Published on – Sunday, March 01, 2026

অন্তঃস্রোত

কৌশিক বসু

তুমি কি কখনো ভালোবেসেছ
নদীর মত–
আকাশের প্রতিবিম্ব নিঃশব্দে বুকে জড়িয়ে বেঁচেছ দিনের পর দিন?
কখনো কি দেবদারু গাছের নির্মোহ সারল্য নিয়ে, পুরুষালী ভঙ্গীতে
চোখ তুলে বলেছ,”ভালোবাসি, তোমাকে ভালোবাসি..!”
ফুলে ফুলে ভরে থাকা গাছের  কোমলতায়  প্রেয়সীকে দু হাত বাড়িয়ে ডেকেছ কখনো?
নিবিড় শান্তিতে অভিভূত হয়ে দু দন্ড কথা বলেছ নিজের সাথে?
জানি, ঝরা পাতার মত অনেক ইচ্ছা বুকেই ঘুমিয়ে গেছে।
তবে জাগাও নিঃশর্তে সেই সব ঘুমন্ত ইচ্ছা,
নীল আঁচড়ে আঁকা ছবির মত
জেগে ওঠো ভাবুক ভালবাসা নিয়ে,
এই পৃথিবীর যত প্রেম আত্মস্থ করো তুমি।

colorful paint splatter background
happy holi celebration vertical banner design with top view collection of different colored powders (gulal) in bowls.

Published on – Sunday, March 01, 2026

বসন্ত উৎসব

প্রদীপ স্বর্ণকার

খোঁপা জোর পলাশ তোমার
কৃষ্ণচূড়ার মালা
হাতটি জোরা কোপায় পারের
বুনফুলের বালা।

মুখটি জুরে ফাগুন হাসি
আগুন রাঙা মনে
ইচ্ছা করে হারিয়ে যেতে
সোনা ঝুড়ির বনে।

ধরবে কি হাত? বলবে চলো!
হারিয়ে যাওয়ার দেশে,
যে দেশেতে দুক্ষরা সব
আনন্দে যায় ভেসে।

দূর সে গাঁয়ে জৎস্না রাতে
বাউল সুরের গান
জোৎস্না মেখে মাতাল মনের
অন্যরকম স্নান।

অন্যরকম মনের কথা
অন্যরকম চাওয়া
অন্যলয়ে ভেষে চলা
ভিন্য তরী বওয়া।

ঠিক তখনি একটা শিমুল
পরবে খসে পাশে
স্বপ্ন, জীবন একসাথে সব
উরবে পরবাসে।

দুহাত নেরে গায়বে তুমি
ফগুন দিনের গান
কোপাই ভেসে হৃদয় যুরে
ডাকবে প্রেমের বান।

আকাশ যুরে শিমুল পলাশ
বাতাসে বৈভব
ঠিক তখনি সত্যকারেই
বসন্ত উৎসব।

Published on – Sunday, March 01, 2026

ভালোবাসার স্পর্শ

বিপ্লব ভট্টাচার্য

আজ তোমাকে কথা দিলাম
আর কোনদিন বিরক্ত করব না,
ভালোবাসার অধিকার নিয়ে পাশে যাবো না।
আমি মন পেতে চেয়েছিলাম,
তোমার আঁচলের গন্ধে মাতাল হতে চেয়েছিলাম।
তোমাকে ভালোবেসেছিলাম একদিন—
আজও ভালোবাসি,
ভালোবেসে যাবো প্রতি নিয়ত,
প্রতিটা অবক্ষয়ের বোমা ফাটার আর্তনাদে।

আমি যে বিচ্ছেদে ভয় পাই
প্রতিটা রাতে আমার ঘুম আসে না,
ভয়ে আতঙ্কে তোমার কোমল হাতের স্পর্শ অনুভব করি।

আজ আর কিছু চাই না আমি তোমার কাছে–
আমাকে ঘুম পাড়িয়ে চলে যাও
সেই ক্লান্ত ঘুমের দেশে নীল আকাশের বুকে
তারা হয়ে তোমাকে দেখবো আমি।
না চাই প্রত্যাশা, না চাই ভালোবাসা;
বঞ্চনার কালো মেঘ বুকে নিয়ে,
বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বো একদিন—
তোমার চুল ভিজিয়ে দেবো
ভালোবাসার স্পর্শ দিতেই হবে সেদিন…

happy holi celebration vertical banner design with top view collection of different colored powders (gulal) in bowls.
happy holi celebration vertical banner design with top view collection of different colored powders (gulal) in bowls.

Published on – Sunday, March 01, 2026

অন্য বসন্ত

কলমে চিত্রদীপ

ফাগুন কবে আসবে গো?
বসন্ত্ বাহার সুর শুনি !
দিনগুনি….
প্রতি পল গুনি….
আসবে কখন ফাল্গুনী?

ছন্দে ফেরে না মনের দোল!
প্রেম গজল..
চোখ সজল..
তবু স্বপ্নের জাল বুনি।
আসবে কবে সে ফাল্গুনী ?

আমের মুকূলে ন্যুব্জ ডাল,
কৃষ্ণচূড়াও রক্তে লাল !
পলাশ ফুল–
কি আকুল !
ভোমরার মুখে গুনগুনী !
আসবে কবে সে ফাল্গুনী।

আমি তো অন্ধ ! হুঁশকানা ।
বুঝিনি আসলে তালকানা।
ফাগুন এসেছে।
কখন হেসেছে।
উতল হয়েছে শালবনী ।
পার হয়ে গেছে পার্বনী ।

মধু ঋতুরাজ আসার খবর
শুনেছি বাজছে ঢাকও ডগর
মূল বসন্তে ?
দেখি হসন্তে ?
বৃথাই বাজলো খঞ্জনী ?
আসবে কবে সে ফাল্গুনী?

Published on – Sunday, March 01, 2026

ফাগুন যৌবন

সত্যেন্দ্র প্রসাদ নন্দী

স্বপ্নরা দল বেঁধে হাজির হয়েছে
তালাপাতায় সুর তুলে।
পলাশের ডাকে, আমের মুকুল গন্ধে,
শীতল পাটি বিছিয়ে বসে থাকে
কোকিলের ঝাঁক আর রঙিন প্রজাপতি।

ফাগুন রঙা বাসন্তী দরজায় শিকল তুলে
এ বাড়ি ও বাড়ি হাঁক দেয়।
বাসনের ঝুড়িতে থাকে রঙিন আসবাব
শুধু জীবনের বিবর্ণ হিসাব, খাতা খোলে
সেখানে বসে রঙের হাট।

শিমুলিয়া রঙে পাশের বাড়ির ছাদ
ষোড়শীর উচ্ছলতায় ওড়না খসে পড়ে।
এখানে ওখানে গুড়ো গুড়ো আবীর ওড়ে
জমা হয় হৃদয় জাহাজে,
নোঙর ফেলে ফাগুয়া যৌবন।

colorful paint splatter background
happy holi celebration vertical banner design with top view collection of different colored powders (gulal) in bowls.

Published on – Sunday, March 01, 2026

বসন্ত-রাগ

সংহিতা রায়

একলা মেয়ে ডুরে শাড়ি
কোথায় যাস
দূর সুদূর!
মাঘ ফাগুনের মিঠেল হাওয়ায়
চাদর গায়ে
ভর দুপুর।

লাগছে ভালো
তোর কপালে চন্দনে লাল
সিঁদুরে টিপ,
খোঁপার পাশে দুলছে মৃদু
পাপড়ি গাঁথা ঝুমকো দুল।

পলাশ কাঁকন
সাজছে হাতে
বাজছে নুপুর রিনিকঝিন,
শিমূল রাঙা আলতা পায়ে
ছন্দ তোলে বাঁশীর সুর।

ও মেয়ে
তুই ডাকিস কাকে!?
কন্ঠে তোর কুসুমহার,
আবীর আলোয় গোধূলি বেশ
কৃষ্ণচূড়ার অভিসার।

নোলক পড়া নাকের কোলে
কাজল কালো দীঘির জল,
উদাস হাওয়া সঙ্গোপনে
করছে খেলা ছলাৎ ছল!

