ইতিহাস ঐতিহ্যের আলোয় নিশ্চিন্তপুরের মা বিশালাক্ষী
বিশ্বজিৎ রায়
ইতিহাস কখনো মানুষের কথা বলে , সভ্যতা তারই অনুলিখিত অভিক্ষেপণ। আর এই ইতিহাস চর্চায় আজ আমরা আলোকপাত করব স্থানীয় গ্রাম নিশ্চিন্তপুরের ঐতিহ্যবাহী দেবী বিশালাক্ষী মাতার প্রতিষ্ঠা ও পূজা আরাধনার।
অধুনা পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা মহকুমার অন্তর্গত বাঘনা পাড়া পঞ্চায়েতের অধীনে অবস্থিত নিশ্চিন্তপুর গ্রামটি। প্রথমে আমরা প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী জনপদ বাঘনাপাড়া সম্পর্কে দু-এক কথা বলি।
জনশ্রুতি আছে, প্রাচীনকালে ব্যঘ্রপাদ ঋষি নামে একজন তান্ত্রিক এই জনপদে বাস করতেন। তার নামানুসারে ব্যঘ্র পাঠক আশ্রম বা ব্যঘ্র পদাশ্রম নামে পরিচিত হয় জনপদটি। সেইমতো ভাগনাপাড়া বা বাঘনাপাড়া নামটি জনমানসে স্বীকৃতি লাভ করে।
বৈষ্ণব সাধন ক্ষেত্র বলে পরিচিত বাঘনাপাড়া নামক শ্রীপাটটি (জনপদ )প্রতিষ্ঠা করেন বৈষ্ণব সাধক রামচন্দ্র গোস্বামী।
যদিও এও এক জনশ্রুতি বলেই পরিচিত।
যাই হোক, আজকের আলোচনায় ফিরি।নিশ্চিন্তপুর গ্রামটির এমন নামকরণের পিছনে সঠিক কোনো প্রামাণ্য কথা বা তথ্য এখনো পাওয়া যায়নি। সাধারণত বাংলার পাঁচটি গ্রামের নামকরণের ক্ষেত্রে যেমন হয়ে থাকে, হয়তো তেমনি বলা যেতে পারে।

ইতিহাসের সাক্ষ্যে আমরা যতটুকু জানতে পারি, আনুমানিক চারশো থেকে সাড়ে চারশো বছরের পুরাতন নিশ্চিন্তপুর নামক গ্রামটি এবং পার্শ্ববর্তী বাঘনাপাড়া অঞ্চলের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আমরা সকলেই কম-বেশি জানি।
নিশ্চিন্তপুর গ্রামের অধিষ্ঠাত্রী দেবী বিশালাক্ষী মাতার আবির্ভাব নিয়ে একাধিক জনশ্রুতি এখনো বর্তমান। তবে প্রধান সেবাইত বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের মতে, একদা এই পরিবারের পূর্বপুরুষগণ এই পুজোর লালন-পালন করলেও, বর্তমান সেবাইত মুখোপাধ্যায় পরিবার এবং গ্রামের সকল বাসিন্দার আন্তরিক সাহচর্যে পূজাটি বর্তমানে সার্বজনীন মাতৃ আরাধনার রূপ পেয়েছে।
আনুমানিক পাঁচশো বছরের পুরাতন এই পুজোর আবির্ভাবের ইতিহাস, গ্রামের নামকরণের মতোই কৌতূহলদ্দীপক। সঠিক প্রামাণ্য পরিসরের অবকাশ থাকলেও আধুনালুপ্ত ভাগীরথীর শাখা নদী ভল্লুকার চড়ায় চড়াভূমিতে গড়ে ওঠা এই গ্রাম বিগত চারশো বছরের অধিক সময়ে আপন মহিমায় ভাস্মর।
বিগত জনশ্রুতি ছাড়াও পারিপার্শ্বিক ভৌগোলিক তথ্য বিচারে জানা যায়, ভল্লুকা নদীর নতুন জেগে ওঠা চড়ায় নিরিবিলি বন জঙ্গলের মাঝে তান্ত্রিকগণের সাধন পীঠে তন্ত্র সাধনার চল ছিল।
