসারে তাঁর আরও কয়েকটি নাম আছে। সব ক’টি নামই তাঁর সুন্দর চোখের বর্ণনা দেয়। যেমন –
পঙ্কজাক্ষী বিরূপাক্ষী রক্তাক্ষী চ সুলোচনা।
একনেত্রা দ্বিনেত্রা চ কোটারাক্ষী ত্রিলোচনা ।।”
বেদে নীল সরস্বতী দেবীর আরও একটি খুব সুন্দর ধ্যান মন্ত্র রয়েছে—
যা কুন্দেন তুষারহার ধবলা যা শুভ্রবস্ত্রাবৃতা।
যা বীণা বরদণ্ড মণ্ডিতকরা যা শ্বেতপদ্মাসনা ।।
যা ব্রহ্মাচ্যুতশঙ্কর প্রভৃতির্দেবৈঃ সদাবন্দিতা।
সা মাং পাতু সরস্বতী ভগবতী নিঃশেষ জাড্যাপহাম ।।
অর্থাৎ কিনা দেবী কুন্দ ফুলের ন্যায় শুভ্র তুষারের হার পরিধান করে আছেন। তিনি শ্বেত বস্ত্র পরিধান করে শ্বেত পদ্মের উপর আসীন। দুই হাতে তাঁর বরদণ্ড এবং বীণা। যাঁকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর বন্দনা করেন সেই দেবী তুষ্ট হন। আরও একটি ধ্যান মন্ত্রেও দেবী পূজিতা হন—
তরুণশকলমিন্দোর্বিভ্রতী শুভ্রকান্তিঃ ।
কুচভরণমিতাঙ্গী সন্নিষণ্ণা সিতাব্জে ।। নিজকরকমলোদ্যল্লেখনীপুস্তকশ্রীঃ । সকলবিভবসিন্ধ্যৈ পাতু বাগদেবতা নঃ ।।
ঐং সরস্বতৈ নমঃ।
এর অর্থ– চন্দ্রের তরুণ অংশের ন্যায় যাঁর কান্তি শুভ্র, যিনি স্তনভারে আনতা, যিনি শ্বেত পদ্মাসনা, যাঁর নিজ কর কমলে উদ্যত লেখনী ও পুস্তক শোভিত, সকল ঐশ্বর্য সিদ্ধির নিমিত্ত সেই বাগদেবী আমাদিগকে রক্ষা করুন । নীচে আরও একটি ধ্যান মন্ত্র দেওয়া হল। এই মন্ত্রটিতে দেবী সরস্বতীর রূপ অপেক্ষা চণ্ডীর রূপই প্রকট হয়ে উঠেছে—
||মুলেন ব্যাপকং ন্যাসেৎ ধ্যায়েদ্দেবীং পরাং শিবাম। ধ্যায়েদ্দেবীং বিশালাক্ষীং তপ্তজাম্বুনদপ্রভাম ।। দ্বিভুজাম্বিকাং চণ্ডীং খড়্গখেটকধারিণীম। নানালংকারসুভগাং রক্তাম্বরধরাং শুভাম ।।
সদা ষোড়শবর্ষীয়াং প্রসন্নাস্যাং ত্রিলোচনাম। মুণ্ডমালাবলি রম্য পীনোন্নতপয়োধরাম ।।
শবোপরী মহাদেবীং জটামুকুটমণ্ডিতাম।
শত্রুক্ষয়করাং দেবীং সাধকাভিস্টদায়ীকম ।। সর্বসৌভাগ্যজননী মহা সম্পদপ্রদং স্মরেৎ ||১
শুক্লাং ব্রহ্ম বিচার সার পরমাদ্যাং জগদ্ব্যাপিনীম।
বীণাপুষ্পক ধারিণীমভয়দাম্ জাড্যান্ধকারাপহাম ।।
হস্তেস্ফটিকমালিকাম্বিদধতীম্পদ্মাসনে সংস্থিতাম্বন্দে।
ত্বাং পরমেশ্বরীম্ ভগবতীম্ বুদ্ধিপ্রদাম্ সারদাম্॥২||
এখানে বলা হচ্ছে দ্বিভুজা দেবী আয়তনয়না। গলায় মুণ্ডমালা, মাথায় জটা এবং মুকুট। তিনি ভৈরবীর মতো লাল কাপড় পরিহিতা এবং ত্রিলোচনা। অথচ ওই মন্ত্রেরেই দ্বিতীয়ার্ধে রূপভেদে দেবী শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা বীণা পুস্তক এবং স্ফটিক মালিকা ধারণ করে শ্বেত পদ্মের উপর বিরাজ করছেন।