পূবের থেকে পশ্চিমে মেঘ
মাঘ আকাশে ফাগুন সাজ!
আখরগুলোয় রাখছে লিখে
পদাবলীর বসন্ত রাগ।

Published on – Sunday, March 01, 2026

বসন্তের আহ্বানে

শংকর পালিত

যে পলাশ, কৃষ্ণচূড়ার রঙ লাল
সে রঙে বসন্তের প্রেম।
আবার যে রক্ত ঝরে সারা বিশ্বে
আগ্রাসনে, ক্ষমতা, দম্ভে, প্রভুত্বে
তার রঙও লাল।
শ্রমজীবী মানুষের বিপ্লবের
যে পতাকা তার রঙ লাল।
কাঁকুড়ে যে পথ গিয়েছে
মহুয়ার সৌরভে শাল, পলাশ,
শিমুলের বন ধরে তারও রঙ লাল।
তাই যৌবনের উচ্ছলতায় আর
বসন্তের আহ্বানে ধৌত হোক
সব রক্তের দাগ।
যুদ্ধবাজদের মনেও বসন্ত আসুক,
জাতের ধর্মের বিভাজনে
বসন্তের কোকিল শোনাক
মিলনের গান।
লাল ওড়না পড়ে যে মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে
ওর হাতেও পলাশের ফুল ভিজিয়ে
যে রঙ এনেছে তাতে সবটাই প্রেম
ওর দু চোখের গভীরতায়
পাতলা ঠোঁটের কম্পনে
ধরা দিয়েছে নব যৌবনের বসন্তরা
ফাগুনের এ বাতাস আবীরের গন্ধকে
এমনভাবে অকাতরে বিলোচ্ছে
যে নিঃস্ব, যে রিক্ত, যে বিরহে, উদাসীনতায়
তাকেও ওই লাল পথে নামিয়েছে
পলাশ ও কৃষ্ণচুড়ার মিলন ঘটাতে,
সাক্ষী কেবল মাদার, শিমুলেরা।।

happy holi celebration vertical banner design with top view collection of different colored powders (gulal) in bowls.
happy holi celebration vertical banner design with top view collection of different colored powders (gulal) in bowls.

Published on – Sunday, March 01, 2026

বসন্তে সংশয়

বুদ্ধদেব মুখোপাধ্যায়

বসন্ত রঙে যখন সবার মন রাঙা
তখন বিরহী হৃদয়পুর কাঁচ ভাঙা।
হাসির ফোয়ারায় পুরো ভিজতে চাই
যখন, তখনই তুমি আর কোথাও নাই।
শুন্যতা আমায় একাকী গ্রাস করে
আর সবুজ মন তোমাকে খুঁজে মরে।।
লাল শিমুলের পত্রহীন শাখে শাখে
বিরহী কোকিল তারস্বরশব্দে ডাকে,
ঠিক আমারই মতো হয়ত আর্তমন
তোমার জন্য আকুল সে সর্বক্ষণ।।

তুমি তখন কৃষ্ণচূড়ার শিরে রাঙা ফুল
হয়েথাক,আর আমার হয় বারবার ভুল।
আমার চোখের আড়ালে আবডালে
শাখার মাঝে তুমি লুকোচুরি খেলে
আমায় করো অতি নাকাল নাজেহাল
অথচ তোমায় দেখার ছাড়ি না হাল।
তোমায় খুঁজে খুঁজে আমি যখন হন্য
আমার প্রাপ্তির ভান্ডার প্রকৃত শূন্য-
তুমি তখন গেয়ে ওঠো বসন্ত গান
আর সে অশ্রাব্য সুরে ভরে আমার প্রাণ।

তাই এ বসন্তের ভোরে মৃদুমন্দ বাতাসে
তোমার অনুভুতি কেবল ভেসে আসে।
উদ্বেলিত এ হৃদয়ে জাগে তীব্র বাসনা
তবু বিফল আমি, তুমি আর আস না।।
বার বার উন্মুখ মন ছুটে ফিরে আসে
আর নিজেকেই প্রশ্ন করে সে কি ভালোবাসে???

Published on – Sunday, March 01, 2026

কসমোপলিটান

সিদ্ধার্থ দাস

প্রতিবাদ নীরব হওয়া বাঞ্ছনীয়।
কেউ কাউকে দেখতে পায় না
দু-চারটে মুকুল রয়ে গেলে
ভাগ্যিস, বংশ বাঁচিয়ে রাখে।

ফুলের কিছু অনুনয় থাকলে
ঝরা পাপড়ি, নিহত মনের সাক্ষী

সময়ের অভিযোগ ভিত্তিহীন
বাধা যত বাঁধনে, ফলাফল ত্রেতা
সর্বপ্রশান্তির দিকে চেয়ে খোলা আবদার।

লাঠি, ঘোড়দৌড় অগ্রাহ্য করে
স্থিতাবস্থায় ফিরে আসে।

ফল, বহুগুণ ভুগতে হবে

 

Published on – Sunday, March 01, 2026

বিবাহ অ্যালবাম

সিদ্ধার্থ দাস

লক্ষ করো— তুমি আমার যেদিন ছিলে
সেদিন আমিও তোমার ছিলাম।

তারপর আলিস্যি, রওয়া বসা কুঁড়েমি
বাঁয়ার আওয়াজে অবিন্যস্ত বমভোলা
খরতা প্রবল রসে অম্লান স্বাদকোরক

বিভিন্ন আয়তনের নুড়ি সুখ জাগানিয়া
কলতান, স্বচ্ছ জলতলে অসামঞ্জস্য, বেণী
গভীর জঙ্গলে মেজাজ অন্যরকম, শ্লথ
সংগ্রাহকের দিনক্ষণ, পাঁজি

অপার দূরত্ব মুছে যায় দিগন্তে
হাঁটতে থাকে ভিনদেশি আইসোটোপ।

 

holi festival banner design with illustration of two young women dancing in front of a bright, colorful background.