আর সেই প্রেক্ষাপটে বিশালাক্ষী মাতার প্রধান সেবাইত বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের পূর্বপুরুষ ভগবতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই পঞ্চমুন্ডীর আসন প্রতিষ্ঠা এবং তারই উপরে মূল বিগ্রহের স্থাপনা হয়। এখানের দেবী মূর্তিটির বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য পরিলক্ষিত হয়।
বিশালাক্ষী মাতা মূলত মা দুর্গার অপর রূপ হিসেবে পূজিতা হলেও, এখানে দেবী মূর্তির গলে মুন্ডমালা, হাতে রক্তমুন্ড ছাড়াও শায়িত মহাদেবের বুকে পা রেখেই তার দণ্ডায়মান অবস্থান। এবং অন্যত্র দেবী মূর্তির দুই পাশে জয়া-বিজয়া নামক দুই সখীর দেখা না মিললেও, এখানে তা দেখা যায়।
আমাদের মনে হয় পঞ্চমুন্ডীর আসন থেকে নরমুন্ডমালা প্রভৃতি বৈশিষ্ট্যগুলি এখানের মাটিকে শক্তি সাধন ক্ষেত্র বলেই পরিচিতি দান করেছে।
আমরা আজ মাতৃ বিগ্রহের যে রূপ পাই, তাও নাকি ভগবতী বন্দ্যোপাধ্যায়ের স্বপ্নে পাওয়া মাতৃমূর্তির আদলে তৈরি বলে জনশ্রুতি আছে। যদিও কালের নিয়মে ধীরে ধীরে নদীর বিলুপ্তির সাথে সাথে, দেবী মূর্তির আশপাশের নদীর চড়াভূমিতে বর্তমান নিশ্চিন্তপুর গ্রামের রূপ প্রতীয়মান হয়ে ওঠে। প্রায় চারশো বছরের অধিক সময়ের কথা।
গ্রামে সব সম্প্রদায়ের বসতি থাকলেও, মূলত এ দেশীয় সদগোপ সম্প্রদায়ের সংখ্যাই বেশি। কৃষি প্রধান এই গ্রামে গ্রামীণ সংস্কৃতি ও পূজা পার্বণ বিশেষ জায়গা নিয়ে এসেছে অতীত সময় থেকেই।
দেবীর নিত্য পূজা এবং সন্ধ্যা আরতি প্রত্যহ নিয়ম মেনে আয়োজিত হলেও, প্রতি বারো বছর অন্তর প্রতিষ্ঠা দিবস অন্য মাত্রা যুক্ত করে দেবী আরাধনায়।
তবে বর্তমানে প্রধান সেবাইত দিলীপ মুখার্জি এবং নির্মল মুখার্জির মতে, প্রতি বারো বছর অন্তর মূর্তি প্রতিষ্ঠা এবং আরাধনা পূর্ণ শাস্ত্রীয় বিধিমান্যতা দিয়ে হয়; তা কিন্তু নয়। বরং দেবী বিগ্রহের ঔজ্জ্বল্য ও আনুষঙ্গিক পূজা আচারের কারণেই এই বিধি চলে আসছে।
এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো, প্রথম প্রতিষ্ঠিত দেবী মূর্তি সময়ের বিবর্তনে ক্রমবিবর্তিত হয়ে সময়ান্তরেও নানা আদলে আরাধিত হয়েছে। এও শিল্প কীর্তির এক অনন্য নিদর্শন।
নিশ্চিন্তপুরের বিশালাক্ষী মাতার আরাধনা আজ কমবেশি প্রায় পাঁচশো বছর অতিক্রান্ত। তবু দেবী মহিমা ক্রমপ্রসারণমান। যা আজ বাংলা তথা ভারতের অন্যতম প্রাচীন ঈশ্বর উপাসনা স্থল হিসেবে সর্বজন স্বীকৃতি লাভ করেছে।