মজার কথা নীল সরস্বতী দেবীর মন্দির ভারতবর্ষের অন্য কোথাও না থাকলেও বিশালাক্ষী হিসেবে দেবী অন্যত্র পূজিতা হন। তার প্রমাণ মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর ওই ধ্যান মন্ত্রগুলিতেই বিশালাক্ষী দেবীকে আহ্বান জানানো হয়। বিশালাক্ষী দেবীর আদি মন্দিরটি রয়েছে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের পিছনে মীরঘাটে। সেটিও একান্ন সতীপীঠের একটি পীঠ। কবি চণ্ডীদাস পূজিত বিশালাক্ষী দেবীর বিগ্রহটি রয়েছে বীরভূমের নানুরের মন্দিরে। সেখানেও দেবীর পূজায় ব্যবহৃত হয় প্রথম এবং দ্বিতীয় ধ্যান মন্ত্র দুটি।
বিদ্য়া ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতী ৬৪ কলায় পারদর্শী। দেবীর চারটি হাত। একটি হাতে জল, অপর হাতে জপমালা, অন্য দুটি হাতে পুস্তক ও বীণা। প্রত্যেকটির ভিন্ন ভিন্ন অর্থ আছে। জল নির্মলতা বা শুদ্ধতার প্রতীক। পুস্তক বেদের প্রতীক, জপমালা মনসংযোগ ও আধ্য়াত্মিকতার প্রতীক আর বীণা হল সুর ও ছন্দের প্রতীক । দেবীর বাহন হাঁস। হাঁস দেবীকে বহন করে জল, স্থল ও অন্তরীক্ষে বিচরণ করতে পারে। এই হাঁস হল নির্মল, শুভ্র ও শুচিতার প্রতীক ।
সনাতন ধর্ম ছাড়াও বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেও এই দেবী পূজিতা হন প্রজ্ঞাপারমিতা হিসেবে। তবে বজ্রযানী বৌদ্ধ তন্ত্রমতে এই দেবী সরাসরি নীলসরস্বতী রূপেই পূজিতা হন। রামায়ণ মহাভারতেও দেবী সরস্বতীর উল্লেখ রয়েছে বিভিন্ন জায়গায়।
অনুশোচনার বিষয় এটাই যে, এই ঐতিহ্যপূর্ণ গৌরবমণ্ডিত সনাতনী পীঠস্থান আজ ভারত রাষ্ট্রের বাইরে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে অবহেলায় পড়ে রয়েছে।

prabir babu

প্রবীর আচার্য্য

কাটোয়া নিবাসী এই ইতিহাসবিদ গবেষক ইতিমধ্যেই ১৫ টি গ্রন্থ লিখে ফেলেছেন ৷ বিপ্রকলম পত্রিকার সম্পাদক প্রবীর বাবু একজন অবসর প্রাপ্ত সরকারী আধিকারীক ৷ ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে একসময় ঘুরে বেড়িয়েছেন ৷ বর্তমানেও সময় সুযোগমত চারিদিকে ভ্রমণের জন্য চলে যান ৷ অবশ্য আঞ্চলিক ইতিহাসের খোঁজে তিনি এ রাজ্যের বিভিন্ন পুরাকীর্তি কে লিপিবদ্ধ করার আপ্রান চেষ্টা করেন ৷ প্রবীর বাবু ইদানিং কিছু অন্য ধারার সাহিত্যও রচনা করছেন ৷

Scroll to Top