Published on – Sunday, March 01, 2026

কাশ্মীরের শারদাপীঠ ও বিশ্ববিদ্যালয়

প্রবীর আচার্য্য

সম্প্রতি আমেরিকা ভারত রাষ্ট্রের একটি মানচিত্র প্রকাশ করেছে। তাতে দেখানো হয়েছে পাক অধিকৃত কাশ্মীর ভারতের অংশ। সে প্রসঙ্গেই এই প্রবন্ধের অবতারণা।
হিমালয় পর্বতমালার বহু উঁচুতে কাশ্মীর দেশে রয়েছে হরমুখ পর্বত। বর্তমানে জায়গাটা পাক অধিকৃত কাশ্মীর নামে পরিচিত। দুর্গম পার্বত্য অঞ্চলে সেই হরমুখ পর্বতের নীচেই রয়েছে নীলম উপত্যকা। তার চারদিক ঘিরে বরফে ঢাকা দুধ সাদা গগনচুম্বী গিরিশৃঙ্গের মালা। উপত্যকাটি কিন্তু নয়নাভিরাম সবুজ বৃক্ষরাজিতে ঢাকা। কারণ হরমুখ পর্বত থেকে নেমে এসে উপত্যকাটিকে ঘিরে বয়ে চলেছে কিষাণগঙ্গা নদী। কাশ্মীরের মানুষ তাকে বলে নীলম নদী। হাজার হাজার বছর আগে এই নদী মধুমতী নদী নামে পরিচিত ছিল। নৈসর্গিক সৌন্দর্যে সাজানো সেই নীলম উপত্যকায় রয়েছে শারদা নামে একটি অতি প্রাচীন জনবসতি। সাড়ে ছয় হাজার ফুট উচ্চতায় এই শারদা জনপদটিতে ছিল সুপ্রাচীন এক হিন্দুমন্দির। যার নাম ছিল শারদাপীঠ।
আজ শুধু পড়ে আছে সে মন্দিরের ধ্বংসাবশেষটুকু। লাল বেলেপাথরে তৈরি শারদাপীঠ মন্দিরটির উচ্চতা একসময় ছিল আনুমানিক ১৪০ ফুট, দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ ছিল ৯৫ ফুট করে। মূল মন্দিরের সামান্য কিছু অংশ এখনও টিকে আছে। মন্দিরের ভিতর কোনও বিগ্রহ নেই। মন্দিরের তিনটি দেওয়াল ভালো অবস্থায় থাকলেও, মন্দিরের ছাদ ও দরজার কোনও অস্তিত্ব নেই। নীলম জেলা প্রশাসনের মতে মন্দিরটির ধ্বংসের জন্য দায়ী আবহাওয়া ও ভূমিকম্প। কিন্তু সেটা যে আসল কারণ নয়, তা জানে প্রশাসনও। তাই একসময় সারা ভারতবর্ষের হিন্দুদের অন্যতম শ্রেষ্ঠ তীর্থস্থান শারদাপীঠ, আজ অবলুপ্ত হতে বসেছে কালসমুদ্রে।
ষষ্ঠ থেকে অষ্টম শতাব্দীতে রচিত ‘নীলমাতা’ পুরাণে এই শারদাপীঠের উল্লেখ আছে। ঐতিহাসিক আল বিরুনি শারদাপীঠকে এশিয়ার অন্যতম শ্রেষ্ঠ মন্দির হিসেবে বর্ণনা করেছিলেন। শারদাপীঠের উল্লেখ পাওয়া যায় কলহনের রাজতরঙ্গিণী গ্রন্থেও। রাজতরঙ্গিণী থেকে জানা যায়, শারদাপীঠ ছিল সে যুগের শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান। কারণ মন্দিরের পাশেই ছিল সুবিশাল শারদা বিশ্ববিদ্যালয়। আজও যেটির ধ্বংসাবশেষ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে।
দুগ্ধফেননিভ শুভ্র তুষারের মুকুট পরে সারি সারি গিরিশৃঙ্গ চতুর্দিকে দণ্ডায়মান। নীল আকাশের প্রেক্ষাপটে তাদের মাথায় পত পত করে উড়ছে শুভ্র চীনাংশুকের মতো মেঘ খণ্ডের বিজয় কেতন। তার নিচে চোখ জুড়ানো সবুজ বনানীতে ঢাকা উপত্যকা। প্রস্ফুটিত তরুলতাগুলি থেকে ভেসে আসছে স্বর্গীয় সুগন্ধ। উচ্ছ্বল ফেনরাশি ছড়িয়ে গিরিকন্দরের খাঁজে খাঁজে উপলখণ্ডে আছড়ে পড়ছে জলরাশি। জল তরঙ্গের ছন্দে ছন্দে ঝর্ণাগুলি উদ্দাম নৃত্যে রত। তারা যেন অপ্সরীদের মতো ধ্যানগম্ভীর পর্বত শৃঙ্গগুলির ধ্যানভঙ্গ করাতে চায়। কোথাও তারা ক্ষণে ক্ষণে দৃশ্যমান, আবার কোথাও পর্বত কন্দরে অদৃশ্য। প্রায় আড়াই হাজার বছর আগে এই শারদা জনপদেই ছিল প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত শারদা বিশ্ববিদ্যালয়। নালন্দা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো শারদা বিশ্ববিদ্যালয়ও ছিল ভারতবর্ষের এক সুপ্রাচীন ঐতিহ্যময় গর্বের স্থান।
রাজতরঙ্গিণী গ্রন্থের লেখক ঐতিহাসিক কলহন শিক্ষাগ্রহণ করেছিলেন এই শারদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই। প্রায় দুই হাজার বছর আগে বৌদ্ধ মহাথের আয়ুর্বেদাচার্য কুমারজীব এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা করেছিলেন। তিনি শুধু বৌদ্ধ শাস্ত্রে সুপণ্ডিত ছিলেন না, ছিলেন একজন ধন্বন্তরি চিকিৎসকও। দুরারোগ্য ব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে চৈনিক দেশের রাজা তাঁকে অপহরণ করে নিয়ে যায়। চৈনিক দেশে তিনিই প্রথম বৌদ্ধধর্ম প্রচার করেছিলেন। বহু বৌদ্ধ গ্রন্থও তিনি চৈনিক ভাষায় অনুবাদ করেছিলেন। তাঁর ভগিনী মহাভিক্ষু অক্ষুমতীও শারদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই শিক্ষালাভ করেছিলেন। সর্বস্ব ত্যাগ করে যিনি রাজকন্যা থেকে বৌদ্ধ সন্ন্যাসিনী হয়েছিলেন। আবার হাজার বছর আগে আদি শঙ্করাচার্য এই শারদা বিশ্ববিদ্যালয় থেকেই অধ্যয়ন করেছিলেন। সর্বজনশ্রদ্ধেয় ভারত বিখ্যাত বিদ্বানরা ছিলেন এই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক। বিশ্ববিদ্যালয়ের নিজস্ব লিপিও ছিল, লিপিটির নামও ছিল ‘শারদা’ লিপি। কলহন বিরোচিত রাজতরঙ্গিণী গ্রন্থে এই শারদা পীঠ এবং শারদা বিশ্ববিদ্যালয়ের উজ্জ্বল বর্ণনা আছে। এ থেকেই বোঝা যায় সেকালে কত উন্নত ছিল কাশ্মীর দেশ।