আনুমানিক ১৯৬০ — ৬২ সাল নাগাদ পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পুরাতত্ত্ব বিভাগ গ্রামটি পরিদর্শনের সাথে সাথে মন্দির ও দেবী বিগ্রহের উদ্ভব এবং নানা আনুসঙ্গিক বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করেন ৷জানা যায় বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবারের উত্তরসূরি শ্রী হরনায়ায়ণ বন্দ্যোপাধ্যায় এই সংক্রান্ত কিছু তথ্য প্রমাণ তাঁদের হাতে তুলে দেন ৷ কিন্তু দুঃখের বিষয় ,সরকারী তরফ থেকে এতদিনেও বিশেষ কোনো সাড়া মেলেনি — বাংলার অন্যতম প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী এই সাধনস্থলকে সরকারী স্বীকৃতি দানের মধ্য দিয়ে ৷তবু ভক্তের আত্ম—মান্যতা চিরবিরাজমান আজও ৷
এখন ইতিহাস আলোচনার শেষে আমরা স্বীকার করে নিতে দ্বিধা করি না যে, নিশ্চিন্তপুর গ্রাম এবং অধিষ্ঠাত্রী দেবী বিশালাক্ষী মাতার প্রতিষ্ঠা ও বর্তমান বিস্তারনের যে সকল তথ্য এখানে সন্নিবেশিত হয়েছে, তা স্বয়ংসম্পূর্ণ নয় ঠিকই ৷ এ বিষয়ে আরও গবেষণার অবকাশ আছে, তা স্বীকার করতেই হয়।
আর এই গবেষণার বিষয়ে একটি কথা বলে রাখি।
আমরা যুক্তি ও বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির আধারে তথ্য সন্নিবেশের পথে এগিয়েছি। সেই কারণে অনেক যুক্তিহীন শোনা গল্পকে বাদ দিতে হয়েছে।
আমরা এই প্রবন্ধের মধ্যে দিয়ে এও দাবি করব, যে কোনো ইতিহাস আলোচনা আমাদের কাছে আগামীর চিন্তার দ্বার উন্মুক্ত করে দেয়। দেশের অজানা ভৌগোলিক পরিচিতিকে সভ্যতার অপর অলংকার করে তোলে তার সত্য জ্ঞানের মধ্য দিয়ে
আমরা তাই সমগ্র বাঘনপাড়া অঞ্চলের সঠিক ইতিহাস পুনরুদ্ধারের জন্য কোন যোগ্য ইতিহাস গবেষককে আহ্বান জানাই এবং আঞ্চলিক ইতিহাস পরম্পরাকে সম্পূর্ণ করে তুলতে বলি আগামীর দায়বদ্ধতায়।
বিশ্বজিৎ রায়
লেখক পরিচিতিঃ পূর্ব বর্ধমান জেলার কালনা থানার অধীন নিশ্চিন্তপুর গ্রামে ইং ১৯৮৬ খ্রীঃ জন্মগ্রহণ করেন। স্থানীয় সিমলন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করে, বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতকোত্তর পাঠ সম্পূর্ণ করেন। একাধিক সাহিত্য পত্রপত্রিকার সঙ্গে যুক্ত। প্রকাশিত হয়েছে নানা মৌলিক রচনা।* *’সংবর্তিকা’- তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ হলেও ‘ডায়ালেকটিক্স দাই প্যারাফেজ অব ড্রিমস’- নামে প্রকাশিত একটি ইংরেজি প্রবন্ধগ্রন্থ ইতিমধ্যে পাঠক-ভাবনায় অন্য পরিচিতি লাভ করেছে।*
*সম্প্রতি দিল্লীস্থিত ‘লিপিসত্র’- নামক সাহিত্য-সংস্থা দ্বারা অনুষ্ঠিত এক আন্তর্জাতিক সাহিত্য সংকলনে লেখকের প্রকাশিত প্রবন্ধ ‘নহবতের দরদালান’- পাঠক মহলে বিশেষ সমাদ্রিত হয়েছে।।*