অতি মনোরম সেই প্রাকৃতিক নৈসর্গিক পরিবেশে ঋষি শাণ্ডিল্য প্রথম স্থাপন করেন নীলসরস্বতী দেবীর আদি মন্দির। যেখানে শিক্ষা, জ্ঞান ও বাকশক্তির দেবী মা সরস্বতীর সঙ্গে একই দেহে লীন হয়ে আছেন স্বয়ং দেবী দুর্গাও। ১৮টি মহাশক্তিপীঠের অন্যতম পীঠ, শারদাপীঠ। কথিত আছে এখানে সতীর ডান হাত পড়েছিল। মা নীল সরস্বতীর নামেই উপত্যকা, নদী ও জেলার নাম আজ হয়েছে নীলম। ঋষি শাণ্ডিল্যের মন্দির প্রতিষ্ঠা সম্পর্কে একটি পৌরাণিক কাহিনিও আছে।
পুরাকালে এই নীলম উপত্যকাতেই মধুমতী নদীর তীরে জ্ঞানলাভের জন্য নীল সরস্বতী দেবীর আরাধনা ও এক বিশাল যজ্ঞের আয়োজন করেছিলেন ঋষি শাণ্ডিল্য। নিয়োগ করেছিলেন কয়েকশো স্থানীয় পুরোহিতদের। উপস্থিত ছিলেন দেশ বিদেশ থেকে নিমন্ত্রিত সাধুসন্তেরা। আর সঙ্গে ছিলেন উপত্যকার গ্রামগুলির বাসিন্দারাও। যজ্ঞ চলাকালীন যজ্ঞস্থলে উপস্থিত হন এক অসামান্যা সুন্দরী নারী। তিনি নিজেকে ব্রাহ্মণী বলে পরিচয় দিয়ে বললেন, যজ্ঞের আমন্ত্রণ পেয়ে অনেক দূর থেকে আমি এসেছি। আমি ও আমার সঙ্গীরা এখন পথশ্রমে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। শীঘ্র আমাদের ক্ষুণ্ণিবৃত্তির ব্যবস্থা কর। করজোড়ে ক্ষমা চেয়ে ঋষি শাণ্ডিল্য বললেন, যজ্ঞ শেষ হবার আগে খাদ্যবস্তু বিতরণ করার নিয়ম নেই। যজ্ঞ শেষ হলেই ব্রাহ্মণী ও তাঁর সঙ্গীদের যথারীতি আপ্যায়ন করা হবে। ক্রুদ্ধ হয়ে ব্রাহ্মণী চিৎকার করে বললেন, যাঁকে তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে এই যজ্ঞ করছো, আমিই সেই দেবী নীল সরস্বতী। ঋষি শাণ্ডিল্য ব্রাহ্মণীর কথা বিশ্বাস করতে পারলেন না। ফলে যজ্ঞের কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।
ঋষি শাণ্ডিল্যের অবজ্ঞায় ক্রুদ্ধ ব্রাহ্মণী ছুঁড়ে ফেললেন তাঁর হাতের পঞ্চাশটি পদ্মবীজের অক্ষমালা। সঙ্গে সঙ্গে চারদিক ঢেকে গেল ঘন কুয়াশায়। শুরু হল প্রবল ঝটিকাবৃষ্টি, নিভে গেল যজ্ঞাগ্নি। অদৃশ্য হয়ে গেলেন ব্রাহ্মণী। ক্ষণপরেই কুয়াশা ভেদ করে ঋষি শাণ্ডিল্যের সম্মুখে অবতীর্ণ হলেন রুদ্রমূর্তি মা নীল সরস্বতী। সালঙ্কারা দেবীর একহাতে অস্ত্র ও অপর হাতে নীল পদ্মের আকারে পুঞ্জীভূত মেঘ। ক্রোধে কম্পমানা দেবী অভিশাপ দিলেন, যজ্ঞাগ্নিতে পুরোহিত, সাধুসন্ত, গ্রামবাসী, গাছপালা, পশুপাখি সব ধ্বংস হয়ে যাবে।
প্রবল বৃষ্টির মধ্যেই পুণরায় জ্বলে উঠল যজ্ঞের আগুন। ঋষি শাণ্ডিল্যর চোখের সামনে যজ্ঞের আগুনে একে একে ভস্মীভূত হয়ে গেল সবকিছু। চূড়ান্তভাবে মুষড়ে পড়লেন ঋষি শাণ্ডিল্য। তাঁর জন্যেই এত মানুষ, পশু, পাখি, গাছপালার মৃত্যু হল। তাঁর জন্যই শুকিয়ে গেল প্রবহমানা মধুমতী নদী। তাঁর জন্যেই বিগলিত হয়ে গেল পর্বতশৃঙ্গের তুষার। তাঁর জন্যেই নীল আকাশ ছেয়ে গেল বিষাক্ত মেঘে। তাঁর জন্যেই সবুজ উপত্যকা পরিণত হল ধু ধু মরুভূমিতে। প্রবল অনুশোচনায় দেবীর পদতলেই প্রাণত্যাগ করলেন ঋষি শাণ্ডিল্য।
ঋষি শাণ্ডিল্যের আত্মদানে তুষ্ট হলেন দেবী নীল সরস্বতী। তিনি পুনরায় প্রাণদান করলেন তাঁকে। জেগে উঠেই দেবী নীল সরস্বতীর ধ্যানে বসলেন ঋষি শাণ্ডিল্য। মাসের পর মাস বছরের পর বছর চলল সেই কঠোর তপস্যা। তপস্যায় তুষ্ট হলেন দেবী। যজ্ঞের আগুনে ভস্মীভূত পুরোহিত, সাধুসন্ত, গ্রামবাসী, গাছপালা, পশু-পাখির জীবন ফিরিয়ে দিলেন তিনি। ঋষি প্রার্থনা করলেন নীলম উপত্যকা এবং মধুমতী নদীটিও যেন আগের রূপ ফিরে পায়। ভক্তের মনোবাঞ্ছা পূর্ণ করলেন মা নীল সরস্বতী। অনুতপ্ত ঋষি শাণ্ডিল্যকে দেবী নীল সরস্বতী আদেশ দিলেন, মধুমতী নদীর তীরে একটি সুদৃশ্য মন্দির তৈরি করতে। সেই মন্দিরেই বিরাজ করবেন দেবী নীল সরস্বতী। সেইদিন থেকে নয়নাভিরাম সৌন্দর্যে সবুজ উপত্যকাটি হয়ে গেল মা নীল সরস্বতীর আবাস।
পাক অধিকৃত কাশ্মীরের হরমুখ পর্বতের নীচে আজও আছে সেই নয়নাভিরাম নীলম উপত্যকা। সেই উপত্যকার পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে পুরাণের সেই মধুমতী নদী। যাকে কাশ্মীরের মানুষ চেনেন নীলম নদী বা কিষেণগঙ্গা নামে। মা নীল সরস্বতীর নামেই উপত্যকা, নদী ও জেলার নাম হয়েছে নীলম।
ঐতিহাসিক কলহনের রাজতরঙ্গিণী থেকে জানা যায়, শারদাপীঠ ছিল সে যুগের শিক্ষা ও সংস্কৃতির পীঠস্থান। অন্যান্য ইতিহাসবিদদের মধ্যেও এই বিষয়ে রয়েছে বিস্তর মতানৈক। কেউ বলেন, সম্রাট অশোক তৈরি করেছিলেন এই শারদাপীঠ। কেউ বলেন, কুষাণ রাজারা তৈরি করেছিলেন মন্দিরটি। আবার কোনও কোনও ইতিহাসবিদ বলেন, প্রায় পাঁচ হাজার বছর আগে ইন্দো-ইরানীয়রা বানিয়েছিল এই শারদাপীঠ। পাকিস্তানের গবেষক ফয়জুর রহমানের দাবি কাশ্মীরে বৌদ্ধ ধর্মের প্রভাব রুখতে এই শারদাপীঠ বানিয়েছিলেন কাশ্মীর রাজ ললিতাদিত্য।
স্থানীয় গ্রামগুলির প্রবীণ অধিবাসীরা বংশ পরম্পরায় বহন করেছেন শারদাপীঠ সম্পর্কে নানান লোকগাথা। বর্তমান গ্রামবাসীরা সবাই ইসলাম ধর্মের অনুসারী। তাদের কাছ থেকে এরকম একটি কাহিনিতে জানা যায়, উপত্যকাটিতে একবার শুভ ও অশুভের মধ্যে লড়াই হয়েছিল। লড়াইয়ে দেবী শারদা তথা নীল সরস্বতী অশুভের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়েছিলেন জ্ঞানের পাত্র। পাত্রটিকে মাটির তলায় একটি কুঠরিতে রেখে সেই জ্ঞানপাত্রটির ওপরেই নির্মাণ করলেন একটি সুরম্য মন্দির। সেই মন্দিরটিই আজ শারদাপীঠ নামে বিখ্যাত।
অপর লোকগাথাটি সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী। তা থেকে জানা যায়, অনেককাল আগে পৃথিবী শাসন করতেন দুই বোন, শারদা ও নারদা। নীলম উপত্যকার পাশে থাকা শার্দি ও নার্দি নামে দুটি তুষারশৃঙ্গে ছিল তাঁদের বাস। একদিন পাহাড়ের ওপর থেকে নারদা দেখতে পেলেন, তাঁর দিদি শারদা দেহত্যাগ করেছেন। দুটি দৈত্য শারদার দেহ নিয়ে আকাশপথে পালিয়ে যাচ্ছে। উগ্রমূর্তি নারদা উড়ে গিয়ে দুই দৈত্যকে থামিয়ে দিলেন। দুই দৈত্যকে নির্দেশ দিলেন, এক দিনের মধ্যে তাঁর দিদির স্মৃতির উদ্দেশ্যে নীলম উপত্যকাতে সুদৃশ্য শারদা মন্দির তৈরি করতে। প্রাণের ভয়ে দুই দৈত্য একদিনেই তৈরি করে দিল এই শারদা মন্দির।
তৃতীয় আর একটি লোকগাথাও এক দৈত্যকে নিয়ে। কোনও এককালে নীলম উপত্যকায় বাস করত এক দৈত্য। সে স্থানীয় রাজকন্যাকে ভালোবাসত। রাজকন্যা একদিন দৈত্যকে বললেন, তাঁর জন্য পৃথিবীর সেরা প্রাসাদ বানিয়ে দিতে। রাজকন্যার জন্য নিজেই প্রাসাদ বানাতে শুরু করল দৈত্য। কাজ যখন প্রায় শেষের পথে, তখন ভোরের আজান শুরু হয়ে গেল । দৈত্য আর প্রাসাদ তৈরির কাজটি সমাপ্ত করতে পারল না। তাই দৈত্যের তৈরি সেই প্রাসাদ অসমাপ্ত হয়ে রয়ে গিয়েছে। সেকারণেই শারদামন্দিরের কোনও ছাদ নেই। এখানে লক্ষ্যণীয় ‘আজান’ শব্দটি ব্যবহার করে কাহিনিটির ইসলামীকরণ করা হয়েছে।
লোকগাথার পর নীল সরস্বতী সম্পর্কে পৌরাণিক এবং শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যায় আসা যাক। শ্রীশ্রীমার্কণ্ডেয় চণ্ডী মতে নীল সরস্বতী হলেন মহাসরস্বতী। স্বত্বগুণ সম্পন্না মহাসরস্বতী, রজগুণ সম্পন্না মহালক্ষ্মী এবং তমোগুণ সম্পন্না মহাকালী এই তিন দেবী হলেন মা-চণ্ডীর এক একটি রূপভেদ। তাই শাক্ত তান্ত্রিক মতে দেবীর পূজা হয়। ঋগ্বেদে প্রথম সরস্বতী নদীর কথা বলা হয়েছে। সেই নদী থেকেই দেবীর উৎপত্তি। জ্ঞান, বাক্ ও সুরের দেবী সরস্বতীর সাথে এক দেহে লীন হয়ে আছেন মহাচণ্ডী ও মহালক্ষ্মী। বেদে সরস্বতী নদীকে জ্যোতিরূপে বর্ণনা করা হয়েছে। এই সরস্বতী নদীর তীরে বসেই বৈদিক মন্ত্র উচ্চারিত হত। পদ্মপুরাণ এবং স্কন্দপুরাণেও সরস্বতী একজন নদীর দেবী ছিলেন। বেদেও সরস্বতীর ত্রয়ী মূর্তির কথা বলা হয়েছে। তাঁরা হলেন ভূঃ বা ভূলোকে ইলা, ভুবঃ বা অন্তরীক্ষে লোকসরস্বতী, এবং স্বঃ বা স্বর্গলোকে ভারতী। ভূঃ ভুবঃ স্বঃ – এই তিনে মিলে সামগ্রিক জগত । ভূলোকে অগ্নি, অন্তরীক্ষ লোকে হিরণ্য দ্যুতি ইন্দ্র এবং স্বঃ লোকে সূর্য এই তিনের যে সম্মিলিত জ্যোতিরাশি তাই সরস্বতীর জ্যোতি। জ্ঞানময়ী বা চিন্ময়ী রূপে তিনি সর্বব্যাপিনী। তাঁর জ্যোতি সর্বত্র পরিব্যাপ্ত । শুধু এই ত্রিলোক নয় ঊর্ধ্ব সপ্তলোক নিম্ন সপ্তলোক পর্যন্ত চতুর্দশ ভুবনে স্তরে স্তরে সেই জ্যোতি বিরাজিতা। সেই জ্যোতি অজ্ঞান রূপী তমসা কে নিবারণ করে। যোগী হৃদয়ে যখন সেই আলো জ্বলে তখন সকল প্রকার অন্ধকার নাশ হয়।
মার্কণ্ডেয় পুরাণের শ্রীশ্রীচণ্ডীতে রয়েছে দেবীর আদি ধ্যান মন্ত্র। এই মন্ত্রটি কিছুটা বিশ্লেষণাত্মক।
পঞ্চাশল্লিপিভির্ব্বিভক্ত মুখদোঃপন্মধ্য বক্ষস্থলং
ভাস্বন্মৌলি নিবদ্ধ চন্দ্রশকলাং আপীনতুঙ্গস্তনীম।
মুদ্রামক্ষগুণংসুধাঢ্যকলসংবিদ্যাঞ্চহস্তাম্বুজৈর্বিভ্রাণাং
বিশদপ্রভাং ত্রিনয়নাং বাগ্দেবতামাশ্রয়ে ।।
দেবীর এক হাতে যে অক্ষমালা আছে, প্রকৃতপক্ষে তা পঞ্চাশৎটি পদ্মবীজের মালা। এই পঞ্চাশটি পদ্মবীজ দেবনাগরী বর্ণমালা বা লিপির পঞ্চাশটি বর্ণের প্রতীক। সেগুলি হল অ, আ থেকে শুরু করে ক, খ পেরিয়ে হ পর্যন্ত। পা থেকে শুরু করে মাথা পর্যন্ত দেবীর পঞ্চাশটি অঙ্গে এক একটি বর্ণ প্রতিস্থাপিত। দেবীর মুখমণ্ডল চন্দ্রকলার ন্যায় উজ্জ্বল। দেবীর বক্ষদেশ সুউন্নত, তিনি সুধা কলস ধারণ করে আছেন। ত্রিনয়নী বিশালাক্ষী দেবী বিদ্যা, বাক্য এবং সুরের নিয়ন্ত্রণকারিণী।
প্রশ্ন উঠতে পারে সংস্কৃত বর্ণমালায় তো একান্নটি বর্ণ থাকে, এখানে পঞ্চাশটি হল কেন? সংস্কৃতে ‘ক্ষ’ যুক্তাক্ষরটিকে বর্ণমালার শেষ বর্ণ হিসেবে আলাদা মর্যাদা দিলে একান্নটি বর্ণই হয়। ওই একান্নটি বর্ণ দেবীর একান্নটি অঙ্গে সংস্থাপিত। দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের পর মহাদেব যখন তাঁর দেহটা কাঁধে নিয়ে তাণ্ডব নৃত্য করতে করতে আকাশ পথে বিচরণ করছিলেন তখন শ্রীবিষ্ণু সুদর্শন চক্রে দেবীর দেহকে একান্নটি ভাগে খণ্ডিত করেন। বর্ণমালার সেই একান্নটি আদ্য অক্ষর যুক্ত দেবীর দেহাংশ ভারতবর্ষের বিভিন্ন জায়গায় পতিত হয়। সৃষ্টি হয় একান্নটি সতীপীঠের। ওই একান্নটি সতীপীঠে একান্নটি পীঠদেবী বিরাজমানা। তাঁদের নামকরণ করা হয়েছে সংস্কৃত বর্ণমালার একান্নটি বর্ণকে আদ্য অক্ষর করে।
অন্য একটি ধ্যান মন্ত্রে ভিন্নভাবে দেবীর রূপ বর্ণনা করা হয়েছে —
ধ্যায়েদ্দেবীং বিশালাক্ষীং শরদিন্দু সুবদনাং।
চতুর্ব্বাহু ধরাং বীণাং ধারয়ন্তীং ত্রিভির্ভুজৈঃ ।।
জপয়ন্তীমেক হস্তেন চাক্ষমালাং বরপ্রদাম্।
বামপদ পদ্মাসনা দক্ষিণপদ শিবোপরি ।।
অর্থাৎ শরৎকালের চন্দ্রের মতো মুখশ্রী যুক্ত বিশালাক্ষী দেবীকে ধ্যান করছি, তিনি চতুর্ভুজা। তিনটি হাতে তিনি বীণা ধারণ করে রয়েছেন, অপর হাতটিতে রয়েছে জপমালা বা অক্ষমালা। দেবীর বামপদ পদ্মের উপর এবং দক্ষিণপদ শিবের উপর স্থাপিত।”
প্রশ্ন উঠতে পারে, তা দেবী যদি সরস্বতীই হবেন, তাহলে তাঁর একটা পা শিবের উপর কেন? সেক্ষেত্রে ব্যাখ্যাটা হল, ইনি হলেন তান্ত্রিক দেবী। এঁর অপর নাম বিশালাক্ষী হলেও ইনি মহাসরস্বতী এবং চণ্ডীরূপেও বিরাজমানা। তাই তাঁর একটি পা শিবের উপর স্থাপিত। এই মন্ত্রটি কিন্তু শাস্ত্রীয়। দেবীর নাম বিশালাক্ষী হওয়ার তাৎপর্য হল দেবীর চক্ষু দুটি আয়ত এবং খুব সুন্দর, তাই বিশাল অক্ষি থেকে দেবীর নাম বিশালাক্ষী। এছাড়াও শাস্ত্র অনুসারে তাঁর আরও কয়েকটি নাম আছে। সব ক’টি নামই তাঁর সুন্দর চোখের বর্ণনা দেয়। যেমন –
পঙ্কজাক্ষী বিরূপাক্ষী রক্তাক্ষী চ সুলোচনা।
একনেত্রা দ্বিনেত্রা চ কোটারাক্ষী ত্রিলোচনা ।।”
বেদে নীল সরস্বতী দেবীর আরও একটি খুব সুন্দর ধ্যান মন্ত্র রয়েছে—
যা কুন্দেন তুষারহার ধবলা যা শুভ্রবস্ত্রাবৃতা।
যা বীণা বরদণ্ড মণ্ডিতকরা যা শ্বেতপদ্মাসনা ।।
যা ব্রহ্মাচ্যুতশঙ্কর প্রভৃতির্দেবৈঃ সদাবন্দিতা।
সা মাং পাতু সরস্বতী ভগবতী নিঃশেষ জাড্যাপহাম ।।
অর্থাৎ কিনা দেবী কুন্দ ফুলের ন্যায় শুভ্র তুষারের হার পরিধান করে আছেন। তিনি শ্বেত বস্ত্র পরিধান করে শ্বেত পদ্মের উপর আসীন। দুই হাতে তাঁর বরদণ্ড এবং বীণা। যাঁকে ব্রহ্মা, বিষ্ণু এবং মহেশ্বর বন্দনা করেন সেই দেবী তুষ্ট হন। আরও একটি ধ্যান মন্ত্রেও দেবী পূজিতা হন—
তরুণশকলমিন্দোর্বিভ্রতী শুভ্রকান্তিঃ ।
কুচভরণমিতাঙ্গী সন্নিষণ্ণা সিতাব্জে ।। নিজকরকমলোদ্যল্লেখনীপুস্তকশ্রীঃ । সকলবিভবসিন্ধ্যৈ পাতু বাগদেবতা নঃ ।।
ঐং সরস্বতৈ নমঃ।
এর অর্থ– চন্দ্রের তরুণ অংশের ন্যায় যাঁর কান্তি শুভ্র, যিনি স্তনভারে আনতা, যিনি শ্বেত পদ্মাসনা, যাঁর নিজ কর কমলে উদ্যত লেখনী ও পুস্তক শোভিত, সকল ঐশ্বর্য সিদ্ধির নিমিত্ত সেই বাগদেবী আমাদিগকে রক্ষা করুন । নীচে আরও একটি ধ্যান মন্ত্র দেওয়া হল। এই মন্ত্রটিতে দেবী সরস্বতীর রূপ অপেক্ষা চণ্ডীর রূপই প্রকট হয়ে উঠেছে—
||মুলেন ব্যাপকং ন্যাসেৎ ধ্যায়েদ্দেবীং পরাং শিবাম। ধ্যায়েদ্দেবীং বিশালাক্ষীং তপ্তজাম্বুনদপ্রভাম ।। দ্বিভুজাম্বিকাং চণ্ডীং খড়্গখেটকধারিণীম। নানালংকারসুভগাং রক্তাম্বরধরাং শুভাম ।।
সদা ষোড়শবর্ষীয়াং প্রসন্নাস্যাং ত্রিলোচনাম। মুণ্ডমালাবলি রম্য পীনোন্নতপয়োধরাম ।।
শবোপরী মহাদেবীং জটামুকুটমণ্ডিতাম।
শত্রুক্ষয়করাং দেবীং সাধকাভিস্টদায়ীকম ।। সর্বসৌভাগ্যজননী মহা সম্পদপ্রদং স্মরেৎ ||১
শুক্লাং ব্রহ্ম বিচার সার পরমাদ্যাং জগদ্ব্যাপিনীম।
বীণাপুষ্পক ধারিণীমভয়দাম্ জাড্যান্ধকারাপহাম ।।
হস্তেস্ফটিকমালিকাম্বিদধতীম্পদ্মাসনে সংস্থিতাম্বন্দে।
ত্বাং পরমেশ্বরীম্ ভগবতীম্ বুদ্ধিপ্রদাম্ সারদাম্॥২||
এখানে বলা হচ্ছে দ্বিভুজা দেবী আয়তনয়না। গলায় মুণ্ডমালা, মাথায় জটা এবং মুকুট। তিনি ভৈরবীর মতো লাল কাপড় পরিহিতা এবং ত্রিলোচনা। অথচ ওই মন্ত্রেরেই দ্বিতীয়ার্ধে রূপভেদে দেবী শ্বেতবস্ত্র পরিহিতা বীণা পুস্তক এবং স্ফটিক মালিকা ধারণ করে শ্বেত পদ্মের উপর বিরাজ করছেন।
মজার কথা নীল সরস্বতী দেবীর মন্দির ভারতবর্ষের অন্য কোথাও না থাকলেও বিশালাক্ষী হিসেবে দেবী অন্যত্র পূজিতা হন। তার প্রমাণ মার্কণ্ডেয় চণ্ডীর ওই ধ্যান মন্ত্রগুলিতেই বিশালাক্ষী দেবীকে আহ্বান জানানো হয়। বিশালাক্ষী দেবীর আদি মন্দিরটি রয়েছে কাশী বিশ্বনাথ মন্দিরের পিছনে মীরঘাটে। সেটিও একান্ন সতীপীঠের একটি পীঠ। কবি চণ্ডীদাস পূজিত বিশালাক্ষী দেবীর বিগ্রহটি রয়েছে বীরভূমের নানুরের মন্দিরে। সেখানেও দেবীর পূজায় ব্যবহৃত হয় প্রথম এবং দ্বিতীয় ধ্যান মন্ত্র দুটি।
বিদ্য়া ও জ্ঞানের দেবী সরস্বতী ৬৪ কলায় পারদর্শী। দেবীর চারটি হাত। একটি হাতে জল, অপর হাতে জপমালা, অন্য দুটি হাতে পুস্তক ও বীণা। প্রত্যেকটির ভিন্ন ভিন্ন অর্থ আছে। জল নির্মলতা বা শুদ্ধতার প্রতীক। পুস্তক বেদের প্রতীক, জপমালা মনসংযোগ ও আধ্য়াত্মিকতার প্রতীক আর বীণা হল সুর ও ছন্দের প্রতীক । দেবীর বাহন হাঁস। হাঁস দেবীকে বহন করে জল, স্থল ও অন্তরীক্ষে বিচরণ করতে পারে। এই হাঁস হল নির্মল, শুভ্র ও শুচিতার প্রতীক ।
সনাতন ধর্ম ছাড়াও বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মেও এই দেবী পূজিতা হন প্রজ্ঞাপারমিতা হিসেবে। তবে বজ্রযানী বৌদ্ধ তন্ত্রমতে এই দেবী সরাসরি নীলসরস্বতী রূপেই পূজিতা হন। রামায়ণ মহাভারতেও দেবী সরস্বতীর উল্লেখ রয়েছে বিভিন্ন জায়গায়।
অনুশোচনার বিষয় এটাই যে, এই ঐতিহ্যপূর্ণ গৌরবমণ্ডিত সনাতনী পীঠস্থান আজ ভারত রাষ্ট্রের বাইরে পাক অধিকৃত কাশ্মীরে অবহেলায় পড়ে রয়েছে।

holi festival banner design with illustration of two young women dancing in front of a bright, colorful background.

Published on – Sunday, March 01, 2026

সেদিন কুয়াশা ভোরে

মৌসুমী চট্টোপাধ্যায় দাস

       ঘুমটা আমার হঠাৎই ভেঙে গেল৷ এখন শীত শেষে বসন্ত আসব আসব করছে৷ তবু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব আছে বেশ৷ আর আবহাওয়ার খামখেয়ালিপনা তো আছেই৷ মনে হল, বাথরুম গেলে ভাল হয়৷ বোন পাশেই ঘুমে অচেতন৷ ঘরের দরজা খুলে বাইরে এলাম৷ 
     আমাদের একতলা বাড়ি৷ উঁচু পাঁচিল দিয়ে ঘেরা৷ সামনে অনেকটা জায়গা নিয়ে আমাদের বাগান৷ বাবা মা আমার বোনের— সকলের প্রিয় শখ বাগান করা৷ মরশুমী ফুলরা এখনও শুকিয়ে যায় নি৷ এবার বেশ দেরী করেই ফুটেছে ডালিয়াও৷ 
         ভেতরে একটা লম্বা গ্রীলঘেরা বারান্দার পাশে আমাদের ঘরগুলো৷ বারান্দার দুপ্রান্তের দুটি ঘর শোবার ঘর হিসাবে ব্যবহৃত হয়৷ মাঝে রান্না-খাবার ঘর, তা ছাড়া আছে একটা বড় ঘর যেটা লোকজন এলে শোয়ার ঘর, না হলে বসার কাজে লাগে৷ আমাদের দু’বোনের পড়ার জন্যও ব্যবহার হয়৷ বাইরে খোলা জায়গায় কলতলা আর সঙ্গে একটা বড়  বাথরুম আছে, তবু ছোট একটা বাথরুম বারান্দার এক প্রান্তে—বাবার ঘরের পাশে আছে, যাতে বারান্দার গ্রীল খুলে  রাতে আর বাইরে যেতে না হয়৷
      বারান্দায় পা বাড়িয়ে বুঝলাম হালকা আলো ফুটলেও কুয়াশা কুয়াশা ভাব আছে৷ বারান্দার আলো জ্বালালে ঘুম চটকে যাবে এই আশঙ্কায় কোনো আলো জ্বালালাম না৷ বাথরুম যাবার সময় দেখলাম বাবার ঘরের দরজাটা বন্ধ৷ বাবা ঘরের দরজা সাধারণতঃ খুলেই রাখে, যাতে আমরা প্রয়োজন মত ডাকতে পারি৷ বারোমাস শুধু পর্দাটানা থাকে৷ মা নেই এখন বাড়িতে৷ মামারবাড়ি গেছে দাদু ডেকে পাঠিয়েছেন উকিলের সাথে কী কাজ আছে বলে৷
     বাথরুমের কাজ মিটিয়ে আসতে আসতে দেখছি আমার শোবার ঘরের দরজার কাছে পিসিমণি দাঁড়িয়ে আছেন৷ আমার মনে পড়ল মা বলে গেছেন যে পিসিমণি আসবে৷ থাকবে ক’দিন৷ মা এলে তবে ফিরবেন৷ কাল রাতেও বাবা বলেছেন ট্রেন নাকি লেটে চলছে৷ পিসিমণির বাড়ি সেই ইন্দোরে৷ কতদিন পরে আসছেন৷
     আমায় দেখে পিসিমণি ঘরে ঢুকে গেলেন৷ দরজাটা আধখোলা ছিল৷ আমি পেছন পেছন ঢুকতে যেতেই পাল্লাটা কাঁধে লাগল৷ ঢুকে দেখি পিসিমণি গদিমোড়া মোড়াটাতে বসে আছেন৷ আমি পিসিমণির দিকে ভাল করে তাকালাম৷ অনেক দিন দেখিনি৷ রোগা পাতলা মানুষ মোটেও নন৷ তবে, আধখোলা পাল্লা দিয়ে ঘরে এলেন কি করে?
     এখন তো কথা বলা উচিত৷ মানে মা থাকলে যা আতিথেয়তা করত সে সব করা উচিত৷ কিন্তু আমি খুবই ঘুম কাতুরে মানুষ৷ কথা বললেই ঘুমটার বারোটা বাজবে৷ এই হালকা ঠান্ডায় কম্বল জড়িয়ে ভোর ভোর সেকেন্ড রাউন্ড ঘুম যে কি লোভনীয়! 
     “পিসিমণি, এত সকালেই পৌঁছে গেলে!”
বলতেই সে বলল, “তুমি আমাকে চেন না?”
      অবাক কথা৷ না চেনার কি আছে? তবে পিসিমণি তো এমন আটপৌড়ে শাড়ি পরে রাস্তায় যাতায়াত করবে না৷ তবে এনার সঙ্গে কার এত মিল? ভাবতে ভাবতেই মনে পড়ল৷ আর মনে পড়তেই আমার মনে হল, তা কী করে সম্ভব?
     তখন অনেক ছোট ছিলাম৷ দুধঠাকমা রোজ দুধ দিতে আসত আমাদের বাড়ি৷ মাঝে মাঝেই বায়না করতাম দুধঠাকমার বাড়ি যাবার৷ নিয়ে যেতেন৷ গরুর গোয়াল, খড় কাটা, জাবনাপাত্র, দুধ দোওয়ানো এসব দেখে মজা পেতাম৷ আর খেলতাম শিবের সাথে৷ আমারই বয়সী ঠাকমার ছোট নাতি৷ মানুষ যে চোখের পলকে কত কিছু ভাবতে পারে তা ভাবলেও অবাক লাগে৷
চোখের সামনে  মুহূর্তে ভেসে উঠল,গোয়ালঘর, খড়ের পালা, পুকুর ধার, শিবের সাথে লুকোচুরি—এই সব কিছু৷ কিন্তু শিবেরা তো এখানে থাকত না আর৷
     সঙ্গে সঙ্গে একটা শিরশিরানি খেলে গেল আমার শিরদাঁড়ায়৷ আমি বোনকে আর বাবাকে ডাকতে ডাকতে তিড়িং বিড়িং লাফে বোনের কম্বলের তলায়৷ কিন্তু বোন কোনো সাড়া দিচ্ছে না৷ আমার গলা দিয়ে আদবেও কোনো আওয়াজ বের হচ্ছে তো? গলা কেমন যেন আঠা আঠা৷
      ঘুম ভাঙলো বোনের ধাক্কাধাক্কিতে৷ “কি রে দিদি আজ এত্ত ঘুমোচ্ছিস! আমাকে সকাল সকাল ডাকতে বলেছিলাম না? আমার পড়তে যাওয়া আছে৷”
     চোখ খুলেই বললাম, “পিসিমণি এসে গেছে?” ততক্ষণে বাবা এ ঘরে হাজির৷ বলল, “দাঁড়া, ট্রেনের টাইমের আগে কি করে আসে বল? হাওড়া থেকে বাসে উঠেছে বলল ফোনে৷ একটু পরেই চলে আসবে৷”
     বাবার হাতে চাবির গোছা৷ ঘুম থেকে উঠে বাবার প্রথম কাজ বারান্দার গ্রীল,বাইরের গেটসহ সব তালা খোলা৷ আমার আবার মনে হল গেট বন্ধ থাকলে কেউ ঘরে আসবে কি করে?
     তখন আমি বাধ্য হয়ে ওদের সব কথা বলেই ফেললাম৷ বোন বলল, “দুধঠাকমা, মানে যিনি কালা হয়ে গেছিলেন? দুধ দিয়ে ফেরার পথে একদিন লাইন পার হতে গিয়ে ট্রেনে কাটা পড়েন? আমি তো তাকে দেখিই নি৷ শুধু মাঝে মাঝে মা বলে ওনার কথা৷  তোকে নাকি খুব ভালবাসত?”
     বাবা বলল, “ওসব তোমার স্বপ্ন৷ অবচেতন মনে তার কথা ভেবেছ হয়ত৷ তাছাড়া আমার ঘরের দরজা কাল রাতেও যথারীতি খোলাই ছিল৷ যা, হাতমুখ ধুয়ে এসে একটু চা বানা৷ সবাই খাই৷ ফ্রেস লাগবে৷”
     বোন পড়তে চলে গেলে আমি বই নিয়ে নোট বানাতে বসলাম৷ কিন্তু মন বসছে না৷ শিবের কথা মনে পড়ছে৷ ঠাকমা মারা যাবার পর ওর বাবা পুঁটে জেঠা ওদের নিয়ে নিজের কাজের জায়গায় চলে গেছিলেন৷ জেঠা ছোটখাট কোনো কাজ করতেন বলেই ঠাকমা কষ্ট করেও দুধের ব্যবসা করতেন৷ কিন্তু আজ এত বছর পরে একথা মনে হল কেন?
      পিসিমণি যথা সময়ে হাজির৷ নিজের হাতে তৈরী খাঁটি ঘি এনেছেন৷ আরও কত কি! বাবা ঘি ভালবাসেন৷ বললেন, তুই এলে বিশুদ্ধ ঘিএর স্বাদ পাই৷ এখানে সব ভেজাল৷”
     পিসিমণি একথা শুনেই বলে উঠলেন, হ্যাঁ রে ছোড়দা, সেই যে মাসি আমাদের দুধ দিয়ে যেত তার নাতির কি খুব অসুখ?”
     বাবা খুব চমকে উঠলেন৷ আমি তো বটেই৷  বাবা মুখে বলল, “কেন? কী হয়েছে শিবের?”
      পিসিমণি বলল, বাস থেকে নেমে টোটোর খোঁজ করছি৷ দেখি,পুঁটেদা কাছের একটা নার্সিং হোমের সামনে৷ আমাকে চিনতে পারে নি নিশ্চয়ই৷ শুনলাম, পাশে দাঁড়ানো একজনকে বলছে, ‘এক্ষুনি বেশ খানিকটা টাকার জোগাড় না হলে  ছোট ছেলেটাকে বাঁচাতে পারব না৷’ আমি ভাবলাম তোকে বলব এসে, যদি কোনো ব্যবস্হা হয়৷”
     আমি ঝলমলে দিনের আলোয় চোখে যেন অন্ধকার দেখছি৷ প্রচন্ড শীত শীত ভাব নিয়ে পিসিমণিকে জড়িয়ে ধরতে ধরতে দেখলাম, বাবা হন্তদন্ত হয়ে বাইরে বেড়িয়ে গেল৷

holi festival banner design with illustration of two young women dancing in front of a bright, colorful background.

Published on – Sunday, March 01, 2026

মন্দিরময় পাথরার কথা

সুতনু ঘোষ

         Archeological Survey of India এর অন্তর্ভুক্ত পশ্চিম মেদিনীপুরের একটি গুরুত্বপূর্ণ পুরাকীর্তি স্থল পাথরা , মন্দিরময় পাথরা। পাথরার বয়স্কদের মুখে প্রবাদের মতো প্রচলিত একটি ছড়া – “শিব মন্দির ছিল ঊনআশি, আশি হলেই হয়ে যেত কাশি।” অর্থাৎ এককালে কি বিপুল সংখ্যক পুরোণো মন্দিরের উপস্থিতি ছিল। বর্তমানে যে গ্রামে প্রাচীন চৌত্রিশটি মন্দিরের অবস্থান , যেখানে এলে বাংলার মন্দির শৈলীর প্রায় সবগুলিরই ( চালা , রত্ন , দেউল , মঞ্চ , দালান ) দর্শন হয়ে যায় তার আগে মন্দিরময় শব্দটি এমনিতেই যুক্ত হয়ে যায় । 
মেদিনীপুর সদরের অন্তর্গত পাথরা গ্রামের দক্ষিণে প্রবহমান কংসাবতী নদী । নদীর পাড়ে চাষের ক্ষেত । আর ছড়িয়ে থাকা মন্দিরের সারি । গুপ্তযুগে তাম্রলিপ্ত বন্দরের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র ছিল এই স্থান । পালযুগে এখানে হিন্দু , বৌদ্ধ ও জৈনদের উপস্থিতি লক্ষনীয় ।
এখান থেকে যে কয়েকটি প্রাচীন পুরাবস্তুর সন্ধান মিলেছে তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বিষ্ণু লোকশ্বর মূর্তিটি । মজে যাওয়া জমিদার দীঘি থেকে ১৯৬১ সালে পাওয়া গিয়েছিল মূর্তিটি । এই মূর্তিটি দশম শতকের বলে অনুমান করা হচ্ছে । এছাড়া এখানে প্রাচীন শিখর মন্দিরের আমলক শিলা দেখতে পাওয়া গিয়েছে ।
জেমস রেনেলের ম্যাপে পাথরাকে কংসাবতীর তীরে একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখানো রয়েছে । যেখানে , তিনটি প্রাচীন রাস্তা এসে মিলেছে পাথরাতে ।
বাংলার নবাব আলিবর্দি খাঁ এর সময়ে রতনচক পরগণার অন্তর্ভুক্ত ছিল পাথরা । এই স্থানের রাজস্ব আদায়ের দায়িত্বে ছিলেন বিদ্যানন্দ ঘোষাল। তার একটি জমিদারিও ছিল পাথরাতে ।
তিনি বেশ কয়েকটি মন্দির নির্মাণ করেছিলেন এখানে । এরপর বিদ্যানন্দের বংশধরেরা এখানে জমিদারি এবং নীল ও রেশমের ব্যবসা সামলাতে থাকে । ঘোষাল বংশের পরে মজুমদার , বন্দ্যোপাধ্যায় , চট্টোপাধ্যায়েরা এখানে জমিদারি দেখাশোনা করত। তারা ব্যবসার লাভের অর্থে মন্দির নির্মাণ করে গিয়েছে ।
আজ পর্যন্ত কটি মন্দির তারা নির্মাণ করেছিল তা জানা যায় না । কয়েক দশেক আগে এখানে যে বাজারপাড়া ছিল , তার চিহ্নও মুছে গিয়েছে ।
তবে এখনও পর্যন্ত যে কয়েকটি মন্দির ও অন্যান্য প্রাচীন স্থাপত্য অবশিষ্ট রয়েছে তার সংখ্যা চৌত্রিশটি । এগুলির গায়ে টেরাকোটার অলঙ্করণগুলি অধিকাংশই নষ্ট হয়ে গিয়েছে । পাথরার বেশ কয়েকটি মন্দিরে টেরাকোটার দ্বারপালগুলি তুলনামূলক ভালো অবস্থায় রয়েছে ।
আরও কত কিছু যে কালের গর্ভে ও কংসাবতীর গর্ভে হারিয়ে গিয়েছে তার হিসেব পাওয়া দুষ্কর ।
বর্তমান মন্দিরগুলির মধ্যে কয়েকটি সংরক্ষণ করে রেখেছে Archeological Survey of India এর Kolkata Circle . তারা এগুলিকে চারটি Temple Complex এ ভাগ করেছে ।
প্রথমটি , Dharmaraj Temple Complex ( N-WB-102)। ধর্মরাজ মন্দিরটি রাস্তার দক্ষিণদিকে একটু দূরে কংসাবতীর পাড়ে অবস্থিত । মন্দিরটি দক্ষিণমুখী , পঞ্চরত্ন রীতির । অষ্টাদশ শতকের শেষের দিকে মন্দিরটি তৈরী হয়েছিল । বর্তমানে মন্দিরটি বিগ্রহহীন , বিগ্রহটি পুরোহিতের বাড়িতে নিত্যপূজিত ।
দ্বিতীয়টি , Nabaratna Temple Complex & Kalachand Temple Complex ( N-WB-105 )
এটি ধর্মরাজ মন্দিরের কিছু পূর্বে অবস্থিত । Nabaratna Complex এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য মন্দিরটি মজুমদার পরিবারের পশ্চিমমুখী নবরত্ন মন্দির । অষ্টাদশ শতকের কোনও এক সময় প্রতিষ্ঠার আগে মন্দিরে বাজ পড়ার ফলে মন্দিরটি অভিশপ্ত মনে করায় পরিত্যক্ত হয়ে যায় ।
তার উত্তর দিকে দালান রীতির চারটি শিবালয় আছে । আগে নাকি , এরকম আরও আটটি , মোট বারোটি শিবালয় ছিল নবরত্ন মন্দিরের চারপাশ ঘিরে । এখানে একটি ছোট আকারের তুলসীমঞ্চ দেখা যায় ।
নবরত্ন মন্দিরের পেছনের দিকে একটি আটচালা শিবালয় রয়েছে । তার ভেতরের ছাদে লাল হলুদ রঙ দিয়ে যে নকশাটি রয়েছে , সেটি এখানকার একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ ।
Kalachand Complex – এর কালাচাঁদ মন্দিরটি দালান রীতির । এই মন্দিরটির উত্তরে পাশাপাশি তিনটি পুবমুখী আটচালা মন্দির রয়েছে , এর মধ্যে দুটি মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৪৯ ও ১৮৫১ খ্রীষ্টাব্দ ।
এছাড়া চালা ও রত্ন রীতির আরও কয়েকটি মন্দির আছে এখানে ।
কালাচাঁদ চত্বরের একেবারে উত্তরে একটি মাকড়া পাথরের প্রাচীন ভাঙা স্থাপত্য রয়েছে । এটি ছিল মজুমদার পরিবারের দুর্গামন্ডপ ।
তৃতীয়টি , Sitala Temple Complex ( N-WB-104 )
দক্ষিণমুখী শীতলা মন্দিরটি সপ্তরথ দেউল আকারে নির্মিত । অষ্টাদশ শতকে এটি নির্মিত হয়েছিল । একসময় এখানেই মজুমদার বংশের গৃহদেবতার পুজো হত ।
চতুর্থটি , Banerjee Temple Complex ( N-WB-103 )
এখানে ঢুকতে ডানদিকে রয়েছে তিনটি পঞ্চরত্ন রীতির শিব মন্দির । এদের মধ্যে সবচেয়ে উত্তর দিকের মন্দিরটি ১৮১৬ খ্রীষ্টাব্দে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
কিছুটা এগিয়ে গেলে একটি দোতলা কাছারি বাড়ি ও তার কাছে দালান রীতির দুটি শিব মন্দির রয়েছে ।
কাছারি বাড়ির দক্ষিণ পূর্ব কোণে একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্যের দেখা মেলে । সেটি হল নবরত্ন অষ্টকোণাকৃতি একটি রাসমঞ্চ । ১৮৩২ খ্রীষ্টাব্দে যাদবেন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় রাসমঞ্চটির নির্মাণ করেছিলেন । একই সময়ে নির্মিত একটি পিতলের রথ ছিল এখানে , যার গায়ে এচিং এর কারুকাজ ছিল । বর্তমানে তার কোনও চিহ্ন নেই ।
এই মন্দিরগুলির কিছু উত্তরে হাটতলায় বন্দ্যোপাধ্যায়দের রেশমের কুঠী ছিল । এখানে রয়েছে আরও চারটি পঞ্চরত্ন শিব মন্দির । এগুলির একটির প্রতিষ্ঠাকাল ১৮৬৬ খ্রীষ্টাব্দ।
পাথরায় ঢুকতেই আরও দুটি মন্দির দেখা যায় গোলমাতা ও শিব মন্দির। এগুলি বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের মন্দির। দালান রীতির গোলমাতা মন্দিরটি ভেঙে পড়লে সেখানেই একটি নতুন মন্দির করা হয়। তার পাশে রয়েছে আটচালা শিব মন্দির। মন্দিরটি জীর্ণ হয়ে পড়লে সংস্কার করা হয়। এছাড়াও রয়েছে জীর্ণ সূর্য মন্দির, পঞ্চরত্ন সর্বমঙ্গলা মন্দির, রত্নেশ্বর শিব মন্দির, দশমহাবিদ্যা মন্দির প্রভৃতি।
মন্দিরময় পাথরার প্রাণপুরুষ বলা হয় ইয়াসিন পাঠানকে । তিনিই প্রথম পাথরা গ্রামের মন্দিরগুলি ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচানোর জন্য আন্দোলন শুরু করেন । পার্শ্ববর্তী সকল ধর্মের মানুষকে এই কাজে যুক্ত করতে পেরেছিলেন । গড়ে উঠেছিল পাথরা পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ কমিটি । তাদের দীর্ঘদিনের লড়াইয়ের পর ২০০৩ সালে Archaeological Survey of India পাথরার ৩৪ টি মন্দির ও সংলগ্ন কিছু জমি অধিগ্রহণ করে । ইয়াসিন পাঠান তার কাজের জন্য রাষ্ট্রপতি শঙ্করদয়াল শর্মার কাছ থেকে ” কবীর ” পুরষ্কার পেয়েছেন । তার লেখা দুটি উল্লেখযোগ্য বই “Archeological list and map of district Paschim Medinipur ” এবং ” মন্দিরময় পাথরার ইতিবৃত্ত ” ।
বর্তমানে পাথরা পুরাতত্ত্ব সংরক্ষণ কমিটির প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক – মহঃ ইয়াসিন পাঠান এবং সভাপতি – জয়ন্ত কুমার সামন্ত ।
 
 
তথ্যসূত্র :-
অবহেলিত পুরাকীর্তির প্রাচুর্য : পাথরার দেবদেউল – তারাপদ সাঁতরা
পুরাকীর্তি সমীক্ষা ( মেদিনীপুর ) – তারাপদ সাঁতরা
পশ্চিমবঙ্গের মন্দির – শম্ভু ভট্টাচার্য্য
Scroll to Top